আজ মনে হচ্ছে আমি সার্থক: ববিতা

তৌহিদা শিরোপা | তারিখ: ১৯-১২-২০১২

  • ২৫ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • ববিতা

    ববিতা

    ছবি: সৈকত ভদ্র

  • ছেলে অনিকের সঙ্গে মা ববিতা

    ছেলে অনিকের সঙ্গে মা ববিতা

আর দশটা দিনের মতোই সেদিন সকালটা শুরু হয়েছিল। দিন কয়েক আগে ফিরেছেন ছেলের কাছ থেকে। ছেলে পড়াশোনা করে কানাডায়। জেটল্যাগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বসার ঘরে এসে দেখেন অনেক চিঠির স্তূপ। এতগুলো চিঠির মধ্যে একটিতে তাঁর চোখ আটকে গেল। সেই বিশেষ চিঠিতে যে তাঁর জন্য খুশির সংবাদ আছে, তখনো তাঁর অজানা। খামটি খুলেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। এক দৌড়ে গেলেন কম্পিউটারের সামনে। স্কাইপে লগ-ইন করলেন। তৎক্ষণাৎ তা ছেলেকে জানালেন। ছেলের সে কী আনন্দ!
এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়। বাস্তবের এক মায়ের গল্প। অভিনয়শিল্পী ববিতা ও তাঁর ছেলে অনিক ইসলামের জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্তের গল্প। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুতে তড়িৎকৌশল বিভাগে ‘স্প্রিং টার্ম-২০১২’-এ অনিক ইসলাম প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। ববিতার গুলশানের বাসায় যখন তিনি এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, সামনে যিনি বসে আছেন, তিনি একজন সাধারণ মা, একজন সফল মা। কে বলবে ইনি বাংলাদেশের গুণী অভিনেত্রী ববিতা, যাঁর তারকাখ্যাতি সীমানা ছাড়িয়ে। কিন্তু অভিনয়জগতের বাইরে যাঁর প্রাণজুড়ে আছেন শুধুই তাঁর সন্তান। গর্বিত মা শোনালেন একা কীভাবে ছেলেকে এত দূর নিয়ে এসেছেন।
আপাতদৃষ্টিতে মনে করা হয়, সিনেমার নায়িকা ও তাঁদের সন্তানেরা সারাক্ষণ অনুষ্ঠান, পার্টি—এসব নিয়ে মেতে থাকেন। সংসার ও সন্তানের দিকে তাঁদের হয়তো কোনো খেয়াল থাকে না। সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছেন ববিতা ও তাঁর ছেলে। অনিকের বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন তাঁর বাবা ব্যবসায়ী ইফতেখারুল আলম মারা যান। একদিকে অভিনয়, অন্যদিকে সংসার-সন্তান সামলানো—সবই তিনি করেছেন। কীভাবে এটি সম্ভব হয়েছে? জানতে চাইলে ববিতা বলেন, ‘অনিক যখন ছোট, তখন ঢাকার বাইরে কোনো শুটিং করতাম না। এফডিসি বা ঢাকার মধ্যে যে কাজগুলো হয়েছে, সেগুলো করেছি। ধীরে ধীরে ও বড় হয়েছে। তখন বাইরে কাজ করতাম। কিন্তু সারাক্ষণ ছেলের খবর নিয়েছি। খেয়েছে কি না, স্কুল থেকে ফিরে বিশ্রাম নিয়েছে কি না, স্কুলের পড়া ঠিকমতো হলো কি না, সব; এমনকি বাসায় কোন শিক্ষকের কাছে পড়বে, সেটিও আমি ঠিক করতাম। আমার ছেলেও ভীষণ ভালো। অতটুকু বয়স থেকেই এত বোঝে আমাকে।’
মা-ও কম কিসে। অনিকের বয়স তখন ১০-১২ হবে, একদিন স্কুল থেকে ফিরে মাকে শোনান, তাঁর বন্ধুর মা কত ভালো রান্না করেন। এখন উপায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ববিতা চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেছেন। তাই কাজের চাপে রান্নাটা ঠিকমতো শেখা হয়নি। কিন্তু তাঁকে ভালো মা হতে হলে যে ছেলের মনে কোনো অপূর্ণতা রাখা যাবে না। কিনে আনলেন সিদ্দিকা কবীরের রেসিপির বই—রান্না, খাদ্য, পুষ্টি। একদিন নিজের হাতে নানা পদের খাবার রান্না করে খাইয়ে ছেলেকে তাক লাগিয়ে দিলেন। শুধু কি তা-ই, মা ববিতা অনেক সময় নিজে ভাড়া করা গাড়ি বা ট্যাক্সিতে শুটিংয়ে গেছেন; আর নিজের গাড়ি ছেলের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন।
সেদিন যখন স্কাইপে ছেলেকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনিকের এত ভালো ফল করার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছে; আর ‘উইন্টার টার্মে’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের গবেষণার সহকারী (রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট) হিসেবে কাজ করার জন্যও প্রস্তাব দিয়েছে। কম্পিউটারের পর্দায় এ-পাশে মা আর ও-পাশে ছেলের তখন আনন্দাশ্রু ঝিলিক দিচ্ছিল। এই ফলের পুরো কৃতিত্ব ছেলে দেন মাকে। ববিতা বলেন, ‘ছেলের জন্যই তো স্বামী হারানোর শোক ও একাকিত্ব ভুলে থেকেছি। যখনই নিজেকে অসহায় মনে হতো, তখনই অনিকের মুখ ভেসে উঠত চোখের সামনে। ব্যস, আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছি।’
চলচ্চিত্রের এই গুণী শিল্পী অন্য সব মায়ের মতোই সন্তানের পরীক্ষার সময় রাত জেগে থাকতেন। ছেলের পরীক্ষার সময় বোরকা পরে স্কুলের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মনে হতো, মায়েরই যেন পরীক্ষা। কেননা, সন্তানের চেয়ে বড় কিছু তাঁর জীবনে আর কখনোই প্রাধান্য পায়নি। ‘আর্থিক সমস্যা না থাকলেও জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাদের সমাজে একজন নারী বিয়ে না করে একা থাকলে নানা জনে নানা কথা বলে। কখনো যে বিয়ের কথা ভাবিনি তা নয়; কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, অনিক যদি তাকে গ্রহণ না করে। কিংবা সেই মানুষ যদি অনিককে আমার মতো ভালোবাসতে না পারে। এ কারণে সেসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলেছি। অনিকের সফলতায় আজ মনে হচ্ছে, আমি সার্থক ও সফল।’ বললেন ববিতা।
অনিক ঢাকায় স্কলাসটিকা থেকে এ এবং ও লেভেল পাস করার পর কানাডায় যান তড়িৎকৌশলে পড়তে। একা হয়ে যান ববিতা। একাকিত্ব দূর করার জন্য নিজের মতো করে জীবন সাজিয়ে নিয়েছেন। বাড়িতে পাখি, কুকুর ও গাছপালার যত্ন নিয়ে সময় কাটান। এ ছাড়া নানা ধরনের সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বাইরে তিনি ডিসট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন। বছরে অন্তত দুবার কানাডায় ছেলের কাছে যান। মা-ছেলের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের। সময় পেলেই তাঁরা ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। পরস্পরের বোঝাপড়া খুব ভালো। ছোট থেকেই মায়ের কাজকে অনেক শ্রদ্ধা করেন অনিক। মা যে এত বড় একজন তারকা, তা অনিককেও গর্বিত করে। একজন ভালো শিল্পী একজন ভালো মা-ও হতে পারেন—তা যেন প্রমাণ করলেন ববিতা। অনিককে বিদেশে বাড়ি কিনে দেওয়ার কথা বললে উত্তরে ছেলে মাকে বলেন, ‘আমার জন্য অনেক করেছ। তোমার টাকা তুমি নিজে উপভোগ করো। মা, আমি আমার মতো করে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই।’ ছেলের এমন কথা মাকে গবির্ত করে। ভাবেন, আজ তিনি সত্যিই সার্থক।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Apu kowsar

Apu kowsar

২০১২.১২.১৯ ০৩:০৪
আমার এক খালা-আমমার চেহারা সাথে উনার চেহারের মিল ছিল বিধায় ছোট বেলা থেকেই ভাল লাগে ববিতা ma'am কে । আজ শ্রদ্ধাবোধ আরো অনেক গুন বেড়ে গেলো তাঁর খুশির সংবাদ শুনে---- আমার ও ভীষন খুশি লাগছে অনিক ইসলাম প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এই জেনে। মা ও ছেলে দুইজনের জননই রইলো ভালবাসা আর শুভকামনা। অনিক ইসলাম ---- সায়েন্টিসট অনিক ইসলাম হিসেবেই দেখতে চাই আপনাকে ---- তা না হোলে কিন্তু আপনার মায়ের সাথে আপনাকে মানাবে না !!!

Showkat

Showkat

২০১২.১২.১৯ ০৩:০৮
Yeah.. smart parents always send their children to Canada... the best place to be!

Fahim

Fahim

২০১২.১২.১৯ ০৪:৩৭
আমি কানাডা থাকি। ওয়াটারলু এখানে অন্যতম ভাল একটা ইউনিভার্সিটি। ববিতা ম্যাডামের ছেলের জন্য রইল শুভেচ্ছা।
২০১২.১২.১৯ ০৫:৩৯
আমি ববিতা আমাদের দেশের খুবি সম্মানিত একজন অভিনেত্রী এবং অসম্ভব ভাল মানুষ। তার ভাল কাজের প্রতিফলন তার ছেলে দেখিয়ে দিল। আললাহ তাকে সব টুকু শান্তি দিন। আমিন....

Muzibur rahman

Muzibur rahman

২০১২.১২.১৯ ০৬:২৯
First of all, congratulation to Onik. We proud of him for his brilliant result

RIPON

RIPON

২০১২.১২.১৯ ০৭:৪০
CONGRATULATIONS !!!!!!!!!!
২০১২.১২.১৯ ০৭:৫০
সালাম ববিতা, তোমায় সালাম।
২০১২.১২.১৯ ০৭:৫০
well done. Greetings for Babita Apa and her beloved son Anik.

syed Kamal mohammad Mukul

syed Kamal mohammad Mukul

২০১২.১২.১৯ ০৮:৩৬
অভিননদন অনিক ! ও এক জন মা 'কে !!

shahed1985

shahed1985

২০১২.১২.১৯ ০৮:৫১
অনেক শুভেচ্ছা রইল মা ও সন্তানের প্রতি। আমাদের প্রিয় ববিতা প্রতি। অনিক আরো উন্নতি করুক এই কামনা করি।

R.M.Farhad

R.M.Farhad

২০১২.১২.১৯ ০৯:৩৩
Congratulations congratulations and Congratulations !!!!!!! both Mother and Son!!!!!

Naser Babu

Naser Babu

২০১২.১২.১৯ ০৯:৩৫
আজ যারা নিজেদের শিল্পী হিসেবে ভাবেন তারা ববিতাকে অনুসরন করবে আসা রাখি।

Golam Masud

Golam Masud

২০১২.১২.১৯ ০৯:৫০
অনেক নেতিবাচক সংবাদের ভীড়ে একটা ইতিবাচক সংবাদ । যা পড়ার পর মনটা ভীষণ ভাল লাগা অনুভব করছে । আমােদর প্রিয় নায়িকা ও তার সন্তান অণিক এর জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা ।

কাউসার রুশো

কাউসার রুশো

২০১২.১২.১৯ ০৯:৫৫
প্রিয় অভিনেত্রী একজন সফল এবং গর্বিত মা, শুনে খুব আনন্দিত হলাম

MMR Sarker Miraj

MMR Sarker Miraj

২০১২.১২.১৯ ১০:৩২
খুব ভালো একটি সংবাদ। অনিক ও ববিতা দুজনকে অভিননদন।

Labony Akter

Labony Akter

২০১২.১২.১৯ ১০:৫০
ভালো একজন বিজ্ঞানি পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শুভকামনা রইল অনিক এবং প্রিয় অভিনেত্রির প্রতি।
২০১২.১২.১৯ ১১:৫১
feeling good. congrates to Babita Madam and her beloved son. well done onik for ur mother. great son!

Muzibur rahman

Muzibur rahman

২০১২.১২.১৯ ১১:৫৯
Most popular actress of bangladesh. Her son Onik did brilliant result we all her fans are happy and wish good future of Onik.. Babita became widow at young age, why she did not marry 2nd time? may be she could have more son & daughter like Onik may be more popular movie star would born. Our country girls are so sacrificing which hardly see in other culture. Our men always look for excuse to get marry 2nd or more times. Our beloved x president Ershad may be still dreaming get more marry.

shaker

shaker

২০১২.১২.১৯ ১২:৪৯
বড় পর্দার আমার প্রিয় অভিনয় শিল্পী ম্যাডাম ববিতা। যেমন অভিনয় জীবনে নিজেকে উচ্চতার শিখরে তুলেছেন তেমনি উনার সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করেছেন । তাই মা সন্তান উভয়ের জন্যে রইল শুভেচ্ছা । অনিক কে অনুরোধ করবো পরাশুনা শেষ করে দেশের জন্যে কিছু করতে । মেধাবীরা বিদেশে থাকলে দেশ উন্নত হবে না ।

২০১২.১২.১৯ ১৩:০৭
All service holder mother including actress should read this news and compare themselves. In this article there are lot more thinks to learn from the mother like Bobita Mam. She always honorable to us and Mr. Anik as well. Thanks Prothom Alo.

Shajol

Shajol

২০১২.১২.১৯ ১৩:৩৩
ভালো কাজ করা যে কোনো অঙ্গনে থেকেই যে সম্ভব আমাদের সিনেমা অঙ্গনের কিংবদন্তি ববিতা ম্যাম তা প্রমাণ করে গেলেন পাপাশাপশি বাবা না থাকলেও যে সন্তান মানুষের মতো মানুষ হতে পারে অনিকও সেটার প্রমাণ রেখেছে, তাই ববিতা ম্যামকে অভিনন্দন এজন্য যে তিনি সিনেমা পাড়ার মানুষের সবারই যে নৈতিক স্খলণ হয় না সেটার প্রমাণ রাখার জন্য, আর জীবণে মায়ের কর্মের কারণে এত কম সাণ্যিধ্য পেয়েও যে ছেলেটি নিজেকে চাপাতি সাকিলের মতো নরকসাই তৈরী না করে মেধার স্বাক্ষর রেখেও যে দেশের সুনাম বাড়ানো সম্ভব এটার প্রমাণ রাখার জন্য, ববতিা ম্যাম আল্লাহ্ আপানার দীর্ঘায়ু দান করুন, কারণ আপনি একটি আদর্শ মায়ের উদাহরণ হয়ে আজীবণ রত্নগর্ভা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকবেন, আর অনিক তুমি শুধু তোমার নও তুমি সবার, তুমি শুধু ববিতার নও তুমি দেশের

MK Majumder

MK Majumder

২০১২.১২.১৯ ১৩:৩৮
খুব ভালো লাগলো খবরটা পড়ে..
অনেকটা আমার মায়ের..

Mirza Mehedi Hasan

Mirza Mehedi Hasan

২০১২.১২.১৯ ১৪:১৩
I have seen My favourite actress Babita standing in front the school wearing Borka.

jannatul ferdush

jannatul ferdush

২০১২.১২.১৯ ১৮:৪৯
এটা দেখে অন্তত মানুষ বুজবে চাকরি ভাল মা হবার অন্তরায় হতে পারে না। ধন্যবাদ ববিতা ।হয়তো আপনার আই খবরে বাংলাদেশের মেয়েরা আরও একটু এগিয়ে যাবার সুযোগ পাবে।

mukta rahman

mukta rahman

২০১২.১২.১৯ ২০:২৭
ববিতা আমার প্রিয় অভিনেত্রী