মুক্ত সংলাপে বক্তারা
মাদক থেকে বাঁচাতে পারে পারিবারিক বন্ধন
মাদকাসক্তি একটি রোগ। তবে যথাযথ চিকিৎসা ও যত্নের মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এ রোগ থেকে মুক্ত থাকতে হলে ঘৃণা করতে হবে মাদককে, ভালোবাসতে হবে জীবনকে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে মাদক সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। পারিবারিক বন্ধন ও শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন, সৎ উপার্জন ইত্যাদি পারে মাদক থেকে বাঁচাতে।
‘মাদকমুক্ত সুস্থ জীবন’-এর প্রত্যাশায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী মুক্ত সংলাপে এ বিষয়গুলোই উঠে আসে বারবার। সংলাপে অংশ নেন মন্ত্রী, মাদকবিরোধী আন্দোলনকর্মী, মাদক থেকে মুক্তি পাওয়া তরুণ-শিশু, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। প্রথম আলোর মাদকবিরোধী আন্দোলন, বাংলালিংক ও প্রথম আলো বন্ধুসভা যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গান গেয়ে শোনান কণ্ঠশিল্পী তানভীর আলম সজীব। ‘ফিরে এলাম জন্মভূমি’ এবং ‘কবে যাবো পাহাড়ে’ শিরোনামে পরপর দুটি গান শুনিয়ে দর্শক ও অতিথিদের মুগ্ধ করেন তিনি।
যুদ্ধ শুরু হয়েছে: প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছি।’ প্রতিমন্ত্রী জানান, শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সীমান্তসংলগ্ন ফেনসিডিলের কারখানাগুলো বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও যুগোপযোগী করা ও নতুন তিনটি মাদক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শামসুল হক বলেন, তিনি আইনজীবী বা হাজার কোটি টাকার মালিক পুঁজিপতিকেও আহাজারি করতে দেখেছেন। কারণ, তাঁর একমাত্র সন্তান মাদকাসক্ত।
পারিবারিক জীবনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন দেখতাম, ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরে কি না, তা দেখার জন্য বাবারা সন্ধ্যার আগে বাড়িতে এসে বসে থাকতেন। এ চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।’
জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান বলেন, শুধু সরকারকে দোষারোপ করলে হবে না। সবারই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা শহরে যে অল্প কয়টা খেলার মাঠ আছে, এর কতগুলো আবার ভূমিদস্যুদের দখলে। তারা আবার আস্ফাালনও করে। খেলাধুলাসহ সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের সব পথ আমরা রুদ্ধ করে দিয়েছি।’
মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, যাঁরা মাদকসেবী, তাঁরা ফাঁদে পড়ে গেছেন। তাঁদের সুচিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, মাদক রুখতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ, সামাজিক সচেতনতা আর বেসরকারি উদ্যোগ সব একসঙ্গে প্রয়োজন।
মাদক সমস্যার ভয়াবহতার মাত্রা তুলে ধরে প্রথম আলো ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘এসিড নিক্ষেপ বন্ধ করাসহ আমাদের অন্য প্রচেষ্টাগুলো সফল হচ্ছে। কিন্তু প্রথম আলো মাদকের বিরুদ্ধে আট বছর ধরে দেশব্যাপী জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করলেও মাদকাসক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মাদক আইনে বড় কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সাজা হয়েছে বলে শুনিনি। যারা ধরা পড়ে, তারা তো বাহক মাত্র।’
মাদক নির্মূলে দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টার তাগিদ দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এ সিদ্দিক।
বিতার্কিক ও উপস্থাপক আব্দুন নূর তুষার বলেন, ‘যখন পত্রিকায় দেখি মাদক ব্যবসায়ী আদালতের বারান্দায় পায়চারি করছে, তখন আমরা হতাশ হই। মাদক ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে।’
চাই সৎ জীবন: ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি কাজী রফিকুল আলম বলেন, সৎ জীবনযাপনের চর্চা করতে হবে। উপার্জন সৎ হলে ছেলেমেয়েরা মাদকের পথে যাবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মাদক বন্ধ করতে হলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বদলাতে হবে আচরণ।
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল মুশফিকুর রহমান বলেন, সম্পদের পাহাড় গড়লে হবে না। সবাই যদি শুধু নিজের স্বার্থ বোঝে, সমাজকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলে, তাহলে সন্তান তো মাদকাসক্ত হবেই।
পারিবারিক বন্ধন: অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত বলেন, ‘আমি চাই আমার সন্তানদের সেরা বন্ধু হতে। বাচ্চারা মানুষ হিসেবে গড়ে না ওঠা পর্যন্ত তাদের আগলে রাখাটাই আমার দায়িত্ব। তবে আমরা কেন যেন আমাদের পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে পারছি না।’
মাদকাসক্ত হয়েছিল এমন দুই সন্তানের বাবা নিজের করুণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সন্তানকে মাদক থেকে দূরে রাখতে সুস্থ পারিবারিক বলয় গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তাঁরা জানান, সন্তানেরা মাদক থেকে ফিরে আসার পর এখন তাদের সম্পর্ক অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ। সন্তান মাদকাসক্ত হলে অভিভাবকদের বিষয়টি অন্যকে জানিয়ে পরামর্শ চাওয়ার উপদেশ দেন এই দুই বাবা।
সোহেল ও দুর্জয়ের গল্প: মাত্র ১০-১২ বছর বয়সেই সোহেল আর দুর্জয় স্বাদ নিয়েছে প্রচলিত প্রায় সব মাদকের। মাদক নিরাময় কেন্দ্র ‘আপন’-এর পরিচালক ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল তাদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এই দুই বালক বলে, বাবা-মায়ের আদর-স্নেহ না পেয়ে তারা পথে পথে ঘুরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।
ব্রাদার রোনাল্ড বলেন, ‘মাদকাসক্তি সমাজে মর্যাদা হানিকর।’
মাদক নয়, অভিযান: মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে জীবনকে বন্দী করে না তরুণদের ছোট ছোট অভিযানে যাওয়ার পরামর্শ দেন প্রথম এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশি মুসা ইব্রাহীম। তিনি বলেন, ‘এভাবেই জীবন খুঁজে পাবে তার অর্থ। কিন্তু মাদকে জীবন হবে নষ্ট।’
বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান রওশনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম ও উপসম্পাদক আনিসুল হকও বক্তব্য দেন।
সেরা প্রতিবেদন: প্রথমবারের মতো আয়োজিত প্রথম আলো সেরা মাদকবিরোধী প্রতিবেদন প্রতিযোগিতার পুরস্কার দেওয়া হয় এ অনুষ্ঠানে। ‘মাদকের রাহুগ্রাস’ শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য প্রথম পুরস্কার পান দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার এমরানা আহমেদ। ‘নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে’ শিরোনামে সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য দ্বিতীয় পুরস্কার জিতেছেন তাসলিমা তামান্না।
‘বিপন্ন সভ্যতা: ক্ষয়ে যাচ্ছে তারুণ্য’ শিরোনামে কুমিল্লার কাগজ পত্রিকায় ছাপা হওয়া প্রতিবেদনের জন্য তৃতীয় পুরস্কার পান নিউ এজ-এর কুমিল্লা প্রতিনিধি ইয়াসমীন রীমা। তিনটি পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান যথাক্রমে ২৫ হাজার, ১৫ হাজার ও ১০ হাজার টাকা।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






