মালিকদের দ্বন্দ্বে ছয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা

মোশতাক আহমেদ | তারিখ: ২৩-০৯-২০১২

  • ৮ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

মালিকদের দ্বন্দ্বে অস্থিরতা চলছে দেশের ছয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বেশ কিছু মামলাও হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব নিরসনে সময় বেঁধে দিলেও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকপক্ষ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছেন না।
বিরোধপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রাইম ইউনিভার্সিটি ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
জানতে চাইলে শিক্ষাসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালোভাবে চলুক। এ জন্য যেগুলোতে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে, সেগুলোকে সমাধানের উপায় খুঁজতে বলা হয়েছে। নিজেরা সমাধানে ব্যর্থ হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) আতফুল হাই শিবলী প্রথম আলোকে বলেন, মালিকানার দ্বন্দ্ব নিরসন না করলে আইন অনুযায়ী আচার্য ও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হবে।
অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল মালিক ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই মালিকানা নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। প্রথমে আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য আবুল হোসেন শিকদারের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরই জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একপ্রকার বিতাড়িত হন আনোয়ারা বেগম। বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাংসদ মো. ইসরাফিল আলম। আর ট্রাস্টি বোর্ডে যুক্ত হয়েছেন ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন সাবেক নেতা। তাঁরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
মালিকানার দ্বন্দ্বে উপাচার্য ছাড়াই এখন চলছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে বর্তমান মালিকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী ঘরানার এক শিক্ষককে উপাচার্য করার চেষ্টা করছেন। ট্রাস্টি বোর্ডের এক সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টাও চলছে।
ইবাইস ইউনিভার্সিটি: বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ছিলেন জাকারিয়া লিংকন। কিন্তু সহোদর কাওছার এইচ কমেটের সঙ্গে মালিকানার দ্বন্দ্বে তিনি এখন ইউনিভার্সিটি থেকে বিতাড়িত। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন দুটি ট্রাস্টি বোর্ড। একটিতে আছেন জাকারিয়া লিংকন নিজেই। তাঁর ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন অপরটির চেয়ারম্যান হয়েছেন পারটেক্স গ্রুপের প্রধান এম এ হাসেমের ছেলে শওকত আজিজ। আর ভাইস চেয়ারম্যান কাওছার এইচ কমেট। লিংকনকে বাদ দিয়ে তাঁরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ জমা হয়েছে।
জানতে চাইলে জাকারিয়া লিংকন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইউনিভার্সিটি আমিই প্রতিষ্ঠাতা করি ও ট্রাস্টি বোর্ডেরও সভাপতি। কিন্তু আমার ভাইকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়টি দখল হয়ে গেছে। এ নিয়ে আমি ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছি। সেখানে সমাধান না হলে প্রয়োজনে মামলা করব।’
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি: এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক এ বি এম মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারী। আর এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংসদ মকবুল হোসেন। কিন্তু বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সাংসদ ও সাবেক ছাত্রদলের নেতা নাসির উদ্দীন আহম্মেদ একপ্রকার জোর খাটিয়ে দখল করে নেন বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার মালিকানা দাবি করেন মকবুল। এ নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারীর ছেলে মোহাম্মদ শহিদুল কাদির পাটোয়ারী।
সূত্রমতে, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বর্তমান কর্তৃপক্ষ মকবুল হোসেনের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শামীম হায়দার পাটোয়ারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিক সমঝোতার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি: নতুন করে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। সেখানেও গঠন হয়েছে দুটি ট্রাস্টি বোর্ড। একটির পক্ষে আছেন আবু হাসান মো. সাদেক এবং আরেকটিতে আছেন তাঁর আরেক ভাই। এ নিয়েও মন্ত্রণালয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয়েছে, মামলা চলছে। উপাচার্য আবু হাসান মো. সাদেকের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের স্তূপ জমা পড়েছে। এর আগে সনদ-বাণিজ্য, শাখা (আউটার) ক্যাম্পাস থাকাসহ বিভিন্ন অভিযোগে রাষ্ট্রপতি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।
প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়: প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা দাবিদার দুটি পক্ষ। মিরপুর ১ নম্বরের নর্থ ইস্ট অব দারুস সালাম সড়কের ক্যাম্পাসটি ইউজিসি অনুমোদিত। এর বাইরে উত্তরায় রয়েছে আরেকটি ক্যাম্পাস, এর মালিক দাবিদার আবুল হোসেন। দুই পক্ষই নিজেদের আসল মালিক দাবি করছে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন। এ নিয়ে মামলাও আছে।
দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়: দেশে সবচেয়ে বিতর্কিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি। বর্তমানে চার ভাগে বিভক্ত হয়ে চলছে এর কার্যক্রম। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন এ এ বজলে রাব্বি। তিনি সাভারের গণকবাড়ীতে ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আবুল হোসেনের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ উত্তরায় এবং মো. আকবর উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষাক্রম চালাচ্ছে। আর ধানমন্ডির ক্যাম্পাসে মরহুম মনিরুল ইসলামের গ্রুপ আগে থেকেই আছে। এ নিয়ে কমপক্ষে ১০টি মামলা চলছে। অসংখ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশন শুনানির সুযোগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক সনদ বাতিল অর্থাৎ বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করে। প্রায় ছয় মাস আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চারটি পক্ষকে কেন সনদ বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একধরনের নীরবতা পালন করছে।
জানতে চাইলে শিক্ষাসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, নোটিশ দেওয়ার আগে আইনি কোনো সমস্যা আছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে। সেখান থেকে জবাব আসার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

shawkat hassan

shawkat hassan

২০১২.০৯.২৩ ০৬:৪৮
ভর্তি বন্ধ করে দিয়ে ছাত্রদেরকে সমস্যামুক্ত রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ত্ব ইউজিসির। এ দায়িত্ত্ব পালন করলে ওরা নিজেরাই সমঝোতা করে নেবে।

Hasan Ferdous

Hasan Ferdous

২০১২.০৯.২৩ ০৯:০২
In Bangladesh, private universities have now turned into nothing but grocery shops.

mithoon

mithoon

২০১২.০৯.২৩ ০৯:৫৭
সরকারের কাছে অনুরোধ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে রানিং ছাত্র/ছাত্রী দের ক্ষতি না হয় ............

A.B.M. Mehedi Hasan

A.B.M. Mehedi Hasan

২০১২.০৯.২৩ ১০:৪২
"যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আজ ক্ষমতায় থাকা ডেমোক্র্যাটিক নেতা আর আমলাদের দখলে !"
উপরের লেখাটা খেয়াল করুন, দেখতে অবিশ্বাস্য হলেও, আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, কি বিশ্বাস করতে হবে? এটা সম্ভব না? কোথায় সম্ভব না? উত্তর আমেরিকা তে।

আর আমাদের বাংলাদেশে? আমরা এমন এক জাতি যারা যে কোন কিছু সইতে সইতে নিজেদের চোখে খারাপ ব্যাপার গুলো স্বাভাবিক দেখতে থাকি। আর কিছুদিন পরে রাস্তায় কেউ খুন হলে আমাদের অনুভূতি হবে, "বাংলাদেশ এ থাকি, এটা হতেই পারে, আমিও খুন হতে পারি, কিছু করার নাই"
২০১২.০৯.২৩ ১১:০৩
i accept with shawkat hassan......

ABDUL MAJID QUAZI

ABDUL MAJID QUAZI

২০১২.০৯.২৩ ১১:০৮
বেঙকে পাল্লয় ওজন করা যায় না। এ প্রবাদ বাক্যটির অর্থ বুঝতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে । আমার মাথায় কথাটা সহজে ঢুকতনা । একদিন আমাকে এক বয়স্ক প্রবীন লোক কথাটার মর্মার্থ বুঝিয়ে দিলেন। এখন পদে পদে এর নজীর দেখি। এখানে আমার সেই প্রবীন ভদ্র লোকের ভাষায় মালিকদেরকে বুঝায়।

Abu Taiyeb

Abu Taiyeb

২০১২.০৯.২৩ ১১:২৯
Government should come forward to solve this problem.

Sumon Ahmed

Sumon Ahmed

২০১২.০৯.২৩ ২১:২৮
সরকারের অতি দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এই ধরনের সমস্যা বর্তমান ছাত্রদের জন্য কেবল ক্ষতিই বয়ে নিয়ে আসবে, যেটা কখনো কাম্য নয়।