সেই বিকেলের গল্প

আনিসুল হক | তারিখ: ২৫-০৩-২০১১

  • ৩ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

শিল্পী: শাহাবুদ্দীন আহমদ

বাইরে একটা কোকিল ডেকে উঠল। দক্ষিণের জানালা দিয়ে বাতাসও আসছে ঘরে, বসন্তের বিখ্যাত সমীরণ। আমের গাছে মুকুল এসেছে নাকি! আজকাল বাতাসে কেবল বারুদের গন্ধ, টায়ার পোড়ানোর গন্ধ। এর মধ্যে হঠাৎ করে এক ঝলক বসন্ত বাতাস শেখ মুজিবের শরীরে একটু যেন শান্তির স্পর্শ বুনে দিল। তাঁর মনে হলো, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁদের বাড়ির সামনের ছোট্ট খালটার পাশে আমগাছের নিচে এমনই গন্ধ লেগে থাকত। গাছতলাটা কেমন ছেয়ে থাকত ঝরা মুকুলের দানায়।
শেখ মুজিব শুয়ে আছেন বিছানায়। মাথার কাছে তাঁর বড় মেয়ে হাসু একটা মোড়া নিয়ে বসে আছেন। আর পায়ের কাছে বসেছেন বেগম মুজিব। শেখ মুজিব তাঁকে ডাকেন রেনু বলে। এই বিকেলে মুজিবের এভাবে শুয়ে থাকার কথা নয়। আজ সাতই মার্চ। ১৯৭১ সাল। রেসকোর্স ময়দান ভরে গেছে মানুষে মানুষে। প্রায় ১০ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছে সেখানে। প্রায় সবার হাতে লাঠি। সবার মুখে স্লোগান: ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
স্বাধীনতা...সারাটা জীবন এই একটা লক্ষ্যই মনের মধ্যে মুজিব সযত্নে লালন করে আসছেন। সেই যখন ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো, শরৎ বসু আর মুজিবের নেতা সোহরাওয়ার্দীর শেষ মুহূর্তের আসামসহ একটা অখণ্ড বাংলা গঠনের উদ্যোগ ভেস্তে গেল, আবুল হাশিমপন্থী বলে পরিচিত মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশটা খাজাদের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ল, তখন শেখ মুজিব বেকার হোস্টেলের একটা কক্ষে মিলিত হয়েছিলেন মুসলিম ছাত্রলীগের সমমনা কর্মীদের সঙ্গে। সেদিনই তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান অর্জিত হচ্ছে বটে, কিন্তু আমাদের সংগ্রাম শেষ হচ্ছে না, শুরু হচ্ছে।’ ঢাকায় ফিরেই তিনি শুরু করলেন মিছিল-মিটিং। ১৯৪৮ সালেই ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে শুরু করে দিলেন আন্দোলন। গত ২৪টা বছর তিনি এই একটা লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছেন। অ্যান্থনি মাসকারাসের সঙ্গে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে বালুচ রেজিমেন্টের মেসেও তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা পেতে হবে। আমাদের নিজেদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী থাকতে হবে।’
আজ একটা সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছেন তিনি। গতকাল বিকেলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ভাষণ দিয়েছেন। নিজের এই ঘরে শুয়ে রেডিওতে সেই ভাষণ তিনি শুনেছেন। সব দোষ বাঙালিদের দেওয়া হলো? দোষ আমাদের? আমাদের রক্তের দামে কেনা বুলেট আমার মানুষের ওপর বর্ষণ করা হচ্ছে, আর দোষ আমাদের? গত রাতে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ভাষণ-পরবর্তী করণীয় নিয়ে বৈঠক হয়েছে।
আজ পুরো জাতি অপেক্ষা করছে তিনি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে কী বলবেন, তা শোনার জন্য। মানুষ একটা কথাই শুনতে চায়। স্বাধীনতা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ থেকে এরই মধ্যে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই মুহূর্তে ইউডিআই, ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স তিনি করুন, তারা সেটা চায় না। কাল রাতেই ইয়াহিয়া খান ফোন করেছিলেন, তিনি অনুরোধ করেছেন, এখনই যেন মুজিব চূড়ান্ত কিছু ঘোষণা না দেন। চারদিকে রব, আজ যদি তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, আজকেই পাকিস্তানি বাহিনী হামলা শুরু করবে। রক্তনদী বইয়ে দেওয়া হবে। তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে দোষ দেওয়া হবে। স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই তো চলবে না। সেটা ধরে রাখতে হবে। ফিলিস্তিনিরা সেই কবে থেকে লড়ছে স্বাধীনতার জন্য, আইরিশরা লড়ছে, কিন্তু অর্জন তো করতে পারছে না।
অন্যদিকে মানুষ নিজের গতিতে বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছে। এই নেতৃত্ব মুজিবের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যদি তাঁর মুখ থেকে সময়ের সংলাপ উচ্চারিত না হয়। ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বানিয়ে ফেলেছে। তাঁর উপস্থিতিতেই সেই পতাকা ওড়ানো হয়েছে। তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’—এই গানটা হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। সবকিছু ঠিক। ছাত্রনেতারা তাঁকে বারবার করে জানান দিচ্ছেন, স্বাধীনতা ঘোষণার চেয়ে কম কিছু তাঁরা শুনতে চান না।
তিন দিন আগে গুলিতে মারা গেছে ফারুক ইকবাল। আবুজর গিফারি কলেজের ছাত্র। মৌচাক-মালিবাগের মোড়ে তারা মিছিল করছিল। মুজিব শুনতে পেয়েছেন, মৃত্যুর আগে নিজের রক্ত দিয়ে এই ছাত্রটি রাজপথে লিখেছিল, ‘জয় বাংলা’। মানুষ মরতে শিখেছে। এই মানুষকে কে দাবায়া রাখতে পারবে?
একটু পরে তাঁকে উঠতে হবে গাড়িতে। যেতে হবে রেসকোর্স ময়দানে। রেনু তাঁকে বললেন, ‘মেলা রাত মিটিং করেছ। সারা দিন একদণ্ডও ফুরসত পাওনি। এখন একটু বিশ্রাম নাও। ১০টা মিনিট শুয়ে থাকো।’
মুজিব রেনুর কথা শুনলেন। তিনি ১০টা মিনিটের জন্যই শরীর এলিয়ে দিলেন বিছানায়। পায়ের কাছে রেনু, মাথার কাছে হাসু।
বেগম মুজিব বললেন, ‘শোনো, তোমার সামনে লক্ষ মানুষ, তাদের হাতে লাঠি। তোমার পেছনে বন্দুক। এই লক্ষ মানুষ যেন হতাশ না হয়। কারও পরামর্শ শোনার দরকার নাই। তোমার বিবেকের দিকে তাকাও। তোমার মন যা বলবে, তা-ই বলবা।’
মুজিব যেন কোত্থেকে শক্তি পেলেন। তাঁর মন যা বলবে, তা-ই তিনি বলবেন।
তিনি উঠে পড়লেন। বেগম মুজিব তাঁকে এগিয়ে দিলেন তাঁর সাদা পাঞ্জাবি, তাঁর কালো হাতাকাটা কোট।
বঙ্গবন্ধু মুজিব রওনা হলেন। নিরাপত্তার জন্য ৩২ নম্বর থেকে সরাসরি মিরপুর রোডে না উঠে পশ্চিম দিক দিয়ে রওনা হলো গাড়ি।
শেখ মুজিব চলেছেন। পথে মানুষ আর মানুষ। হাতে লাঠি, লগি। তাদের এক দফা—স্বাধীনতা। মানুষের ভিড় ঠেলে সভামঞ্চে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। নৌকা আকৃতির মঞ্চ। এখন যেখানে শিশুপার্ক, তার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ছিল সেই মঞ্চটি।
রোদ মরে আসছে। ফাল্গুনের বাতাস স্তব্ধ হয়ে আছে মুজিব কী বলেন, তা শোনার জন্য। উৎকর্ণ হয়ে আছে সমবেত ১০ লাখ মানুষ। তাঁর সঙ্গে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। ২৪টা বছর যে মানুষটা সাহস, প্রতিজ্ঞা, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ দিয়ে হয়ে উঠেছেন সব বাঙালির একমাত্র কণ্ঠস্বর, এবার তিনি মুখ খুলবেন।
তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। একটা সবুজ হেলিকপ্টার সেনাবাহিনীর উপস্থিতি জানান দিতে উড়ছিল রেসকোর্সের ওপর দিয়ে।
মুজিব জনতাকে অভিবাদন জানিয়ে মুখ খুললেন। ‘আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।’
বললেন তাঁর সারা জীবনের সব ক্রিয়াকর্মের সারকথা, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, দেশের মানুষের অধিকার চাই।’
বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’
‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
২০ মার্চ ২০১১, ঢাকা

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Mirza arifur rahman

Mirza arifur rahman

২০১১.০৩.২৬ ০৩:২৪
I can feel tears in my eyes...Thank you Mr. Anisul Haque for such a good writing...

Ashraful Haque

Ashraful Haque

২০১১.০৩.২৬ ০৩:৪৭
গল্পে গল্পে ইতিহাস|গল্পে গল্পে ঐতিহাসিক বিকেলের গল্প|এমন গল্প জানা ইতিহাসে যুক্ত করলো নতুন নতুন মাত্রা| ভালো লাগলো|

M Rahman Sohel

M Rahman Sohel

২০১১.০৩.২৬ ১০:১১
মুজিব মোদের চেতনায়...
মুজিব মোদের বিশ্বাস .....