সংবিধান

স্বপ্নটা বাস্তব হতে পারত সহজেই

শাহ্দীন মালিক | তারিখ: ০৪-১১-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

বছর ৫০-৬০ আগের সংবিধানগুলো ছিল ভয়াবহ আইন। সংবিধানের শুরু যে দেশে, সে দেশে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রেও বলতে গেলে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সংবিধান ছিল একটা ভয়ংকর গোছের আইন। ভয়ংকরতা দেখাতে শুধু একটা ব্যাপারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেই চলবে। গত শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ব্যাখ্যায় ধরে নেওয়া হতো যে আপনার গায়ের রং সাদা না হলে আইনের চোখে আপনাকে সম্পূর্ণ মানুষ বলা যাবে না। চামড়ার রং-নির্বিশেষে সব মানুষই যে সমান, সেটা খোদ আমেরিকায় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে মাত্র বছর পঞ্চাশেক আগে।
সব দেশেই কম-বেশি একই অবস্থা ছিল। ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট থাকা সত্ত্বেও চামড়ার রং সাদা না হওয়ার কারণে ট্রেন থেকে ঘাড় ধরে মহাত্মা গান্ধীকে বের করে দেওয়ার ঘটনা আমরা অনেকেই জানি। মহাত্মা গান্ধীর পর গত শতাব্দীর শুরুতে বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকায় যে সংগ্রামের শুরু, তা শেষ হলো এই তো সেদিন নেলসন ম্যান্ডেলার সে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
আমরা যখন পাকিস্তান ছিলাম, তখন আমাদের অর্থাৎ পাকিস্তানি সংবিধানে ছিল, মুসলমান না হলে পাকিস্তান নামক দেশের রাষ্ট্রপতি আপনি হতে পারবেন না।
গায়ের চামড়ার রং, ধর্ম, গোত্র ইত্যকার সব উদ্ভট মাপকাঠিতে মানুষকে বিচার করার প্রায় তিন হাজার বছরের মানবজাতির লিখিত আইনের যে ইতিহাস, তা থেকে সম্পূর্ণভাবে সুস্পষ্টভাবে সরে এসে এখন যেসব মাপকাঠিকে আমরা মনুষ্যত্বের মাপকাঠি বলি, তার প্রথম দিককার বা সূচনালগ্নের পূর্ণ সংবিধান আমাদের বাংলাদেশের সংবিধান।
দূরে না গিয়ে আশপাশের দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা সহজেই দেখব, নেপালে এখন কোনো সংবিধান নেই। শ্রীলঙ্কার সংবিধানে রাষ্ট্রপতির যে ভীষণ ক্ষমতা, তাতে ভুটানের রাজাও লজ্জা পেতে পারেন। ভুটানে রাজতন্ত্র, অতএব সংবিধান নিয়ে মাথাব্যথা অত্যল্প। পাকিস্তানের সংবিধানে যাই থাকুক না কেন, দেশ তো আসলে চালায় সেনাবাহিনী, কট্টর মোল্লারা আর তাদের মার্কিন বন্ধুবান্ধব।
বাকি রইল ভারত। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র—এসব জিনিস তারা শিখেছে আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানের পর।
সংবিধানের মূলনীতি নিয়ে যে গণজাগরণ আর গণ-আন্দোলন হতে পারে, সেটা আমরাই বিশ্বকে দেখিয়েছি। সংবিধান রচনা করার জন্য দেশ স্বাধীন করব, এটাও আমরাই প্রথম দেখিয়েছি।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা এবং পরবর্তী সময়ে এই ছয় দফাভিত্তিক যে আন্দোলন, সেটা যে সংবিধানের মূলনীতির জন্য আন্দোলন, তা আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পদের বণ্টন, দেশ পরিচালনায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাপকাঠি অর্থাৎ ছয় দফার এই মূল কথাগুলো ছিল ভবিষ্যতের সংবিধানের রূপরেখা।
ষাটের দশকের শেষে পাকিস্তানে সংবিধান ছিল না। তাই ১৯৭০ সালে সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন, হয়তো প্রায় চার দশক পার হয়ে গেছে তাই। গুলিয়ে ফেলে মনে করেন যে ১৯৭০ সালে সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। সংসদ নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন হয়েছিল সংবিধান প্রণয়নের জন্য গণপরিষদের।
নির্বাচনের ফলাফল দেখে পাকিস্তানিদের টনক নড়ল। তাদের পাকিস্তান ও ছয় দফার ভিত্তিতে রচিতব্য সংবিধানের পাকিস্তান তো ভিন্ন দেশ হবে। সে জন্য ১৯৭১ সালের মার্চে গণপরিষদের প্রথম বৈঠক বাতিল করা হলো। এল ২৫ মার্চ।
এরপর ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত গণপরিষদের সদস্যরা তাঁদের ওপর জনগণ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব, অর্থাৎ সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করার জন্য দেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল এই, যেহেতু পাকিস্তান সরকার গণপরিষদের বৈঠক করতে দিচ্ছিল না এবং দেশময় নিষ্ঠুর বর্বরতা, গণহত্যা, লুট, ধর্ষণ করে পাকিস্তানের কাঠামোর আওতায় সংবিধান প্রণয়ন অসম্ভব করে ফেলেছিল; সেহেতু সংবিধান প্রণয়নের স্বার্থে দেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হলো।
সংবিধান প্রণয়নের জন্য জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত গণপরিষদের সদস্যরা একত্রে মিলিত হয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।
ছয় দফার সাংবিধানিক রাজনীতি ও আন্দোলন, গণপরিষদ, সংবিধানের জন্য স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ঘোষণাটা গণপরিষদ দ্বারা—এটাই আমাদের ইতিহাস।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেই গণপরিষদ আমাদের সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণ করে নিজেদের অর্থাৎ গণপরিষদকে বিলুপ্ত করে।
আমাদের এই যে বিশাল এবং বিশ্বে অদ্বিতীয় সাংবিধানিক ঐতিহ্য, তা আমরা নিজেরা প্রায়ই ভুলে যাই। ভুলে যাই বলেই হয়তো এখন সংবিধানে স্বাধীনতা তিনবার—৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ২৬ মার্চের ঘোষণা আর ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।
ইতিহাসের অদ্বিতীয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিয়ে সাংবিধানিকভাবে যে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, সে দেশেরই সংবিধানে স্বাধীনতা এখন তিনবার। অচিরে আরও একটা স্বাধীনতা ঘোষণা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গন্ডা পুরো হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
এখানেই স্বপ্ন, এখানেই স্খলন।
দু-একটা ছাড়া ১৯৭২ সালের সংবিধানে দোষ খুঁজে পাই না। সংবিধান হবে অল্প কথার, বড় দাগে বড় মাপের কিছু কথা থাকবে। বাকিটা সময়ের বিবর্তনে, প্রয়োজনের তাগিদে সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ হবে। যেমন ‘পরিবেশ’ শব্দটাই ছিল না সংবিধানে মাস তিনেক আগ পর্যন্ত। কিন্তু নেই বলে তো কোর্ট পরিবেশের পক্ষে রায় দিতে কোনো কুণ্ঠা বোধ করেনি।
সংবিধানের দোষ-ত্রুটির পাহাড় হয়েছে প্রায় প্রতিটি সংশোধনের কারণে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসংক্রান্ত প্রথম সংশোধনী ছাড়া এক অর্থে প্রতিটি সংশোধনীই স্বপ্নভঙ্গের দলিল।
এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল স্বপ্নের যে অপরিপূর্ণতা ছিল, তা প্রতিটি সংশোধনীতে একটু একটু করে পূর্ণ হবে। আস্তে আস্তে সংবিধানে অন্নের অধিকার নিশ্চিত হবে। তারপর আসবে বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার।
খাদ্যের দাম নাগালের বাইরে যাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যপণ্যে ধনীদের একচ্ছত্র অধিকার হয়ে গেছে। প্রায় ৪০ বছরে সংবিধান গরিব-দরিদ্র-শিক্ষা-স্বাস্থ্যহীন জনগোষ্ঠীকে কিছু দেয়নি। সেনাপতিদের দিয়েছে, বিচারপতিদের দিয়েছে, আমলাদের দিয়েছে, বড় ব্যবসায়ীদের দিয়েছে অঢেল, অকাতরে। আর রাজনীতিবিদেরা ব্যবসা করছেন অথবা ব্যবসায়ীরা রাজনীতি। সংবিধানে ছবি সেঁটেছেন, মহান আইনটাতে চোর-ডাকাতের ফৌজদারি আইনের মতো শাস্তিও ঢুকিয়েছেন।
স্খলন হয়েছে নেতাদের। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সংবিধানকে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে যদি পুরোপুরি ফিরে যাওয়া যেত, তাহলেই স্বপ্ন পূরণ হতো। ওই সংবিধানের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। দেশ স্বাধীন করে স্বাধীনতার গর্ব সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল ১৯৭২ সালের সংবিধান।
সংবিধানে জাতীয়তাবাদ ছিল, গণতন্ত্র ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতা আর সমাজতন্ত্র ছিল। ওই সব শব্দ এখন কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। তবে আসলটা পাইনি। প্রায় আসলের মতো, কিন্তু পেয়েছি নকলটা।
সংবিধানে যে গণতন্ত্র এবং দেশের নামে যে ‘গণপ্রজাতন্ত্র’, তার মানে নিশ্চয় এই নয় যে সাকল্যে তিনজন ব্যক্তি, তা যত মহান হোক না কেন, ৩০ বছর ধরে দেশের সর্বোচ্চ স্থানটি পর্যায়ক্রমে ধরে রাখবেন। একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার একটু সংস্করণ এখন সংবিধানে—ধর্ম আছে আর নামকাওয়াস্তে আছে ধর্মনিরপেক্ষতা। বড়লোকেরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরিবেরা আরও দরিদ্র, অথচ বলে সমাজতন্ত্র।
তবে বিশ্বাস ও আশা, স্খলনগুলো সাময়িক, কারণ জনগণ এখন স্খলন-সচেতন। ১৯৭২ সালের স্বপ্নের সংবিধান আবার ফিরে আসবে, আবার পাব। তারপর যে ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তা সহজেই শুধরে নেওয়া যাবে। সবাই মিলে নিশ্চিত করব, সংবিধানে থাকবে দেশের স্বপ্ন, দল বা ব্যক্তির নয়। আর আদর্শগুলো থাকবে খোলামেলা, ভোট ও ক্ষমতার লোভে কাটাছেঁড়ার সংবিধান নয়।
ভোট আর ক্ষমতার লোভে সংবিধান রচনা করলে ১৯৭২ সালের গণপরিষদ সংবিধান রচনা শেষে নিজেদের বিলুপ্ত করতে পারত না। তাদের প্রণীত সংবিধানটাই আমার স্বপ্নের সংবিধান।
ড. শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন