জেলা-উপজেলা সর্বত্র একই চিত্র

হাত বাড়ালেই এসিড

শরিফুজ্জামান | তারিখ: ০৭-০৩-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

সরকারি ও বেসরকারি তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা তেমন কমেনি, আবার বাড়েওনি। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে সারা দেশে ১১৫টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে ১৫৩ জন। ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য—২০১৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পঞ্চাশে নামিয়ে আনা। জাতীয় এসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল এর সঙ্গে একমত হয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসিডের সহজলভ্যতায় বর্তমানে শুধু নারীরাই সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে না, পুরুষ এমনকি ছোট শিশুর জীবনও বিপন্ন হচ্ছে। প্রেমসংক্রান্ত কারণ ছাড়িয়ে এখন জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ অথবা রাজনৈতিক কোন্দলে অস্ত্র হিসেবে এই তরল পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। এএসএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে এসিড-সন্ত্রাসের ৩৭ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে জমিজমা ও সম্পদের বিরোধের কারণে। আর প্রেম প্রত্যাখ্যান ও বিয়েসংক্রান্ত ঘটনায় এই সন্ত্রাস হয়েছে ২২ শতাংশ।
তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে। কী কারণে এই সন্ত্রাস কমে গেল, তা নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো গবেষণা নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, গণমাধ্যমের প্রচার, আইনের প্রয়োগ বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ এই সুফল অর্জনে সহায়তা করেছে। অবশ্য এএসএফ ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে এসিড আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০০৯ সালে এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে ১২০টি। এতে আক্রান্ত হয় ১৫০ জন। ২০০২ সালে এসিড আক্রান্তের ঘটনা ছিল সর্বোচ্চ ৩৬৭টি, এসব ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছিল ৪৯০ জন।
এসিড-সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে আনতে এই মুহূর্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? এর জবাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসিডের সহজলভ্যতা বন্ধ করতে হবে। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার ও মিটফোর্ড এলাকার কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে যে পরিবেশ দেখা যায়, তাতে সেখান থেকে এসিড পাওয়া খুব একটা কঠিন বিষয় নয়।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের ব্যবসা-বাণিজ্য শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার বাবুল মিয়া জানান, এসিড পরিবহন, ব্যবহার ও বিক্রির জন্য লাইসেন্স রয়েছে ৫২৩টি। তবে লাইসেন্স ছাড়া কী পরিমাণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসিড কেনাবেচা ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত, সেই তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।
ঢাকার বাইরে চারটি জেলায় (ভোলা, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, পাবনা) প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা এসিডের সহজলভ্য ব্যবহার লক্ষ করেছেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাবনায় ছোট-বড় আট শতাধিক প্রতিষ্ঠানে এসিড কেনাবেচা ও ব্যবহার চলছে। এগুলোর মধ্যে লাইসেন্স নেওয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাত্র ১৫টি। দিনাজপুর জেলায় এসিড ব্যবহারকারী হিসেবে লাইসেন্স আছে ১৯ জনের। ভোলায় সহস্রাধিক ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসিড ব্যবহার করলেও নিয়ম মেনে ব্যবসা করছে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠান। সিরাজগঞ্জে ৮১টির লাইসেন্স থাকলেও এর ব্যবসায়ী কয়েক হাজার।
অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, দেশের কিছু এলাকায় সহজলভ্যতার কারণে এসিডের অপব্যবহার হচ্ছে। সহজলভ্য হওয়ার কারণেই সিরাজগঞ্জে এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়ছে বলে স্থানীয় নাগরিকদের ধারণা। সিরাজগঞ্জ জেলা এসিড নিয়ন্ত্রণ কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৮ সাল থেকে এক দশকে জেলায় এসিড-সন্ত্রাস হয়েছে ৯৯টি। কিন্তু ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন বছরে এই সন্ত্রাস হয়েছে ৬৪টি।
জাতীয় এসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের সদস্য এবং এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুনিরা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এসিড নিক্ষেপকারীরা এটা সংগ্রহ করে প্রধানত এসিডের ক্ষুদ্র ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। লাইসেন্সের আওতায় না থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কতটুকু এসিড যাচ্ছে, তা চিহ্নিত করার উপায় নেই। এ ছাড়া গুদামে এসিডের সংরক্ষণ ও এই তরল পদার্থের পরিবহনব্যবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইন অনুযায়ী লাইসেন্সের শর্ত পালন না করে কোনো এসিড উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, মজুদ, বিক্রয় বা ব্যবহার করলে বা দখলে রাখলে শাস্তি হিসেবে তিন থেকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্স ছাড়াই চলছে এর কেনাবেচা ও ব্যবহার।
পাবনার প্রশাসন অবগত: জেলা প্রশাসনের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা শাখা সূত্রে জানা গেছে, জেলার নয় উপজেলার মধ্যে পাবনা সদরে এসিড ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় আড়াই শ। সুজানগরে রয়েছে ৫০, বেড়ায় ৭৫, ভাঙ্গুড়ায় ৬৫, ফরিদপুরে ৭২, চাটমোহরে ৯৬, সাঁথিয়ায় ৮৪ ও ঈশ্বরদীতে ১২৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছে ১৫টি প্রতিষ্ঠান।
বেসরকারি সংস্থা আসিয়াবের প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. নজরুল ইসলাম জানান, অনুমোদনহীন এসিড ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই গয়না তৈরির কারখানা। এর বাইরে ৬১টি ব্যাটারি তৈরির কারখানা রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই অল্পশিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানহীন কর্মী কাজ করেন। যাঁরা এসিড সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যত্রতত্র এসিড বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম বলেন, এসিড ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। অনুমোদনহীন এসিড ব্যবহারকারীদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
জেলার পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে কাজ চলছে। কেউ অবৈধভাবে এসিড ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার করছে কি না, তাও ওই আদালত খতিয়ে দেখবেন।
ভোলায় এসিডের ব্যবহার প্রকাশ্য: ভোলায় সহস্রাধিক ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসিড ব্যবহার করছে। এর মধ্যে এসিড ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহারের লাইসেন্স আছে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানের। জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের লাইসেন্স শাখা জানিয়েছে, গত এক বছরে লাইসেন্স নিয়েছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলার সাত উপজেলার বিভিন্ন লঞ্চ, ফেরি ও সি-ট্রাক ঘাট দিয়ে প্রতিদিন কনটেইনারভর্তি এসিড ওঠানামা করে। বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে এসিডের চালানগুলো ভোলায় আসছে। ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকে মাসোহারা দিয়ে এই ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোলার প্রায় সাড়ে সাত শ স্বর্ণ, দুই হাজার ব্যাটারিচালিত যান, শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানাগার এবং শতাধিক আসবাবপত্রের দোকানে এসিড ব্যবহার করা হয়।
ভোলা প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান মোশারেফ লাবু বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তিন চাকার হওয়ায় যখন-তখন উল্টে যায়। তখন ব্যাটারির এসিড পড়ে যাত্রীদের শরীর ঝলসে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। অবশ্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিক্রেতা জাকির হোসেন বলেন, তাঁরা ব্যাটারিতে যে এসিড ব্যবহার করেন, তা খুব বিপজ্জনক নয়।
স্থানীয় ভেনাস জুয়েলার্সের মালিক পঙ্কজ কুমার ভাওয়াল বলেন, সাধারণত খাদ পরীক্ষা ও স্বর্ণ গলানোর কাজে যে এসিড ব্যবহূত হয়, তার সঙ্গে পানি মেশানো হয়। পানি মেশানোর পর তা আর ক্ষতির পর্যায়ে থাকে না।
সিরাজগঞ্জে দুই মাসে ৫০টি লাইসেন্স: সিরাজগঞ্জে তাঁত ছাড়াও এসিড ব্যবহূত হয় জুয়েলারি ও ব্যাটারিশিল্পে। এসিড ব্যবহার হওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১০ হাজার। সহজলভ্য এবং স্বল্প খরচ হওয়ায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহূত হচ্ছে এসিড। এই জেলায় এসিড-সন্ত্রাসের ঘটনাও তাই বেড়েছে।
তবে এসিড-সন্ত্রাস বাড়ার পাশাপাশি এসিডের লাইসেন্স নেওয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। জেলা এসিড নিয়ন্ত্রণ কমিটির সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় এসিডের লাইসেন্স ছিল মাত্র ৩১টি। দুই মাসের মধ্যে (জানুয়ারি ২০১১ পর্যন্ত) এর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮১টি।
জেলা জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ কুমার জানান, আগে জুয়েলারির মালিকেরা এসিড ব্যবহার করে পালিশের কাজ করতেন। পরে পরিবেশ যাতে দূষিত না হয়, সে জন্য পাঁচটি পালিশের কারখানা করা হয়েছে। এসিড বিক্রির জন্য একজন ডিলার নিযুক্ত করা হয়েছে। ফলে এই শিল্প থেকে এখন এসিড বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম।
শাহজাদপুর ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হাকিম জানান, লাইসেন্স পেতে জেলা প্রশাসনের কাছে গিয়ে কিছু ঝামেলা পোহানোর কারণে অনেকেই অনাগ্রহ প্রকাশ করে।
সিরাজগঞ্জ জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. রেজাউল করিম জানান, ইতিপূর্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসিড বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা থাকলেও সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পুলিশ সুপার মোশারফ হোসেন জানান, বেআইনিভাবে এসিড বিক্রির অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানান, সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরি করে অননুমোদিত এসিড ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সিরাজগঞ্জ থেকে এনামুল হক, দিনাজপুর থেকে আসাদুল্লাহ্ সরকার, ভোলা থেকে নেয়ামতউল্যাহ ও পাবনা থেকে সরোয়ার উল্লাস]

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন