অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ
ছাত্র সংগ্রহে শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি ধরনা
পেশায় তিনি শিক্ষক। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে পড়ানো ছাড়াও রয়েছে শিক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্ব। ভর্তি মৌসুমে নিরুপায় হয়েই শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি ছুটতে হয় তাঁকে। ভর্তি-ইচ্ছুক এবং তার অভিভাবককে অনুরোধ করেন। দিতে হয় ভালোভাবে পড়াশোনা করানোসহ নানা রকমের আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি।
এই শিক্ষক ঝিনাইদহ-৩ আসনের সাবেক সাংসদ শহিদুল ইসলামের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত আলফাতুন্নেছা মহাবিদ্যালয়ে চাকরি করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক বলেন, ‘চাকরি নেওয়ার সময় শর্ত ছিল, শিক্ষার্থী জোগাড় করতে হবে। এটা না করলে কলেজ চলবে কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থী না থাকলে কলেজ থাকবে না, কলেজ না থাকলে চাকরিও থাকবে না।’
এই অবস্থা শুধু ঝিনাইদহের আলফাতুন্নেছা কলেজের নয়, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। বাইসাইকেল, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ, বিনামূল্যে বই ও পোশাক দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও এখন শিক্ষার্থী ভর্তি করার চেষ্টা চলে।
শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলায় এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৮০টি, কলেজ ৫৫টি আর মাদ্রাসা ১১০টি। আর এমপিওভুক্তি ছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৮টি, কলেজ পাঁচটি ও মাদ্রাসা ২৩টি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর এসব বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এক লাখ ১২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। স্থানীয় সাংসদ ও তাঁদের স্বজনের নামে গড়া হয়েছে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান। মূলত নামকরণের আশায় গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই বর্তমানে ভুগছে শিক্ষার্থীর সংকটে।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু নিজের বা বাবা-মায়ের নামেই প্রতিষ্ঠান গড়াই লক্ষ্য ছিল না। ওই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েও ব্যাপক আর্থিক বাণিজ্য হয়েছে।
জানা যায়, ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা মসিউর রহমান এবং তাঁর বাবা-মায়ের নামে রয়েছে সাতটি প্রতিষ্ঠান। ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা শহিদুল ইসলাম ও তাঁর বাবা-মায়ের নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সাবেক সাংসদ বিএনপির নেতা এম এ ওহাবের বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কলেজ। ঝিনাইদহ-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ শফিকুল আজম খাঁনের বাবার নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাবেক সাংসদদের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার বিষয়ে সদর উপজেলার গান্নাবাজার মুক্তিযোদ্ধা মসিউর রহমান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, তাঁরা প্রথমে গান্নাবাজার কলেজ নামকরণ করেছিলেন। কিন্তু এমপিওভুক্তির সময় সাংসদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নাম পরিবর্তন করা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নামকরণের ক্ষেত্রে এককালীন ১৫ লাখ টাকা কলেজে দান করার বিধান থাকায় তিনি কলেজের হিসাবে ১৫ লাখ টাকা জমা দেন। পরে জমি ক্রয়সহ বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে তিনি টাকা ফেরত নিয়েছেন। কোটচাঁদপুর জি টি কলেজের শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সাংসদ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নামের ক্ষেত্রে কলেজের হিসাবে টাকা জমা ও খরচ—সবই হয় কাগজ-কলমে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অধ্যক্ষ জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে হলে সাংসদদের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার উপায় থাকে না। তাঁদের সহায়তা চাওয়া হলে কেউ কেউ নিজেদের ইচ্ছেমতো নামকরণের শর্ত জুড়ে দেন।
একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজনৈতিক কারণে আর শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে অর্থবাণিজ্যের আশায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি স্কুল-কলেজে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। টাকা দিয়ে চাকরি নিয়ে বেতন পাননি এমন শিক্ষকও রয়েছেন অসংখ্য। বিশেষ করে ঝিনাইদহ জেলার ১৫টি ডিগ্রি কলেজে শতাধিক তৃতীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা আজও বেতন পাননি।
টাকা দিয়ে চাকরি নিয়ে বেতন না পাওয়ায় ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া কলেজের শিক্ষকেরা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে যারা তাঁদের টাকা নিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাঁদের সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। ওই কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে জানান, তাঁদের কলেজের প্রায় সব শিক্ষককে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে চাকরি নিতে হয়েছে। কলেজের বিজ্ঞান শাখা অনুমোদন না থাকলেও শুধু টাকার জন্য ওই বিভাগে আটজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। যাঁরা আজও সরকারি বেতন পাননি। একইভাবে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ডাকবাংলো কলেজে অতিরিক্ত আটজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহের ছয়টি উপজেলার ১৫টি বেসরকারি ডিগ্রি কলেজে শতাধিক তৃতীয় শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের জানানো হয়েছে, একটি বিষয়ে দুজনের অতিরিক্ত শিক্ষকের বেতন দেওয়া সম্ভব নয়।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ডাকবাংলোয় অবস্থিত আব্দুর রউফ ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক শাহানুর আলম জানান, এনজিওর চাকরি ছেড়ে এখানে যোগদান করেন। তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হওয়ায় আজও বেতন পাননি। দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে চাকরির পাশাপাশি নিজে একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা করে সংসার চালাচ্ছেন। অপর এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাকরি পেতে তাঁকে এক লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়োগকর্তারা টাকার জন্য নিয়োগ দেন, কিন্তু তাঁরা ভাবেন না, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা বেতন পাবেন কি না।







syed Mamun
২০১১.০৭.৩১ ১৫:৩৩aminul
২০১২.১১.০৭ ১২:৫৬Tajerul islam sadhin
২০১২.১১.২১ ০৭:০০