কওমি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে রাজনীতি

ওয়াসেক বিল্লাহ | তারিখ: ০৩-১১-২০০৯

  • ১০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

কওমি মাদ্রাসা এবং এর শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনায় এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয়, দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিদেনপক্ষে ১৮ লাখ বলেও দাবি করছেন এ মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সংস্থার নেতারা। এই ধারার শিক্ষার কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা নিয়ন্ত্রণ নেই।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই আসে হতদরিদ্র পরিবার থেকে। ফলে সমাজের উঁচু শ্রেণী বা সরকার দীর্ঘদিন এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এই শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকেরা সব সময়ই বলে আসছেন, কোনো কোনো বিপত্গামী জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে জড়ালেও শিক্ষার্থীরা মূলত সমাজের শান্তি, স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে।
মাদ্রাসা, শিক্ষক, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অজানা: কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারের স্বীকৃতি, অনুমোদন ও অর্থায়ন ছাড়াই চলছে। এতে কত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, তার সঠিক হিসাব শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো সংস্থাতেই নেই।
খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আবদুর রব ইউসুফী প্রথম আলোকে জানান, গত ৮ এপ্রিল মালিবাগের জামেয়া শ্যরিয়া মাদ্রাসায় এক বৈঠকে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারাসিল আরাবিয়ার (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার বলেন, এই জরিপের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
২০০৬ সালে কওমি মাদ্রাসার সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যে হিসাব দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছে, আটটি স্তরে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৫ হাজার ২৫০টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ এবং শিক্ষক এক লাখ ৩২ হাজার ১৫০ জন। এই সংখ্যা নিয়েও অবশ্য বিতর্ক আছে।
স্বীকৃতি মেলেনি: লাখ লাখ শিক্ষার্থী তাদের ১৩ বছরের শিক্ষাজীবনে যা পড়ে, এর কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। শিক্ষাব্যবস্থায় নেই কোনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। বিভিন্ন সময়ে এসব মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো সরকারের কাছে এই স্বীকৃতি দাবি করেছে। গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই দাবি নিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থপ্রসূত কূটকৌশলই হয়েছে বেশি।
চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্তে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে ‘মাস্টার্সে’র সমমান দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে মনে করা হয়, এই ঘোষণা যতটা না এই ধারার শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় মূল কাঠামোতে নিয়ে আসার উদ্যোগ ছিল, এর চেয়ে বেশি ছিল কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের ভোট টানার কৌশল। প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক এবং উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গভিত্তিক চারটি আঞ্চলিক বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সংস্থা’র ৬২ জন আলেমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কওমি সনদের স্বীকৃতি ও পাঠক্রমের আধুনিকায়ন বিষয়ে আলেম-ওলামাদের নিয়ে একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
যে কারণে কমিটি হয়নি: বৈঠকের ১৫ দিনের মধ্যে কমিশন গঠনের কথা থাকলেও গত ছয় মাসে তা গঠিত হয়নি। বেফাক ও সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে দ্বন্দ্বের পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা মেরুকরণও এ জন্য দায়ী। কয়েকটি দলের নেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে জোট হিসেবে আছে আরও কয়েকটি দল। সরকারের বিরোধী নেতারা স্পষ্ট করেই বলছেন, বর্তমান সরকারের হাত থেকে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি আসুক—এটা তাঁরা চান না।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার প্রথম আলোকে জানান, সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাদ্রাসার সংখ্যা কম থাকলেও কমিশনে তারা বেশি সদস্য দাবি করার কারণে জটিলতা কাটেনি।
অন্যদিকে সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, বেফাক আসলে এই সরকারের কাছ থেকে কিছু নিতে আগ্রহী নয়। সেটা প্রকাশ করতে পারে না বলে একেক সময় একেক কথা বলে।
রাজনৈতিক স্বার্থ: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলেমদের বৈঠকের পর কওমি মাদ্রাসাশিক্ষার উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এরপর আবার রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সমর্থক আলেমরা এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা বাদ দিয়ে আলেম-ওলামাদের আন্দোলনে নামার পরামর্শ দেন।
গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে বিএনপিপন্থী পেশাজীবী নেতা ও দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান আলেমদের উদ্দেশে বলেন, ‘বর্তমান সরকার আপনাদের আবেদন-নিবেদনে সাড়া দেবেন—এ রকম আপনারা চিন্তা করছেন কেন?’
২১ এপ্রিল জামায়াতে ইসলামীর এক সমাবেশে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা বলেন, ‘যেসব আলেম নামের কলঙ্ক দালালি করতে গেছেন, তাদের কাজ শেষ হলে টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেবে।’
বেফাকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন সদস্য বলেন, ‘চারদিকে নানা ঘটনা ঘটছে। বিভ্রান্তির কোনো শেষ নেই।’
২০০৬ সালে জোট সরকার কওমি সনদের স্বীকৃতি ঘোষণা করার আগেও রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। ঘোষণা আসবে—এটা নিশ্চিত হয়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রীতিমতো কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। ঘোষণার কয়েক দিন আগে খেলাফত মজলিস স্বীকৃতির দাবিতে মুক্তাঙ্গনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচিও পালন করে। অথচ দলটি সে সময় চারদলীয় জোটের শরিক ছিল। এর আগে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটও একাধিকবার এই স্বীকৃতির কৃতিত্ব দাবি করে।
নেই একক সংস্থা: কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণে কোনো একক সংস্থা নেই। বেফাকুল মাদারাসিল আরাবিয়ার অধীনে চার থেকে পাঁচ হাজার মাদ্রাসা আছে। গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গায় আঞ্চলিক বোর্ড বেফাকুল মাদারিস, বগুড়ায় উত্তরবঙ্গভিত্তিক তানজিমুল মাদারিস, চট্টগ্রামের পটিয়ার ইত্তেহাদুল মাদারিস এবং সিলেটের আজাদ-দ্বিনী এ দারা—এই চারটি আঞ্চলিক বোর্ড মিলে গঠিত ‘সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সংস্থা’র অধীনে প্রায় দুই হাজার মাদ্রাসা আছে।
সিলেট বিভাগের আজাদ-দ্বীনি এদারা (সিলেট বিভাগ), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এ দ্বারা এ তালিমিয়া, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও নরসিংদী এলাকার মাদানীনগর এ দ্বারা, সিলেটের জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাটের মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণের জন্য কানাইঘাট এ দ্বারা, দ্বীনি শিক্ষা বোর্ড নামের সংস্থা হবিগঞ্জের মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার জানিয়েছেন, ‘কোনো বোর্ডের আওতায় নেই, এমন মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় চার হাজার।’
আরও যত মাধ্যম ও পাঠক্রম: মূলত দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ধর্ম শিক্ষা দেওয়ার জন্য কওমি মাদ্রাসা ছাড়াও আছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে নূরানী, হাফিজিয়া বা ফোরকানিয়া ও মসজিদকেন্দ্রিক মক্তব উল্লেখযোগ্য।
নূরানী মাদ্রাসায় মূলত কোরআন পড়ার সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয়। হাফিজিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় কোরআন মুখস্থ করানো হয়।
বর্তমানে কওমি মাদ্রাসায় ১৩ বছর মেয়াদের শিক্ষা দেওয়া হয়। নূরানী মাদ্রাসায় দুই বা তিন বছর পড়ে ছাত্রছাত্রীরা হাফিজিয়া বা ফোরকানিয়ায় ভর্তি হয়। এ ছাড়া কেউ কেউ জামাত বিভাগে পড়াশোনা করে।
যারা নূরানীতে পড়াশোনা করে না, তারা প্রথম চার বছর ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। এটা প্রাথমিক শিক্ষা বলে পরিচিত। চার বছরের প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় জামাত বিভাগে। এখানে পরের নয় বছরে আরবি ব্যাকরণ, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফেকাহ, আরবি সাহিত্য প্রভৃতি পড়ানো হয়।
উপলব্ধি এসেছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে: কয়েক বছর ধরে জামাত বিভাগে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও ভূগোল পড়ানো হচ্ছে। তবে সরকারি পাঠক্রম পরিবর্তন করে নিজেদের মতো বইগুলো তৈরি করেছে বেফাক। বেফাকের মহাসচিব জানিয়েছেন, তাঁরা দশম শ্রেণী পর্যন্ত একে নিয়ে যেতে চান। ২০০৬ সালে বেফাক কওমি মাদ্রাসার পাঠক্রম প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ভূগোল, বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করে।
যশোরের জামেয়া ইসলামিয়া দড়াটানা মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা কোরআন-হাদিস শিক্ষার বাইরে সরকারি পাঠক্রমের দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যক্রমও অনুসরণ করছে।
সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সংস্থার মহাসচিব রুহুল আমিন জানিয়েছেন, তাঁদের অধীনে থাকা মাদ্রাসাগুলোর কোনোটাতে পঞ্চম শ্রেণী, কোনোটাতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার বইগুলো পড়ানো হয়। তবে যে মাদ্রাসাগুলো কোনো বোর্ডের অধীনে নয়, সেগুলোতে কোরআন-হাদিস শিক্ষার বাইরে কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
২০১০.১১.২৪ ১৩:০৩
They are Islamic criminal. They use Islam name but their work is non Islamic. kaomi is opposite name OHABI. We know their very well.
২০১০.১২.২৪ ১২:৩৫
hay above person u know ur thinking here absolutely wrong they are real source of islam. Before throwing any comment plz think of that topics
২০১০.১২.২৬ ০২:৫৩
Before making comments we need to know them. In fact you will get good people and bad people everywhere. We notice thousands of bad news every year about universities, it does not mean that universities are bad.

Nirob Khan

Nirob Khan

২০১১.০১.১৩ ০৯:৪৪
The student of cowami madrasa still study Urdu language which is useless for Islamic life...these madrasa gives more focus on Urdu instead of Arabic. Most of the teacher are not conscious about real Islam. Different Huzur gives diffirent Hadis which is harmful for Islam and our country.. the true thing is that more than 50% student give up cowami madrasa after 2-5 years study and they waste their golden time of life...after that they can not come back in study..they remain unconscious about present world...!!!
২০১১.০১.১৬ ০৯:৫৭
The education system should be equalize.

Muhammad Kutub Uddin

Muhammad Kutub Uddin

২০১১.০৩.১০ ১৬:৪৩
we r so expert to comment about everything.but we r foolish.

nezam uddin

nezam uddin

২০১১.০৪.০৭ ১৬:০৮
I want to say the first person.pls don't write like this comment. think deeply. then write . if u r Muslim.

Kamrul Islam

Kamrul Islam

২০১১.০৭.০৯ ০৫:০৬
The students and teachers of Kawmi Madrasahs are citizen of Bangladesh. They do not come from Pakistan. If there is any wrong in there curriculum the govt. should work together with them to make their education system modern. And should not forced them.

muhammadullah

muhammadullah

২০১১.০৮.২৩ ১৯:১৫
আমরা আমাদের নেতাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমাদের জীবন নিয়ে যেন কোন খেল না হয়।

Zahirul Islam

Zahirul Islam

২০১১.১০.২৩ ০৪:২৪
আসলে আমাদের দেশের পুরা শিক্ষাব্যাবস্থাতেই ত্রুটি আছে। যেখানে স্কুল কলেজ পাস করিয়া কোন চাকুরী পাওয়া যায় না।সেখানে কওমী মাদ্রাসায় পড়ার কোন যুক্তি আছে কি? কওমী মাদ্রাসাগুলো হইল ইসলামী নাম ধারী রাজনৈতিক দল গুলোর লাঠীয়াল তৈরীর কারখানা। এই সব কওমী মাদ্রাসায় কোরান - হাদীস এর পাশাপাশি ভকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা দরকার।