শিরোনাম:

প্রবাসীর চোখে

জাতিসংঘের নেতৃত্বের আসনে বাংলাদেশ

হাসান ফেরদৌস | তারিখ: ০৪-১১-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বসভায় একটি নিজস্ব কণ্ঠস্বর অর্জন করেছে মুখ্যত জাতিসংঘের শান

    সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বসভায় একটি নিজস্ব কণ্ঠস্বর অর্জন করেছে মুখ্যত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কার্যকর ভূমিকার জন্য

জাতিসংঘে বাংলাদেশের শুরুটা খুব ভালো হয়নি। এই আন্তর্জাতিক সংস্থার অধিকাংশ সদস্যই মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতর একটা রাজনৈতিক সমাধান হোক, গণহত্যা বন্ধ হোক, সে ব্যাপারে অবশ্য জাতিসংঘ—অর্থাৎ এই সংস্থার অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের অধিকাংশ দেশ—আন্তরিকভাবেই চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালির রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তারা কুটোটিও তুলে দেখেনি। সে কাজটি বাঙালি নিজেই সম্পন্ন করেছে। তারা কী চায়, সে কথা বোঝাতে সংগ্রামরত দেশটি জাতিসংঘে তার একজন প্রতিনিধি পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু দু-একটি বড় রাষ্ট্রের ভ্রুকুটির কারণে বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী নিউইয়র্ক পর্যন্ত এসেও নিরাপত্তা পরিষদে ভাষণ দিতে পারেননি।
স্বাধীনতা অর্জনের পরও আমাদের রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংহতি দেখাতে ব্যর্থ হয় জাতিসংঘ। পূর্ণ সদস্যপদ চেয়ে আমরা ব্যর্থ হই মুখ্যত এই সংগঠনের একটি বৃহৎ সদস্যের ‘না’-সূচক ভোটের কারণে। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয় সেই সদস্যপদের জন্য। কিন্তু একবার এই সংস্থায় নিজেদের ন্যায্য আসনটি গ্রহণের পর বাংলাদেশ বিশ্বসভায় সম্ভাব্য কার্যকর ভূমিকা পালনে পিছপা হয়নি।
কেউ কেউ জাতিসংঘকে নাট্যশালা বলে বর্ণনা করেছেন, যে নাট্যশালার একমাত্র নটবর তার সদস্যরা, অর্থাৎ বিশ্বের ১৯৩টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। একটি স্বল্পোন্নত জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে এই নাট্যশালায় নিজের জন্য কোনো নিজস্ব ভূমিকা চিহ্নিত করা সহজ নয়। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রেই পরনির্ভর। বড় ভাইয়েরা যা বলেন, আমাদের তা-ই শুনতে হয়। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক প্রশ্নে অবশ্য বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম, গ্রুপ অব ৭৭-এর সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে থাকে। ফলে একধরনের পূর্বনির্ধারিত সীমাবদ্ধতার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এগোতে হয়।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বসভায় নিজের জন্য একটি নিজস্ব কণ্ঠস্বর অর্জন করেছে মুখ্যত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে তার কার্যকর ভূমিকার জন্য। কিছুটা পরিহাসের মতো শোনালেও এ কথা সত্যি যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলেই বাংলাদেশ প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। পরিহাস বলছি এ কারণে যে শান্তিরক্ষা মিশনের একটা অলিখিত দায়িত্ব গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করা। নিজের ঘরে সেনাশাসন, দেশের বাইরে তারাই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ! ১৯৮৮-তে বাংলাদেশ ইরাক ও নামিবিয়ায় দুটি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়। এরপর গত ২০-২২ বছরে বাংলাদেশ ৩০টির মতো শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারি নেতৃত্ব প্রশংসিত হয়েছে। শুধু সেনাসদস্যরাই নন, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসিত হয়েছেন। গত বছর বাংলাদেশের নারী পুলিশের একটি দলও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে হাইতিতে গিয়েছে।
জাতিসংঘের বিগত মহাসচিব কফি আনান ও সংস্থার চলতি মহাসচিব বান কি মুন—উভয়েই বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার কথা নানা সময় উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘের নথিপত্রেও সে প্রশংসার নানা প্রমাণ রয়েছে। তাঁদের পেশাদারির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশকে একাধিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। মাত্র মাস দুয়েক আগে পশ্চিম সাহারার জন্য গঠিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল আবদুল হাফিজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই মুহূর্তে মোট ১৫টি শান্তিরক্ষা মিশনে প্রায় ৯৮ হাজার সেনা ও পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশেরই রয়েছে সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী—আট হাজার ৫৭৯ সেনাসদস্য ও দুই হাজার ৭৬ জন পুলিশ। ফলে এমন আশা করা খুব অনুচিত নয় যে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা দপ্তরের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ থেকেই কাউকে নিয়োগ দেওয়া উচিত।
জাতিসংঘের শান্তি রক্ষার কার্যক্রম ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই ছয় দশকের বেশি সময় শুধু শিল্পোন্নত দেশ থেকেই দপ্তরপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থের জোগান তারাই দিয়েছে, ভারী যন্ত্রপাতিও তাদের কাছ থেকে আসে। কিন্তু মাটিতে বৈরী পরিবেশে অস্ত্র হাতে সামাল দিয়েছে মূলত ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোই। এ জন্য ত্যাগও স্বীকার করতে হয়েছে তাদের। শুধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরই ১০৭ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
অতএব, শান্তিরক্ষা দপ্তরের প্রধান বাংলাদেশের না হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এ কেবল স্বপ্নের কথা নয়, বাস্তবসম্মত এক প্রস্তাবও বটে।
এর তুলনায় জাতিসংঘে সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি অনেক কম বাস্তবসম্মত একটি দাবি। বাংলা বিশ্বের পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। অতএব এই ভাষাকেও জাতিসংঘের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, এমন দাবি কেউ কেউ তুলেছেন। এ নিয়ে বাংলাদেশের আইন পরিষদে একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। অথচ এ দাবির পেছনে যতটা আবেগ কাজ করে, যুক্তি ততটা নয়। জাতিসংঘের সরকারি ভাষা মানে এই সংস্থার প্রতিটি নথিপত্র বাংলায় অনুবাদ হওয়া, সংস্থার প্রতিটি অঙ্গ পরিষদ—যেমন, ধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদ—তাতে প্রতিটি ভাষণের তাৎক্ষণিক সমান্তরাল অনুবাদ নিশ্চিত করা। প্রশ্ন হলো, সেই অনুবাদকৃত ভাষণ বা নথিপত্র কে পড়বে? বাঙালি ছাড়া অন্য কারও প্রয়োজনেই তো আসবে না নথিপত্র। এমনকি বাংলাদেশ বা বাঙালি কূটনীতিকেরা সে নথিতে খুব আগ্রহী হবেন, এমন সম্ভাবনাও কম। তাঁদের অধিকাংশই ইংরেজিতে লিখতে ও পড়তে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফলে এমন চেষ্টা কেবল পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছু নয়। এর জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সে কথা না-হয় না-ই তুললাম।
জাতিসংঘের উচ্চপদে বাঙালি আসীন হবে, এমন স্বপ্নও আমি পোষণ করি না। এই পদে দায়িত্ব পালন খুবই সম্মানজনক, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ফলে দেশের সুনাম খুব বর্ধিত হয়, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। উ থান্ট ১০ বছর এই দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু তার ফলে মিয়ানমারের মর্যাদা খুব বেড়েছে, সে কথা শুনিনি, অথবা মিয়ানমারের রাজনীতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন এসেছে, তা-ও কেউ বলবে না। আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের পদে এর আগে দুজন বাঙালি দায়িত্ব পালন করেছেন খুবই যোগ্যতা ও সুনামের সঙ্গে। তাঁদের একজন আনওয়ারুল করিম চৌধুরী—মহাসচিব হিসেবে তাঁকে নিয়ে জল্পনাকল্পনাও হয়েছিল। জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচিত হন ভৌগোলিক পর্যায়ক্রমের এক অলিখিত নিয়ম অনুসারে। সেই চক্রাবর্তেই এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন বান কি মুন। চাকা ঘুরে আবার এশিয়ার ডাক আসতে অর্ধশতক পেরিয়ে যাবে। অতএব, সেই স্বপ্ন দেখা আপাতত মুলতবি রইল।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক প্রধান ক্ষেত্র এই জাতিসংঘ। বহুপক্ষীয় বিষয় নিয়ে তার কায়কারবার হলেও অনেক সময় নানা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানেও এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই যুক্তিতে ভর করে কেউ কেউ ভেবে থাকেন, ভারত বা অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের যেসব জটিল দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে—যেমন, আন্তর্জাতিক নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যা, স্থল ও সমুদ্র সীমান্ত চিহ্নিতকরণ—তার সমাধানে এই সংস্থা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সমস্যা পুরোনো। সেখানেও সাহায্য করতে পারে জাতিসংঘ। তার চেয়েও বড় কথা, একাত্তরের গণহত্যার জন্য বিচারের যে দাবি বাঙালির, সে ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা সে গ্রহণ করতে পারে। যেমন ঘটেছে কম্বোডিয়া, বসনিয়া বা রুয়ান্ডায়। কিন্তু আমার সন্দেহবাদী মন সে প্রস্তাবে সায় দেয় না। জাতিসংঘে উত্থাপিত হলে এসব সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ সম্ভব, কিন্তু সেসব সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। দুটি সার্বভৌম দেশের দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধানের জন্য সবার আগে চাই উভয় রাষ্ট্রের সেসব সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একই কথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও। দেশের ভেতর এ প্রশ্নে রাজনৈতিক মতৈক্য চাই সবার আগে। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আগে দরকার এ দাবির পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের কূটনৈতিক উদ্যোগ। তেমন সমন্বিত উদ্যোগের আগে এই নিয়ে জাতিসংঘে ধরনা দিলে ঠিক কী লাভ হবে, তা খুব নিশ্চিত নয়।
জাতিসংঘে বাংলাদেশকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত স্বপ্ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষুদ্র ও আন্তর্জাতিকভাবে কম বিতর্কিত হওয়ায় নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ছোট-বড় অধিকাংশ দেশের কাছেই বাংলাদেশ অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। নামের আগে ইসলামি কথাটা লেখা না থাকলেও বাংলাদেশ মূলত ইসলামি দেশ হিসেবেই পরিচিত। ইসলামি, অথচ গণতান্ত্রিক। ইসলামি, অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারী। ইসলামি, অথচ ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসের বিরোধী। এই হিসাব মাথায় রাখলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে খুবই ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময়। চলতি সংঘাতময় বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে নৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ তাই মোটেই জটিল অথবা অসম্ভব কিছু নয়। আর সে নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত নাট্যমঞ্চ এই জাতিসংঘ। কিন্তু তার জন্য মানুষ তৈরির কাজটা করতে হবে দেশের ভেতরেই।
আমি অপেক্ষায় সেই দিনের, যেদিন এই আন্তর্জাতিক নাট্যমঞ্চে তার নৈতিক, শৌর্যে ও পেশাদারি শ্রেষ্ঠত্বে বাংলাদেশ তার যোগ্য আসনটি গ্রহণ করবে।
রচনায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন