শিরোনাম:

এসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চাই প্রতিরোধ

আসাদুল্লাহ সরকার ও মজিবর রহমান খান, দিনাজপুর | তারিখ: ০৭-১০-২০১০

  • ২ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

‘দিনাজপুরে আমরা রুখবো এসিড-সন্ত্রাস’ শীর্ষক মুক্ত সংলাপে এসিডদগ্ধদের সঙ্গে অতিথিরা

ছবি: মঈনুল ইসলাম

‘আমি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী। ২০০২ সালের ১৯ জুন গভীর রাত। জানালা দিয়ে নিক্ষেপ করা তরল পদার্থে মুখমণ্ডল ভিজে যায়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে যায়। প্রথমে বিরামপুর হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার পর জীবন ফিরে পেলেও সমাজ আর আমাকে গ্রহণ করেনি। স্কুলে, স্বজনদের বাড়িতে বা সমাবেশে যেখানেই গেছি, আমার বিকৃত মুখ আর শরীরের গন্ধে সবাই সরে গেছে দূরে। পৃথিবী আমার কাছে এখন ধূসর-বিবর্ণ। জীবন অর্থহীন। কিন্তু আমি জানতে পারিনি, কে আমার দিকে এসিড ছুড়ে মেরেছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে বিরামপুরের কাটলাহাটের রওশন আরা যখন কান্নায় ভেঙে পড়েন, দিনাজপুর শিশু একাডেমী মিলনায়তনে তখন পিনপতন নীরবতা। সবার চোখে পানি।
বোচাগঞ্জ উপজেলার এসিডদগ্ধ রূপজানের অপরাধ ছিল, নিজের আয়ের টাকা সংসারের খরচ জোগাতে বাবার হাতে তুলে দেওয়া। বিয়ের আগে চাতালে কাজ করে তিনি বাবাকে সাহায্য করতেন। কিন্তু বিয়ের পর তা মানতে পারেননি স্বামী। তাই স্বামীর সঙ্গে বিবাদের এক রাতে তাঁর মুখ এসিডে ঝলসে দিয়ে নিরুদ্দেশ হলেন স্বামী। আর ফিরে আসেননি। রূপজান স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিলেন, কিন্তু টাকার অভাবে মামলা চালাতে পারেননি। একদিন মামলা খারিজ হয়ে যায়। আক্ষেপ করে রূপজান বললেন, যার খাবারের টাকার জোগাড় নেই, তার আবার বিচার পাওয়ার অধিকার!
আর প্রচণ্ড ক্ষোভে পার্বতীপুর উপজেলার বুলবুলি বেগম সমাজের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, কারা এসিড নিক্ষেপের শিকার? নারীরা। কোন নারী? যারা বিত্তহীন। বুলবুলির স্পষ্ট উচ্চারণ, শুধু সভা-সেমিনার করে এসিড-সন্ত্রাস রোধ করা যাবে না। একজন এসিড-সন্ত্রাসীকে ফাঁসি দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি না করা পর্যন্ত সমাজ থেকে এই সন্ত্রাস দূর হবে না।
ঘোড়াঘাটের রাশিদা খাতুন বখাটে যুবকের প্রেমে সাড়া দেননি। পরিণতিতে এসিডে ঝলসে দেওয়া হয়েছে তাঁর মুখমণ্ডলসহ সারা শরীর। সমাজপতি, চেয়ারম্যান, পুলিশ এমনকি আদালতের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে রাশিদা বলেন, বখাটে যুবকের কথাই সত্যি হয়েছে— টাকা দিয়ে সব কেনা যায়। কেনা গেছে।
এসিড-সন্ত্রাসের শিকার দিনাজপুরের চারজন নারী এভাবেই গতকাল বুধবার দেশের বিশিষ্টজন, জেলা ও পুলিশ প্রশাসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ সবার সামনে তাঁদের বঞ্চনার কথা প্রকাশ করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা এসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
ব্র্যাক ব্যাংকের সহায়তায় প্রথম আলো এসিড সহায়ক তহবিল আয়োজন করে ‘দিনাজপুরে আমরা রুখব এসিড-সন্ত্রাস’ শীর্ষক মুক্ত সংলাপ। আলোচনায় অংশ নেন জেলা প্রশাসক জামাল উদ্দিন আহমেদ, পুলিশ সুপার সিদ্দিকী তাঞ্জিলুর রহমান, প্রথম আলো সহায়ক তহবিলের উপদেষ্টা সামন্তলাল সেন, পারসোনা বিউটি কেয়ার লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কানিজ আলমাস খান, ব্র্যাক ব্যাংকের করপোরেট-বিষয়ক প্রধান জিসান কিংশুক হক, কণ্ঠশিল্পী তপন চৌধুরী, প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়কারী ফেরদৌস ফয়সাল ছাড়াও দিনাজপুরের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
দিনাজপুর শিশু একাডেমী মিলনায়তনে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। জেলার এসিড-সন্ত্রাসের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি আসাদুল্লাহ সরকার। এরপর ৫৮ জন এসিডদগ্ধ নারীর পক্ষে বিরামপুরের রওশন আরা, কহিনূর বেগম, পার্বতীপুরের বুলবুলি বেগম, ফুলবাড়ীর উলফাতুন বেগম ও মুক্তা রানী, দিনাজপুর সদরের নার্গিস বেগম ও বোচাগঞ্জের রূপজান বেগম তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। মুক্ত আলোচনা সঞ্চালন করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, ‘আমি ভবিষ্যতে আর কোনো এসিডদগ্ধের চিকিৎসা করতে চাই না। কারণ একজন এসিড-আক্রান্তকে যতই চিকিৎসা দেওয়া হোক না কেন, তার চেহারা আর আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা যায় না। এসিড-সন্ত্রাস নিরসনের একমাত্র পথ হলো প্রতিরোধ।’
জিসান কিংশুক হক এসিডদগ্ধ নারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন। এটাই বড় কথা। এসিড নিক্ষেপ ঘৃণ্য কাজ, এটা পরিবার থেকে শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারের এ শিক্ষাই সমাজ থেকে এসিড-সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধ রোধ করতে পারে।’
কানিজ আলমাস খান এসিডদগ্ধ নারীদের বলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে এসিডদগ্ধ নারীদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।
পুলিশ সুপার সিদ্দিকী তাঞ্জিলুর রহমান বলেন, এসিড-সন্ত্রাস পশুর তুল্য একটি জঘন্য অপরাধ। এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশের সক্রিয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতি মাসে রাজশাহী রেঞ্জের মাসিক সভা এবং জেলা এসিড প্রতিরোধ কমিটির সভায় এসিড-আক্রান্তের প্রতিটি ঘটনার পর্যালোচনা করা হয়।
তপন চৌধুরী আইজীবীদের উদ্দেশে বলেন, এসিড-সন্ত্রাসীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা না করলে দেশে এসিড-সন্ত্রাস দ্রুত প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এসিডদগ্ধ নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ‘আমার গানের অন্তরা/ আমার বাংলাদেশটা’ দেশাত্মবোধক গানটি গেয়ে শোনান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যে বিবেক আছে। কোনো না কোনো সময় তা জাগ্রত হয়। এসিড-সন্ত্রাস নিরসনে দেশের মানুষের মধ্যে বিবেককে নাড়া দিতে প্রথম আলোর উদ্যোগ সারা দেশে প্রভাব ফেলেছে।
দিনাজপুর জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘একটি দেশ যখন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে, তখন সমস্যা নিরসনের জন্য মানুষকে সচেতন করতে হয়। এখন আমাদের এসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতন করার পালা।’ তিনি বলেন, দেশে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন আছে, কিন্তু এর জন্য পৃথক কোনো আদালত নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি পৃথক আদালত গঠন ও আইনজীবী নিয়োগের দাবি জানান।
মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন পৌর মেয়র শফিকুল হক, কে বি এম কলেজের ইংরেজির শিক্ষক বিলকিস বানু, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক কান্তা রায়, আরডিআরএসের মাঠ সমন্বয়কারী অপূর্ব সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদ, আইনজীবী সিরাজুম মনিরা, শিক্ষক শফিকুল ইসলাম প্রমুখ। আলোচনার পর আমন্ত্রিত অতিথিরা এসিডদগ্ধদের হাতে তাঁতের শাড়ি তুলে দেন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
২০১০.১০.০৭ ০৪:৪৯
যত্রতত্র এসিডের প্রাপ‌্যতা কমানোর দায়িত্বটা কার ?

ABDUL MAJID QUAZI

ABDUL MAJID QUAZI

২০১০.১০.০৭ ০৮:০১
এসিড যারা নিক্কেপ করে তাদের বিচারের সাজাটা এসিডের মাধ্যমে দিলে এবং দুই একটি বিচার এভাবে হয়ে গেলে এটা কমবে।