শিরোনাম:

বাংলাদেশের ভেতরে ভারত

ছোট ছোট ছিটমহল, বড় বড় দুঃখ

সেলিম জাহিদ ও সফি খান, কুড়িগ্রাম | তারিখ: ১৮-০৮-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

‘কম হলেও ছিটের জমির কিছু দাম আছে। কিন্তু ছিটের মানুষের কোনো দামই নেই।’
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহল কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ছোট গারালজোড়ার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. মকবুল হোসেন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন কথাটি।
ষাটোর্ধ্ব মহিউদ্দিন বলেন, ‘ছিটের জমি ভারতের। আমরা তার নাগরিক। তাহলে আমাদের চলাচলের রাস্তা, অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থা কোথায়?’ মহিউদ্দিন বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের আরেক ছিটমহল বড় গারালজোড়ার বাসিন্দা।
ছিটমহলের ‘বন্দিজীবন’ থেকে মুক্তি চান কালামাটির শাহেদ আলী। বললেন, ‘আর সহ্য হয় না রে ভাই। এই ছিট বাংলাদেশ হয়ে গেলে আমি গরু জবাই করে তবারক খাওয়াব।’
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কালামাটি, বড় গারালজোড়া, ছোট গারালজোড়া ও ফুলবাড়ী উপজেলার দাশিয়ার ছড়ায় খণ্ড খণ্ড কয়েকটি ছিটমহল ঘুরে একই দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
অবকাঠামোর চিত্র সর্বত্রই একই—হাঁটাচলার রাস্তা নেই। শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের সময়েও কপালে জোটে না সরকারি সহযোগিতা। উল্টো পদে পদে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
সীমান্তের বেশির ভাগ জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করে রেখেছে ভারত। সেখানে অস্ত্র হাতে টহল দেয় বিএসএফ।
কিন্তু বাংলাদেশে ভারতের ছিটমহলগুলোতে কোনো সীমানাপ্রাচীর বা পাহারা নেই। আশপাশের বাংলাদেশি ও ছিটমহলবাসী ভারতীয় নাগরিকদের ভাষা, গায়ের রং ও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রায় অভিন্ন। এসব ছিটমহল থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের দিনহাটা থানা ও ৪৫-৫০ কিলোমিটার দূরে কোচবিহার জেলা সদর।
এক ছিটের পেটে আরেক ছিট: বাংলাদেশের ভেতরে ভারত, তার ভেতরে আবার বাংলাদেশ। যেমন কুড়িগ্রামে ভারতের ছিটমহল দাশিয়ার ছড়া। দাশিয়ার ছড়ার ভেতরেই আছে চন্দ্রখানা নামের বাংলাদেশের একটি ছিটমহল।
কুড়িগ্রাম জেলায় ভারতের ১৮টি ছিটমহল আছে। বড় গারালজোড়ার ছিটমহলে বসবাস করে ১০টি পরিবার। এর আয়তন ৩৫ দশমিক ২৪ একর। এ ছাড়া ছোট গারালজোড়া ১৭ দশমিক ৭৮ একর ও কালামাটির আয়তন ২১ একর।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হামিদুল হক বলেন, এই উপজেলায় ভারতের ১০টি ছিটমহল আছে। লোকগণনা অনুযায়ী, এই ১০টিতে ২৬২টি পরিবারে এক হাজার ১৬৯ জন বাস করে।
ছিটের জীবন-জীবিকা: ছিটমহলের মানুষ কৃষিনির্ভর। অধিকাংশ মানুষ দিনমজুর। উৎপাদিত পণ্য বাংলাদেশের হাটবাজারেই তাঁরা বেচাকেনা করেন।
বড় গারালজোড়ার ছিটমহলে কথা হয় আলিমুদ্দীনের (৬০) সঙ্গে। উদোম শরীরে কাদামাটি মাখা, পরনে আধা ভেজা লুঙ্গি। দেহে দিনভর পরিশ্রমের ক্লান্তি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর আলিমুদ্দীন বলেন, ‘মাত্র ওপার থেকে (ভারত) আসলাম। সারা দিন বদলা দিয়ে দেড় কেজি মোটা চাল, দেড় শ রুপি (ভারতীয় মুদ্রা) নিয়ে ঘরে ফিরলাম।’
এভাবেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অথবা সীমান্তের ওপারে নিজ দেশ ভারতে দিনমজুরি করে চলছে আলিমুদ্দীনের মতো আরও অনেকের জীবন। তবে ওপারে গিয়ে মজুরি বিক্রি করা সহজ নয়। এর জন্য বিএসএফের ‘দয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়’।
বাসিন্দারা জানান, ওপারে মজুরি বেশি। কিন্তু তাঁদের প্রায়ই ফিরিয়ে দেয় বিএসএফ। নিজের দেশে ঢুকতে তাঁদেরকে নির্ভর করতে হয় বিএসএফের করুণার ওপর।
কালামাটি ছিটমহলে চলাচলের কোনো রাস্তা নেই। জমির আইল ধরে যাতায়াত করেন মানুষ। একই চিত্র বড় ও ছোট গারালজোড়া ছিটমহলেও।
নেই চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধা। বেশির ভাগ মায়ের সন্তান প্রসব হয় গ্রাম্য দাইদের হাতে। অবস্থা জটিল হলে পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশের হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন।
শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মইদাম কলেজ থেকে এবার উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করেছে বড় গারালজোড়া ছিটমহলের রফিকুল ইসলাম। কালামাটি ছিটমহলের মানিক পড়ছে বাগভান্ডা দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে। একই স্কুলে তার সঙ্গে আছে হূদয় ও সাইফুল। স্কুলে ভর্তির সময় পরিচয় দিয়েছে ভূরুঙ্গামারীর ভোটহাট এলাকার বাসিন্দা হিসেবে।
ছোট গারালজোড়ার মিজানুর রহমান বলেন, ‘ছিটের বাসিন্দারা পড়ালেখা করে কী করবে? তাদের তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ভারতেও চাকরি পায় না, বাংলাদেশেও না।’
ছিটমহলের বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তার পাশাপাশি বাংলাদেশিদের সঙ্গেও বিয়েশাদির সম্পর্ক গড়ছেন। হাতেগোনা দু-চারজন খুঁজে পাওয়া যায়, যাঁরা একসময় ভারতের কোনো এলাকায় বিয়েশাদি করেছেন।
স্বাধীনভাবে বাঁচার আকুতি: স্বাধীনভাবে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচাসহ অনেক মৌলিক অধিকার নেই ছিটমহলে। এই অবস্থার অবসান চান তাঁরা। আত্মীয়তা, যোগাযোগব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাস ইত্যাদি কারণে বড় একটা অংশ বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকতে চান।
এলেঙ্গামারী ছিটমহলের মহিউদ্দিন (৬০) এখন জীবনের শেষ প্রান্তে। মৃত্যুর আগে ছিটের জীবনের অবসান চান। বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে মরতে চান।
আবার ব্যতিক্রমও আছে। ছোট গারালজোড়া ছিটের আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতে থাকতে চাই। মানুষ দিল্লি থেকে ম্যালা টাকা কামাই করে নিয়ে আসে। ভারতে কাজের দাম বেশি।’
এ প্রজন্মের চান মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশ বুঝি না, ভারতও বুঝি না। যেখানেই থাকি, স্বাধীন দেশের নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে থাকতে চাই।’
আমেনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে বিএসএফ বলেছে, “দিল্লি থেকে কাগজ আসছে রে, এখন আর তোদের যাইতে দেব না।”’

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন