গোলটেবিল বৈঠক
অতিদারিদ্র্য নিরসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
১৮ অক্টোবর অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ, ব্র্যাক-এর সহযোগিতায় ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘অতিদারিদ্র্য নিরসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হলো:
যাঁরা অংশ নিলেন
আবুল কালাম আজাদ
সংসদ সদস্য, তথ্য এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, পিকেএসএফ
রাশেদা কে চৌধুরী
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
ড. মাহবুব হোসেন
নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ
প্রধান সম্পাদক, নিউজ টুডে
মতিউর রহমান চৌধুরী
প্রধান সম্পাদক, মানবজমিন
শাইখ সিরাজ
পরিচালক (বার্তা), চ্যানেল আই
মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ফরিদ হোসেন
ব্যুরোপ্রধান, এপি
মনজুরুল আহসান বুলবুল
সিইও, বৈশাখী টেলিভিশন
জ ই মামুন
বার্তাপ্রধান, এটিএন বাংলা
এলিসন সুব্রত বাড়ৈ
কর্মসূচি সমন্বয়কারী
অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ, ব্র্যাক
আনিসুল হক
উপসম্পাদক, প্রথম আলো
মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম
যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
আলোচনা
মতিউর রহমান
আপনারা শত ব্যস্ততার মধ্যেও আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন, তাই আপনাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বর্তমান বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা অনেক। গুণগতমানের দিক থেকেও বর্তমানের গণমাধ্যমগুলোর অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকার পাঠক ও টিভি চ্যানেলগুলোর দর্শকের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অবশ্যই এগিয়ে, কারণ তাদের দর্শকের সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেকোনো সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আলোচনা করলে গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা বাদ দেওয়া যায় না।
গণমাধ্যমের একটি বড় কাজ হলো অতিদারিদ্র্য নিরসনের বিষয়টি নিয়মিত নজরদারিতে রাখা, সাফল্য ও ব্যর্থতা তুলে ধরা, যেন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যায়। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারলে অবশ্যই সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে। আমাদের গণমাধ্যমগুলো গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এই গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনে সহযোগিতা করার জন্য ব্র্যাক অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আব্দুল কাইয়ুম
বর্তমান বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এখন প্রায় ১২ শতাংশ। এ অবস্থায় দারিদ্র্য-পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে কি না, সে বিষয়ে লেখালেখি করতে হবে গণমাধ্যমগুলোকে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক সম্প্রতি গবেষণা করে দেখেছেন, আমাদের দেশে গ্রামের অনেক সাধারণ গরিব মানুষ আর্সেনিকের ভয়ে টিউবওয়েলের পানি বাদ দিয়ে খালবিলের পানি পান করছে। ফলে তাদের অনেকে নানা অসুখ-বিসুখে মারা যাচ্ছে। অতিদরিদ্ররাই এ ধরনের বিপর্যয়ের শিকার। গতকাল বিবিসি ওয়ার্ল্ডে এ সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। আমরা আর্সেনিকদুষ্ট টিউবওয়েল চিহ্নিত করেছি, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা কি যথেষ্ট করেছি? দরিদ্র, অতিদরিদ্ররা তো খায় সামান্য ভাত আর পানি, তাও তিন বেলা জোটে না। তারা কীভাবে বাঁচবে যদি পরিষ্কার পানিটুকুও না পায়? গণমাধ্যম এসব সমস্যা তুলে ধরতে পারে।
আলোচনার শুরুতে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ড. মাহবুব হোসেনকে অনুরোধ করব বলার জন্য।
ড. মাহবুব হোসেন
অতিদারিদ্র্য নিরসন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নিকট অতীতে পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী আমরা দেখেছি গণমাধ্যমগুলো দারিদ্র্য বিষয়টা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
আমরা দুটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি পত্রিকায় গত এক বছরে প্রকাশিত দারিদ্র্যবিষয়ক প্রতিবেদনের সংখ্যার জরিপ করেছি। জরিপে দেখা গেছে, এমন প্রতিবেদনের সংখ্যা সাত শতাধিক। এ ছাড়া অন্যান্য পত্রিকা ও টেলিভিশন মিডিয়ায় এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করা হয়েছে। সুতরাং গণমাধ্যমগুলো দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
গণমাধ্যমের রিপোর্টগুলো ফলদায়ক হচ্ছে কি না, জনমত সৃষ্টি করতে পারছে কি না, মানুষের জীবনযাত্রায় এর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আমাদের অবস্থানকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে পারে, এটা আশঙ্কাজনক। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যায়, প্রায় ১৮ লাখ মানুষ প্রতিবছর বাড়ছে। এত বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদির সঠিক ব্যবস্থাপনা করা আমাদের দেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ১৯৯০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৫৮ থেকে ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সুতরাং আমাদের অর্জনও কোনো অংশে কম নয়।
কৃষিখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ৩০ বছর আগে আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ২০ শতাংশ জমি সেচের আওতায় ছিল, বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ জমি সেচের আওতায় এসেছে। কৃষিতে প্রযুক্তির এই ব্যবহার কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এটাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে স্বল্প আয়ের কৃষকেরা কিছু মূলধন তৈরি করতে পারলেই কৃষিজ খাত ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। কৃষি-শ্রমিকদের বড় একটা অংশ অকৃষি খাতে চলে যাওয়ায় শ্রমিকদের মজুরিও বর্তমানে অনেক বেড়ে গেছে। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষেরও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে। একসময় বর্গাচাষিদের মালিকপক্ষকে বিঘাপ্রতি চার মণ ধান দিতে হতো কিন্তু এখন অনেক জায়গায় বিঘাপ্রতি ছয় মণ ধান দিতে হয়। এতে বর্গাচাষিরা আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না।
অতিদারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচির কার্যক্রমে দেখা গেছে, একজন অতিদরিদ্রের পেছনে ২০০ ডলার ব্যয় করে, বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের আওতায় নিয়ে এলে, সে আত্মনির্ভরশীলতার সহনীয় পর্যায়ে উত্তরণ করতে পারে। সুতরাং সরকারের এই খাতের অর্থ দিয়ে শুধু রিলিফের ব্যবস্থা না করে ব্র্যাকের গৃহীত কর্মসূচির মতো কার্যক্রম পরিচালনা করলে শুধু দারিদ্র্যই দূর হবে না, বরং তারা আত্মনির্ভরশীল হয়েও গড়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোকে সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। উদ্ভাবনীমূলক নতুন কাজগুলোকে কীভাবে মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, কীভাবে মানুষকে আরও বেশি সচেতন করে তোলা যায়, সেদিকে গণমাধ্যমগুলোকে ব্যাপক দৃষ্টি দিতে হবে। অবশ্যই দারিদ্র্য নিরসনে আমরা সফল হব।
শাইখ সিরাজ
বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে গণমাধ্যমের অন্যতম হাতিয়ার ধরা হয়। সে ক্ষেত্রে ব্র্যাকের জরিপের আওতায় ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে আনলে আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে। নীতি-নির্ধারণে আমরা সরকারকে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারি। যেমন ড. মাহবুব হোসেন কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপ্লবের কথা বলেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্যের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে গ্রামীণ জনজীবনে শুধু কৃষি খাতে নয়, বরং অকৃষি খাতেও অনেক বড় ধরনের বিপ্লব ঘটেছে। যেমন হাঁস-মুরগি-মাছের খামার ইত্যাদি। একজন খুব সাধারণ মানুষ, যার হয়তো বসবাসের উপযোগী কোনো জায়গাও নেই, অথচ সে গ্রামের ডোবায় চিংড়ি মাছ চাষের মাধ্যমে বর্তমানে ১০-১৫ হাজার টাকা উপার্জন করছে। সুতরাং তাদের চিন্তাচেতনার বিপ্লব ঘটেছে। আমরা সরকারকে কার্যকর কমিউনিটি রেডিওর কথা জোর দিয়ে বলতে পারি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের দ্বিতীয় চ্যানেলকে কার্যকর করে তোলার জন্য জোর দেওয়া উচিত।
সাধারণ মানুষের কাছে লাগসই একটা তথ্য পৌঁছে দিতে পারলে বাস্তব জীবনে তা জাদুর মতো কাজ করে। একজন বাস্তব সফল কৃষকের সফলতার সব চিত্র যদি অন্যান্য কৃষকের মধ্যে তুলে ধরা যায়, পরবর্তী সময়ে তারাও সফল হবে। এভাবেই পরিবর্তনের গতি বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের দেশে বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল চালু করার সময় এসেছে—এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।
মতিউর রহমান চৌধুরী
গণমাধ্যমগুলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে পারে। অন্যদিকে গণমাধ্যমে দারিদ্র্য-পরিস্থিতি সম্পর্কে সবাইকে অবহিত ও সচেতন করে সরকারকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য দিতে বাধ্য করতে পারে। গণমাধ্যমগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ হলো, কর্মসংস্থান সম্পর্কে সব খোঁজখবর জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, জনগণকে বিভিন্ন কর্ম উদ্যোগে উদ্বুদ্ধ করা প্রভৃতি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি কর্মোদ্যোগী করে তোলার জন্য সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন একটা কলাম থাকতে পারে, যেখানে গ্রামীণ জনজীবনের নানা বিপ্লবের কথা, সুযোগ-সুবিধার কথা স্থান পাবে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারলে গণমাধ্যমগুলো দারিদ্র্য দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে।
মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ
দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পার্থক্য সবার কাছে পরিষ্কার হতে হবে। আমরা জানি, একজন মানুষ প্রতিদিন ২,২০০ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করলে সে দরিদ্র ও ১,৮০০ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করলে সে অতিদরিদ্র। এ সংজ্ঞার ভিত্তিতে মাঠে গিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষে দারিদ্র্য সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব নয়।
অতিদারিদ্র্য দূরীকরণের আগে এটাকে সর্বনিম্ন মাত্রায় কমানোর জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। অতিদরিদ্ররা সুরক্ষিত নয়। তারা শ্রমক্ষমতা জন্ম দিতে পারে না এবং উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে না। এর ফলে তারা ক্ষুদ্র ঋণের বাইরে থেকে যায়। তাই তাদের জীবনধারণের প্রধান উৎস নিরাপত্তা বলয় (সেফটিনেট) ধরনের কর্মসূচি হওয়া উচিত।
অন্যদিকে অর্থনীতিতে নিম্নগামিতার যে শক্তি কাজ করছে তা আটকানো কঠিন। এটা আটকাতে হলে আমাদের নীতিগত বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। নানা মনীষীর গবেষণায় উঠে এসেছে, দরিদ্রদের ক্ষমতায়ন ছাড়া এটা সম্ভব না। ক্ষমতায়নের তিনটি মাত্রা আছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। এর মধ্য থেকে বিচ্ছিন্নভাবে একটি দিক নিয়ে কাজ করে সমাধান আসবে না। তিনটি মাত্রায় গরিবদের একসঙ্গে ক্ষমতায়িত করতে পারলে তবেই সমাধান আসবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হবে? গণমাধ্যমগুলোকে প্রথম পর্যায়ে দারিদ্র্যের পকেটগুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন, হাওর অঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চল, যেসব জায়গায় চরম দরিদ্ররা বাস করে। এসব ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে? দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে শুধু কঠিন দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা।
অন্য আলো নামে প্রথম আলোতে একটি পাতা বের হয়, যেখানে নিজ প্রচেষ্টায় যারা প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের সাফল্যগাথা তুলে ধরা হয়। এ ধরনের বিষয়গুলোকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমরা সুফল পাব।
মনজুরুল আহসান বুলবুল
সাংবাদিকতায় তিনটি বিভাগ আছে। প্রোটোকল সাংবাদিকতা, স্ট্যানোগ্রাফি সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী (ইনভেস্টিগেটিভ) প্রতিবেদন। এর মধ্যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হচ্ছে আসল সাংবাদিকতা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এর বাস্তবতা অনেক কম। আমরা, গণমাধ্যমগুলো, দারিদ্র্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করি না। কখনো কখনো গণমাধ্যমগুলোর সীমাবদ্ধতা থাকে। অনেক সময় প্রতিবেদনের প্রাধান্য বিবেচনা করলে তা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, সহিংসতা ও দুর্নীতির বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যান্য বিষয় স্থান করে নিতে পারে না। সুতরাং রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক শক্তি এবং যাঁরা দারিদ্র্যকে নিয়ে কাজ করেন তাঁদের সব শক্তিকে একীভূত করে গণমাধ্যমের সহযোগিতায় সামনের দিকে এগিয়ে গেলে অবশ্যই দারিদ্র্যের হার কমে আসবে।
সরকার ও সামাজিক শক্তির সহযোগিতায় গণমাধ্যমগুলো তাদের বিষয়বস্তুর উন্নয়ন করে এবং সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন উদ্যমে কাজ করলে দেশের দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে।
রাশেদা কে চৌধুরী
আমাদের গণমাধ্যমগুলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়কে খুব বেশি প্রাধান্য দেয় না। এগুলো জনমনে সাড়া জাগাতে পারে না। তার পরও গত ১০ বছরে অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। সংজ্ঞা দিয়েই সব সময় দারিদ্র্যের বিচার সম্ভব নয়। যেখানে একজন বাঙালি নারীর স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই, শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই, যেখানে নারীদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয় না, সেখানে দারিদ্র্যের সংজ্ঞা কী হবে?
বর্তমানে গণমাধ্যমগুলোতে নারী নির্যাতনের ব্যাপারে যতটা খবর আসে ঠিক ততটা নারীদের দারিদ্র্যের খবর আসে না। এদিকটায় গণমাধ্যমগুলোকে দৃষ্টি দিতে হবে।
একটা থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম, বাহ্যিক দৃষ্টিতে সেখানে সব ব্যবস্থাপনা ঠিক আছে। অপারেশন থিয়েটার আছে। ডাক্তার আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কোনো প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে?
তারা বলল, গত সপ্তাহে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। কেন মারা গেল জানতে চাইলে তারা বলল, অপারেশনের দরকার ছিল কিন্তু তা করা সম্ভব হয়নি। কেন সম্ভব হয়নি? অপারেশন থিয়েটার রুমে প্লাগ পয়েন্ট নষ্ট ছিল তাই। এর মূল্য কত? ২৫৬ টাকা। ওটা কি বদলানো যায় না? যায় ম্যাডাম। ফাইল ওপরে গেছে। অনুমোদন হয়ে এলে বদলানো যাবে। এ ক্ষেত্রে দুজন প্রসূতি মায়ের প্রাণের মূল্য মাত্র ২৫৬ টাকা। এই দারিদ্র্যকে আপনারা কোন সংজ্ঞার মধ্যে আনবেন?
ক্ষমতায়নের ব্যাপারে নারীরা সর্বদা পেছনে পড়ে থাকে। একজন নারীকে দক্ষতার সঙ্গে সংসার সামলাতে হয় কিন্তু পছন্দ-অপছন্দের দিকটায়ই সে চরম অবহেলিত, সেখানে দারিদ্র্যের যে পীড়া তা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব?
আমাদের গণমাধ্যমগুলো সামর্থ্য বৃদ্ধি করে পরিকল্পিতভাবে সামনে এগিয়ে গেলে দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে।
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ
আমরা শুনেছিলাম দারিদ্র্য জাদুঘরে চলে যাবে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দারিদ্র্য জাদুঘর থেকে মাঠে বের হয়ে আসছে।
জাতি হিসেবে আমরা দ্বন্দ্বে ভুগি। অনেক বড় ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থা বাংলাদেশে আছে, যারা নোবেল প্রাইজ পর্যন্ত পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানে শুনি, দারিদ্র্য নিরসনে তাদের দিয়ে কোনো সফলতা আসেনি। প্রথমে আমাদের এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
আমাদের দেশে নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। শিল্পে গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থাও হতাশাব্যঞ্জক। দারিদ্র্য দূর করতে হলে অবশ্যই আমাদের নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়া করতে হবে।
বর্তমানে দারিদ্র্য নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয় না। এর সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক ক্ষেত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি। এগুলো নিয়েও খুব বেশি প্রতিবেদন পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শাইখ সিরাজ, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এর প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাবে, যেসব কৃষকের কৃষিকাজে খুব বেশি চাহিদা ছিল না তাঁদের মধ্যে নতুন উদ্যম সৃষ্টি হচ্ছে। একই জমিতে দুবার অথবা তিনবার ফসল চাষ কীভাবে করতে হবে তা নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। গণমাধ্যমগুলো এ ধরনের উদ্ভাবনী বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে জনমনে সাড়া জাগাতে পারে।
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
বর্তমানে গ্রামের জীবনযাত্রা লক্ষ করলে দেখা যায়, অনেকেই পায়ে ভালো জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করছেন। আগের দিনে এমনটা খুব কম দেখা যেত। এ অবস্থা থেকে আমরা কী বিচার করব? তাঁদের মধ্যে দারিদ্র্য নেই? হতে পারে তাঁরা পরিবারের অসুস্থ কোনো সদস্যের চিকিৎসা না করে সামাজিক জীবনকে একটু সুন্দরভাবে থাকার জন্য অর্জিত অর্থ ব্যয় করে ভালো জুতা পায়ে দিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে ওপরের বেশ দেখেও আমরা নির্ধারণ করতে পারব না কারা দরিদ্র।
বর্তমানের তথ্য অনুযায়ী দারিদ্র্যসীমার নিচে ৩১.৫ শতাংশ লোক বাস করে। কিন্তু প্রতিদিন না হলেও প্রতিবছরে অবশ্যই বেশ কিছু মানুষ এই সীমার মধ্যে ওঠানামা করে। অন্যদিকে একটি পরিবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে বাস করে, কিন্তু চাহিদা পূরণের দিক থেকে সেই পরিবারের সদস্যদের কেউ দারিদ্র্যসীমার ওপরে কেউ বা নিচে বাস করে। বিশেষ করে পরিবারের নারী শিশুদের দিকে লক্ষ করলে এমনটা দেখা যায়। বৈষম্যের এ দিকটায় আমাদের গণমাধ্যমগুলোকে দৃষ্টি দিতে হবে। দারিদ্র্যকে ব্যাপকভাবে দেখতে হবে। আমার মতে, দারিদ্র্যকে বিবেচনা করা উচিত মানবাধিকারের আঙ্গিক থেকে, মানব মর্যাদার আঙ্গিক থেকে ও ব্যক্তির আঙ্গিক থেকে।
একজন মানুষ সমাজে প্রকৃত মানব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে কি না তা নিয়ে কাজ করতে পারে গণমাধ্যমগুলো। তথাকথিত হিসাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। একজন মানুষ সঠিক ও সুন্দরভাবে বাঁচতে পারছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে আমাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা-প্রাপ্তির দিকে নজর দিতে হবে, তবে শিক্ষাকে বাদ দিয়ে নয়।
সমৃদ্ধি নামে আমাদের একটা প্রকল্প আছে। ২২টি ইউনিয়নে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রত্যেকটা পরিবারকে বিবেচনা করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক এবং অন্য সব বিষয়কে খতিয়ে দেখে উপযুক্ত মানুষদের এ প্রকল্পের আওতায় এনেছি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে যথেষ্ট ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।
এ ধরনের প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়ন ব্যাপক হারে করতে পারলে আমরা দারিদ্র্যের বেড়াজাল থেকে টেকসইভাবে বেরিয়ে আসতে পারব।
ফরিদ হোসেন
দারিদ্র্য আমাদের কাছে খবর হিসেবে কম চমকপ্রদ (সফট) একটা বিষয়। বর্তমানে দারিদ্র্য নিরসনে গণমাধ্যম যা করছে, আমার দৃষ্টিতে তা যথেষ্ট নয়। সবার সঙ্গে একটা বিষয়ে আমিও একমত পোষণ করছি যে গণমাধ্যমের নীতি-নির্ধারকদের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে পারলে কাজটা সহজ হবে। কার্যকর বিভিন্ন বিষয় জনগণের সামনে উপস্থাপন করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দারিদ্র্য নিরসনে গৃহীত সরকারি সব কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজে গণমাধ্যমগুলো তদারকি করতে পারে।
আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একজন স্বামী পরিত্যক্তা নারী, যার সম্বল বলতে কিছুই ছিল না, ব্র্যাকের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করে সে স্বাবলম্বী হয়েছে। বর্তমানে তার সন্তান স্কুলে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে। একসময় দারিদ্র্যের গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে পারব।
যারা উদ্ভাবনী কাজ করে সাফল্য অর্জন করেছে তাদের মাধ্যমে অন্যদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা করা যেতে পারে। অনেক গণমাধ্যম আবার এ ধরনের সাফল্যকে কালিমা লেপন করে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে চায়। এ ধরনের কার্যক্রম থেকে গণমাধ্যমগুলোকে দূরে থাকতে হবে।
জ ই মামুন
গত সপ্তাহে আমাদের এটিএন বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে এমন একটি ঘটনা বলছি। আমরা লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলে রিপোর্টার পাঠিয়েছিলাম, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব অঞ্চলের মানুষের কী প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী গেলে তারা কী করবে—এসব বিষয়ে রিপোর্ট করার জন্য। এসব রিপোর্টের পাশাপাশি রিপোর্টাররা একটি ভিন্ন ধরনের রিপোর্ট পাঠিয়েছিল। একটি গ্রামের এক ভদ্রলোকের তিন মেয়ে আছে। তিনটি মেয়েই অন্ধ। আমাদের রিপোর্টার ওই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং স্থানীয় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে পারে কিছু অর্থ ব্যয় করে তাদের চিকিৎসা করলে তিনজনই পৃথিবীর আলোর মুখ দেখতে পাবে। এটাকে আপনারা হয়তো কেউ দারিদ্র্য বলবেন না, কিন্তু ওই পরিবারটা দারিদ্র্যের থেকেও অনেক বেশি খারাপ অবস্থানে আছে। শুধু তা-ই নয়, তিন মেয়ে অন্ধ হওয়ার কারণে সমাজে তারা চরম নিগৃহীত এবং অভিশপ্ত একটা পরিবার। এমনকি মেয়েগুলোর বাবার সঙ্গে সমাজের অনেকেই যোগাযোগ রক্ষা করে না।
এ ধরনের খবর আমরা দারিদ্র্যের বিচারে প্রচার করি না। সাধারণ একটা রিপোর্ট করি। পরবর্তী সময়ে অনেক সাড়া পাই। অনেকে এ ধরনের রিপোর্ট দেখে উৎসাহিত হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। এ ধরনের ঘটনাগুলোর প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য রিপোর্টিংয়ের ট্রিটমেন্টও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আনিসুল হক
আমরা যখন নিউজ করি, তখন দারিদ্র্য দূরীকরণের চিন্তা করে হয়তো তা করি না কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর সুফল পাওয়া যায়।
অমর্ত্য সেন বলেছেন, যে দেশে গণতন্ত্র আছে ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না।
আমার গ্রামের বাড়ি রংপুরের গোবিন্দগঞ্জে। ছোটবেলায় যখন গোবিন্দগঞ্জে যেতাম তখন আমার জ্যাঠাইমা বলতেন, বাবা তোমরা তো খাচ্ছ অথচ আমাদের পাশের ঘরে আমাদেরই আত্মীয়স্বজন তারা না খেয়ে আছেন। এমন ঘটনা সাধারণত কার্তিক মাসে বেশি লক্ষ করা যেত।
কিন্তু বর্তমানে আমার গ্রামের বাড়ি গোবিন্দগঞ্জে গেলে আমি আর শুনতে পাই না যে কার্তিক মাসে ওই গ্রামের কেউ না খেয়ে আছে। সুতরাং এটা আমাদের সফলতার একটা অংশ। এ কাজ আমরা করেছি তা বলব না, কিন্তু কাজটা করতে সহায়তা করেছি, এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।
এলিসন সুব্রত বাড়ৈ
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্যের সম্পর্ক কারও অজানা কথা নয়। একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন শুধু ভাত-কাপড় নয়, তার অন্যান্য মৌলিক ও নাগরিক সুবিধা সমাজ ও রাষ্ট্রকে দিতে হয়। যেখানে বর্তমান জনগোষ্ঠীকেই এসব সুবিধা দিতে রাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাড়তি জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করব, নাকি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি উদ্যোগী হব? অন্যদিকে, যেহেতু জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়, সুতরাং বর্ধিত জনগোষ্ঠীর জন্য দেশের বাইরে আরও বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন আধা-দক্ষ বা দক্ষ (সেমি স্কিলড বা স্কিলড) জনগোষ্ঠী তৈরি করে নিরাপদ অভিবাসনের ব্যবস্থা করা। এতে সরকারের রেমিট্যান্স বাড়বে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে। মিডিয়া এ ক্ষেত্রে ‘অভিবাসন’-সম্পর্কিত ভিন্নধর্মী কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে, যেভাবে চ্যানেল আই ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটি প্রচার করে চলেছে।
আব্দুল কাইয়ুম
আজকের গোলটেবিল বৈঠকের প্রধান অতিথি মাননীয় তথ্য এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী জনাব আবুল কালাম আজাদ এমপিকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।
আবুল কালাম আজাদ
‘অতিদারিদ্র্য নিরসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। প্রথম আলো আয়োজিত এবং অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ, ব্র্যাকের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত আজকের এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে পেরে আমি আনন্দিত। আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু ‘অতিদারিদ্র্য নিরসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ অত্যন্ত যথাযথ ও সময়োপযোগী বলে আমি মনে করি। ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সম্পদের এ দেশে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন লাভে দারিদ্র্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। সংগত কারণেই বর্তমানে সরকারের উন্নয়ন প্রয়াসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন। সরকারের ক্রমাগত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের প্রকটতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-এইচআইইএস ২০০৫ অনুযায়ী, এ দেশে ২০০৫ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০.৪ শতাংশ, যা ২০১০ সালের খানা ব্যয় জরিপের প্রাথমিক হিসাবমতে ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে ২০১৩ ও ২০২১ সালের মধ্যে এ দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ২৫ শতাংশ ও ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অতিদরিদ্রদের জন্য টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসেবে ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা’ (২০১০-২১) এবং ২০১১-২০১৫ মেয়াদের জন্য প্রস্তাবিত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘জনগণের ক্ষমতায়ন মডেল’ উপস্থাপন করেন। এতে শান্তি প্রতিষ্ঠার সহায়ক হিসেবে পরস্পর ক্রিয়াশীল যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেন তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ। কারণ বাস্তবিক অর্থে দারিদ্র্য দূরীকরণ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর এই লক্ষ্য অর্জনে গণমাধ্যম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, জনসাধারণের জীবনমানের উন্নয়ন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের উন্নয়নের মূল গতিধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গণমাধ্যম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় পরিচালিত সরকারের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যম জনগণকে সচেতন করে তুলতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য অর্জনে গণমাধ্যম সরকারের সঙ্গে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বৈষম্যমুক্ত কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি খাত, উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রতিটি নাগরিকের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক। বিশেষত গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে আজকের গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের জন্য প্রথম আলো ও ব্র্যাক অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করতে চাই যে ব্র্যাক দীর্ঘ সময় ধরে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথম আলোও সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা প্রশংসার যোগ্য। আশা করি, সবার সম্মিলিত চেষ্টায় দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আমরা উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হব।
আব্দুল কাইয়ুম
আজকের আলোচনায় অতিদারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গণমাধ্যমের বিভিন্ন ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন সমস্যা এবং তা সমাধানে গণমাধ্যমের কী করণীয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিশেষে আজকের গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






