আমার কাছে ২৫ বিলিয়ন ডলার!

উৎপল শুভ্র | তারিখ: ২৮-০৮-২০১১

  • ১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

এটিএন বাংলার ক্রীড়া সাংবাদিক আবদুল্লাহ হীরার মনটা খুব বড়। আমি চাইলাম আর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার দিয়ে দিল! একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের নোট। আরেকটা ৫ বিলিয়নের। এক বিলিয়নে যে এক শ কোটি, এটা তো নিশ্চয়ই জানেন। এবার ২৫ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশি টাকায় কত হয়, বের করে ফেলুন। দেখুন মিলেছে কি না—প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকা। হীরার বদান্যতায় এই বিপুল পরিমাণ টাকা এখন আমার ড্রয়ারে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বিশ্বাস না হলে যেকোনো সময় এসে দেখে যেতে পারেন।
মানুষের চাওয়ার আসলে কোনো শেষ নেই। এটি আরও ভালো করে বুঝলাম হীরা নোট দুটি দেওয়ার পর। ওর হাতে একতাড়া নোট। কোনোটাই মিলিয়ন ডলারের কমমূল্য নয়। বিলিয়ন ডলারই বেশি। এক শ ট্রিলিয়ন ডলারের নোটও আছে। এক ট্রিলিয়ন মানে এক লক্ষ কোটি। যার মানে, এক শ ট্রিলিয়নের ওই একটা নোটের দামই এক শ লক্ষ কোটি ডলার! ২৫ বিলিয়ন ডলার পেয়েও তাই আমার মন ভরছিল না। বিশেষ করে এক শ ট্রিলিয়ন নোটটার প্রতি খুব লোভ হচ্ছিল। ওর এত আছে, আরও কিছু আমাকে দিতেই পারে। পরক্ষণে নিজেই নিজেকে ধমকে দিলাম—যা দিয়েছে, তাতেই সন্তুষ্ট থাক্। মানুষের থাকলেই কি অন্যকে দিয়ে দেয় নাকি! তা হলে তো এই পৃথিবীতে গরিব বলে কিছু থাকত না।
এই রে, বিপদটা হঠাৎ টের পাচ্ছি। এয়ারপোর্ট কাস্টমসের কেউ এই লেখা পড়লে তো বিষম ঝামেলায় পড়তে হবে। ২৮ আগস্ট সকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে পুনঃপ্রবেশের সময় ‘পাঁচ হাজার ডলারের বেশি আছে কি না’ এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’তে টিক দিয়েছি। অথচ এখন বলছি ২৫ বিলিয়ন ডলারের গল্প। হীরার কাছে যে আরও ছিল, কথায় কথায় সেটিও তো ফাঁস করে দিয়েছি।
রহস্যটা এখন ভেঙে ফেলাই নিরাপদ। বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের যে গল্প ফেঁদেছি, সেটি মিথ্যা নয়। কিন্তু ‘ডলার’ মানেই ‘মার্কিন ডলার’, এটা আপনাকে কে বলল? আমার কাছে ২০ ও ৫ বিলিয়ন ডলারের যে দুটি নোট, তা জিম্বাবুইয়ান ডলার। যখন বাজারে চালু ছিল, তখনো এর খুব বেশি মূল্য ছিল না। এখন তো একেবারেই নেই। ওই সব অচল নোট।
একেবারেই মূল্য নেই, কথাটা ঠিক নয়। বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের ওই সব নোট জিম্বাবুয়েতে এখন স্যুভেনিয়ের হিসেবে বিকোয়। হীরাই যেমন ভিক্টোরিয়া ফলসে গিয়ে এক মার্কিন ডলারে পাঁচটি করে নোট কিনেছে। এই পৃথিবীতে কত আশ্চর্য ব্যাপারই না ঘটে! ‘এক ডলার’ দিয়ে ‘বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার’ কেনাটাও কি এরই একটা উদাহরণ নয়!
বিশ্বের প্রথম এক শ ট্রিলিয়নের নোটটা জিম্বাবুয়ে বাজারে ছেড়েছিল ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। মুদ্রাস্ফীতি তখন এমনই গগনস্পর্শী যে সেটির মূল্যমান ছিল আসলে মাত্র ৩০ মার্কিন ডলারের সমান। ‘মুদ্রাস্ফীতি’ কথাটা দিয়েও ব্যাপারটা ঠিক বোঝানো যাচ্ছে না। ‘ইনফ্লেশন’ মানে মুদ্রাস্ফীতি। কিন্তু জিম্বাবুয়েতে যেটি হয়েছিল, সেটিকে বলে ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’। এর বাংলা কী হবে, আমি জানি না। তবে ইন্টারনেটের কল্যাণে সেই ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’-এর হারটা আপনাকে জানাতে পারি। ২৩১ মিলিয়ন পার্সেন্ট অর্থাৎ শতকরা ২৩ কোটি ভাগ! যা বোঝার বুঝে নিন। এর অর্থ কী, আমার মাথায় ঠিক ঢুকছে না।
গত ১০ বছরে চারবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে বলে জিম্বাবুয়ের পাগুলে অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়েছে। ২০০১ সালে আমার প্রথম সফরে পাগলামির লক্ষণ মাত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ব্যাংকে বিনিময় হার ১ মার্কিন ডলার=৬০ জিম্বাবুইয়ান ডলার, অথচ কালো বাজারে সেটি ৯০ জিম ডলার। মনে আছে, হারারে এয়ারপোর্টে নেমে ব্যাংকে ডলার ভাঙাতে যাব, এক প্রবাসী বাংলাদেশি ‘কী করছেন, এখানে কেউই ব্যাংকে ডলার ভাঙায় না’ বলতে বলতে হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
২০০৪ সালে অবস্থা আরও খারাপ। ব্যাংক হারের সঙ্গে কালোবাজারের ব্যবধান আরও অনেক গুণ বেশি। বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে হোটেল ভাড়া-টাড়া সব মার্কিন ডলারে নেওয়ার সরকারি নির্দেশ জারি হয়ে গেছে। জিম ডলার তত দিনে এমনই খোলামকুচিতে পরিণত যে, এক বোতল পানি কিনতে সাড়ে তিন-চার হাজার ডলার লাগে। সেবার জিম্বাবুয়ে যাওয়ার পর দিন অফিসে ই-মেইল করে সহকর্মীদের ঘাবড়ে দিয়েছিলাম। তাতে শুধু সে দিনের খরচের নির্দোষ বিবরণ ছিল—সকালের নাশতা: ২০ হাজার ডলার, দুপুরের খাওয়া: ৪০ হাজার ডলার, বিকেলের নাশতা: ১৫ হাজার ডলার...ইত্যাদি ইত্যাদি। একটুও বাড়িয়ে লিখিনি। জিম ডলার আর মার্কিন ডলারে গুলিয়ে ফেললে আমার কী দোষ, বলুন!
২০০৭ সালে যখন তৃতীয়বার জিম্বাবুয়ে যাই, তার বেশ আগেই ব্যাংক নোট ছেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। চালু হয়েছে ‘বিয়ারার চেক’। ১০ হাজার ডলার, ২০ হাজার ডলারের অঙ্ক বসানো বিয়ারার চেক, যেটিতে দেওয়া আছে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ। সেবার গিয়ে ‘বিয়ারার চেক’ চালুর আগের পরিস্থিতি শুনেছি, যখন এক-দুই শ মার্কিন ডলার ভাঙালে এক বস্তা জিম ডলার হয়ে যেত। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সফরের সময় টাকার বস্তা নিয়ে ক্রিকেটারদের ছবিও ছাপা হয়েছে বাংলাদেশের পত্রিকায়। তখন লাঞ্চ করতে মিলিয়ন ডলারও নাকি লেগে যেত!
এবার গিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছ থেকে একটা কৌতুক শুনলাম। তখন কেউ রাস্তায় জিম ডলারভর্তি বস্তা পেলে নাকি ডলারগুলো ফেলে দিয়ে বস্তাটা নিয়ে যেত। বস্তার যে তাও একটু ‘দাম’ আছে! কৌতুক, আবার কৌতুকও নয়। পাউরুটি কেনার জন্য লোকে লাইনে দাঁড়িয়েছে, কাউন্টার পর্যন্ত যেতে যেতে সেটির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে!
আর কোনো উপায় না দেখে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি জিম্বাবুইয়ান ডলার বাতিল করে বহু মুদ্রার দেশ হয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। ‘বহু মুদ্রার’ নামেই, দক্ষিণ আফ্রিকান র‌্যান্ড একটু চললেও মূলত মার্কিন ডলারই এখন কেনাবেচার মাধ্যম। বাংলাদেশে আমরা ডলারের চকচকে নোট দেখেই অভ্যস্ত। সেই ডলার কত নোংরা আর কুচিমুচি হতে পারে, সেটি দেখতে আপনাকে জিম্বাবুয়ে যেতে হবে। এটি যেহেতু বেশ ঝামেলার ব্যাপার, আপনাকে একটু বুঝতে সাহায্য করি। বাংলাদেশে দুই টাকার নোটের যে অবস্থা, জিম্বাবুয়েতে এক-দুই ডলারের নোটের অবস্থা মনে করুন তার চেয়েও পাঁচ গুণ খারাপ। কোনো কিছু কিনে বড় নোট দিয়ে তাই আতঙ্কে থাকতাম। কী যে ফেরত পাব!
আরেকটা মজার ব্যাপার, বর্তমানে জিম্বাবুয়েই সম্ভবত এই বিশ্বে একমাত্র দেশ, যেখানে ভাংতি পয়সা বলে কিছু নেই! সুপারস্টোরে কেনাকাটার পর ভাংতি পয়সা পাওনা হলে ভাউচারের পেছনে তা লিখে দেওয়া হয়। সেটির হিসাব হয় পরের বার কেনাকাটার সময়। এবার জিম্বাবুয়েতে থাকতেই স্থানীয় এক পত্রিকায় পড়লাম, ভাংতি পয়সা আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই বছরের শেষ নাগাদ জিম্বাবুইয়ানরা ভাংতি পয়সায় ভিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

আব্দুল্লাহেল মাসুম

আব্দুল্লাহেল মাসুম

২০১১.০৮.২৮ ০৮:৩০
বাংলাদেশে ৫ টাকার কোয়েন দিয়ে বাদাম কিনলে তার অর্ধেক ওজনের বাদাম পাবেন। আমরাও একদিন টাকা নিয়ে ছড়াছড়ি খেলব।