মাদকবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করতে হবে পরিবার থেকেই

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ২৭-০৬-২০১২

  • ৪ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে আলোচনা সভায় মাদকবিরোধী সেরা প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার পাওয়া সাংবা

প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে আলোচনা সভায় মাদকবিরোধী সেরা প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার পাওয়া সাংবাদিক ও অতিথিরা

ছবি: প্রথম আলো

মাদকের সমস্যা সমাধানে সামাজিক সচেতনতা বাড়িয়ে আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আর এ ধরনের আন্দোলনের সূচনা করতে হবে পরিবার থেকেই। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১০ বছরে সমাজে মাদকের ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো ট্রাস্ট আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এই তাগিদ ও সতর্কতা উচ্চারণ করেন। কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে প্রথম আলো কার্যালয় মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মাদক প্রতিরোধে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয় আলোচনায়।
প্রথম আলো ট্রাস্ট গতকালের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে আটজন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করে। এই ট্রাস্ট ‘প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাদকবিরোধী সেরা প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কারটি দিয়ে আসছে। এবার তৃতীয়বারের মতো সাংবাদিকদের পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিজয়ীদের পুরস্কার তুলে দেন। সভাপতিত্ব করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সদস্য হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলী।
‘পরিবার হোক মাদকমুক্ত’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরু এবং শেষে সঞ্চালকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মিলনায়তনে উপস্থিত সবাই সমস্বরে মাদককে ‘না’ বলেন।
প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘মাদক, ইভ টিজিংসহ বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন সব থেকে বড় শক্তি ও হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাই মাদকসহ বিভিন্ন সমস্যার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে কঠোর আইন করতে হবে।’
শিক্ষামন্ত্রী অচিরেই পাঠ্যপুস্তকে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেন। শিক্ষকদের জন্য তৈরি নির্দেশিকাতেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সব মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেন বিশেষ অতিথি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকারও। তিনি বলেন, ‘পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা গণমাধ্যমের একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সম্মিলিতভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।...শুধু এক দিন ঘটা করে মাদকবিরোধী দিবস পালন করে থেমে গেলে চলবে না। সমস্যাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রতিটি দিনকেই এ ধরনের দিবস মনে করতে হবে।’
মাদকাসক্তিকে একটি ‘পারিবারিক রোগ’ আখ্যা দিয়ে আইজিপি বলেন, ‘কারণ, একজনের আসক্তি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। তাই পরিবার থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে হবে।’
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের উপদেষ্টা মোহিত কামাল বলেন, ‘মাদকাসক্ত তরুণেরা অপরাধ ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। তাদের কাছ থেকে জাতি নেতৃত্ব আশা করতে পারে না।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১০ বছরে মাদকের ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কোন পরিবারের সন্তান যে এতে আক্রান্ত হবে, তা কেউ গ্যারান্টি দিতে পারবে না।’
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে মাদক বড় বাধা। তাই নিজ দায়িত্বে মাদকবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সবাইকে যুক্ত হতে হবে।
মাদকাসক্তি পুনর্বাসনকেন্দ্র আপনের পরিচালক ও প্রথম আলোর মাদকবিরোধী আন্দোলনের উপদেষ্টা ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকা এবং কেউ আসক্ত হয়ে পড়লে তাঁকে সহযোগিতা করতে সবাইকে আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে একসময় মাদকাসক্ত ছিল এমন কয়েকটি পথশিশু তাদের ভালো হয়ে ওঠার কাহিনি শোনায়।
প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের উপদেষ্টা আব্দুন নূর তুষার বলেন, মাদকের সমস্যা প্রতিরোধে যুবকদের কাজ দিতে হবে। শিশুদের জন্য খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মাহফুজুল হক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন করে কাউন্সেলর নিয়োগের উদ্যোগ নিতে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আহ্বান জানান।
মাদককে ভয়াবহ বলে তরুণসমাজকে সতর্ক করে দেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তবে আসক্ত ব্যক্তিদের ভরসা দিয়ে তিনি বলেন, এ আসক্তি নিরাময়যোগ্য। কিন্তু এ জন্য আন্তরিক চেষ্টা ও ধৈর্য থাকতে হবে।
প্রথম আলো ট্রাস্টের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক, আপন, কনকর্ড এন্টারটেইনমেট, ব্র্যাক ব্যাংক, নটর ডেম কলেজ ও ইম্পিরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী ও অন্যান্য প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সেরা প্রতিবেদন পুরস্কার: সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মাদকবিরোধী সেরা প্রতিবেদনের জন্য আটজন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করেছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। সংবাদপত্র শাখায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক গোলাম মর্তুজা প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাবাজার পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক শম্পা হাসান দ্বিতীয় এবং সংবাদ-এর নিজস্ব প্রতিবেদক আলী আজম তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া বিচারকদের রায়ে প্রথম আলোর সাভারের নিজস্ব প্রতিবেদক অরূপ রায় ও যশোর প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন।
টেলিভিশন শাখায় এন টিভির নিজস্ব প্রতিবেদক সফিক শাহীন প্রথম, চ্যানেল আইয়ের নিজস্ব প্রতিবেদক মোস্তফা মল্লিক দ্বিতীয় ও ইটিভির নিজস্ব প্রতিবেদক ইলিয়াস হোসেন তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।
পুরস্কৃত প্রত্যেককে সনদ ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রথম স্থান অধিকারী প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অধিকারীদের ২৫ হাজার ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের ১৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল ও প্রথম আলোর বার্তা বিভাগের পরামর্শক কুর্রাতুল-আইন-তাহিমনা।
অনুষ্ঠানে উদ্দীপনামূলক গান গেয়ে শোনান প্রথম আলোর মাদকবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম উপদেষ্টা শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু। গানের আগে তিনি বলেন, ‘মাদকের সমস্যাটির হয়তো আজই সমাধান করা সম্ভব হবে না। তবে পরশু হবে সে আশাবাদ করাই যায়।’
বন্ধুসভার সদস্য রোকেয়া ইয়াসমিনও গান শোনান। প্রথম আলোর পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের সংগঠন বন্ধুসভা অনুষ্ঠানে সার্বিক সহায়তা করে। সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান রওশন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Khandker Md. Ashrafuzzaman

Khandker Md. Ashrafuzzaman

২০১২.০৬.২৭ ১০:১৭
পরিবার থেকে সূচনা করতে পারলে তো খুবই ভাল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরাকারের আইনকে সঠিক রূপে বাস্তবায়ন করতে হবে।

M. Shawkat Ali

M. Shawkat Ali

২০১২.০৬.২৭ ১০:৪৮
এদেশে সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর জন্য নানা উপলক্ষ্য তৈরী করা হয়েছে। সেটা এই ধরনের কর্মকান্ডের মাধ্যমেই প্রকট। দেশে মাদকের বিরুদ্ধে আইনের অক্ষমতা, মাদক নিয়ন্ত্রন বিভাগে লোকবল কমিয়ে আনা, গ্রেপ্তারকৃত মাদকপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে সরকারের ইচ্ছাকৃত অনীহা প্রভৃতির মধ্যে তথাকথিত জনসচেতনতা বৃদ্ধির শ্লোগান শুনতে ভাল লাগলেও আসলে ফাকাবুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিভিন্ন জনপ্রিয় দৈনিকের খবরেই প্রকাশ মাদকমুক্ত দিবসেও রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে মাদকের উন্মুক্ত বাজার বসেছে। এমতাব্স্থায় পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কেবল অভিভাবকদেরকে সজাগ থাকার আহ্বান জানানো সরকারের দায়িত্ব এড়ানোরই কৌশল মনে মনে করার যথেষ্ট কারন আছে। কারন সিংগাপুর বা মালয়েশিয়া, এমনকি মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের মত দেশে মাদকের বিরুদ্ধে সরকার এত কঠোর যে তাদের এধরনের আহ্বান জানানোর প্রয়োজন পড়েনা।

Md. Ariful Islam

Md. Ariful Islam

২০১২.০৬.২৭ ১৩:২৭
আগামীকাল নয় এখন থেকেই আমরা দৃঢ প্রতিজ্ঞা করি কোন প্রকার মাদক গ্রহণ করবো না এবং অন্যকে যতকুটু সম্ভব মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি।

মোল্লা বাবুল (Mollah Babul)

মোল্লা বাবুল (Mollah Babul)

২০১২.০৬.২৭ ১৮:৪০
আমাদের দেশে মাদকের সহজলভ্যতা মাদকের বিস্তারের অন্যতম একটি মূল কারন।