করুণা আর দয়ানির্ভর জীবন!

অমর সাহা, কলকাতা থেকে | তারিখ: ১৮-০৮-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

‘বলতে পারেন কোথায় যাব? কী-ই বা আমাদের পরিচয়? এটুকু জানি, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আমাদের খোঁজ রাখে না। আমরা তো ভারতের মাঝে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পড়ে আছি। অথচ ভারত সরকারও আমাদের মেনে নেয়নি, দেয়নি নাগরিকত্ব। বেঁচে আছি ভারতের করুণা, দয়া আর সাহায্য নিয়ে। দেশভাগের পর থেকে এটাই যেন আমাদের নিয়তি। দুর্বিষহ এ নিয়তি থেকে এখন আমরা মুক্তি চাই।’
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মশালডাঙ্গা ছিটমহলের প্রবীণ বাসিন্দা মহম্মদ তালেব আলীর এই বক্তব্য আসলে ছিটমহলের সব মানুষেরই মনের কথা। ৮০ বছর পেরোনো তালেবের কৈশোরে ঘটেছিল র‌্যাডক্লিফের মানচিত্র আঁকার ‘ছেলেখেলা’। চেয়ে চেয়ে দেখলেন পাকিস্তান, তারপর বাংলাদেশ নামের নতুন দেশ জন্ম নিল। দেশ বদলে দেশ হয়েছে। কিন্তু শেষ হয়নি তাদের বঞ্চনার আখ্যান।
গত ১৬ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা মহকুমার নাজিরহাটের মশালডাঙ্গা ছিটমহলে গিয়ে শুনতে হলো অসহায় মানুষের যন্ত্রণার সঙ্গে বসবাসের বয়ান।
পূর্ব মশালডাঙ্গায় ননীবালা বর্মণও বললেন, ‘ভারতের পেটের মধ্যে বাস করায় এখানকার মানুষজন আমাদের যেমন সাহায্য করে, তেমনি অবজ্ঞাও করে। বেঁচে আছি তো তাদের দয়ায়। অবজ্ঞা করলেও যে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।’
তালেব কিংবা ননীবালার মতো মো. বেল্লাল হোসেনের স্বরটা অত নিচু নয়। দিনযাপনের কথা শুনতে চাইলে ক্ষোভ উগরে পড়ল ৪০ পেরোনো কণ্ঠে। ‘আমাদের ছিটমহলে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তারই আমাদের সম্বল। তবে গুরুতর অসুখ হলে আমরা শহরে ছুটে যাই। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে সেখানে চিকিৎসা নিই। সত্যি কথা কী, ছিটমহলের বাসিন্দার পরিচয় দিলেই আর কোনো চিকিৎসা হবে না। কারণ আমরা বাংলাদেশি। তাই আমাদের ভুয়া পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। থানা তো আমাদের মামলা নেয় না। আমরা সেখানে অবাঞ্ছিত। ঝগড়াঝাঁটি হলে নিজেদের মিটিয়ে নিতে হয়।’
আবদুল আজিজ বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দা। আদালতেও আমাদের ঠাঁই নেই। আর মামলা দায়েরের সুযোগ কোথায়! তবে সত্যটা হলো, আমরা এখনো বেঁচে আছি এখানকার মানুষজন এবং পঞ্চায়েতের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে। তাঁরাই আমাদের বন্ধু। বিপদে-আপদে সাহায্য করেন। নইলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে ছিটমহলে বেঁচে থাকতে পারতাম না।’
মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমরা বেঁচে আছি চাষাবাদ এবং দৈহিক শ্রম বিক্রি করে। ভাগ্য ভালো, ভারতের সরকারি কাজে যোগ দিতে না পারলেও অনেক ভূমালিকের কাজ করার সুযোগ পাই আমরা। আমাদের সব সময়ই যেতে হয় ভারতের বাজারে। আমাদের নিজেদের উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যও বিক্রি করতে হয় ভারতীয় বাজারে। আবার কিনতে হয় ভারতীয় পণ্য।’
তোজাম্মেল হক জানালেন, তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ভুয়া ভারতীয় ঠিকানা ব্যবহার করে ভারতের স্কুলে ভর্তি করান। তাঁদের ভোটার পরিচয়পত্র নেই। তাই বাঁচার জন্য ভুয়া ভারতীয় প্রমাণপত্র তৈরি করতে হয়। এভাবেই চলছে এঁদের পরগাছার মতো জীবন।
কিন্তু অন্য দেশে ‘পরগাছা’ হিসেবে থাকতে চান না ভারতের ভূখণ্ডে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দারা। তাঁরা দাবি তুলেছেন ছিটমহল বিনিময়ের, যার মাধ্যমে তাঁরা হয়ে যাবেন ভারতের নাগরিক।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন