শিরোনাম:

• প্রথম ৬ মাসের বাজেটের অগ্রগতির প্রতিবেদন সংসদে আগামী সপ্তাহে   • পবন বিএনপির কার্যালয়ে বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী: শোভনের স্বীকারোক্তি   • রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর বেতন ৮৩ শতাংশ বেড়েছে   • সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা বেশির ভাগ নারী নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত: খালেদা জিয়া   • তিনদিনের ম্যাচ (চট্টগ্রাম): বাংলাদেশ ‘এ’ ২০২ ও ১৩১/৩, রকিবুল ৫০*, ইংল্যান্ড ২৮১/৭ডি (২য় দিন শেষে)   • নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক সব আইন বাতিল করা হবে: প্রধানমন্ত্রী    • পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সহিংসতার অজুহাতে নেতা-কর্মীদের হয়রানি করবেন না: বিএনপি   • সেগুনবাগিচায় আকরাম টাওয়ারে আগুন লেগেছে   • ‘সমঅধিকার, সমসুযোগ সকলের জন্য’ স্লোগান নিয়ে নারী পুলিশদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত   • অস্কার জিতল ‘দ্যা হার্ট লকার’  

যারা এসিড ছোড়ে, তাদের প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার

বিশেষ প্রতিনিধি | তারিখ: ০৮-০৩-২০১০

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

আয়োজনটির উপলক্ষ আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার শতবর্ষপূর্তি। এতে সমবেত হয়েছিলেন কয়েক হাজার নানা বয়সী পুরুষ। ফাগুনের পড়ন্ত বিকেলে তাঁরা ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরের সামনে দৃপ্তকণ্ঠে শপথ নিয়েছেন—নারী ও শিশু নির্যাতন করবেন না। যারা নারীর প্রতি এসিড ছোড়ে, তাদের প্রতিরোধ করবেন, যাতে আর একটি মুখও এসিডে ঝলসে না যায়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল তখন। হাতে হাতে ধরা মোমের আগুনে ছড়িয়ে পড়া আলোয় তাঁরা সমাজের অন্ধকার দূর করে আলোকিত ভবিষ্যত্ রচনার অঙ্গীকার করেছেন।
গতকাল রোববার বিকেলে এসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুরুষদের অঙ্গীকারের এই সমাবেশ যৌথভাবে আয়োজন করেছিল প্রথম আলো ট্রাস্ট ও এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ)। সহযোগিতায় ছিল দেশটিভি। এসিড-সন্ত্রাসের মতো ঘৃণ্য অপকর্ম প্রতিরোধের জন্য জনসচেতনতা এবং এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের জন্য প্রথম আলো ও এএসএফ ২০০২ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথম এ ধরনের পুরুষ সমাবেশের আয়োজন করেছিল। সেই কর্মসূচি এখন পরিণত হয়েছে সামাজিক আন্দোলনে। সরকার এসিড-সন্ত্রাস আইন পাস করেছে। সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা সম্প্রতি কমে এলেও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। গত বছরেও ১৪৫টি এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালের মধ্যে সমাজের এই কলঙ্কময় ক্ষত সম্পূর্ণ নিরাময়ের লক্ষ্যে প্রথম আলো ও এএসএফের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আগের দিন অনুষ্ঠিত হলো পুরুষ সমাবেশ।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার সূচনা। এরপর অতিথিরা এসিড-সন্ত্রাসের শিকার নারী ও শিশুদের নিয়ে রঙিন বেলুনগুচ্ছ উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সমাবেশে অংশ নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন। এর আগে স্বাগত বক্তব্য দেন এএসএফের নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান। তিনি বলেন, ২০০২ সালে দেশে এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ছিল ৪৯০টি, ২০০৯ সালে ১৪৫। এখনো দেশে গড়ে প্রতি দুই দিনে একটি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এসিড নিক্ষেপকারীরা মূলত পুরুষ এবং এর প্রধান শিকার নারী। সে কারণেই এসিড-সন্ত্রাস প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে পুরুষদের এই সমাবেশ।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এসিড-সন্ত্রাসের মতো জঘন্য অপরাধ অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখের। তিনি এসিড-নিক্ষেপকারীদের প্রতিরোধ করার জন্য তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যে আইন আছে, তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে এসিড সহজেই সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও নানা জটিলতার কারণে নির্যাতিতরা উপযুক্ত বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রথম আলো ২০০০ সাল থেকে এসিড-সন্ত্রাস বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ সৃষ্টিতে কাজ করছে। গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি ছাড়াও এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল গঠন করে এ পর্যন্ত ২৩০ জন এসিডদগ্ধ নারীকে আইনি, চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর এই কার্যক্রম সারা দেশে চলছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
অঙ্গীকার সমাবেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। ঘোষণায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে আইনের বাস্তবায়ন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, এসিডের অপব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এই আয়োজনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিশিষ্টজনদের এক মিনিটের বক্তৃতার পালা শুরু হয় এরপর। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, আইনে প্রাণদণ্ডের বিধান থাকলেও শুধু প্রাণদণ্ড দিয়েই অপরাধ দমন করা যায় না। প্রতিরোধ করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি অঙ্গীকার করার পাশাপাশি যাঁরা এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন, তাঁদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতিশীল আচরণ করারও আহ্বান জানান।
প্রথম আলো ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘এই সভ্য যুগে আমাদের দেশে পুরুষেরা নারীর প্রতি এসিড নিক্ষেপ করছে, পুরুষ হিসেবে আমি এতে অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করি। সমাজের উন্নয়নের জন্য পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বতোভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, নারীর মুক্তি মানেই মানবজাতির মুক্তি। নারীকে পশ্চাত্পদ রেখে মানবজাতি এগোতে পারবে না।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আইনের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি তো পরে। আগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যাতে কেউ আক্রান্ত না হয়, সে জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘আমাদের যা কিছু সাফল্য, তা নারী ও পুরুষের মিলিত চেষ্টায় সম্ভব হয়েছে। এই প্রিয় স্বদেশকে গড়তে এই মিলিত চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, সরকার নারী নীতি প্রণয়নে কাজ শুরু করেছে। দ্রুতই তা আইনে পরিণত হবে। তবে সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য সমাজে উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে।
সংহতি প্রকাশের ফাঁকে ফাঁকে ছিল এসিড-সন্ত্রাসের শিকার নারীদের গানের দল পঞ্চমসুরের শিল্পীদের সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা। তাঁরা গেয়েছেন ‘দেখ সন্ত্রাসীরা এসিডে পোড়ে না অন্তর/ বল সুন্দর সুন্দর সুন্দর।’ ‘ময়না ছলাত্ ছলাত্ চলে রে পেছন ফিরে চায় না রে’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেছে এসিডদগ্ধ শিশু বাবলি। শিল্পী শুভ্রদেব সংহিত প্রকাশ করে তাঁদের নিয়ে গেয়েছেন ‘সত্ মানুষ কখনো এসিড ছোড়ে না।’
জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ বলেন, ‘যারা এসিড ছোড়ে, তারা কাপুরুষ। এরা কীটপতঙ্গের চেয়েও হীন। এদের আমরা রুখবই।’
লেখক আনিসুল হক বলেন, মানুষ কখনো এসিড ছোড়ে না। যারা এসিড ছোড়ে তারা অমানুষ। এরা দেশমাতৃকার মুখ মলিন করে দেয়। এদের সবাই মিলে প্রতিরোধ করতে হবে।
প্রথম আলো ট্রাস্টের সদস্য তানজীব-উল আলম বলেন, আইন থাকলেই হবে না, তার যথাযথ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
এএসএফের চেয়ারপারসন পারভীন মাহমুদ আগামী প্রজন্মকে এসিড-সন্ত্রাসের কলঙ্কমুক্ত একটি দেশ উপহার দিতে নারী-পুরুষ সম-অধিকারের ভিত্তিতে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
এরপর ‘আলোর পথযাত্রী’ গানের সঙ্গে মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্বের সমাপ্তি হয়। দ্বিতীয় পর্বে ছিল রাশেদ উদ্দীন তপুর ব্যান্ড ‘যাত্রী’র গান। যাত্রীর সঙ্গে শ্রোতাদের গান শুনিয়েছেন বিউটি, কনা, রুমি, জয়, দীপ্ত। অনুষ্ঠানে সহায়তা করেছেন প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা।
আজ ১৫ জেলায় অনুষ্ঠান: আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল ও এএসএফের উদ্যোগে এসিড-সন্ত্রাস বেশি হয়, এমন ১৫টি শহরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জাগো মানুষ রোখো এসিড-সন্ত্রাস শিরোনামের এ কর্মসূচিতে থাকবে এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা ও মুক্ত আলোচনা। প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা এসব কর্মসূচি পালনে সহায়তা করবেন।
অনুষ্ঠান হবে জামালপুরে গণগ্রন্থাগারে। গাজীপুর, নীলফামারি, ময়মনসিংহ, পাবনা, দিনাজপুর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় স্থানীয় প্রেসক্লাবে। নেত্রকোনায় শহীদ মিনারে, সিরাজগঞ্জ ভিক্টোরিয়া স্কুলে, ভোলা বাংলা স্কুলের মোড়ে, বগুড়ায় শহীদ খোকন পার্কে, যশোর সমবায় ভবনে, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজে এবং রংপুরে কাচারী বাজার ট্রাফিক মোড়ে। প্রতিটি জেলাতেই অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ১০টায়।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন