মুখ রচনা

আমার বাংলাদেশ

আনিসুজ্জামান | তারিখ: ০৪-১১-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল। মনে হয়েছিল, আর কিছু না হোক, মৌলিক গণতন্ত্র বিদায় নিয়ে এবারে গণতন্ত্র আসবে দেশে। কেন মনে হয়েছিল, সে-ব্যাখ্যা দিতে পারব না।
২৫ মার্চে চট্টগ্রামে পৌঁছেছি ঢাকা থেকে। সেখানে নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কর্মপ্রার্থী, পরদিন ইন্টারভিউ। বিকেলে এক বন্ধুর বাড়ি গেছি চা খেতে। সেখানেই বেতারে খবর পেলাম, আবার সামরিক শাসন জারি হয়ে গেছে দেশে। খবর শুনে উঠে পড়লাম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার গৃহকর্তা-বন্ধুকে বললাম, ‘এদের সঙ্গে (মানে দেশের পশ্চিমাংশের সঙ্গে) আর একসঙ্গে থাকা যাবে না।’ এমন কথা আগে বলিনি, ভাবিওনি।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল-ঘোষণার পরে আবার আশান্বিত হওয়ার পালা। গণতন্ত্র আসবে। বোধহয় অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়া যাবে। হয়তো সম্পদের সুষম বণ্টনের দিকেও এগোনো যাবে।
পরের ২৫ মার্চ রাতে ন মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। ঘরবাড়ি ছেড়ে দৌড়োচ্ছি—জান বাঁচাতে, পারলে নতুন দেশের জন্যে লড়তে। দুর্যোগের মধ্যেও সুদিনের আশা করছি। নেতারা বলছেন, বাংলাদেশ হবে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের দেশ। বিশ্বাস করছি সেকথা।
গভীর প্রত্যয় নিয়ে তখন এক ভারতীয় বন্ধুকে বলেছিলাম, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে দুটো ব্যাপার কখনো ঘটবে না—সামরিক শাসন আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।’
বাস্তবে দুটোই ঘটেছে, একাধিকবার। ধিক্কার দিয়েছি নিজেকে, ধিক্কার দিয়েছি আত্মবিশ্বাসকে। বলেছি, দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা আমার মতো লোকের সাজে না।
তবু স্বপ্ন পিছু ছাড়ে না।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান যেদিন গৃহীত হলো, সেদিন মনে হয়েছিল, আমার জন্ম সার্থক হলো। নিজের হাতে যখন সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদটা লিখি—প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—তখন ফিরে গেছি কুড়ি বছর আগে। ভেবেছি, সময় লাগল বটে, স্বপ্ন তো পূরণ হলো। আসলে কিন্তু হলো নতুন স্বপ্নের সূচনা—সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হবে। তার বছর তিনেকের মধ্যেই শুনি, রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে আমাদেরই এক সহকর্মী আমাকে বলছেন, ‘বাংলা-বাংলা করে আমরা ভুল করেছি, দেশটাকে পিছিয়ে দিয়েছি।’ অচিরেই দেখি, এ-ভাবনা তাঁর একার নয়। আমার আবার স্বপ্নভঙ্গ, আশাভঙ্গ, বিশ্বাসভঙ্গ। একসময়ে তো এক বত্তৃদ্ধতায় লিখেই ফেলেছিলাম, স্বপ্ন দেখার সাহস আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কী দুর্ভেদ্য ঐক্যই না গড়ে উঠেছিল আমাদের। মনে হয়, বিজয়লাভের পরদিন থেকেই বিভেদ শুরু হয়ে গেল। এখন কোনো বিষয়েই দেশে মতৈক্য গড়ে তোলা দুঃসাধ্য। যেদেশে এত মতানৈক্য সেদেশ সামনে এগোবে কী করে!
যখন মতের ঐক্য হয়, তখন আমরা অসাধ্য-সাধন করে ফেলি। একাত্তরে করেছি, নব্বইয়ে করেছি। তখন মানুষ নিজেকে আলাদা করে দেখে না, ব্যক্তিস্বার্থ ভুলে যায়। তখন একেকজন দেশেরই অংশ হয়ে ওঠে—দেশের জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। সকলকে আবার স্বপ্ন দেখায়।
তাই দেখব না-দেখব না করেও স্বপ্ন দেখে ফেলি, আশায় বুক বাঁধি।
এই যেমন এবারে ভেবেছিলাম সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম উঠে যাবে, ভেবেছিলাম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে। কোনোটাই হয়নি।
জানি, আমাদের পর্বতপ্রমাণ সমস্যা, সম্পদ সীমিত। পরের উপর নির্ভর করতে হয়, সে-নির্ভরতা অনেক সময়েই যথোচিত ফল দেয় না।
কিন্তু আত্মশক্তিও সামান্য নয়। এই যে দিনের পর দিন সংখ্যা বাড়ছে মানুষের, সেই বর্ধিত জনসংখ্যার অন্নের জোগানও হচ্ছে এই মাটি থেকে। এ এক বিস্ময়—শ্রম ও সৃষ্টিশীলতার মহৎ যোগের ফল। একে তুচ্ছ করে দেখা যায় না।
তেমনি আজ আমরা অনেক কিছু করছি পঞ্চাশ বছর আগে যা ভাবা যেত না। সকল বিরুদ্ধতার মধ্যেও মানুষ পিছিয়ে নেই, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। চলছে সামনের দিকেই।
তবু দুঃখ এই যে, দেশটা সামনের দিকে যথেষ্ট চলতে পারছে না। তার চলার পথে অনেক বাধা, অনেক বিড়ম্বনা। অনেকে চাইছে দেশটাকে পেছন দিকে নিয়ে যেতে। ধর্মান্ধতার সংস্কার ছড়িয়ে দিয়ে, নারীদের অগ্রগতিতে বাধা দিয়ে, যুক্তিতর্কের কথা বাতিল করে ইতিহাসের অনেক পুরোনো দিনে ফিরে যেতে।
সেটা হতে দেওয়া চলবে না।
এমন একদিন ছিল যখন সন্তানের জন্যে মা দুধভাত পেলেই খুশি হতো। ক্ষুধাতুর শিশু যেকালে দুটো ভাত একটু নুন চাইত, সে-সময়টাও আমরা পেরিয়ে এসেছি। এখন মানুষ অনেক কিছু চায়: অন্ন চায়, বস্ত্র চায়, আশ্রয় চায়; শিক্ষা চায়, স্বাস্থ্য চায়, প্রাণ চায়; বল চায়, আলো চায়, মুক্ত বায়ু চায়; আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু চায়, চায় সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। মানুষ জানতে চায়, শুনতে চায়, বলতে চায়। আজ এসবই আমাদের অধিকার।
আগে জানতাম না, বুঝতাম না। ভাবতাম, যাঁরা রাষ্ট্র চালান, তাঁদের কাছে চেয়ে-চিন্তে নিতে হবে আমাদের অধিকার। এখন জানি, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। এ দেশের সকল কর্তৃত্ব আমাদের—সাধারণ মানুষের। আমরা শুধু পাঁচ বছরে একবার ভোট দিয়ে বসে থাকব, তা নয় (অবশ্য ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগও আমরা পাই না সব সময়ে)। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি করতে হবে আমাদের কাছে। আমরা নিজেদের প্রতিনিধি বদল করতে পারি, প্রতিনিধিরা কি পারেন জনগণকে বদল করে নিতে?
এই পীড়িত, লাঞ্ছিত, শোষিত মানুষ আমাদের স্বপ্ন দেখায়। তারা চাইলে অসাধ্য-সাধন করতে পারে। আমি খুব নিশ্চিত যে, মানুষ নিশ্চেষ্ট বসে থাকবে না। দেশটাকে তারা নিজের মতো করে গড়ে নেবে। সেই কাজে আমিও হাত লাগাতে চাই—সুযোগটা পাব তো?
দেশটাকে নিয়েই যত স্বপ্ন। সেটাই স্বপ্নের বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখতে দেখতেই একদিন রাত পোহাবে। তারই আশায় কাল গুনি।
আনিসুজ্জামান: গবেষক, প্রাবন্ধিক। অধ্যাপক ইমেরিটাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন