আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বিশ্বায়িত পৃথিবীতে বাংলাদেশ
-
শেখ হাসিনা ও মনমোহন সিং
-
শেখ হাসিনা ও বারাক ওবামা
-
সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্কের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রধানত তিনটি ধারা লক্ষণীয়। প্রথমত, পররাষ্ট্র সম্পর্কের সাফল্যের সব কৃতিত্ব আমরা পেতে আগ্রহী এবং যেটুকু ব্যর্থতা, তা যেন অন্য পক্ষের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ের মধ্যে একটি অদৃশ্য বিভাজন রেখা টানার প্রয়াস লক্ষণীয়, যা বিশ্বায়নের যুগে প্রায় অসম্ভব। সত্যি কথা বলতে কি, এ ধরনের বিভাজন অনেক আগেই অপসৃত হয়েছে। লক্ষণীয় যে এ ধরনের প্রচেষ্টার ফলে আমাদের পররাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে পৃথিবীর মানুষের কাছে অনাবশ্যক দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তৃতীয়ত, পররাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়টি আমরা দৃশ্যত অতিমাত্রায় আমলাতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলেছি। ফলে সরকার যা ভাবছে, জনগণ তা বুঝতে অসুবিধা বোধ করছে। এর ফলে পররাষ্ট্র বিষয়ে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সক্ষমতা কমছে। বর্তমান পৃথিবীতে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও নিয়মকানুন এখনো কার্যকর থাকলেও এর পরিচালন-পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করার মতো। বস্তুত এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যের সাফল্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সম্পর্কের প্রক্রিয়ার ব্যাপ্তি ও গভীরতার ওপর। অনেকগুলো উপাদান এ ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল।
যেকোনো দেশের পররাষ্ট্র সম্পর্কের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে, সে দেশের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ ও সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং সে সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের প্রতি চ্যালেঞ্জের যেকোনো সম্ভাবনা দূর করা। এ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সেগুলো হলো: বৈদেশিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সম্যক ধারণা, সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম হিসেবে যোগাযোগের ভূমিকা, পারস্পরিক বিশ্বাস সৃষ্টি এবং বাইরের পৃথিবীতে অবস্থিত রাষ্ট্রকাঠামো ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে একধরনের অংশীদারি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা।
সাম্প্রতিক কালে যেকোনো দেশের বৈদেশিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট রচনায় বেশ কয়েকটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তার মধ্যে রয়েছে ক্রমবিবর্তনশীল বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়া, গণতন্ত্রায়ান, প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার এবং সর্বোপরি নীতি-প্রক্রিয়ায় সর্বশ্রেণীর জনগণের অংশগ্রহণ। ফলে অনেক নতুন মূল্যবোধ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে সুশাসন, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং লাগসই উন্নয়ন প্রায় সর্বজনীনতা অর্জন করেছে। এর ফলে ‘ক্ষমতা’র ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা এখন কিছু মানুষের স্বার্থের হাতিয়ার থেকে প্রসারিত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে। ফলে অভ্যন্তরীণ দায়বদ্ধতার পাশাপাশি একধরনের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ঘটনাপ্রবাহ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশও এই বিশ্ব পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার অংশীদার। আমাদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ক্রমান্বয়ে বহিঃসম্পর্কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির ৫৬ শতাংশ বিশ্ব-অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছে। বলা বাহুল্য, আগামী দিনগুলোতে এ প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। সমাজ উন্নয়নের অন্যান্য বিষয়কেও ছোট করে দেখার উপায় নেই। প্রথমত, ধরুন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংহতকরণ একটি বড় মাপের কাজ এবং এ ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকামী বিশ্বের মানুষের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি জাতীয় প্রাধান্যের বিষয় এবং এটি দারিদ্র্য বিমোচনের একটি পূর্বশর্তও বটে। দেশীয় প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র বা বৈদেশিক সম্পর্ক একটি নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে। তৃতীয়ত, যৌথ প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়া ও সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ৫৪টি যৌথ নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবহার এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমায় অবস্থিত জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহারের কথা মনে রাখা যেতে পারে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রয়োজন সর্বত্রই অনুভূত হচ্ছে। এমনকি পানিসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীনেরও একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
অতএব, যখন আমরা সংযোগ বা কানেকটিভিটির কথা বলি, তখন তা হতে হবে অনেক বিস্তৃত ও গভীর। বিস্তারের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাঠামো শুধু ভারতকেই অন্তর্ভুক্ত করবে না, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তিও হবে এ প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক বিস্তার। সংযোগ বা কানেকটিভিটির আরও একটি দিক রয়েছে, তা হলো—খাড়া বা ভার্টিকেল সংযোগ, যাতে বাংলাদেশের শিক্ষাকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বলা বাহুল্য, মধ্য আয়ের বাংলাদেশ গড়তে সব ধরনের সংযোগ বা কানেকটিভিটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি পুঁজি, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনাগত সমর্থনের এক বড় রকমের সহায়ক ভূমিকা রয়েছে। সঠিক ও সার্থক পররাষ্ট্র সম্পর্ক এ ধরনের কাজে দীর্ঘমেয়াদি, ফলপ্রসূ, টেকসই অংশীদারি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে কমিউনিকেশন বা বার্তা আদান-প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটা সময় ছিল যখন শুধু সরকারি পর্যায়ে বার্তা আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিবর্তন ঘটত। সে অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এখন যেকোনো রাষ্ট্রেই সরকারের পাশাপাশি অনেক সংগঠন রয়েছে, যারা দেশের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের বার্তা আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে সম্পর্কের ভিত দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংকেত বা সিগন্যাল কখনো কখনো অনেক কিছুর আভাস দিতে পারে। এ ছাড়া বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আমরা যখন গ্লোবাল কনভারসেশন বা বিশ্বালাপের পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, তখন সংবাদ বা বার্তার আদান-প্রদানের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার প্রয়োজন নেই। বস্তুত একটি দেশের ভাবমূর্তি ও জাতীয় আকর্ষণ তৈরির ক্ষেত্রে মেসেজ বা কমিউনিকেশনের ভূমিকা আজ বিশ্বজোড়া স্বীকৃত।
আমাদের বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিবেশ দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। চীন ও ভারতের উত্থানের পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমেই বিশ্ব অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু এশীয় মহাদেশকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এটি আমাদের জন্য যেমন ভালো খবর, তেমনি চ্যালেঞ্জও বটে। নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোর সমস্যা, শঙ্কা, আশা ও স্বার্থকে আমলে নিয়ে এই দেশগুলোর সঙ্গে বিশ্বাস ও অংশীদারির সম্পর্ক গড়ে তোলা খুবই জরুরি। অন্য কথায় বলা চলে, নতুন বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে ঘিরে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক ঢেলে সাজানো দরকার। আঞ্চলিক দেশগুলোর সমস্যা থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখলে সমাধানের ক্ষেত্রেও আমাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত, পেশাগত জ্ঞান ও কূটনৈতিক উৎকর্ষ কাজে লাগিয়ে নতুন সম্পর্কের সোপান গড়ে তুলতে হবে। জাতি হিসেবে আমরা আমাদের সৃজনশীলতার একটি বড় পরিচয় এ ক্ষেত্রে রাখতে পারি।
যেকোনো সম্পর্কই গতিশীল, বৈদেশিক সম্পর্কও তাই। ঐতিহাসিক কারণেই বহির্বিশ্বে আমরা অতিমাত্রায় আমলাতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক সুশীল সমাজের সংগঠন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক সমস্যার কথা তারা উন্নত দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়ে তার সমাধানের পথও তৈরি করছে। বাংলাদেশের মতো সীমিত সামর্থ্যের দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজের সঙ্গে সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ ধরনের সংগঠনগুলো আমাদের জন্য শক্তিবর্ধক বা ফোর্স মাল্টিপ্লায়ারের ভূমিকা পালন করতে পারে, যা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য খুবই জরুরি।
অর্থনৈতিক বিষয়কে আমাদের পররাষ্ট্র সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত এর গতি উৎসাহব্যঞ্জক নয়। সরকারি নীতিকাঠামোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভুক্তি সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার প্রচেষ্টা যথেষ্ট গতিশীল নয়। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামো যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুবিধা আদায় করতে হলে আন্তর্জাতিক আইন, নীতিমালা ও মূল্যবোধের আলোকেই তা করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা বা ইচ্ছা এ প্রক্রিয়ার একটি উপাদান মাত্র।
বাংলাদেশে কূটনীতির কাঠামো এখনো অপেক্ষাকৃত সীমিত আকারে এবং জাতীয় প্রাধান্যের প্রেক্ষাপটে অপেক্ষাকৃত অসমাদৃত। এখানে দুটি সমস্যা বিদ্যমান। একটি ধারণাগত সীমাবদ্ধতা, অন্যটি কাঠামোগত সমস্যা। ধারণাগত দিক থেকে পররাষ্ট্র সম্পর্ককে আর দশটা সম্পর্কের মতো দেখা হয়, যা বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। বাংলাদেশ বিশ্বের ১৯৩টি দেশের একটি। তাত্ত্বিকভাবে আমাদের আরও ১৯২টি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়। বলা বাহুল্য, প্রতিটি দেশই তার মতো করে ভিন্ন প্রকৃতির এবং সফল ও সার্থক পররাষ্ট্র সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়; তাহলে আমাদেরও সেই পরিমাণ গভীরতা দিয়ে ভাবতে হবে এবং কাজও করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রাধান্য অন্যের প্রাধান্যের সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সম্পর্কের সাযুজ্য খুঁজে বের করাই হবে পররাষ্ট্র সম্পর্কের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
পররাষ্ট্র সম্পর্কের ধারণা নিয়ে আরও একটি অস্পষ্টতা বিদ্যমান। সাধারণত পররাষ্ট্র সম্পর্ককে কনস্যুলার বা প্রটোকল কাজের প্রেক্ষাপট থেকে দেখার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান। ফলে পররাষ্ট্র সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও গভীরতা নিয়ে নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভবত সে কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব এই প্রতিষ্ঠানটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেননি বা একে যথাযথভাবে কর্মক্ষম করে তুলতে সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দেননি। যখন বিভিন্ন দেশ বিশ্বায়িত পৃথিবীতে তাদের পদচারণ সরব ও সচল করার জন্য কূটনৈতিক কাঠামো ও কর্মকাণ্ডকে বহুগুণে শক্তিশালী করছে, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র-সম্পর্কিত কাঠামো—যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়—তা বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হচ্ছে। বাজেটস্বল্পতা থেকে শুরু করে জনবলের ঘাটতিসহ বাইরের অযাচিত ও অপেশাদার হস্তক্ষেপে এ কাঠামোটি এখন ভগ্নপ্রায় এবং সে সঙ্গে বাংলাদেশের পেশাদার কূটনীতিকেরা হারাচ্ছেন তাঁদের নৈতিক ও পেশাদারি মনোবল।
আরও যা চিন্তার কারণ তা হলো, যখনই সর্বজনীন ও প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক আচার ও প্রথার বাইরে গিয়ে আমরা বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে চাইছি, তখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের দুর্বলতাগুলো প্রকট হয়ে উঠছে, পৌঁছে যাচ্ছে ভুল সংকেত। এ ধরনের অবস্থা কাজে লাগিয়ে সাম্প্রতিক কালে প্রতিবেশী দেশ তাদের স্বার্থ আদায় করে নেওয়ার জন্য সচেষ্ট থেকেছে। এ কথা মনে রাখা দরকার যে আলোচনা করা বা নেগোসিয়েশনের দক্ষতা, যা সাধারণত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের বিশেষ দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হয়, তা অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা এজেন্সির কাছে হস্তান্তর করা যায় না বা এ ধরনের দক্ষতা রাতারাতি অর্জন করাও সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নে পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার অবকাশ রয়েছে এবং জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশকে এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ও সংশ্লিষ্ট করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুশীল সমাজের সদস্যদের বিশ্বসমাজের পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে জরুরিভাবে পরিচিত করানো দরকার। এ কাজে শিক্ষাকাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটানো অপরিহার্য। এর কারণ শিক্ষাই একমাত্র মাধ্যম, যা দিয়ে আমরা বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট হতে পারি, তেমনি এর থেকে ইতিবাচক ফল লাভ করতে পারি। এখানে মনে রাখা দরকার যে আমরা চাই বা না চাই, বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনকে স্পর্শ করে চলেছে। সে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি সুশীল সমাজ, বিশেষ করে গবেষণা-প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, মিডিয়াসহ তরুণসমাজের বিভিন্ন অংশকে আমাদের নীতিকাঠামোর আওতায় এনে তাদের সঙ্গে অংশীদারি গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে তারা জ্ঞাত হতে পারে এবং আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা জনমত গড়ে তুলে বাংলাদেশের পাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারে। বলা বাহুল্য, আমাদের কূটনৈতিক কাঠামোতে বড় রকমের বিস্তৃতি ঘটানো প্রয়োজন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগও দরকার; দরকার লোকবল ও আর্থিক সমর্থন। দূতাবাসের সংখ্যা বাড়ানো দরকার, সে সঙ্গে তাদের কাজের আরও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। মোট কথা, পররাষ্ট্র সম্পর্ক শুধু একটি আমলাতান্ত্রিক-প্রক্রিয়া নয়, এটি একধরনের অংশীদারির প্রয়াস। তার চেয়ে বড় কথা, বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি একধরনের সংস্কৃতি, যা অনুধাবন ও অবগাহন করতে প্রয়োজন এক বিশেষ ধরনের মানসিকতা ও দক্ষতা। আমরা যত তাড়াতাড়ি তা উপলব্ধি করতে পারব, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্ক তত দ্রুত সৃজনশীলতা ও গতি লাভ করবে। আমরা সে স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছি।
এম হুমায়ুন কবির: সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






