দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল
গেট ফেইলের ফাঁদে জীবন
‘সারা দিন ভটভটি চালিয়েছি পাটগ্রামে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে গ্রামে ফিরতে হবে। সবকিছু ভেবে সতর্কই ছিলাম। কিন্তু পথে ভটভটির চাকা পাংচার হওয়ায় সময়মতো আসতে পারিনি। আর বিএসএফও সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় গেট বন্ধ করে দেয়। তাই রাত কাটাতে হয়েছে পরিচিত এক লোকের বাড়িতে।’
বিড়ম্বনার এই গল্পটা দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের বাসিন্দা মকবুল হোসেনের। গত ২৮ জুলাই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপের সময় মকবুল জানান, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সব বাসিন্দার একটাই চিন্তা—যে করেই হোক, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার আগে বাড়ি পৌঁছাতেই হবে। তা না হলে যে ‘গেট ফেইল’। গেট ফেইলের বৃত্তে বন্দী এখানকার ১৫ হাজার মানুষের জীবন।
দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতার ডানে-বাঁয়ে ভারত। সামনে বাংলাদেশের ভূখণ্ড। তবে তা কয়েক কদম হাঁটা পথের এক টুকরো ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে বিচ্ছিন্ন। এই পথটুকু কেড়ে নিয়েছে ছিটমহলের মানুষের অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা। আর এই হাঁটা পথটাই হচ্ছে তিনবিঘা করিডর। বাংলাদেশ থেকে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যেতে ভারতের তিনবিঘা করিডর পেরোতে হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তিনবিঘা করিডরের গেট খুলে দেয় সকাল সাড়ে ছয়টায়। গেট বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। মাঝখানের এই ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তাদের বাইরের কাজ সারতে হয়।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে ঢুকতেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবির) নিরাপত্তা চৌকি। এরপর তিনবিঘা করিডর। এরপর আবার বিজিবির চৌকি। মাঝখানের তিনবিঘা করিডর ভেদ করে চলে গেছে ভারতীয় সড়ক। সড়ক ও করিডরের নিয়ন্ত্রণ করে বিএসএফ। এই সড়কেই বিএসএফের গেট।
ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের যে ৫১টি ছিটমহল আছে, এর মধ্যে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাই বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা। বাকি সবই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে এক থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ১৯৯২ সালের ২৬ জুন ভারত তিনবিঘা করিডর খুলে দিলে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার বাসিন্দারা বাংলাদেশে যাতায়াতের সুযোগ পায়। এর আগে লোকজন ভারতে গেলেও বাংলাদেশে আসত বিএসএফের নজর এড়িয়ে। প্রথম দিকে তিনবিঘা করিডরের গেট দিনে এক ঘণ্টা পর পর বিরতি দিয়ে ছয় ঘণ্টা খোলা থাকত। এখন থাকে একটানা ১২ ঘণ্টা।
২৪ ঘণ্টা গেট খোলা রাখার দাবি: দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা দুটি ছিটমহল নিয়ে একটি ইউনিয়ন। প্রায় ১৫ হাজার জনগোষ্ঠীর এই ইউনিয়নে স্কুল থাকলেও কোনো কলেজ নেই। ছোট্ট একটা বাজার আছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের দেখা মেলে না। তাই চিকিৎসার জন্য এখানকার লোকজনকে ছুটতে হয় পাটগ্রাম উপজেলা সদর ও লালমনিরহাটে।
ছিটমহলের পানবাড়ীর হাবিবুল্লাহ, খাইরুল আলম ও বদিউজ্জামান জানান, গত ২৯ জুলাই তাঁরা পাটগ্রামের হাট থেকে ফিরে তিনবিঘা করিডরের গেটে আসতে সন্ধ্যা ছয়টা ৩১ মিনিট হয়ে যায়। এরপর আর বিএসএফ ঢুকতে দেয়নি। পরে পাটগ্রামে ফিরে গিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকেন। আঙ্গরপোতার প্রধান বাড়ির সৈয়দ দুলাল হোসেন ও দুলু ইসলাম বলেন, সপ্তাহে কোনো না কোনো দিন গেট ফেইল করেনি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধা মিনিট দেরি হলেও বিএসএফ ঢুকতে দেয় না।
দহগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র নূর হোসেন বলে, সম্প্রতি তার এক আত্মীয় রাতে গুরুতর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। লালমনিরহাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফকে গেট খোলার অনুরোধ জানানো হলে প্রথমে সাড়া দেয়নি। অনুনয়-বিনয়ের পর গেট খোলার অনুমতি পাওয়া গেলেও ততক্ষণে প্রায় দুই ঘণ্টা চলে যায়।
বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালন। পাটগ্রামে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। ছিটমহলের বাসিন্দারা গবাদিপশু বিক্রি করে ওই হাটে। বিএসএফ হাটবারে ১০টির বেশি গবাদিপশু নিতে দেয় না। তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ঠিক করেন, কার কার গবাদিপশু বেচার অনুমতি দেওয়া হবে।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছে। সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, ‘ছিটমহলের মানুষের জীবন এখন অনেক ব্যস্ত। বাংলাদেশি ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে গিয়ে “গেট ফেইল” আতঙ্কে ভোগে সবাই। আমাদের দাবি, ২৪ ঘণ্টা গেট খোলা থাকুক।’
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






