লাইসেন্স পাওয়া কঠিন, বিপাকে খুদে ব্যবসায়ীরা
এসিড নিক্ষেপকারীরা এসিড সংগ্রহ করে ক্ষুদ্র ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। তাই এ ধরনের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সের আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে জোরেশোরে। এর জবাবে খুদে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি বিধি মেনে তাঁদের অনেকের পক্ষে লাইসেন্স করা অসম্ভব।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাঁত, স্বর্ণশিল্পসহ কুটিরশিল্পে মাসে এসিডের প্রয়োজন দুই থেকে চার লিটার। কিন্তু লাইসেন্স পাওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে, ম্যাজিস্ট্রেট ও গোয়েন্দা সদস্যরা পৃথক পরিদর্শন করবেন। লাইসেন্স ফি পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা (আমদানি ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে যথাক্রমে এক লাখ ও দেড় লাখ) দিতে হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তহবিলে (এলআর ফান্ড) চাঁদা দেওয়াসহ বিভিন্ন খরচ তো থাকছেই। সঙ্গে দিতে হবে মূল্য সংযোজন কর, ট্যাক্স ও ব্যাংকের সনদ, ব্যবসার লাইসেন্স, নিরাপদ গুদাম, পরিবহনের জন্য ট্রাকের নম্বর ও এর ধারণক্ষমতা, রোড পারমিটসহ বিভিন্ন কাগজ। অন্যদিকে আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীদের লাইসেন্স ফি বেশি হলেও তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা তাদের জন্য খুব একটা কঠিন বিষয় নয়।
এসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, এসিডের লাইসেন্স পাওয়া অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার চেয়ে কঠিন। তাই বেশির ভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাইসেন্স করছেন না।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার বাবুল মিয়া বলেন, এই স্পর্শকাতর বিষয়ে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন মেনে চলার চেষ্টা করা হয়।
আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীদের ঝামেলা কম: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হলেও এসিডের আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীরা এসব সমস্যায় ততটা উদ্বিগ্ন নন। সারা দেশে আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী আছেন ৫০ থেকে ৬০ জন। এঁদের মধ্যে প্রভাবশালী কয়েকজন এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা কতটুকু এসিড উৎপাদন বা আমদানি করেন, তার সঠিক হিসাব কারও জানা নেই। আইন অনুযায়ী, প্রতি তিন মাসে জেলা প্রশাসনের কাছে এই হিসাব দেওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে, যে হিসাব দেওয়া হয়, তার মধ্যে থাকে নানা রকম মারপ্যাঁচ ও গরমিল। তা ছাড়া এসিড আমদানিকারকদের কয়েকজন শুল্ক বিভাগের একশ্রেণীর কর্মকর্তার সহায়তায় প্রকৃত পরিমাণ গোপন করেন।
বাংলাদেশ এসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এই ব্যবসার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গত ফেব্রুয়ারি মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ও বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানকে দেওয়া চিঠিতে সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, এমন কোনো শিল্প নেই, যেখানে কমবেশি এসিড ব্যবহার হচ্ছে না। কিন্তু যত্রতত্র ব্যবহার ও বিক্রয় রোধে ব্যবস্থা নেই। এমতাবস্থায় সমিতির ছাড়পত্র বা প্রত্যয়নপত্র ছাড়া কেউ যাতে এই লাইসেন্স নবায়ন ও ইস্যু করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব জেলা প্রশাসককে অবহিত করা উচিত বলে মনে করেন সমিতির সভাপতি হারুন-আল-রশিদ। তিনি আরও বলেন, আমদানি করা এসিড বা রাসায়নিক খালাস এবং উৎপাদন করা এসিড বাজারজাতের ক্ষেত্রে সমিতির ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা ছাড়া হিসাব মিলবে না।
এসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসংখ্যা পুরোনো ও সহযোগী মিলিয়ে এখন ১৬৫। এর বাইরে এসিড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক ব্যবসায়ী, আমদানিকারক রয়েছেন। কে, কোথায়, কতটুকু এসিড আমদানি, কেনাবেচা ও ব্যবহার করছেন, তার কোনো হিসাব সরকারের কাছে যেমন নেই, তেমনি সমিতিও কিছু জানে না।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসিড যাতে সহজলভ্য না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, এখন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ চলছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সমিতির সদস্য না হলে কেউ এসিড-সংক্রান্ত ব্যবসা করতে পারবেন না। আমদানি, উৎপাদন ও লাইসেন্স নবায়নসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সমিতির সদস্য-সনদ জমা দিতে হবে। এর ফলে এসিড কেনাবেচা, উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমিতিরও দায়বদ্ধতা থাকবে।
এসিড ব্যবসা প্রভাবশালীদের দখলে: জোট সরকারের সময় প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রীর আত্মীয় ও আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০০২ সাল-পরবর্তী সময়ে চারটি লাইসেন্স দেওয়া হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় একজন লাইসেন্সধারীর এসিডের একটি পণ্য আমদানির অনুমতি ছিল। কিন্তু তিনি নয়টি পণ্য আমদানি করে বাজার সয়লাব করে দেন। অবশ্য জোট সরকারের পতনের পর তিনি এখন একটি পণ্যই আমদানি করছেন।
জোট সরকারের আরেকজন প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয় ওই সময় কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। তিনি একজন ব্যাংকার, তাই স্ত্রীর নামে লাইসেন্স করে এসিড আমদানির মাধ্যমে বিপুল টাকা আয় করেন।
২০০২ সালের পর বেনাপোল বন্দর ব্যবহার করে এবং সেখানকার শুল্ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে হাত করে এই ব্যবসার গডফাদার হয়ে ওঠেন ‘ফ’ আদ্যক্ষরযুক্ত একজন ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী এসিড আমদানি করেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু বিশেষ কৌশলে তিনি এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সব এসিড ক্ষতিকর নয়: সাধারণত নয় ধরনের এসিড কেনাবেচা, উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। এগুলো হচ্ছে: সালফিউরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড, কার্বলিক এসিড, ক্রোমিক এসিড, কস্টিক পটাশ, ফসফরিক এসিড, ব্যাটারি ফ্লুইড ও এ্যাকোয়া রেজিয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে এসিড দিয়ে সন্ত্রাস করা হয়, সেটি সালফিউরিক এসিড এবং এটি ‘মাদার অব কেমিক্যাল’ নামে পরিচিত। দেশে এই এসিড তৈরির কারখানা আছে ছয়টি (এখন চালু চারটি)। এ ছাড়া সব সার কারখানায় সালফিউরিক এসিড তৈরি হয়। এই এসিডের দাম সবচেয়ে কম (কেজি ১৩ থেকে ১৫ টাকা) এবং কৃষি ও শিল্পে ব্যবহূত হয় সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল কাদের প্রথম আলোকে জানান, মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হচ্ছে সালফিউরিক এসিড ও ব্যাটারি ফ্লুইড। এই দুই ধরনের এসিড ত্বক ঝলসে দেয়। এ ছাড়া হাইড্রোক্লোরিক এসিড পরিবেশের ক্ষতি করে এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন। বাকি আইটেমগুলো মানবদেহের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর না হলেও প্রতিটি আইটেমের কিছু না কিছু ক্ষতিকর প্রভাব আছে।
রাজধানীর এম এন ইমপেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে জানান, শিল্পের উৎপাদনের সঙ্গে এসিডের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। তাই এসিডের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এসিডের লাইসেন্স পেতে খুদে ব্যবসায়ীদের কিছুটা বেগ পেতে হয়। এর কারণ, একটি গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়, একজন ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া ব্যয়ও কিছুটা বেশি। তিনি আরও বলেন, এসিড যাতে বেশি সহজলভ্য এবং এর অপব্যবহার না হয়, সে জন্য শর্তগুলো কিছুটা কঠোর করা হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের খুব একটা অসুবিধা যাতে না হয়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখা হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






