আমার প্রিয় ঋতু

শীত

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ | তারিখ: ০৫-১১-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

    আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

উর্দু কবিতায় অনেক বলিষ্ঠ প্রেমের ছবি চোখে পড়ে, বিশেষ করে প্রেমিকার জল্লাদি নিষ্ঠুরতার। প্রেম গালিবের কবিতাতেও নিষ্ঠুর ও হূদয়বিদারক। কেবল প্রেম-নিগ্রহ নয়, উর্দু কবিতায় নিঃসঙ্গতা, নিঃস্ব দীর্ঘশ্বাস, গভীর জীবনোপলব্ধি বহু কিছুই পাঠক দেখতে পাবেন, শুধু পাবেন না একটা জিনিস: প্রকৃতি। প্রকৃতির সৌন্দর্য নেই উর্দু কবিতায়। একেবারে নেই তা নয়, কিন্তু তা খুব একটা স্পষ্ট ও সজীব নয়। সামান্য উঁকিঝুঁকি দিয়েই চলে যায়। রবীন্দ্রনাথের গানে যেভাবে আছে ‘আকাশে উড়িছে বকপাঁতি/ বেদনা আমার তারি সাথি...’ সেই প্রকৃতি সেখানে নেই। থাকবে কী করে, উত্তর ভারতের সেই খাঁ খাঁ আধা-মরুভূমির রাজ্যে কোথায় প্রকৃতি। ওদের কবিতায় গোলাপ, লালা বা চেমন মাঝেমধ্যে উঁকি দিলেও শীত আর গ্রীষ্মের বাইরে কোথায় ঋতু সেখানে?
কিন্তু আমাদের দেশ তা নয়, এ দেশ ঋতুর দেশ। পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে আমরাই হয়তো এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাগ্যবান। ঋতুগুলো নিঃশব্দে, পাতার ফুলের অস্ফুট রং-বদল ঘটিয়ে, প্রকৃতির চেহারাটাকে একটু একটু করে পাল্টে দিয়ে একটা আরেকটার মধ্যে কেবলই মিলিয়ে যাচ্ছে। একটা না যেতেই চলে আসছে আরেকটা। তাই বছরজুড়ে ঋতুবদলে নিগ্রহ আমাদের আর শেষ হয় না। বারো মাসের ছোট্ট একটা বছরে ছয়-ছয়টা ঋতু থাকলে তা না হয়ে উপায় কী? অনেকগুলো ঋতু আমাদের, কিন্তু এদের মধ্যে অনান্দনিক যেন কেউই নয়। সবাই তাদের অনবদ্য রূপের পসরা সাজিয়ে এক অলীক শোভাবাজার মেলে বসে আছে। সবাই সুন্দর; তবু আমি বলব, এদের মধ্যে বর্ষাই হয়তো সুন্দরতম, বৈভবে-গরিমায় সবকিছুতে। তবে যত অনবদ্যই হোক, ওই বর্ষার চেয়ে যা আরও অপরূপ তাহলো রবীন্দ্রনাথের গানে আর কবিতায় এই বর্ষার অনবদ্য রূপ। প্রকৃতির সঙ্গে মানবহূদয়ের স্বপ্ন-বেদনা-সৌন্দর্য-হাহাকার একসঙ্গে হয়ে এগুলোকে যেন প্রকৃতির চেয়েও সুন্দর করে তুলেছে। আমার অনেক সময়ই মনে হয়েছে, বাংলার প্রকৃতির বর্ষা আর রবীন্দ্রনাথের গানের বর্ষা—এ দুই মিলিয়েই বাঙালির কাছে বর্ষা হয়তো অমন অনুপম। রবীন্দ্রনাথের আগে বর্ষা হয়তো সত্যি সত্যি এমন অনিন্দ্য ছিল না। প্রকৃতি আর শিল্প মিলে বর্ষার যে অনবদ্য রূপকথা এ দেশে তৈরি হয়েছে, তা পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না জানি না।


বসন্তও সুন্দর আমাদের। সে আসে অল্প কয়েক দিনের জন্য। প্রমথ চৌধুরী ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, আমাদের বসন্ত যে এসেছে, তা ক্যালেন্ডারের পাতা না ওল্টালে বোঝা যায় না। তবু আমাদের বসন্ত সুন্দর। শীতের ঝরা পাতাদের মিলিয়ে যাওয়া অস্ফুট শব্দ, পাখির ঘাতক কলকণ্ঠ, ফুল ফোটার অগ্নিপ্রভ রূপ আর কোকিলের গান শোনার আনন্দ তো বসন্তেই মেলে। কোকিলের ডাকের মতো এমন রক্তঘাতী গান মানুষ বা প্রকৃতি-জগতে আর কোথায় আছে?
শীতের ভেতর থেকে খরযৌবনের জ্বালা নিয়ে বসন্তের আবির্ভাব। রবীন্দ্রনাথের গানের ‘বইল প্রাণে দখিন হাওয়া, আগুন জ্বালা’র মতো সে-ও যেন অনল-সঞ্চারী। অল্প দিনের জন্য এলেও দীর্ঘদিনের স্মৃতি জাগিয়ে সে বিদায় নেয়। বসন্ত যন্ত্রণার চিরসঙ্গী কোকিলের কথা আগেই বলেছি। কোকিলের ডাকের যে বর্ণনা বঙ্কিমচন্দ্র দিয়েছেন, তার চেয়ে বসন্ত-যন্ত্রণার নির্মম নিঃসঙ্গতার চিত্র বাংলা সাহিত্যে হয়তো আর নেই:
‘কোকিলের ডাক শুনিলে কতকগুলি বিশ্রী কথা মনে পড়ে। কী যেন হারাইয়াছি—যেন তাহা আর পাইব না। যেন কী নাই, কেন যেন নাই, কী যেন হইল না, কী যেন পাইব না। কোথায় যেন রত্ন হারাইয়াছি—কে যেন কাঁদিতে ডাকিতেছে।’
এই হচ্ছে বসন্ত আর তার নিগ্রহ-দূত কোকিল। সংস্কৃত কবিরা বসন্তকে ঋতুরাজ বলেছেন, আমরা বাঙালিরা বর্ষাকে। দীর্ঘস্থায়িত্বে, বর্ণাঢ্যতায়, বৈচিত্র্যে, সৌরভে, মেঘের থরথর রাজকীয়তায় এ সত্যিই তুলনাহীন।


আমার অনুভূতিতে তাই বর্ষাই বাংলার শ্রেষ্ঠ ঋতু। কিন্তু আশৈশব এ ঋতু আমার শরীরের শত্রু। কেবল বর্ষা নয়, গ্রীষ্মও। ঋতু দুটোর ভ্যাপসা গরম আর আর্দ্রতা আমাকে শারীরিকভাবে ভারাক্রান্ত আর আর্তনাদমুখর করে। ওই সময় আমি হয়ে পড়ি জরাগ্রস্ত আর স্থবির। নিরাপদ ভাবতে পারে না বলে মানুষ যেমন সাপের মতো অবিশ্বাস্যরকম সুন্দর একটি প্রাণীর সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারে না, আমিও তেমনি বর্ষার রাজকীয়তা আর বৈভব উপভোগ করতে পারি না। ছেলেবেলা থেকে তাই আমার প্রিয় ঋতু শীত। বাঙালির কাছে এ তার দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ঋতু—নিরাপদ, উপভোগ্য, উজ্জ্বল আর সোনালি। ছেলেবেলা থেকে আজ অবধি এই ঋতুটির অস্ফুট আগমনের প্রথম পায়ের শব্দটুকুও আমি যেন টের পেয়ে যাই। হঠাৎ নিজের অগোচরেই কোনো এক সন্ধ্যায় দেখি, শহরের লাইটপোস্টগুলোর চারপাশে হালকা কুয়াশার একটা বিষণ্ন আস্তরণ নিঃশব্দে ভিড় করতে শুরু করেছে। সেই কুয়াশাঘেরা রাতের লাইটপোস্টগুলোর দিকে তাকিয়ে জীবনের ভেতর কোথায় যেন একটা নিঃসঙ্গ বিমর্ষতা অনুভব করি।
আমার বাসার সামান্য দূরে আছে একটা ছয়তলা বাড়ি। তার ছাদের একেবারে মাথায় রয়েছে একটা নিঃসঙ্গ ছোট আকারের গাছ। চিকন দীর্ঘ ডাল আর ছোট ছোট সবুজ পাতায় ভরা গাছটাকে আমার খুবই নির্জন আর রহস্যময় লাগে। আমার সাততলার ফ্ল্যাটের জানালায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন গাছটাকে আমি দেখি, ওর দিকে তাকিয়ে আমাদের প্রকৃতি-জগতের পরিবর্তনটাকে টের পাই। বসন্তে দক্ষিণ থেকে চৈতী হাওয়া বইতে শুরু করলেই দেখি, বাতাসের ঝাপটার সঙ্গে সরু সরু ডালপালা নিয়ে গাছটা উত্তর দিকে ঝুঁকে আছে। বৈশাখে দখিনা হাওয়া উত্তাল হলে নাজুক গাছটা উত্তর দিকে আরও নুয়ে পড়ে একটা অর্ধনমিত পতাকার মতো সারা দিন উড়তে থাকে। বর্ষায় পুবের হাওয়া জোরালো হয়ে উঠলেও পশ্চিমে নুয়ে একইভাবে উড়ে চলে। হেমন্তে সব দিকের বাতাস থেমে গেলে, গন্তব্য বুঝতে না পেরে, ও সোজা হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুদিন। এর কিছুদিনের মধ্যেই উত্তর থেকে ঠান্ডা কনকনে শীতের হাওয়া বইতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছিলেন: ‘শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আম্লকির এই ডালে ডালে’—সেভাবে। ওর ছোট ছোট পাতার রাজ্যে তখন যেন অশরীরী মৃত্যুর কণ্ঠস্বর। ওর তখন ওড়া শুরু হয় দক্ষিণ দিকে হেলে। আমার স্বভাব কিন্তু গাছটার উল্টো। গ্রীষ্ম, বর্ষা যেমন আমাকে জরাগ্রস্ত করে, শীত তেমনি আমাকে করে তোলে প্রাণবন্ত। শীতের হাওয়া আমার হারিয়ে যাওয়া তারুণ্যকে যেন আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এ জন্য শীত আমার এত প্রিয়। শীতে আমার সারা অস্তিত্ব যেন জেগে ওঠে কথা কয়। নিজেকে মনে হয় হালকা, ফুরফুরে।


আমি তখন কলেজে পড়ি। কলেজের ভেতর থেকে যে রাস্তাটা শহরের দিকে এগিয়ে গেছে, তার দুই দিকে অসংখ্য গাছপালা, মাঠ। সেই রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা শীর্ণ স্রোতোস্বিনীর ওপরে একটা ছোট্ট কালভার্ট, তার ওপর একটা মাঝারি আকারের শিরীষগাছ সবুজ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তর থেকে শীতের বাতাস যখন প্রথম শিরশির করে বইতে শুরু করত, তখন শীতকে প্রতিটি প্রাণকোষে অনুভব করার জন্য আমি সেই কালভার্টের ওপর গিয়ে দাঁড়াতাম। আমার সামনে অনেক দূরে একটা অরণ্য, তারপর ফসলের মাঠ। হিমালয়ের বরফরাজ্য পেরিয়ে উড়ে আসা সেই শীতের হাওয়া আমার জামায়, আস্তিনে, শার্টের কলারে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুর অনুভূতির ভেতর আমাকে যেন জীবনের গান শোনাত। আমাদের ছেলেবেলায় শীত পড়ত এখনকার চেয়ে বেশি। শীতের ঠান্ডা হাওয়া তীক্ষ সুচের মতো শরীরে এসে বিঁধত। শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে সে শিহরিত অনুভূতিগুলো এখনো আমার ভেতরে বয়ে গেছে। আকাশজুড়ে ছুটে যাওয়া শীতের কঠিন লকলকে হাওয়ার দিকে তাকিয়ে শেক্সপিয়ারের কবিতার ‘Freeze, Freeze thou bitter sky’ লাইনটাতে আমি যেন সেই জমে যাওয়া বরফের মতো নির্দয় আকাশটাকে দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে উঠতাম। একবার উত্তরবঙ্গের একটা গান শুনেছিলাম। ভাওয়াইয়া গান। তাতে একখানে ছিল: ‘বইতোচে শিরশির হাওয়া’। আমি অনুভব করতাম সেই শিরশির হাওয়া যেন আমার স্নায়ু-শিরার ভেতর দিয়ে তিরতির করে ছুটে আমাকে একটা নির্মম শীতার্ত রাত্রিতে পরিণত করেছে। একেক সময় দিন দুই-তিনের জন্য হঠাৎ করেই দেখা দিত মেঘমাতাল অস্থির তীব্র হাওয়ার সঙ্গে মুখ ভার-করা বিমর্ষ দিন। আকাশজুড়ে শুরু হতো ছেঁড়া মেঘের ছোটাছুটি, তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে হালকা ছুঁচোলো ঠান্ডা বৃষ্টির ছাঁট। আমরা সুদূর বাংলাদেশে বসেও যেন ইউরোপীয় হেমন্তের বিবর্ণ ভুতুড়ে আবহ অনুভব করতাম।


আগেই বলেছি, আমাদের ছেলেবেলায় এ দেশের শীতের তীব্রতা ছিল এখনকার তুলনায় বেশি। তবে এখনকার শীতকালের কুয়াশার নিচে ঢাকা পড়ে দিনগুলোর মতো তখনকার শীতের দিন এমন গোমরা হয়ে থাকত না, ধূসর আকাশ বুকের ওপর এভাবে চেপে থাকত না। তখন শীতের দিন ছিল ঠান্ডা, মিষ্টি, রৌদ্রকরোজ্জ্বল আর আলোয় ভরা—মনে হতো, ক্যালিফোর্নিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার স্বচ্ছ নীল সোনাঝরা আকাশ নেমে এসেছে বাংলার প্রকৃতিতে।
সাপ যেমন শীত এলে গুটিয়ে যায়, আমি সে রকম গুটিয়ে যাই শীত চলে গেলে। আসলে আমি বেঁচে থাকি মাঝ-অক্টোবর থেকে মাঝ-এপ্রিল পর্যন্ত। বছরের বাকি ছয় মাস আমার হাইবারনেশনের—জীবন্মৃত অবস্থায় টিকে থাকার—সময়। এই যে এবার শীত নামতে শুরু করেছে, ছয়-সাত দিন আগেই তার অস্ফুট পায়ের শব্দ আমি টের পেয়ে গেছি। আমার মন আবার জীবনের আশায় ভরে উঠেছে। মনে হচ্ছে, আরও কয়েকটা সুন্দর দিন হয়তো জীবন আমাকে দিতে যাচ্ছে। শীত এলে আমি বেঁচে যাই। খোলস-ছাড়া তাজা সাপের মতো আমার ভেতরটা জেগে ওঠে।
গালিব লিখেছিলেন, ‘ভালোবাসায় জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’ আমার প্রায়ই মনে হয়, আমার মৃত্যু যেন হয় এমনি কোনো শীতের দিনে, এমনি সুন্দরতমভাবে বেঁচে থাকার কোনো এক অলীক মুহূর্তে।


আগেই বলেছি, বাংলার সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ঋতু বর্ষা; কিন্তু সবচেয়ে রূপসী ঋতু শীত। এর মতো এমন স্মৃতিকাতরতা আর কোনো ঋতুর নেই। স্বচ্ছ সুন্দর নীল আকাশ, ঠান্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া, সোনাঝরা মিষ্টি রোদ নিয়ে শীত আমাদের জীবনকে রমণীয় করে। আমাদের শীত নামে নগরে, শহরে, ছোট-বড় বন্দরে-বাজারে-গঞ্জে; কিন্তু সবুজ গ্রামবাংলার প্রকৃতিজুড়ে যে শীত নামে, তার চেয়ে রূপসী আর কেউ নয়। রবীন্দ্রনাথ পৌষের গানে লিখেছেন: ‘রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে।’ এ-ও যেন তেমনি সোনা-ছড়ানো। রূপের চঞ্চল পরিদের আমরা সচকিত পায়ে বাংলার মাঠে, পথে, গাছপালার নিভৃত জগতে এই সময় যেন হেঁটে বেড়াতে দেখি। এ সময় জীবন ভরে ওঠে নিরুদ্বেগ প্রসন্নতায়, শস্যের অপর্যাপ্ত সম্ভারে, শীর্ণতোয়া নদীরা চিকচিক করতে থাকে স্বচ্ছ রুপালি ধারায়, বকেরা ওড়াউড়ি করে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির ধারে অতিথি পাখিরা দীর্ঘদিনের জন্য ঘর বাঁধে। লর্ড মেকলে লিখেছিলেন, ‘বাংলার শীত ইংল্যান্ডের বসন্তের মতো’—কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়। এ হয়তো কেবল আমার নয়, হয়তো কোটি কোটি শীতপ্রেমিক বাঙালিরও মনের কথা।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন