সফলদের স্বপ্নগাথা
জীবনটাই একটা সাধনা
-
পণ্ডিত রবিশঙ্কর: যখন খ্যাতির চূড়ায়
-
পণ্ডিত রবিশঙ্কর
সংগীত নিয়ে আমার প্রথম স্মৃতি বলতে মনে পড়ে বেনারসে বাড়ির ছাদে আকাশভরা তারার নিচে শুয়ে মায়ের গলায় ঠুমরি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া। মা অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠে ঠুমরি, কাজরা আর দাদরা গাইতেন। আমাকে পৌরাণিক গল্প শোনাতেন আর আকাশের তারাগুলোর নাম শেখাতেন। আমার জীবনে মায়ের উপস্থিতি ছিল খুব স্বল্প সময়ের জন্য, তিনি যখন মারা যান, আমার বয়স তখন মাত্র ১৬। তার পরও আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন তিনি।
ছোটবেলায় বাবাকে কাছে পাইনি বললেই চলে। বড় ভাই উদয়শঙ্করই আমাকে প্রথম শেখান যে ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। তাঁর নাচ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, বলতে গেলে অনেকটা একাই নাচতে শিখেছিলেন তিনি। কোনো ছবি বা ভাস্কর্যের দিকে একনজর তাকিয়েই তিনি নাচের বিভিন্ন মুদ্রা কল্পনা করে নিতেন। বিভিন্ন উৎসবে অন্যদের নাচ পর্যবেক্ষণ করে তিনি নিজের মতো করে নতুন নাচ সৃষ্টি করে ফেলতেন। তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন, আভিজাত্য আর রুচিশীলতার সমন্বয়ে শিল্পকে কীভাবে আরও শৈল্পিক উপায়ে উপস্থাপন করা যায়।
জীবন নিয়ে আমার একটা আফসোস হলো, আর দশটা ছেলের চেয়ে আমি অনেক দ্রুত বড় হয়ে গিয়েছিলাম, শৈশব বলতে তেমন কিছু ছিল না। ১০ বছর বয়সে আমি আমার ভাই উদয়শঙ্করের নাচের দলের সঙ্গে প্যারিসে চলে আসি। আমার চারপাশ ঘিরে ছিল নামীদামি তারকারা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের দেখতে দেখতে বেড়ে উঠেছিলাম আমি। তাই তারকাদের মতো জীবনযাপন করা আমার কাছে তখন খুব স্বাভাবিক মনে হতো। এভাবেই কখন আমার শৈশবের সময়টুকু পালিয়ে গেছে, টেরই পাইনি। সে সময়ের খ্যাতিমান শিল্পী আর অভিনেতারা, যেমন মার্লোন ব্র্যান্ডো কিংবা পিটার সেলার্স, তাঁরা সবাই আমাকে খুব স্নেহের চোখে দেখতেন। নাচ, গান আর চারপাশে এমন অসাধারণ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে বেড়ে ওঠাটা এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা ছিল। দাদা উদয়শঙ্কর ব্যালে নাচের জন্য ভারতীয় সংস্কৃতির নানা বিষয়কে প্রতিপাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতেন। এ জন্য আমিসহ দলের সবাইকেই অনেক পড়াশোনা করতে হতো। প্যারিসে থাকাকালে আমি মহাভারত ও রামায়ণ পড়ে শেষ করেছিলাম, পড়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যও। আমার বয়স যখন মাত্র ১২, তখন থেকেই আমি নাচ ও গানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়ি এবং অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করি। বলা চলে, জীবনের একদম শুরু থেকেই নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে আমি মিশে গিয়েছিলাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার সামনাসামনি যখন দেখা হয়, তখন আমার বয়স ১৩ কি ১৪। সেদিনের কথা এখনো দিব্যি মনে আছে, এখনো চোখের সামনে ভাসে সেই মুহূর্তগুলো। জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয়টি পাইনি। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, যেন উজ্জ্বল সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার বাবা তাঁর নোবেল পুরস্কার মনোনয়নের জন্য গঠিত কমিটিতে কাজ করেছিলেন। বাবার কথা স্মরণ করে আমার মাথায় হাত রেখে তিনি বাংলায় বলেছিলেন, ‘বাবার মতো হও। দাদার মতো হও।’ আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল তাঁর হাতের স্পর্শে। সেটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
প্যারিসে আমার দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু সেই চোখ ধাঁধানো শহর আর তারকাদের সান্নিধ্য ছেড়ে আমি ভারতের মাইহারে এক অজপাড়াগাঁয়ে এসে হাজির হলাম কিংবদন্তিতুল্য সরোদ জাদুকর আলাউদ্দিন খাঁর কাছে সংগীতে তালিম নিতে। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৩৪ সালে কলকাতার এক সংগীত উৎসবে। তিনি ছিলেন সত্যিই এক জাদুকর। তাঁর চরিত্রে কোমলতা ও কঠোরতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ছিল। ছাত্রদের তিনি নিজ সন্তানের মতো ভালোবাসতেন, কিন্তু কেউ ভুল করলে তার আর রক্ষা ছিল না! বাবা (আলাউদ্দিন খাঁ) ১৯৩৫ সালে আমার ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর দলে সংগীত পরিবেশনা করেন। এর আগে আমার ঝোঁক ছিল প্রধানত নাচের দিকে, কিন্তু তাঁর সান্নিধ্যে এসে আমি পুরোপুরি সুরের সাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়ি। প্রথম প্রথম আমি সব বাদ্যযন্ত্র নেড়েচেড়ে দেখতাম। সেতারও সেভাবেই চেষ্টা করেছিলাম, ঠিক বুঝতে পারিনি কোনটা আমার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কিন্তু বাবা আমার সব ধ্যানধারণা বদলে দেন। এক বছর পর তিনি ভারতে ফিরে যান। কিন্তু আমি আর তাঁকে ছেড়ে থাকতে পারিনি। তিনি চলে আসার দুই বছরের মাথায় আমিও প্যারিসের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে মাইহারে তাঁর কাছে চলে আসি।
মাইহারে জীবনযাপন ছিল খুব সাদাসিধে আর বাবা ছিলেন ভারি কড়া মেজাজের মানুষ। আমার গায়ে কখনো হাত না তুললেও তাঁর অন্য শিষ্যদের তিনি বেশ মারধর করতেন। এমনকি নিজের ছেলে আলী আকবর খাঁকেও তিনি গাছের সঙ্গে বেঁধে মারতে ছাড়েননি। একদিকে দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করে সেতার শেখা, অন্য দিকে তাঁর কঠোরতর নিয়মশৃঙ্খলা—এ দুইয়ে মিলে আমি আর পেরে উঠছিলাম না। এমনকি আমি একবার পালিয়েও গিয়েছিলাম, কিন্তু আলী আকবর খাঁ আমাকে ফিরিয়ে আনেন। ভাগ্যিস, তখন ফিরে এসেছিলাম! বাবাই আমার একমাত্র গুরু, তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। তিনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। আমার মাকে কথা দিয়েছিলেন আমাকে দেখে রাখবেন আর নিজের ছেলে হিসেবে আমাকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, প্রাচীনকালে রাজা-মহারাজারা সংগীতজ্ঞদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এখনকার দিনে সে চল নেই বলে সংগীত পরিবেশনা করে আমাদের জীবিকা অর্জন করতে হয়। কিন্তু তার পরও সুর আমাদের কাছে ভক্তি, ধ্যান, প্রার্থনা। এর পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের অবশ্যকর্তব্য। শাস্ত্রীয় সংগীতে বাবার সঙ্গে তুলনীয় আর কাউকে আমি দেখিনি। গভীরভাবে ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও তাঁর সৃজনশীলতা ও অভিনবত্ব ছিল অনবদ্য।
আমার বয়স যখন চল্লিশের কোঠায়, তখন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনিও ছিলেন এক অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভা। তাঁর প্রথম ছবি পথের পাঁচালীর সুরকার ছিলাম আমি, আমার চোখে সেটি সবচেয়ে নিখুঁত চলচ্চিত্র। পরিচালনা থেকে শুরু করে অভিনয়, কাহিনি—সবকিছুর এত সুন্দর সামঞ্জস্য—এককথায় অতুলনীয়।
অনেক ভারতীয় শিল্পী ও সমালোচকেরা বলেন, আমি ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সংগীতকে পশ্চিমা ধাঁচে ফেলে ব্যবসায়িক পণ্য করে তুলেছি, তথাকথিত পপ ও রক সংস্কৃতিতে মিশে গিয়েছি। পশ্চিমা তারকাদের সঙ্গে তাঁদের ধাঁচের সুর সৃষ্টি করলে আমি এত দিনে অঢেল অর্থের মালিক হয়ে যেতাম। আমি যখন ইহুদি মেনুহিন আর জাঁ পিয়েরের জন্য সুর করেছি, তাঁরা আমার সৃষ্টি করা সুরেই বাজিয়েছেন। আমি নিজে কখনো তাঁদের সঙ্গে পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সংগীত, যেমন বাখ কিংবা বিটোফেন বাজাতে চাইনি। কারণ, আমি জানতাম, সেসবে আমি কখনো তালিম নিইনি, ওসব বাজানো আমার উচিত হবে না। বেসুরো সংগীত আমাকে প্রায় শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তোলে। আমি সুর সৃষ্টি করি, নতুন ধরনের সুর নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আমি ভালোবাসি। কিন্তু আমি যে সুর রচনা করেছি, তার ভিত্তি সব সময়ই ছিল ভারতীয় সংগীত, তা সে শাস্ত্রীয় বা সমকালীন যা-ই হোক। কোনো জ্যাজ বা রক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে আমি কখনো নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে চাইনি, ব্যক্তিগতভাবে ‘ফিউশন’ মিউজিক আমার পছন্দ নয়। এটা এখনকার চলতি ফ্যাশন বলা চলে। দারুণ জনপ্রিয়তা পেলেও লোকে খুব দ্রুত এগুলো ভুলে যাবে। আমি সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাই না, কিন্তু এটা সত্যিই আমার জগতের বাইরে।
জীবনে কখনো চটজলদি সাফল্য বা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য কাজ করিনি। আমি যদি আবার জীবনটাকে নতুন করে শুরু করতে পারতাম, তাহলে আমি এখনকার মতো এই ভারতের একজন সুরসাধক হয়েই থাকতে চাইতাম। শুধু বদলে নিতাম আমার কিছু অভ্যাস। আলসেমি করা অনেক কমিয়ে দিতাম, আরও কম বয়সে সুরের জগতে প্রবেশ করতাম এবং নিজেকে আরও উন্নত করে গড়ে তোলার জন্য অনেক বেশি পরিশ্রম করতাম।
সূত্র: ওয়েবসাইট। কবিতা ছিব্বারকে দেওয়া ২০০৪ সালের এক সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন অঞ্জলি সরকার







Nidhiram
২০১২.১২.১৯ ০৯:১১