প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক

বাংলাদেশে ভূমিকম্প: ঝুঁকি নির্ণয় ও প্রস্তুতি অগ্রগতি

| তারিখ: ১১-০৬-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

৫ জুন প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে ভূমিকম্প: ঝুঁকি নির্ণয় ও প্রস্তুতি অগ্রগতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি। এতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হলো:

যাঁরা অংশ নিলেন
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী
সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সভাপতি, বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি
মোহাম্মদ আবু সাদেক
মহাসচিব, বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি ও পরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদুল্লাহ
মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স
মো. আবদুল মালেক সিকদার
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তর
মো. আলী আকবর মল্লিক
কাঠামো প্রকৌশলী ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ
অধ্যাপক মেহেদী আহম্মদ আনসারী
পরিচালক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়—জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন অ্যান্ড আরবান সেফটি (বুয়েট-জিডপাস)
অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল
নগর ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ, সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়

সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম: যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম
১৮৯৭ সালের ১২ জুন আসাম-বাংলা অঞ্চলে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল, তার কথা আমরা প্রতিনিয়ত স্মরণ করি। সেই বিপর্যয়কারী ভূমিকম্পের ১১০ বছর পূর্তিতে ২০০৭ সালের ২ জুন বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সহযোগিতায় প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক করেছিল। তার শিরোনাম সেদিন দিয়েছিলাম ‘১৯৮৭ সালের ভূমিকম্প ও আজকের বাংলাদেশ’। এরপর চার বছর আমরা অতিক্রম করেছি। সৌভাগ্যের বিষয় যে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। আমরা প্রস্তুতির সময় পেয়েছি। কিন্তু সেই সময়টার কি আমরা সদ্ব্যবহার করতে পেরেছি?
ভূমিকম্প না হোক—এটাই চাই। কিন্তু যদি হয়, তাহলে প্রস্তুতি কতটা? গত ১১ মার্চ জাপানে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর এ ধরনের প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশে পারমাণবিক স্থাপনা নেই। কিন্তু লোকবসতি এত ঘন যে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। প্রয়োজনে বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি আমাদের কতটা? এসব বিষয় আজকের আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। ১১৪ বছর আগের সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা মনে রেখে আলোচনা করব, আমরা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি, আর আমাদের প্রস্তুতিই বা কতটা, করণীয় কী।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।

জামিলুর রেজা চৌধুরী
আমরা প্রায় চার বছর আগে প্রথম আলোর একটি গোলটেবিল বৈঠক করেছিলাম বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি নিয়ে। আমি প্রথম এই চার বছর বাংলাদেশে ভূমিকম্পের প্রস্তুতিতে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করছি। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বললেই বোঝায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন। এগুলোকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখনকার সময়ে এসে আমাদের নীতিনির্ধারক ও জনগণের মধ্যে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে কিছুটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগও রয়েছে। এখানে গণমাধ্যমও একটি বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। দেশের গণমাধ্যমে ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেসব স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, যেগুলো বাংলাদেশে প্রচারিত হয়, সেখানেও ভূমিকম্পের ওপর অনেক সচেতনতামূলক তথ্য পরিবেশিত হচ্ছে। গত দেড় বছরে বিশ্বে বিভিন্ন স্থানে তিনটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়ে গেছে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে হাইতিতে, সেখানে রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক শূন্য। এর কিছুদিন পর হয়েছিল চিলিতে, সেখানে মাত্রা ৮ দশমিক ৮ এবং প্রায় তিন মাস আগে জাপানে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এতে ক্ষয়ক্ষতির দিকগুলো এত বেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে যে তখন বাংলাদেশের জনগণ ভূমিকম্পে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছে।
বাংলাদেশে গত ১০ বছরে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে ১১টি, যেগুলোর মাত্রা ৪ বা এর কিছু বেশি ছিল। এই ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের ভেতরেই ছিল। এ ছাড়া আশপাশের দেশেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে আরও অনেক, যেগুলোর প্রভাবে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সর্বশেষ ৩ জুন সকালে পঞ্চগড় থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে, ভারতের সিকিমে ৫ দশমিক শূন্য মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়, যা আমাদের উত্তরাঞ্চলে অনুভূত হয়। সব মিলিয়ে আমাদের এখানে ভূমিকম্প সম্পর্কে একটি সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু ভূমিকম্পের ঝুঁকি নির্ণয়ে সচেতন হলেই হবে না। আমাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে যে আসল ঝুঁকির পরিমাণ কী। সে ক্ষেত্রেও আমাদের অগ্রগতি হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে এবং উন্নয়ন সহযোগী যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহযোগিতায় সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ফেজ-১ করার ক্ষেত্রে, যেখানে একটি অংশ ছিল ভূমিকম্প ও সুনামি-সংক্রান্ত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ঝুঁকি নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
আমাদের যে বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আছে, তার কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে, যদি আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে চাই। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। কিন্তু ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেখানে আমরা যতই প্রস্তুতি নিই না কেন তা কাজে আসবে না, যদি না অবকাঠামো সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়। আমি যে বিল্ডিংয়ে বসে আছি, তা অফিস হোক আর বাড়ি হোক, যদি তার নির্মাণের কৌশল ঠিক না থাকে, তবে ভূমিকম্প হয়ে তা ধ্বংস হয়ে গেলে, অন্য যে প্রস্তুতিই নিই না কেন কোনো কাজে দেবে না। ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সেখানে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ও নির্মাণকৌশল সঠিকভাবে করা এবং নির্মাণের সময় তা নিশ্চিত করার ওপর।
আমাদের মহানগরের যেসব সংস্থাকে সরকার দায়িত্ব দিয়েছে ভবন নির্মাণ তদারকির জন্য, আমার ধারণা, তারা সঠিকভাবে তদারকি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে পারছে না।
ঢাকায় যখন রাজউক করা হয়েছিল, তখন এত বিল্ডিং ছিল না এবং এলাকার সীমা কম ছিল। ঢাকায় বিল্ডিং নির্মাণের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে এবং শহরের সীমানাও অনেক বেড়েছে। সীমিত ও অপ্রতুল লোকবল দিয়ে রাজউক সঠিকভাবে বিল্ডিং ডিজাইন অনুমোদন ও সঠিকভাবে ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না, তদারক করতে পারছে না।
আরেকটি আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বড় বড় শহর বাদ দিলেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে জমির দাম এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে সেখানেও বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। সেখানে কেউ কোনো রকমের সরকারি অনুমোদনের ধার ধারে না। যেহেতু আর্থিক সংগতি কম ও জমির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেহেতু লোকজন যেখানে আগে একতলা হালকা ভবন নির্মাণ করত, এখন সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। শুধু ইটের দেয়াল দিয়ে কোনো প্রকার রড বা স্টিলের ব্যবহার ছাড়া তিনতলা ভবন তৈরি হচ্ছে, যেগুলো সামান্য ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাবে। সারা দেশে বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইন দুটির প্রয়োগ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে ভূমিকম্পে ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের জন্য। উদ্ধারকাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি কিছু সরকার আমদানি করেছে এবং কিছু বিদেশি সহযোগিতায় পাওয়া গেছে। আমি বলতে চাই, ভূমিকম্পের প্রস্তুতি অগ্রগতির ক্ষেত্রে চার বছর আগে আমরা যে অবস্থায় ছিলাম, সেখান থেকে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু যত দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করা দরকার ছিল, তা হয়নি।
সর্বশেষ সরকারি প্রকাশনায় যেটিকে বিশ্বে একটি মডেল হিসেবে ধরে, স্ট্যান্ডিং অর্ডার ফর ডিজাস্টার (এসওডি) আগে ১৯৯৭ সালে যেটি প্রকাশিত হয়, সেখানে ভূমিকম্পের বিষয়টি ছিল না। ২০১০ সালে যেটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে স্ট্যান্ডিং অর্ডার ফর ডিজাস্টারে বলা হয়েছে ভূমিকম্পের সময় বিভিন্ন সংস্থা থেকে মাঠপর্যায়ে কার কী দায়িত্ব থাকবে।
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ভূমিকম্পের প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০১০ সালের ২২ জুন সরকার ঢাকার জন্য ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ঢাকার আশপাশে যে জলাভূমিগুলো আছে, সেগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে; যেগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনক, সেখানে ভূমিকম্পের সচেতনতা ডেভেলপার ও ভূমিমালিকদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। আমরা একদিকে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকির কাজ বাড়িয়েই যাচ্ছি, অন্যদিকে যদি ক্ষয়ক্ষতি হয়, উদ্ধারকাজের জন্য কী করতে হবে, সে প্রস্তুতিও নিচ্ছি।
কিন্তু যদি ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে বিনিয়োগ করতে হয়, তবে আমাদের আইনগুলো বাস্তবায়ন ও কার্যকর করতে পারলে কম খরচে অধিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারব। নিচু জলাভূমি ভরাটের ফলে যেমন ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি বন্যাজনিত সমস্যাও বৃদ্ধি করছে। আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে সেখানে জ্ঞান আহরণ ও প্রয়োগের কৌশল শেখানো হচ্ছে।

আব্দুল কাইয়ুম
বিল্ডিং কোড ও ইমারত বিধিমালা কার্যকর করা এখন প্রধান দায়িত্ব হয়ে পড়েছে আমাদের জন্য। সে জন্য এগুলো তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে হবে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে। এ বিষয়গুলো নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল মালেক সিকদারকে অনুরোধ করছি বলার জন্য।

মো. আবদুল মালেক সিকদার
দুর্বল বিল্ডিংই ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণ। ভূমিকম্পে দুর্বল বিল্ডিং ধ্বংস হয় বলে মানুষ মারা যায় ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। সুতরাং, এই দুর্বল বিল্ডিংগুলো যদি আমরা ভূমিকম্প-প্রতিরোধক করে ডিজাইন ও নির্মাণ করতে পারি, তাহলেই আমাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটি বলা যতটা সহজ, কাজটা করা অনেক কঠিন। ভবনকে ভূমিকম্পের প্রতিরোধ করে ডিজাইন ও নির্মাণ করার মূল চালিকা হচ্ছে বিল্ডিং কোড। বিল্ডিং কোডের মধ্যেই প্রকৌশলীদের জন্য নির্দেশনা আছে—কীভাবে ভূমিকম্প-প্রতিরোধক বিল্ডিং ডিজাইন করতে হবে। সারা দেশে যে বিল্ডিং তৈরি করা হচ্ছে, এর বেশির ভাগই নন-ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে করা হয়। আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ারদের কোনো সম্পৃক্ততাই থাকে না ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে। এটিই হচ্ছে আমাদের প্রধান সমস্যা। সেখান থেকেই বিল্ডিং কোড কার্যকর করার প্রশ্ন আসে। যদি বিল্ডিং কোড সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যেত, তবে এ সমস্যাটিকে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা যেত।
ভবন নির্মাণে অনুমোদনের ক্ষেত্রে আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ও স্ট্রাকচার ডিজাইন অনুমোদন ঢাকায় করে রাজউক, চট্টগ্রামে করে সিডিএ, রাজশাহীতে আরডিএ, খুলনায় করে কেডিএ। বড় এসব প্রতিষ্ঠানের একটি কমিটি থাকে, যেখানে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাকারী আর্কিটেক্টরা থাকেন। সেই কমিটিগুলোর মাধ্যমে ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাস করা হয়। এ ছাড়া সারা দেশে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদনের কোনো বিষয় নেই। যেটি আছে, তা নামসর্বস্ব। সেখানে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর অভাবে কোনো রকমের একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। দ্রুতহারে বহুতল ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ করেই চলছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সংস্কার করে ভূমিকম্প-সহনীয় করা দরকার। আমাদের দেশে সম্প্রতি এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হবে।

মেহেদী আহম্মদ আনসারী
ভবন নির্মাণের কৌশলে যেমন গুরুত্ব দিচ্ছি, ঠিক তেমনই কোন মাটিতে আমরা ভবন নির্মাণ করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—ঢাকা শহরে ছয় থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত মাটি খুবই খারাপ, যেগুলো হচ্ছে ভরাট মাটি। অর্থাৎ, ড্যাপ যেসব এলাকা চিহ্নিত করেছিল। আমরা কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ভরাট করা মাটি এলাকায় তেমন হারে ভবন নির্মাণ শুরু করিনি। তবে সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) হিসাব মতে, ১৮৯৭ সালের মতো যদি কোনো ভূমিকম্প হয়, তবে ঢাকা শহরে ভালো মাটিতে নির্মিত ৭০ থেকে ৭২ হাজার ভবন ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু মেক্সিকোতে ১৯৮৫ সালে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, সেখানে ৫০ মিটারের মতো গভীর মাটি খারাপ ছিল। সেখানে ১০ থেকে ২০ তলা পর্যন্ত ১০ হাজারের মতো ভবন ভেঙে প্রায় ২৫ হাজার লোক মারা গিয়েছিল। যদি এখন থেকে ১০ বছর পরও এই যে ছয় থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত ভরাট মাটি আছে, সেখানে যদি বাসাবাড়ি হয়ে যায়, তবে সেখানে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে বর্তমান সময়ের তুলনায়। এ বিষয়গুলোতে রাজউকের নজর দিতে হবে ঢাকার আশপাশে মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে। সিডিএমপির যে ম্যাপ রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের জন্য, রাজউকের উচিত সেগুলো প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে বলা যে এই জায়গাগুলোর মাটি খারাপ। এখানে ভবন নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। কাঁঠালবাগান ও হাতিরঝিলে যে ভবনগুলো আক্রান্ত হয়েছে, এই মাটির কারণেই। এই মাটির গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিল্ডিং কোডের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
ভবন নির্মাণে নিয়োজিত মিস্ত্রি বা সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে ভবন নির্মাণে বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা থাকেন না বা থাকলেও সেখানে রাজমিস্ত্রির প্রভাব অনেক বেশি থাকে। রাজউকের শুধু লোকবল বাড়ালেই হবে না, ভবন নির্মাণের পর সেটি কতটুকু ভূমিকম্প-প্রতিরোধক হলো, সে বিষয়ে সঠিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আউট সোর্সিং বাড়াতে হবে। রাজউক ২০-২৫টি বেসরকারি কোম্পানিকে দায়িত্ব দিতে পারে, যারা ভবনগুলো ঠিকভাবে নির্মিত হচ্ছে কি না, মাটির মান উন্নয়ন করা হয়েছে কি না, নির্মাণের সময় ঠিকমতো নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে কি না—অর্থাৎ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হস্তান্তর পর্যন্ত তারা তদারকি ব্যবস্থার দায়ভার নিতে পারে। আমাদের ভবন-সম্পর্কিত বহু বেসরকারি কনসালট্যান্ট ফার্ম আছে; যদি তাদের দায়িত্ব দেওয়া যায়, তবে এ ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি সম্ভব।
সম্প্রতি সরকার ফায়ার সার্ভিসের জন্য কিছু উদ্ধার যন্ত্রপাতি কিনেছে। সিডিএমপি গবেষণার জন্য অর্থায়ন করা হচ্ছে। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপাসিটি অনেক বেড়েছে। সিডিএমপি, বুয়েট ও জিএসবি (জুয়োলজি সার্ভে অব বাংলাদেশ) মিলে ৪২টি ভূকম্প পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোথাও ভূমিকম্প হলে সেখানে কী মাত্রায় ভূমিকম্প হয়, তা পরিমাপ করা যাবে সারা দেশে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের অনুমোদনে বুয়েটে তিনটি ল্যাবরেটরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন ভবন ভূমিকম্প-প্রতিরোধক কি না, তা পরীক্ষা করা যাবে।

এ এস এম মাকসুদ কামাল
বাংলাদেশ খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি-১-এর প্রকল্পে আর্থকোয়েক অ্যান্ড সুনামি প্রিপিয়ার্ডনেসে আমি কাজ করেছিলাম। এই কর্মসূচির দ্বিতীয় অধ্যায় সিডিএমপি-২ চলছে। প্রথম ভাগে আমরা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট—এ তিনটি শহরের ভূমিকম্পের ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করেছিলাম। এ তিনটি শহরের ভূমিকম্পে ঝুঁকি কতটুকু এবং তার আলোকে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার উদ্ধারকাজের প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখ আছে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো, স্বাস্থ্যসেবা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাপনা, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পয়ঃপ্রণালি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এসব সংস্থার জন্য এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যে ভূমিকম্পের দুর্যোগের সময়ে, আগে ও পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য কী কী করণীয়। এগুলো করা হয়েছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণ করে, আমাদের ভূমিকম্পের ঝুঁকি মানচিত্রের আলোকে। ভূমিকম্পে ঝুঁকি নিরূপণের জন্য আমাদের জানতে হবে কোথায় কোথায় ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা রয়েছে, যেখান থেকে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। ১৮৯৭ সালে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, সেখানে অনেকে বলেন, ভারতে একটি ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখার কারণে সেটি হয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দুটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে ব্রিটিশদের যে বাংলো ছিল, সেখানকার সব বাংলো ভেঙে পড়েছিল। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে আমাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং জনশ্রুতিতে জানা যায়, ৪৫০ জনের মতো লোক মারা যায়। সে ভূমিকম্পেও ঢাকা শহরে যত মিশনারি ভবন ছিল, তার অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ভেঙে পড়েছিল। ঢাকা শহরে তিন লাখ ২৬ হাজার ভবন রয়েছে, যার মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলোতে রড ব্যবহার করা হয়নি, ইট-সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে। আরেক ধরনের ভবন, যেসব ভবনের নিচতলা খালি থাকে, এ ধরনের প্রায় ৯০ হাজার ভবন ঢাকা শহরে রয়েছে। এ চিত্র চট্টগ্রাম ও সিলেটে একই ধরনের। ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখার চিত্র থেকে এই তিন শহরের ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি। মধুপুরে যদি ভূমিকম্প হয়, তবে মুহূর্তের মধ্যে ঢাকা শহরে ৭২ হাজার ভবন ধ্বংস হয়ে যাবে। চট্টগ্রামে যদি ভূমিকম্প হয় সেখানে এক লাখ ৮৫ হাজার ভবনের মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার ভবন সহজে ভেঙে যাবে। আর সিলেটে যদি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে ৫২ হাজার ভবনের মধ্যে ৩০ হাজার ভবন ভেঙে পড়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

মোহাম্মদ আবু সাদেক
স্বাধীনতার পর থেকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়েছিলাম, সম্প্রতি ভূমিকম্পের ঝুঁকিকেও গুরুত্বসহকারে দেখছি। আমাদের পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে ভূমিকম্পের প্রস্তুতির জন্য। আমাদের এখনো পর্যন্ত জাতীয়ভাবে ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা হয়নি। এটি করা খুবই জরুরি। এর অধীনে দুটি অংশ থাকবে—একটি হচ্ছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাস এবং অন্যটি ক্ষয়ক্ষতি হলে এর উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রস্তুতি পরিকল্পনা। বাংলাদেশ বিশ্বের মতো ভূমিকম্পের ফলে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ ভূমিকম্পের ফলে ক্ষয়ক্ষতি ঝুঁকির পরিমাণ যদি কমাতে পারি, তবে তা পরে আরও বেশি কার্যকর হবে উদ্ধার তৎপরতার চেয়ে।
আমরা রিস্ক রিডাকশন বলতে প্রিভেনশন, মিটিগেশন ও প্রিপারেশনকে বুঝি। ভূমিকম্পের জন্য প্রিভেনশনটি কার্যকর নয়। কারণ, মানুষের পক্ষে ভূমিকম্প প্রতিহত করা সম্ভব নয়। আমাদের যে ন্যাশনাল প্ল্যান ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ২০১০ রয়েছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদিত হয়েছে, সেখানে আর্থকোয়েক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। এ প্ল্যানটি অতি দ্রুত করতে হবে এবং এই প্ল্যান অনুযায়ী যদি কাজ করতে পারি, তবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে। আমাদের সিডিএমপি—প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। আমাদের ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় ভূমিকম্পের বিষয়টি থাকবে। ঢাকা শহরের আবাসন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যখন আর্থকোয়েক রিস্ক রিডাকশন প্ল্যান করা হবে, সেখানে কিছু কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হতে পারে যে এখানে বেশি উঁচু ভবন তৈরি করা যাবে না, বা এখানে শুধু খেলার মাঠ, লেক বা অন্য কিছু করা যাবে, বহুতল ভবন করা যাবে না। কারণ, এগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাথায় রেখে নগর পরিকল্পনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুরোনো ভবনগুলোর ব্যাপারে, সেগুলো ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ কি না, পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে করতে হবে।
যেহেতু ভূমিকম্প হলে মুহূর্তে ঢাকা শহরে ৭২ হাজার ভবন ভেঙে যাবে, এর সঙ্গে যদি সারা শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তবে আমাদের ফায়ার সার্ভিসের যে ক্যাপাসিটি আছে, সে ক্ষেত্রে উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এসব ভবনের যেসব সংযোগ আছে, তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারি সংস্থাগুলোকে। আমাদের যে বড় বড় বাঁধ, ব্রিজ আছে, সেগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধক কি না, এ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। যেমন—কাপ্তাই বাঁধের কথাই উল্লেখ করি। এটি ভূমিকম্প-প্রতিরোধক কি না, আমরা জানি না।
আমাদের বিল্ডিং কোডে কিন্তু ভূমিকম্পের বিষয়টি আছে, সেখানে একটি বিল্ডিং অথরিটির কথা বলা হয়েছিল, সেটি এখনো করা হয়নি। রাজউক একই সঙ্গে রেগুলেটরির কাজও করছে; আবার জমির ডেভেলপমেন্ট করে মানুষের কাছে বিক্রি করছে। আসলে রাজউকের কাজ কী হবে, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। বিল্ডিং কোড কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী সঠিক আছে কি না, নির্মাণের সময় সেটি চলে আসে। বিএসটিআইয়ের উচিত অন্যান্য পণ্যের যেমন গুণগত মান পরীক্ষা করা, তেমনি ভবনে সঠিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা-ও পর্যবেক্ষণ করা। বিএসটিআইকে এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব নিতে হবে।
সরকারের ন্যাশনাল প্ল্যান ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে একটি অ্যাকশন ম্যাট্রিক্স আছে। সেখানে প্রথমবারের মতো এই ভূমিকম্পের বিষয়টি আছে। এ ছাড়া সরকারি অর্থায়নে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সিটি করপোরেশন ও সেনাবাহিনীকে কিছু ভূমিকম্পে উদ্ধার যন্ত্রপাতি কেনার টাকা দেওয়া হয়েছে জিওবির টাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর পক্ষ থেকে। আর ফায়ার সার্ভিসের ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কাজটি সিডিএমপির মাধ্যমে করা হচ্ছে। বেশ কিছু সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে এবং বিএমডিসি বাস্তবায়নের ওপর আমাদের মন্ত্রণালয় জোর দিচ্ছে।

মো. আলী আকবর মল্লিক
ভূমিকম্পের বিষয়ে প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা যায়। এ ব্যাপারে এ বছর হাইতি ও চিলির ভূমিকম্প দুটির ওপর আলোকপাত করতে চাই। ১২ জানুয়ারি ২০১০ ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ হাইতির লিওগেন নামের এলাকায় ১৩ কিমি মাটির গভীরে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে। আবার দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় দেশ চিলিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ অফ শোর মাউলে ৩৫ কিমি মাটির গভীরে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে। চিলির ভূমিকম্পটি হাইতির থেকে ৫০১ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। অথচ হাইতিতে তিন লাখ ৩০ হাজার এবং চিলিতে মাত্র ৫৬২ জন লোক প্রাণ হারায়। এর অন্যতম কারণ, চিলি কড়াকড়িভাবে বিল্ডিং কোড মেনে চলেছে কিন্তু হাইতির বিল্ডিং কোডই নেই।
বাংলাদেশের অবস্থা হাইতির চেয়ে খুব বেশি ওপরে নয়। তবে আমাদের একটি বিল্ডিং কোড আছে (বিএনবিসি-১৯৯৩)। ১৫ নভেম্বর ২০০৬ বিএনবিসি সরকারি গেজেটে স্থান পায়। কিন্তু এটি কে মেনে চলছে বা চলছে না, সে বিষয়ে কোনো মনিটর করার ব্যবস্থা নেই।
ভূমিকম্প-প্রতিরোধক ভবন নির্মাণে ভবনের সমতল নকশাটি সুষম হতে হবে। একটি সুষম নকশা করতে একজন স্থপতির ভবনের কাঠামোর বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা দরকার। মনে হয়, দেশের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থপতি তৈরি করছে, সেসব বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা দিয়ে স্থপতি তৈরি করছে না। এ ঘাটতির অবসান হওয়া দরকার।
একজন কাঠামো-প্রকৌশলী সমতল নকশাটি সুষম কি না, তা যাচাই করবেন। ভবনের উল্লম্ব (খাড়া) দিকেও ভবনের ভূমিকম্প প্রতিরোধশক্তির সুষম বণ্টন হচ্ছে কি না, তাও তাঁকে যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশে একটি বহুতল ভবনে গাড়ি পার্ক তলাটি (সাধারণত সবচেয়ে নিচ তলা) শুধু কলামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দোতলা ও তার ওপরের তলাগুলো আবাসিক তলা হওয়ায় ওই তলাগুলোতে অনেক ইটের দেয়াল থাকে। সে জন্য আবাসিক তলাগুলোর কর্তনীয় পীড়নের সহ্য ক্ষমতা কার পার্কিং তলাটির চেয়ে বেশি থাকে। যার ফলে এসব ভবন ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হতে দেখা যায়। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, বহুতল আবাসিক ভবন পুরু ফ্ল্যাট প্লেট দ্বারা নির্মাণ করা। চার ইঞ্চি স্লাব ও বিমের স্থলে সাত-আট ইঞ্চি পুরু স্লাবের কারণে একটি তলার ওজন অনেক বেড়ে যায়। তাই ভূমিকম্পের মুহূর্তে ভবন বেশি পার্শ্বশক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ভারী সনাতনী ইটের ব্যবহার। আরসি ফ্রেমের মধ্যে ভারী সনাতনী ইটের ব্যবহার হওয়ায় একটি তলা অপেক্ষাকৃত বেশি ভারী হয়ে যায়। বেশি ভারী হওয়ার অর্থ ভূমিকম্পের মুহূর্তে ভবন বেশি পার্শ্বশক্তি দ্বারা আক্রান্ত হওয়া, যা কাম্য নয়। এর চেয়ে কারখানায় তৈরি ব্লক ব্যবহার করা ভালো, যা সনাতনী ইটের চেয়ে পরিবেশবান্ধব, সনাতনী ইটের চেয়ে হালকা বলে ভবনের ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় খাড়াভাবে রড ব্যবহার করা যায়।
ভূমিকম্প এবং পাইপলাইনে আবাসিক সংযোগ দেওয়া রন্ধনশালার গ্যাসবার্নার (চুলা) সঙ্গে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। একটি এক মিনিটের কম সময়ের ঝাঁকুনির ফলে হাজারটা এমনকি লাখোটা বাড়িঘর-দালানের মতো স্থাপনায় আগুন লেগে সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। তিতাস গ্যাস সূত্রেই জানা যায়, ঢাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ গ্যাসবার্নার সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে রাখা হয়। জ্বালিয়ে রাখা গ্যাসের চুলা ভূমিকম্প হলে প্রলয় ঘটাবে। ১৯২৩ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর জাপানের টোকিও-ইয়োকোহামা অঞ্চলে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার দি গ্রেট কানতো আর্থকোয়েকটি ঘটেছিল। এই ভূমিকম্পে এক লাখ ২৮ হাজার ২৬৬টি ঘরবাড়ি-দালান বিধ্বস্ত হয়, চার লাখ ৪৭ হাজার ১২৮টি ঘরবাড়ি-দালান আগুনে পুড়ে ছাই হয় এবং এক লাখ ৪২ হাজার ৮০৭ জন লোক প্রাণ হারায়। ৯৭ শতাংশ লোক প্রাণ হারিয়েছিল আগুনে পুড়ে। ভূমিকম্পটি ঘটেছিল দুপুর ১২টার কয়েক মিনিট আগে, যখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতে চলছিল দুপুরের রান্নার আয়োজন, তথা রান্নার চুলাগুলো ছিল সক্রিয়। ওই সময় টোকিও গ্যাস কোম্পানির দুই লাখ ২০ হাজার গ্যাস সংযোগ ছিল। ঢাকায় যাঁরা সর্বক্ষণ গ্যাসবার্নার জ্বালিয়ে রাখছেন, তাঁরা কিন্তু সব সময় কানতো আর্থকোয়েকের দুপুর ১২টা বানিয়ে রাখছেন। মহা বিপর্যয় এড়াতে গ্যাসের চুলা অপ্রয়োজনে জ্বালিয়ে রাখা যাবে না।

আবু নাঈম মো. শাহিদুল্লাহ
ভূমিকম্পের সময় ব্যক্তির নিরাপত্তা কীভাবে বিধান করা যাবে, সে বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে অবশ্যই জানতে হবে ভবনে তারা কীভাবে বসবাস করবে। ভবনে আসবাব কীভাবে রাখতে হবে, যাতে সেগুলো তাদের কোনো ক্ষতি না করে। ঢাকা শহরে যে পরিমাণ মানুষ বেড়েছে ও ভবন তৈরি হয়েছে, এ অবস্থায় ভূমিকম্প হলে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী একটি পরিকল্পনা দিয়েছিলেন স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার। সত্যি যদি সেটি বাস্তবায়ন করতে পারি, ঢাকা শহর থেকে লোকজন সরিয়ে স্যাটেলাইট টাউনে নিয়ে যেতে পারি, জনসংখ্যার পরিমাণ যদি শহরে কমাতে পারি, তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ব্যক্তিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের সময় যদি কেউ অফিস, বাসা বা স্কুলে থাকে, সে ক্ষেত্রে কিছু টিপস বা সচেতনতামূলক শিক্ষা স্কুল থেকে শেখানোর ব্যবস্থা করা উচিত। আর যাঁদের বয়স হয়েছে, তাঁদের শেখানোর একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে। আমরা সিডিএমপি প্রজেক্টের মাধ্যমে ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরির কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু করেছি। পাইলট প্রজেক্ট গত বছর শেষ হয়েছে। মেইন প্রজেক্ট এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে ইতিমধ্যে তিন হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এই বছরের মধ্যে আমরা আশা করছি ১৫ হাজারের মতো লোককে ভূমিকম্পের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দিতে পারব।
সিডিএমপির জরিপে দেখা গেছে, দিনের বেলায় ভূমিকম্প হলে একরকম ক্ষয়ক্ষতি হবে, আর রাতের বেলায় হলে আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে। মানুষ যখন ঘরে থাকে, তখন ঘরের কোনায় বা কাঠের টেবিল বা বিছানার নিচে তাদের আশ্রয়স্থলটি আগে থেকে নির্দিষ্ট করে রাখবে, যেখানে শুকনো খাবার থেকে শুরু করে পানি, ব্যাটারিচালিত টর্চলাইটসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ রেখে দিতে হবে। অনেকে মনে করে, কবে ভূমিকম্প হবে, সে জন্য এগুলো সংরক্ষণ করব, এটা পাগলের কথা। এটা ঠিক নয়। আমাদের এখন থেকেই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ, বাসায় মেহমানদের জন্য শুকনো খাবার রাখি বা পানি প্রতিদিনই লাগে। শুধু খাবারগুলো ওই টেবিলের ওপরে না রেখে নিচে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে রাখার অভ্যাস করলেই হবে। জাপানে কিন্তু এই অভ্যাস করা হতো। জাপানে দেয়ালের সঙ্গে টেলিভিশন বা বুকশেলফ আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এতে ব্যক্তির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। আমরা যে ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, তার মূল শর্তই হচ্ছে তাঁরা তাঁদের পরিবারের সদস্য ও আশপাশের বন্ধুবান্ধবকে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেবেন।
আমাদের একটি মহা পরিকল্পনা অবশ্যই করতে হবে। সিডিএমপির মাধ্যমে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। আমি মনে করি, এখানে অনেক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে আলাদা কাজ ভাগ করে দেওয়া আছে। গ্যাস ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আমরা গিয়েছিলাম, তারা এ নিয়ে কী ভাবছে জানতে। সেখানে আমরা অবাক হয়েছিলাম। গ্যাসের লাইন ও তেলের লাইন ভূমিকম্পের ঢাকা শহরে এত বেশি, কিন্তু সেগুলো কোথা থেকে বন্ধ করতে হবে, সে ব্যাপারে কোনো সংস্থার নির্দিষ্ট করে দায়িত্ব দেওয়া নেই। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ কে বন্ধ করবে, আবার ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে সঙ্গে সঙ্গে এসব সংযোগ চালু করবে কে, সেসব বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া নেই। মানুষের আশ্রয়স্থল ও চিকিৎসাসেবা কোথায় দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট করা নেই। ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে দাতা সংস্থার দেশগুলো থেকে যারা আসবে, তাদের সঙ্গে কি আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখন থেকে কোনো নিয়মিত যোগাযোগ আছে বা নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, কোন কোন দেশ থেকে আমাদের সহযোগিতা করতে লোক আসবে। বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে আমাদের এমওইউ চুক্তিতে এখনো স্বাক্ষর করা হয়নি। বিপুলসংখ্যক ভবন ভাঙলে সেগুলো সিটি করপোরেশন কত দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাবে, সে ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নিরাপত্তা ও লুটপাট ঠেকানোর জন্য; যাতে উদ্ধারকর্মীরা নিরাপদে তাঁদের কাজ চালাতে পারেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত বিভিন্ন শ্রেণীতে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত বিষয়টি চূড়ান্ত করা। আমাদের বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি সাহায্য ও ত্রাণ অন্য কোথায় নামানো হবে, তার পরিকল্পনা করা উচিত।
রাজউক ভবন নির্মাণ শেষে অকুপেশন সার্টিফিকেট দেয়, তার জন্য যেসব সংস্থা আছে সেগুলো দ্বারা ভবনটি সঠিকভাবে নির্মিত হলো কি না, তা নিশ্চিত হয়ে দেওয়া উচিত। ফায়ার সার্ভিসের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তামূলক সুন্দর পরিকল্পনা দেখিয়ে অনুমোদন নিয়ে যায়। কিন্তু পাঁচ-সাত বছর সময় লাগে ভবন তৈরি হতে। ভবন কখন নির্মাণ শেষ হলো, সেখানে সঠিক অগ্নিনিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা আর পরীক্ষার জন্য ফায়ার সার্ভিসে আসে না। তাই আমরা বলতে চাই, রাজউক যদি অকুপেশন সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে ওই সব সংস্থার অনুমোদিত পরিকল্পনা সঠিক বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হয়, তবে এসব ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

জামিলুর রেজা চৌধুরী
রাজউকের কয়েক বছরে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে রাজউকে ভবন ডিজাইনের নকশায় যেকোনো প্রকৌশলী স্বাক্ষর করলে হবে না, তাদের একটি নিবন্ধনকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজউকের নিবন্ধিত প্রক্রিয়ার জন্য স্থপতিদের দায়িত্ব দিয়েছে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রকৌশলীদের। সেখানে তাঁদের একটি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়, ভূমিকম্প সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান আছে কি না, তা দেখা হয়। আর এখন তাঁদের আইনগতভাবে একটি দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিবন্ধিত এসব প্রকৌশলীর শাস্তির বিধান রয়েছে; যদি প্রমাণিত হয় তাঁর গাফিলতির কারণে ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির পক্ষ থেকে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে নন-ইঞ্জিনিয়ারিং বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে। আমার ধারণা, ৯০ শতাংশের বেশি ভবন নির্মাণের সঙ্গে স্থপতি, প্রকৌশলী জড়িত থাকেন না। সাধারণত মালিক ও রাজমিস্ত্রিরা নিজেদের মতো করে ভবন নির্মাণ করেন। তাদের এই গাইডলাইন দেওয়ার জন্য বাংলায় চিত্রসহ উল্লেখ রয়েছে, যা মিস্ত্রিরা সহজে বুঝতে পারবেন। সিডিএমপির মাধ্যমে প্রকৌশলী ও স্থপতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে মিস্ত্রিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। রড কীভাবে বাঁধতে হবে, তা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্প নিয়ে বিতর্ক চলছে। বাজারে যে রড আসে, তার সিংহ ভাগই আসে এখান থেকে। সেখানে রডের কোনো গুণগতমান নিশ্চিত করা হয় না। সম্প্রতি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভবনে কাচের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। পরিবেশগত দিক থেকে এটি ভালো। প্রচুর সূর্যরশ্মি আছে। কিন্তু ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এটি সহজে ভঙ্গুর। উপাদানের গুণগতমান যদি ঠিক না থাকে, অর্থাৎ দুর্ঘটনায় ফাটবে কিন্তু ভেঙে পড়ে যাবে না, এ রকম কাচ যদি ব্যবহূত না হয়, তবে আরেকটি ঝুঁকি রয়ে যাবে। দেখা যাবে ভবন ঠিকই আছে কিন্তু কাচ ভেঙে পড়ে মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।
আমাদের প্রাথমিক সমীক্ষায় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করার জন্য রূপপুরকে বাছাই করা হয়েছে, সেখানে বুয়েট থেকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কতটুকু, তা নির্ণয় করা হয়েছে। আগামী কয়েক বছর সেখানে আরও গভীরভাবে গবেষণা করা হবে। জাপানে ভূমিকম্পে পারমাণবিক চুল্লির যে ক্ষয়ক্ষতি হলো, তাতে সারা বিশ্ব নতুন করে ভাবছে এগুলো নিয়ে। যেমন—জার্মানি ঘোষণা করেছে ২০২২ সালের মধ্যে বর্তমানের সব পারমাণবিক প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেবে। আমাদের মতো দেশে এ ধরনের কার্যক্রম করার আগে অনেক চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আব্দুল কাইয়ুম
আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন