সরকার ও বিরোধী দল

ছয় টুকরো স্বপ্ন

আলী রীয়াজ | তারিখ: ০৪-১১-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • স্বপ্ন ৩: নির্বাচনী প্রচারে হবে না কোনো বিধিভঙ্গ

    স্বপ্ন ৩: নির্বাচনী প্রচারে হবে না কোনো বিধিভঙ্গ

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভবিষ্যতে গণমাধ্যমগুলোতে যেসব খবর দেখতে পাব বলে স্বপ্ন দেখি, তারই কয়েকটি।

স্বপ্ন ১: জাতীয় সংসদ
জাতীয় সংসদে গতকাল সকালের অধিবেশনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনায় নিহত আবুল কালামের স্মরণে সর্বসম্মতভাবে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। গত পরশু পারমাণবিক কেন্দ্রের বর্জ্য শোধনাগারে এক দুর্ঘটনায় আবুল কালাম নিহত হন এবং আরও তিনজন—মোহাম্মদ হাসান, রমেশ পাল ও মোহাম্মদ আবু জাফর আহত হন। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে নিয়মিত সন্ধ্যার অধিবেশনের অতিরিক্ত হিসেবে সকালে সংসদের এই অধিবেশন ডাকা হয়। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দুর্ঘটনার বিভিন্ন দিক জানাতে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে স্পিকার এই অধিবেশন আহ্বান করেন।
অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী একটি বিবৃতি দেন। এই বক্তৃতায় তিনি ওই দুর্ঘটনার দায়িত্ব স্বীকার করেন এবং বলেন, যদিও এই বিস্ফোরণ ‘দুর্ঘটনা’, কিন্তু সরকার এর দায়িত্ব নিচ্ছে। তিনি জানান, প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনার পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী পদত্যাগপত্র তাঁর কাছে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বিরোধী দলের প্রধানকে ধন্যবাদ জানান যে দুর্ঘটনার পরপরই বিরোধী দল দলীয় কর্মসূচি স্থগিত করে তাঁর সঙ্গে রূপপুরের ঘটনাস্থলে ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য সফরসঙ্গী হওয়ায় তিনি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের প্রধান ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং ছায়া মন্ত্রিসভার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মুখপাত্র দুর্ঘটনার পরপরই রূপপুরে উপস্থিত হন।
বিরোধী দলের প্রধান দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং সরকারের দ্রুত পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে বিরোধী দলের প্রধান বলেন, এতে করে তাঁর দায়িত্বশীলতার পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি এ-ও বলেন, মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে তাড়াহুড়া করবেন না বলেই তিনি আশা করেন। কেননা, এর সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের প্রধান—উভয়েই এ বিষয়ে আণবিক শক্তি কমিশনের পক্ষ থেকে যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে, তার প্রতিবেদনের জন্য সবাইকে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, ওই কমিটি এ বিষয়ে যেসব সুপারিশ করবে, তা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের পূর্বনির্ধারিত বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দল প্রস্তাবিত বাজেটের তীব্র সমালোচনা করে। বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভার অর্থবিষয়ক মুখপাত্র এই বলে সরকারের সমালোচনা করেন যে এই বাজেটে সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব ‘আত্মঘাতী’। তিনি বলেন, এতে করে রাষ্ট্র দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার থেকে সরে আসছে। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সংকোচনের বিরোধিতা করে বলেন, সরকারি দল দায়িত্ব পালনে অপারগ বলে তাঁরা সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করছেন। বিরোধী দলের এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, বিগত মেয়াদে তাঁরা সরকারে থাকার সময় রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে কিছু কিছু দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, সে জন্য তাঁরা যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘জনগণ সেসব দুর্নীতি ভালোভাবে নেয়নি বলেই আজকে আমরা বিরোধী দলের আসনে।’ কিন্তু এই অজুহাতে সরকার কল্যাণমুখী উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে আসতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থমন্ত্রী বিরোধী দলের ‘আত্মোপলব্ধি’কে স্বাগত জানালেও তিনি বলেন, তাঁর দল নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং তাঁরা এই অঙ্গীকার পালনের চেষ্টা করছেন। সরকার ও বিরোধী দলের অন্যান্য সদস্য আলোচনায় অংশ নিয়ে এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদ, সিপিডিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা উদ্ধৃত করে নিজ নিজ দলের পক্ষে যুক্তি দেন।
অধিবেশন আজ সন্ধ্যায় আবার বসবে।

স্বপ্ন ২: রাজনীতির মাঠে
প্রধান বিরোধী দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘নির্বাচনের দুই বছর বাকি থাকলেও দলীয় কর্মীদের বিশ্রাম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ গতকাল রাজবাড়ীতে দলীয় কর্মিসভায় দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আগামী দুই বছর সময়কে কাজে লাগাতে হবে। জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশায় পাশে থাকুন, তাদের সাহায্য করুন, তারাই আমাদের আবারও বিজয়ী করবে।’ জাতীয় সংসদের এই আসনে বিরোধী দলের প্রার্থী গত নির্বাচনে পরাজিত হন। এর আগে দুটি নির্বাচনে তাঁরা বিজয়ী হয়েছিলেন। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘জনগণের ওপর আস্থা রাখুন, কিন্তু তাদের পাশে সব সময় না থাকলে বিজয়ী হওয়া যাবে না।’ তিনি স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি দলকে সব সময় মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। ফলে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে দলের কাজে সময় দিতে পারেন না। কিন্তু আপনাদের প্রতিদিনের কাজের মধ্য দিয়েই জনগণকে সাহায্য করলে তারা আপনাদের আপনজন হিসেবে দেখবে। মনে রাখবেন, কেউই আপনজনকে পরাজিত দেখতে চায় না।’

স্বপ্ন ৩: নির্বাচনী প্রচারণায়
সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ও সম্পাদকমণ্ডলীর দুজন সদস্য গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিবারকল্যাণমন্ত্রী কর্তৃক নির্বাচনী বিধিভঙ্গের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তাঁরা নির্বাচন কমিশনারের কাছে প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি পৌঁছে দেন। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীর আচরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, জয়পুরহাটের উপনির্বাচনী এলাকায় পরিবারকল্যাণমন্ত্রী একটি দলীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং সে সময় তিনি সরকারি যান ব্যবহার করেন। জয়পুরহাটে দুই সপ্তাহ পরে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন মন্ত্রীর এই আচরণকে ‘নির্বাচনী আচরণ ভঙ্গ’ বলে বর্ণনা না করলেও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। পরিবারকল্যাণমন্ত্রী গত পরশু ওই এলাকায় একটি দলীয় কর্মিসভায় যোগ দেন। সরকারি দল ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিরোধী দলের নেতারা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত ব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সরকারি দলের আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও বিরোধী দল বলেছে, তারা আশা করে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।

স্বপ্ন ৪: প্রশাসন, দুর্নীতি ও গণমাধ্যম
বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল দেশের সর্বাধিক প্রচারিত জাতীয় দৈনিকের প্রশংসা করে বলেছেন, প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। ইন্সপেক্টর জেনারেল বলেন, গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামে কর্মরত তিনজন কর্মকর্তা একজন ব্যবসায়ীর কাছে উৎকোচ দাবি করেছিলেন। ‘খবরটি সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় ছাপা হলেও তা আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি’ বলে আইজিপি মন্তব্য করেন। আজ সাংবাদিকদের তিনি আরও জানান, প্রশাসনিক তদন্তে এই তিনজনের সম্পদের পরিমাণ আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রশাসনিকভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে, যাতে কমিশন এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে বলে তিনি জানান।

স্বপ্ন ৫: ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও দল
সরকার, প্রধান বিরোধী দলসহ দেশের ১৮টি রাজনৈতিক দল পৃথকভাবে অবিকল এক বিবৃতিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দলীয় কোনোরকম ভূমিকা না রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদসহ (ডাকসু) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আগামী মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গত বছর দলগুলো এ রকম এক বিবৃতি প্রদান করে এবং কোনো দলীয় নেতা-নেত্রী ওই সময় কোনো ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠানে অংশ নেননি।
বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এ বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনে দলীয় পরিচয় থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা এবং পাশাপাশি জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান নিয়েই তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছাত্রদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। এ নিয়ে আলাদা করে কোনো মন্তব্যের অবকাশ নেই।’

স্বপ্ন ৬: শিক্ষকদের সম্মেলনে দাবিদাওয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী মৌলিক ও প্রযুক্তি গবেষণার পাশাপাশি সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। চার দিনের সম্মেলনের শুরুতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিদ বলেন, সামাজিক ও মানবিক বিজ্ঞানের উন্নতি ছাড়া প্রযুক্তি গবেষণার অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি শিক্ষা ও উচ্চতর গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির আহ্বান জানান। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
শিক্ষকদের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষকেরা এ বছর প্রতি মাসের এক দিনের বেতন প্রদান করে একটি জাতীয় তহবিল গঠনের অঙ্গীকার করেন। ওই অর্থ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠাগার তৈরি ও গবেষণা খাতে ব্যয় করা হবে।
এদিকে, সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আমন্ত্রিত দেশের ব্যবসায়ীদের সংস্থা এফবিসিসিআইয়ের প্রধান ঘোষণা করেন, এফবিসিসিআই আগামী ১০ বছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর গবেষণার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা অনুদান দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় ইউনিয়নের নেতা, জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ধারক সংস্থা ইউজিসির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ তহবিল তৈরি করা হবে।
সম্মেলনের বিভিন্ন প্যানেলে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন দিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ে কয়েক হাজার শিক্ষক তাঁদের গবেষণা উপস্থাপন করবেন।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন