প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক

‘শেয়ারবাজার: প্রতিবেদনের পর কী?’

| তারিখ: ১১-০৫-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

২৮ এপ্রিল প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘শেয়ারবাজার: প্রতিবেদনের পর কী’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হলো

যাঁরা অংশ নিলেন
ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী
সাবেক চেয়ারম্যান, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)
এ কে আজাদ
সভাপতি, এফবিসিসিআই
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
বিশেষ ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
শাকিল রিজভী
সভাপতি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ
ইয়াওয়ার সাঈদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এইমস বাংলাদেশ
আরিফ খান
সাবেক সভাপতি, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জেনিথ ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
সূচনা বক্তব্য
মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম, যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
শওকত হোসেন, যুগ্ম বার্তা ও বাণিজ্য সম্পাদক প্রথম আলো।

আলোচনা
মতিউর রহমান
গত ডিসেম্বরে বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ১৯ জানুয়ারি একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল ‘শেয়ারবাজার কোন পথে’ শীর্ষক। সেখানে আলোচনায় আশা করেছিলাম, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া হবে। এরপর সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি এরই মধ্যে বাজার ধসের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম, ঘটনা ও সুপারিশসহ সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী বিভিন্ন কথা বলছেন। কিন্তু ২০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, আসলে সরকার এ ব্যাপারে কী উদ্যোগ নেবে বা সরকারের অবস্থান কী হবে? যদিও তদন্ত কমিটি ও তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা রকম তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও চেষ্টা চলছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। শেয়ারবাজারে এখনো অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান। প্রায়ই দরপতন ও রাস্তায় বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। এভাবে চললে তা কখনো দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। সরকার যদি দ্রুত কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। দুঃখজনকভাবে এটি সত্যি যে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেয়ার কেলেঙ্কারি ঘটেছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে ঘটনায় দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়নি। এবারও যদি দোষীদের শাস্তি না দেওয়া যায়, তাহলে তা সরকারের জন্য ভালো দৃষ্টান্ত হবে না, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে একটি বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আজকের আলোচনায় শেয়ারবাজার প্রতিবেদনের পর কী, আমরা কোন অবস্থানে আছি, কী হতে পারে কিংবা আমাদের চিন্তা কী—এ বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসবে। আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করে যদি ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের কোনো আশার কথা বলতে পারি, তবে তা আলোচনার ইতিবাচক দিক হবে।
আলোচনার শুরুতে এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীকে অনুরোধ করব বলার জন্য।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী
প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনেক তথ্য আমরা জেনেছি, আমি যতটুকু দেখেছি ওয়েবসাইটে, প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে চিহ্নিতও করা হয়েছে, যারা এর জন্য দায়ী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বাজারে (প্রাইমারি মার্কেট) শেয়ার অতিমূল্যায়িত করা, প্রাইভেট প্লেসমেন্ট দেওয়া, বুক বিল্ডিং পদ্ধতি ও ডাইরেক্ট লিস্টিং এসব পদ্ধতি অপব্যবহার করার কারণে শেয়ারবাজারে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সেকেন্ডারি মার্কেটের কারণে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
এখানে তদন্ত কমিশনের সঙ্গে আমার মতবিরোধ রয়েছে। কারণ সেকেন্ডারি মার্কেটে প্রথমে শেয়ারের দাম অতিমূল্যায়িত না করলে প্রাইমারি মার্কেটে এসব সুবিধা নেওয়া সম্ভব নয়। যদি সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ারের দাম স্বাভাবিক থাকে তখন কোনোভাবেই প্রাইমারি মার্কেটে শেয়ারের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে প্রতিবেদনের মূল যে কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রাইমারি মার্কেটে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বুক বিল্ডিং কিংবা ডাইরেক্ট লিস্টিং—এগুলোকেও গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। দেখতে হবে এসব সুবিধা কারা নিয়েছে। হয়তো যারা এগুলো করেছে, তারাই প্রথমে সেকেন্ডারি মার্কেটকে অতিমূল্যায়িত করে পরে প্রাইমারি মার্কেট থেকে এসব সুবিধা নিয়েছে।
যারা বাজারটিকে এই উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই মহল চাইছিল এই উচ্চপর্যায়টি আরও কিছু দিন থাকুক। তারা যে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট দিয়েছিল বা অতিমূল্যায়িত শেয়ার নিয়েছিল, এই শেয়ারগুলো যেন সাধারণ মানুষের হাতে চলে আসে, তারপর দরপতন ঘটলে যা ঘটে ঘটুক। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য হচ্ছে, সেটি ঘটার আগেই কিন্তু বাজারের পতন ঘটেছে। ফলে তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি।
আমার মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই জাগে, যখন বাজার অতিদ্রুত বাড়ছিল, তখন সরকারকে কেন কিছু মহল থেকে বলা হলো ‘না, তেমন কোনো অতিমূল্যায়িত বাজার এটি নয়’? এই বলার পেছনে কোনো কারণ ছিল কি? তারা কি চাচ্ছিল বাজার আরও অতিমূল্যায়িত হোক? তদন্তের মূল ফোকাস হওয়া উচিত ছিল বা এখনো হতে পারে, এই যে বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেল এবং বাজারকে এই পর্যায়ে ধরে রাখার চেষ্টা করা হলো—এর পেছনে আসলে কারা ছিল। এর মূল কারণ হলো বাজার বৃদ্ধি। বাজার বৃদ্ধি না হলে প্রাইমারি মার্কেটে এই অপব্যবহার সম্ভব নয়।
এসইসি পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি বর্তমান বাজারকে স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক করার জন্য। এসইসি পুনর্গঠন না করলে বাজারের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আস্থা তৈরি হবে না। এই পুনর্গঠনের কাজটি হতে হবে তিনটি ধাপে। প্রথম ধাপে বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সব সদস্যকে পরিবর্তন করে নতুনভাবে নিয়োগ দিতে হবে।
তবে এসইসি বদলালেই সবকিছু বদলে যাবে তা-ও ভাবা ঠিক হবে না। চার-পাঁচ বছর আগে শেয়ারবাজারে দৈনিক লেনদেন হতো ৩০-৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু এখন সেই লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তখন যে এসইসি ছিল, যে লোকবল ছিল, যে নজরদারি বিভাগ ছিল, এখনো সেটাই আছে। সামান্য কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সেই হিসেবে এসইসির পক্ষে এত বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব ছিল কি না সেটিও ভেবে দেখতে হবে। এসইসির দক্ষ লোকবল বৃদ্ধির প্রতি সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আমার মত হচ্ছে, কমপক্ষে তিনজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, দুজন আইনজ্ঞ ও অন্তত একজন আর্থিক বিশ্লেষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি বেতনকাঠামো দিয়ে এ ধরনের লোক পাওয়া যাবে না। তাই এসইসির জন্য আলাদা বেতনকাঠামোর কথাও সরকারকে ভাবতে হবে।
প্রতিবেদনে যাঁদের নাম এসেছে, আইনগতভাবে তাঁদের দোষী প্রমাণ করা কঠিন। তা ছাড়া তাঁরা পুঁজিবাজারের কোনো আইন ভঙ্গ করেছেন, তার কোনো উল্লেখ নেই প্রতিবেদনে। অথচ তাঁদের শাস্তি দিতে গেলে বিষয়টি একপর্যায়ে আদালতে গড়াবে। কিন্তু আদালতে আবেগের কোনো জায়গা নেই। আদালত তথ্যপ্রমাণ চাইবেন। শাস্তি দেওয়ার আগে পুনর্তদন্ত করে আইন-কানুনের ভিত্তিতে শক্তভাবেই ধরতে হবে। তা না হলে ১৯৯৬ সালের ঘটনার মতো এবারের ঘটনারও কোনো ফল পাওয়া যাবে না। এসইসি পুনর্গঠনের পরই এ কাজটি করা অত্যন্ত জরুরি।

আব্দুল কাইয়ুম
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে, যাদের দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে সরকারের মনোভাব কী, এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
পুঁজিবাজারের সংকটকে যদি নিতান্ত পুঁজিবাজারের ভেতর খোঁজা হয়, তবে এই সংকটের সমাধান পাওয়া যাবে না। পুঁজিবাজারের সংকট বুঝতে হলে আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও পরিস্থিতি অনুধাবন করতে হবে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি যদি ছয় শতাংশ হারে ঘটে, যদি সে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত অর্থনীতির ভিত্তির ওপর হয়, তাহলে যতই আমার আয়বৈষম্য বাড়ুক, তার কিছু কিছু বিকাশমান মধ্যবিত্ত সমাজের হাতে যায়। কিন্তু সেখানে কিছু বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ আমাদের বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং এমনকি নিম্নমধ্যবিত্তের হাতেও সৃষ্টি হয়। এখানে আয় ও সম্পদের সৃষ্টি—দুটোই হয়। দেশের পরিস্থিতিতে এই বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ গুমরে মরছে, কিন্তু কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগের জায়গা তারা পাচ্ছে না। ঐতিহাসিকভাবে মধ্যবিত্তরা ব্যাংকে টাকা রাখাটা নিরাপদ মনে করতেন। কিন্তু দুই বছর আগে সুদের হার কমে যাওয়ায় আমানতকারীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ পরিস্থিতিতে টাকা সাধারণত জমি, ফ্ল্যাট, সোনা কেনা বা বিদেশে পাচার হয়। মধ্যবিত্তদের সেই সুযোগ কম থাকায় তাঁরা পুঁজিবাজারের দিকে ঝুঁকেছেন। আর এ সুযোগ কিছু গোষ্ঠী, বাজার-সংগঠক ব্যবহার করেছেন। কারণ, এখানে দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার অনেকটা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুত।
কিন্তু কাঠামোগত ও আইনগত দুর্বলতা রয়েছে এখানে। শেয়ারবাজার দেখভাল করার যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এখানে। যাঁরা এর জন্য দায়ী, তাঁরা প্রচলিত আইনকে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন। আইনিভাবে বেআইনি কাজ করার সুযোগ তাঁরা পেয়েছেন বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে।
সিদ্ধান্তহীনতা অনেক সময় সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তের চেয়ে খারাপ। দেশে যদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা হয়, সে সিদ্ধান্তহীনতা আপনার সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তের মূল্যের চেয়ে খারাপ। বর্তমানে এমন একটা সিদ্ধান্তহীনতার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাজার যাচ্ছে। বাজার নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে তার সঞ্চয় বিনিয়োগকে আগামী দিনে স্বল্প মেয়াদে দাঁড় করাবে। যাঁরা বাজারসংগঠক, তাঁরাও বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁদের ভূমিকাটা আগামী দিনে কী হবে। যারা দেখভাল করার প্রতিষ্ঠান, তারাও জানে না তারা থাকবে না কি চলে যাবে। সরকারও একটা হতবুদ্ধি অবস্থার মধ্যে আছে। এর ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে যে কর্তৃত্বমূলক ভূমিকা থাকা দরকার, তা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে দিকনির্দেশনামূলক কর্তৃত্ব থাকার কথা, তা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে সবার মনে সন্দেহ জাগছে।
বলা হচ্ছে, এসইসি পুনর্গঠনের জন্য যোগ্য মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে আপনি কীভাবে খুঁজছেন, তার ওপর। আপনি যদি নিজের আশপাশে দেখেই বলে দেন যোগ্য মানুষ নেই, তাহলে তা সঠিক হবে না। এ দেশে অনেক যোগ্য মানুষ আছেন। এই লোক খোঁজার প্রক্রিয়াটিও খুবই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দক্ষতার মাধ্যমে হতে হবে। এই মুহূর্তে এসইসিতে সৎ ও দক্ষ হিসেবে সুনাম রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হলেই কাজ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমাদের সরকারি সব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত। দেশের ভেতর তিনজন যোগ্য ব্যক্তি দ্বারা সার্চ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ওই কমিটি যোগ্য ব্যক্তিদের নাম অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করতে পারে।
সরকার যদি শেয়ারবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় না করে, তবে আবার বিভিন্ন ধরনের ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হবে। ব্যাংকগুলো নিজেদের উদ্বৃত্ত টাকা এখানে বিনিয়োগ করেছে। সরকারি শেয়ার ছাড়াও পিপিপি যদি বড়ভাবে আসে, অনেকে যদি পিপিপির জন্য পুঁজিবাজার থেকে টাকা তোলে, তাহলে অবশ্যই সরকারের সঙ্গে অর্থবাজারের সমন্বয়ের ঘটনা ঘটবে।

শওকত হোসেন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি শাকিল রিজভীকে বলার জন্য অনুরোধ করছি। আমরা জেনেছি, তদন্ত কমিটিকে এসইসি তেমন সহযোগিতা না করলেও ডিএসই তাদের অনেক সহযোগিতা করেছে।

শাকিল রিজভী
আমাদের আগের মার্কেট ছোট ছিল, তাই সামগ্রিক অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলত না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের বাজার অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। সুতরাং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে পুঁজিবাজারের সম্পর্ক এখন অনেক গভীর। পুঁজিবাজারকে যদি এই মুহূর্তে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা না হয়, তবে ভবিষ্যতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে।
এসইসি পুনর্গঠন আগে করতে হবে। কারণ, এসইসিকেই শক্ত হাতে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এসইসির লোকবল বাড়ানো ও আইন-কানুন আরও আধুনিক করা দরকার। অনৈতিক জায়গাগুলোতে আইনি সংস্কার যদি করা হয়, সে সমস্যাগুলো থাকবে না। এসইসিকে শুধু দোষ দিলে হবে না। এসইসির সততা লাগবে, এটা ঠিক। বাজার-সংশ্লিষ্ট সবাইকে এসইসিকে সহযোগিতা করতে হবে। সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবার উচিত নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করা। এসইসির স্বাধীনভাবে চলার মতো শক্তি থাকতে হবে। ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবী—কোনো মহলই যেন এসইসিকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার।
এসইসির যাঁরা উচ্চপর্যায়ে থাকবেন, তাঁদেরও শক্ত মনোবল থাকতে হবে, ‘আমি নিয়মনীতির ভেতর আছি, আপনি যে-ই হোন, আপনি সমাজের যতই শক্তিশালী হোন, নিয়মনীতির মধ্যেই থাকতে হবে।’ বাজার কিন্তু কখনো উঠবে বা কখনো নামবে—এটিই নিয়ম। কিন্তু এমন ধারণা করা ঠিক হবে না, এসইসিকে শক্তিশালী করলে কখনো বাজার নামবে না। কারণ, সার্বিক অর্থনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা—সবকিছুর সঙ্গেই পুঁজিবাজার সম্পর্কিত। যদি ব্যাংকের সুদের হার কমে যায়, তবে শেয়ারবাজারে টাকা আসবে। আবার ব্যাংকের সুদের হার যদি কোনো কারণে বাড়ে, তবে পুঁজিবাজার থেকে টাকা বের হয়ে যাবে। সেকেন্ডারি মার্কেটের প্রভাব এসে পড়ে প্রাইমারি মার্কেটের ওপর। যে সময় পুঁজিবাজারে টাকার প্রবাহ আসছিল, সে সময় যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে এ সমস্যার সৃষ্টি হতো না। তিন বছর আগেও বাজারমূলধন ছিল আট বিলিয়ন ডলার, এখন বাজারের ধস অবস্থায়ও ৩৬ বিলিয়ন ডলার। তিন বছর আগের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি আছে। সেখানে প্রাইস লেভেল প্রি-রেশিও এখন ১৬। ২০০৬-০৭ সালে যেখানে ছিল, সেই লেভেলেই চলে এসেছে। কিন্তু সংস্কারের সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত নেওয়া দরকার। এসইসিকে প্রভাবিত না করে তার নিজস্ব শক্তিতে দৈনিক বাজার পর্যবেক্ষণ করতে দেওয়া উচিত।
পুঁজিবাজার সম্পর্কে যেসব তথ্য দেওয়া হয়, সেগুলোর সত্যতা থাকা দরকার। এমন কোনো তথ্য দেওয়া উচিত নয়, যা মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে বা বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আমাদের বলা হয়, ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ তথ্যও কিন্তু ঠিক নয়। ৩৩ লাখ বিও হিসাবধারীর মধ্যে ১০-১২ লাখ শুধু প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগ করেন। ২০০৯-১০ সালে একটি গবেষণা করে দেখেছি, এসব বিনিয়োগকারী শুধু প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগ করে লাভ করে আরেকটি নতুন আইপিওতে বিনিয়োগ করেন। এগুলো নিয়মের মধ্যেই হচ্ছে। এঁরা কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত নন। কারণ, এঁরা সেকেন্ডারি মার্কেটে আসেন না। যিনি শুধু প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগ করেছেন, এক বছরে তিনি দেড়-দুই লাখ টাকা লাভ পেয়েছেন। যাঁর লটারিতে কম আসে, তিনিও এক লাখ টাকা লাভ করেন। এই টাকাটাও সমাজের কোনো অংশে চলে গেছে। সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে ব্যাংকগুলো ভালো একটি লভ্যাংশ পেয়েছে। কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে বড় লভ্যাংশ নিয়ে এখন আর বাজারে নেই। প্রতিবেদনে কার কার নাম আছে, সেটা মূল বিষয় নয়। দেখতে হবে তার দোষ আছে কি না। নামের পেছনে কোনো সংগত কারণ আছে কি না, তা-ও দেখতে হবে। নাম থাকলেই তাকে দোষী ভাবা ঠিক হবে না।
ডিমিউচুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়াটি প্রতিবেদনের আগে থেকেই প্রক্রিয়াধীন। ডিএসইতে ম্যানেজমেন্ট সেপারেশন অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ডিএসইতে সেমি-ডিমিউচুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি করা হবে। তবে এটি মনে করলে ভুল হবে যে শেয়ারবাজার উত্থান-পতনের পেছনে ডিমিউচুয়ালাইজেশন কাজ করেছে। প্রতিবেদনের দুটি অংশে লেখা আছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তথ্য চলে যায়। কোনো কর্মকর্তা যাতে তথ্য পাচার করতে না পারেন, সে জন্য আমরা অভ্যন্তরীণ একটি কমিটি গঠন করে এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করব। কেউ ভুল তথ্য দিচ্ছে কি না, কাউকে বাঁচানো বা হেয় করার জন্য, সে বিষয়গুলো দেখা দরকার।

ইয়াওয়ার সাঈদ
ছিয়ানব্বইয়ের প্রসঙ্গ বারবার টেনে আনা হচ্ছে। তখনো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবারও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমস্যাটি হচ্ছে আমরা আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতিকে ধ্বংস করেছি। এখন প্রশ্ন আসছে আইন ও নীতি-নৈতিকতার। নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি কখনোই আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি ব্যক্তিসমাজের শিক্ষা। আজকে যাঁরা এই কাজটি করেছেন, তাঁরা ভালো করে জেনেই করেছেন যে তাঁরা পার পেয়ে যাবেন। আইনের যে অপব্যাখ্যা পুঁজিবাজারে চরম আকারে হয় তার অনেক উদাহরণ রয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের কীভাবে বিভ্রান্ত করা হয়। তথ্য ও উপাত্ত অনেক কথা বলে। কিন্তু তথ্য ও উপাত্তগুলো সবাই সবার সুবিধামতো ব্যবহার করেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অর্থমন্ত্রী ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি শুধু একবারই এসইসিতে গিয়েছিলেন বিশেষ বৈঠক করতে। তার পরের দিন পত্রিকায় এল, মন্ত্রী বলেছেন, পাঁচ মিলিয়ন বিও অ্যাকাউন্টস টার্গেট। যদি সরকারের নীতিনির্ধারকদের বোঝানো হয় যে বিও অ্যাকাউন্ট বেশি হলে ভালো, তবে কেন এখন বলছি ৩০ লাখ বিও অ্যাকাউন্ট বেশি হয়ে গেছে? বারবার বলা হয়েছে, জিডিপির অত শতাংশ কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেটের জিডিপিতে শূন্য শতাংশ ভূমিকা রয়েছে। মন্ত্রী বলছেন, ছিয়ানব্বইয়ে কেলেঙ্কারির কোনো সাক্ষী নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক অপরাধের জন্য সাক্ষী লাগে না, লাগে প্রমাণ। ছিয়ানব্বইয়ের ওই প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি, সেখানে অনেক প্রমাণ দেওয়া আছে। পৃথিবীর কোথাও ট্রাস্টিকে—তিনি যদি সেই ট্রাস্টি বোর্ডে থাকেন—বিনিয়োগ করতে দেওয়া হয় না। আমাদের এসইসি একটি মিউচুয়াল ফান্ডকে সে সুযোগ দিয়েছে। তারা সবাইকে একটি নোটিশ দিয়েছে, এখন থেকে আর করতে পারবে না। আইন ছিল, একটি মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজারের অধীন যদি একাধিক মিউচুয়াল ফান্ড থাকে, একটি মিউচুয়াল ফান্ড আরেকটি মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার কিনতে পারবে না। কিন্তু এখন প্লেসমেন্ট ছাড়াতে হবে, সে জন্য বড় বড় মিউচুয়াল ফান্ড হবে ১০০, ২০০ ও ৩০০ কোটি টাকার। কিছুদিন আগে দেখলাম, একটি মিউচুয়াল ফান্ড আরেকটি মিউচুয়াল ফান্ডকে প্লেসমেন্ট দিয়েছে একই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির অধীন। আমি চিঠি দিয়ে জানতে চাইলাম, আইনটি পরিবর্তন করা হয়েছে কি না। উত্তরে বলা হলো, যেহেতু স্পন্সর আলাদা, তাই করা যাবে। অর্থনৈতিক দুর্নীতি বারবার ঘটছে। তরুণ প্রজন্ম যারা নতুনভাবে কাজ করছে, তারা এই দুর্নীতি দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তারাও দুর্নীতি করতে আগ্রহী হচ্ছে, কারণ তারা প্রলোভনের শিকার হচ্ছে। সমস্যাগুলো প্রাইমারি মার্কেট থেকে শুরু করে সেকেন্ডারি মার্কেটে প্রভাব ফেলছে।
মার্চেন্ট ব্যাংককে ডিসক্রিশনারি পোর্টফোলিও করার জন্য তাদের অমনিবাস অ্যাকাউন্ট খোলার একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট আরেকটি কারসাজির জায়গা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা যদি সঠিকভাবে এই কাজটি করত, তবে তাদের একটি শক্তিশালী গবেষণা বিভাগ দরকার ছিল। কারণ কোন শেয়ার কখন কিনব, কখন বিক্রি করব, সে সিদ্ধান্ত গ্রাহক নয়, প্রতিষ্ঠানই নিতে পারবে। অনেকে বলছেন, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, আগে বাজারটা দাঁড় করিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু যারা দোষী, তাদের নাম নেওয়া যাবে না বা শাস্তি দেওয়া যাবে না, যদি তারা বাজার থেকে চলে যায় এই ভয়ে। কমিটির প্রতিবেদনে যেসব ঘটনার কথা বলা আছে, তা সবারই জানা। কমিটি কেবল ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছে।
চরম বিপর্যয়ের মধ্যে একটি খবর এল, ২০০ কোটি টাকার একটি ফান্ড এসইসি অনুমোদন করছে। সেখানে শর্ত হচ্ছে, আগামীকাল থেকেই এই অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু ফান্ডটির নাম ফিক্সড ইনকাম ফান্ড। ফিক্সড ইনকাম ফান্ড কী করে ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ করে? অর্থাৎ রেগুলেশনকে বিকৃত করে কীভাবে কাজ করা হচ্ছে, এটি তার একটি উদাহরণ।

আরিফ খান
সম্প্রতি পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত প্রতিবেদনে কে কত প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে। আসলে সংকটের বীজটা শুরু হয়েছে সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে। যখন সেকেন্ডারি মার্কেটের ইনডেক্স দুই হাজার ছিল, যা আস্তে আস্তে তিন হাজারের দিকে যাচ্ছিল, আমরা সবাই বলেছিলাম, ইনডেক্স বেড়ে যাচ্ছে। আর ইনডেক্স যখন তিন হাজার থেকে আট হাজারের দিকে যাচ্ছিল, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ-দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যখন ইনডেক্স ছয় হাজারে পৌঁছেছিল, তখন বলা হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের সাবধান হয়ে যেতে, বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে গেছে। তখনো কিন্তু আমরা শুনিনি কথাগুলো। সার্কুলার ট্রেডিং করা হয়েছিল, যাঁরা প্রাইমারি মার্কেটে বুক বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ার আনতে চেয়েছিলেন, তাঁদের সেসব শেয়ারে তুলনীয় দাম (রেফারেন্স ভ্যালু) বাড়ানোর জন্য একই বেঞ্চমার্ক সেকেন্ডারি মার্কেট প্রাইস দরকার ছিল। যাতে রোড শোতে বলতে পারে, অমুক কোম্পানির দাম এত, তাই আমাদের কোম্পানির দাম এত হতে পারে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সার্কুলার ট্রেডের প্রবণতা শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন গ্রুপ সংঘবদ্ধভাবে একটি শেয়ারকে এক হাউস থেকে বিক্রি করেছে এবং আরেক হাউস থেকে কিনেছে। এভাবে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি প্রথম শুরু হয়েছিল ডাইরেক্ট লিস্টিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ডাইরেক্ট লিস্টিং বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই প্রক্রিয়া দেখার পর অনেক বিনিয়োগকারী ভাবলেন, এই মার্কেট থেকে এভাবে টাকা নেওয়া সম্ভব। এই সম্ভাবনার মাধ্যমেই সার্কুলার ট্রেডের মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা নিয়ে গেছে। অসংখ্য ইনসাইডার ইনফরমেশন, প্রাইস সেন্সেটিভ ইনফরমেশন নামে বাজারে নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য ভিত্তিহীন দেখা গেছে। এ ঘটনাগুলো যখন ঘটছিল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ মিলে সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না।
পুরো পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল এসইসির। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে দেখেছি, এসইসি অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না, তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল সিদ্ধান্তের জন্য। আবার কখনো কখনো সংসদীয় কমিটির দিক থেকেও নির্দেশনা আসছিল। এগুলোও বিপর্যয়ের পেছনে কাজ করেছে। একটি প্রতিষ্ঠান তখনই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে যখন তার নিজের ওপর আস্থা ও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এসইসির চেয়ারম্যানের অবশ্যই উচিত ছিল নিজস্ব চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাজারের জন্য মঙ্গলজনক কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেওয়া। আরেকটি বিষয়, বাণিজ্যিক ব্যাংকের লায়াবিলিটির ১০ শতাংশের বেশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা যায় না, এটি কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক দেরিতে পর্যবেক্ষণ করেছে। অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক ২৬ শতাংশ পর্যন্ত লায়াবিলিটির বিনিয়োগ করেছিল শেয়ারবাজারে। একদিকে আমরা সুদের হার কমাচ্ছি, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো যে লিমিট ক্রস করছে, তা পর্যবেক্ষণ করছিল না বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা যদি তখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম, তবে ইনডেক্স এত বৃদ্ধি পেত না। এমনও বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারকে আমরা জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেব। আমরা তরুণ প্রজন্মকে বলেছি, আপনারা এই ব্যবসায় আসেন, কোনো লোকসান নেই। কিন্তু অনেক পরে এসে আমরা লোকসানেরই কথা বলেছি। আমাদের সবার নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা উচিত ছিল, শুধু কয়েকজন বা প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করলে হবে না। তদন্ত প্রতিবেদনে এই সার্কুলার ট্রেড কারা করেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করা যেত। বুক বিল্ডিংয়ে ওভার প্রাইস নেওয়ার জন্য প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়ে আসা হয়েছিল। পত্রিকায় অনেক তালিকা এসেছে, কারা কারা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়েছেন। আমার মত হচ্ছে, প্রাইভেট প্লেসমেন্টে এসইসি যদি ক্যাপিটাল রেজিংয়ের অনুমতি দিয়ে থাকে, আমার যদি সাদা টাকা থেকে থাকে, তবে আমি তা নিতেই পারি। কিন্তু তখন তিনি অভিযুক্ত হবেন, যখন তিনি অবৈধ টাকা দিয়ে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নেবেন।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কমিটির সদস্যদের চরিত্র হনন শুরু হয়েছে। কমিটির সদস্যদের নিয়ে যেভাবে লেখা হচ্ছে তাতে দেশে সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান থাকবে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কোনো ভালো মানুষ এ ধরনের কাজ করতে আগ্রহ দেখাবেন না।
এই বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য এসইসির পুনর্গঠন এবং তাদের যোগ্য লোক নিয়োগের জন্য বেতনকাঠামো পরিবর্তন করা দরকার। স্টক এক্সচেঞ্জ সংস্কার করা হচ্ছে। তবে এসব সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন কোনোভাবেই পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অনেকে বলেছেন, সেকেন্ডারি মার্কেটের কোনো ভূমিকা নেই জিডিপিতে। আমি বলতে চাই, সেকেন্ডারি মার্কেট না থাকলে প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগ হবে না। ফলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, যে দেশের পুঁজিবাজার যত শক্তিশালী, সে দেশ তত উন্নত। বিশ্বের প্রায় সব বড় দেশেই শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। কিন্তু দোষী ব্যক্তিরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের শাস্তির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আমাদেরও সেদিকে যেতে হবে। এত বড় ঘটনার পর যদি দু-একজনেরও শাস্তি না হয়, তাহলে সবাই বলতে শুরু করবে, এ দেশে কিছুই হয় না। অপরাধীরা আবার উৎসাহিত হবে।
আমাদের অডিট রিপোর্টে যাঁরা বিশ্লেষক আছেন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একটি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের মতো এটা করার কথা, সেটি যত দিন না হবে, আমাদের প্রিরেশিও হিসাব করে কোনো লাভ হবে না।

শওকত হোসেন
আগে কিছু ব্যবসায়ী ছিলেন যাঁরা একটার পর একটা নতুন কোম্পানি খুলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ডিফল্টার হয়ে টাকা হাতিয়ে নিতেন। কিছুদিন ধরে ব্যবসায়ীদের নতুনভাবে শেয়ারবাজার থেকে টাকা তোলার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়গুলোসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে এফবিসিসিআইর সভাপতি এ কে আজাদকে অনুরোধ করব বলার জন্য।

এ কে আজাদ
সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, তা আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। মানুষের বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। ফলে মানুষ বুঝে বা না বুঝেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছিল। প্রতিবছর ২০ লাখ লোক নতুন কর্মসংস্থানের সন্ধানে আসে। আমাদের ইতিমধ্যে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মোট তিন কোটি লোক বেকার। এই লোকগুলোর যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় তাদের মধ্যে ১০-১২ লাখ লোক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে। আর কিছু লোক বিনিয়োগ করেছে যারা বাজার ম্যানুপুলেট করেছে। স্পেশাল আইপিওতে কোম্পানিগুলো এসে ১০০ টাকার শেয়ার ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছে। এখন আবার সে শেয়ার ১০০ টাকায় চলে এসেছে। সরকারকে আমি অনুরোধ করব, এসব বিষয় টাস্কফোর্স গঠন করে অনুসন্ধান করা হোক, কারা পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিয়ে গেছে। এসইসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পরিবর্তন করা দরকার। কারণ তাদের দুই ধরনের সমস্যা থাকতে পারে, একটি অসততা অথবা অযোগ্যতা। দুদকের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করব, যারা এসইসিতে ছিল, প্রত্যেকের নিজের ও আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করে তদন্ত করুন, কারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। পাশাপাশি যারা শেয়ার বাজারে ম্যানুপুলেট করেছে তাদের বিরুদ্ধেও দুদকের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির দুর্বলতার সুযোগে ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকা মুনাফা তুলে নিয়েছে। অনেক ব্যাংকের ওভার ড্রাফটের (ওডি) টাকা সরাসরি ব্রোকারেজ হাউসে গেছে। যা পুঁজিবাজারকে অতিমূল্যায়িত করতে ভূমিকা রেখেছে। অনেক ব্যাংক তার নির্দিষ্ট সীমার বাইরে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক কী ভূমিকা পালন করেছিল—এ ব্যাপারে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংককে জবাবদিহি করতে হবে। বিষয়গুলো তদন্ত কমিটির তদন্তে উল্লেখ করা দরকার ছিল। ব্যাংকের যেখানে ক্যাপিটালের ৮৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করা যায় না, সেখানে অনেক ব্যাংক ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে, যার বেশির ভাগ শেয়ারবাজারে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংককে নির্দেশ দিল, ৩০ জুনের মধ্যে সব ব্যাংকের ক্যাপিটাল হিসাব ঠিক করতে হবে। তখন ব্যাংকগুলো সুদের হার ১৩ শতাংশের পরিবর্তে ১৪-১৮ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া শুরু করলে ছোট-ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন। শেয়ারবাজারে বিভিন্ন গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। সুশীল সমাজসহ সব শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এ সমস্যা সমাধানের জন্য। কার্যকরী এসইসিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। অডিটরদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করব, যাঁরা শেয়ার ওভারভ্যালুড ও বাজার ম্যানুপুলেট করেছেন, তাঁদের নিয়ে বসে বলেন, আপনাদের শেয়ার আগের অবস্থানে নিয়ে যান। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ করব, শেয়ারবাজারের দায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে চাপাবেন না। ব্যাংকের সুদের হার আগের অবস্থানে নেওয়ার অনুরোধ করছি। ব্যাংকগুলোকে আবার বিনিয়োগ করার জন্য বলব, যে টাকা তারা লাভ করেছে শেয়ার বাজার থেকে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। আগের ঘটনার বিচার হয়নি, কিন্তু এবারও যদি একই ঘটনা ঘটে তবে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হবে। সরকারকে অনুরোধ করব, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য।

আব্দুল কাইয়ুম
আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কারও বিশেষ কোনো পরামর্শ বা মতামত থাকলে সংক্ষিপ্ত আকারে বলার জন্য অনুরোধ করছি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সরকার দেরিতে হলেও শেয়ারবাজারের সংকট অনুধাবন করে একটি কমিটি করেছিল, যোগ্য লোকদের দিয়ে মানুষের কাছে সুনাম বা আস্থা পুনরুদ্ধার করেছিল। সাম্প্রতিককালে যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তেমনি কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ফান্ড নামে যেটি করা হয়েছে, সেটিতে অর্থনীতির ভাষায় নৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। পুরো শেয়ারবাজারকে নিয়ে ঠিক-বেঠিক বা নোংরাভাবে গণমাধ্যম যে ভূমিকা পালন করল, তা নিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত।

আরিফ খান
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী আরও গভীরভাবে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির সম্মুখীন করতে হবে।

ইয়াওয়ার সাঈদ
মিডিয়া যদি হইচই না করত তবে তদন্ত কমিটি হতো না। তদন্ত প্রতিবেদনকে সামনে রেখে আমাদের ভবিষ্যতে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।

শাকিল রিজভী
আমাদের আগামী দিনে পুুঁজিবাজারকে সুদৃঢ় করার জন্য বাজারে এমন কোনো ভয়ভীতি সঞ্চার করা যাবে না, যাতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

এ কে আজাদ
এসইসির একটি উপদেষ্টা বোর্ড আছে, কিন্তু সেটি কার্যকর নয়। এসইসিকে তদারক করার জন্য এই উপদেষ্টা বোর্ড যেন কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে আইনের। শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এসইসিকে তদারক করা সম্ভব নয়। যেসব ব্যাংক অনৈতিক কাজ করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ করব।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী
আমরা সবাই কিছু বিষয়ে একমত হয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদনের যেসব বিষয় গ্রহণযোগ্য, সেগুলো সরকার দ্রুত গ্রহণ করবে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। যেগুলো অধিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হবে, সেগুলো পুনরায় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এসইসিকে অবশ্যই পনুর্গঠন করে তাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

আব্দুল কাইয়ুম
আলোচনায় শেয়ারবাজার প্রতিবেদনের ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন