আমার প্রিয় শহর

বোখারা

ফারুক চৌধুরী | তারিখ: ০৫-১১-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • ফারুক চৌধুরী

    ফারুক চৌধুরী

  • অপূর্ব বোখারা নগরে ছড়িয়ে আছে এ রকম অসংখ্য স্থাপত্য-নিদর্শন

    অপূর্ব বোখারা নগরে ছড়িয়ে আছে এ রকম অসংখ্য স্থাপত্য-নিদর্শন

  • ঘরোয়া পরিবেশে চায়ের আসরে এক উজবেক পরিবার

    ঘরোয়া পরিবেশে চায়ের আসরে এক উজবেক পরিবার

সারা জীবন পৃথিবীর নগরে-বন্দরে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ হয়েছে। প্রথমত, তা হয়েছে পেশাগত জীবনে কূটনীতিক ছিলাম বলে; দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ‘ব্র্যাক’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য; তৃতীয়ত, কম মাত্রায় হলেও প্রথম আলোর সাংবাদিকের দায়িত্বে। আর চতুর্থ কারণ হিসেবে তো বলতেই হয় ‘চোখ মেলে’, ‘কান পেতে’ আর ‘ধরার বুকে প্রাণ ঢেলে’ বিশ্বটিকে দেখার সাধে। একটি সময়ে ভ্রমণের সাধ আর সাধ্য দুই-ই ছিল, আর এখন জীবনের অষ্টম দশক যখন ছুঁইছুঁই করছি, ভ্রমণের সাধ কমেনি কিন্তু হ্রাস পেয়েছে স্বাস্থ্যগত সাধ্য। সেদিন যখন আমার ‘প্রিয় স্থান’ সম্বন্ধে কিছু লেখার অনুরোধ এল—দুরূহ সেই চয়ন—স্মৃতির পর্দায় আপনাতেই ভেসে উঠল উজবেকিস্তানের পঞ্চম বৃহত্তম শহর, ইতিহাস আর ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বোখারার প্রীতিদায়ক চিত্রটি; কম্পিউটারের পর্দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে, বোতাম টিপতেই ব্যবহারকারীর কাঙ্ক্ষিত চিত্র যেমনি পরস্ফুিট হয়।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে সমরখন্দ থেকে বোখারা, মোটরযোগে ঘণ্টা ছয়েকে পৌঁছেছিলাম। আমীর তৈমুরের সুবিশাল দৃষ্টিনন্দন সমাধি রয়েছে সমরখন্দে। সমরখন্দ শহরটির ঐতিহাসিক স্থাপনা, শ্যামলিমা আর সৌন্দর্য নিঃসন্দেহে মনকাড়া। তার তুলনায় প্রথম দৃষ্টিতে বোখারাকে আপেক্ষিকভাবে রিক্তই মনে হয়। কিন্তু মাত্র আড়াই লাখ মানুষ অধ্যুষিত শহরটির কেন্দ্রস্থলে পৌঁছাতেই আড়াই হাজার বছর পুরোনো এ শহরটির কুলীনত্ব চোখে পড়ে। অতুলনীয় ঐতিহ্যবাহী বোখারা। শতাব্দীর পর শতাব্দী, মানবমনের বিকাশের কেন্দ্রস্থল বোখারা।
এই শহরেই নবম শতাব্দীতে ছিল ইমাম বোখারির (৮১০-৮৭০) বাস। পবিত্র কোরআন আর হাদিসের ব্যাখ্যা প্রদানে ইসলামের ইতিহাসে ইমাম বোখারির জুড়ি মেলা ভার। এ শহরেই বাস করতেন ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭), চিকিৎসাশাস্ত্র যাঁর অবদানের জন্য চিরঋণী। এ শহরেই আল-বেরুনি তাঁর জীবনের (৯৭৩-১০৪৮) একটি মূল্যবান অংশ কাটিয়েছেন। মধ্যযুগীয় ইসলামিক বিশ্বের অন্যতম জ্ঞানী এই দার্শনিক, জ্যামিতিক ও ঐতিহাসিক সেই সময়কার ভারতবর্ষ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের একটি প্রধান উৎস। এই বোখারাতেই ছিল সুফি সাধক বাহাউদ্দিন নকসবন্দির বাস, যিনি চতুর্দশ শতাব্দীতে তাঁর আধ্যাত্মিকতার মাঝে সাধারণ মানুষের জন্য রেখে গেছেন তাঁর বাণী, ‘বিশ্বাসী হও, কিন্তু কর্মঠ থেকো।’ বলে গেছেন, ‘পরিমিত নিদ্রা, আহার আর বচন মানুষের অভ্যাস করা উচিত।’ তাঁর এ উপদেশ আজীবন লঙ্ঘন করার জন্য আমি এই সুফি সাধকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী!
বোখারায় আমাদের হোটেলটি আসলে শহরের কেন্দ্রস্থলে পাঁচ কামরাবিশিষ্ট একটি সুপরিচালিত সুসজ্জিত পান্থশালা। একদা ধনাঢ্য এক ইহুদি ব্যবসায়ীর বাসভবনটি বোখারার ঐতিহ্যবাহী দেয়াল অলংকৃত এবং তাতে রয়েছে সুরক্ষিত ‘অ্যান্টিক’ দ্রব্যাদি, যেমন কার্পেট, ফুলদানি এবং সিরামিকের দ্রব্যসহ বাসনপত্র, টাইল কর্ম ও অন্যান্য ধাতব হস্তশিল্প। পান্থশালাটিতে প্রবিষ্ট হতেই ঐতিহ্যবাহী বোখারার সঙ্গে একটি প্রাথমিক পরিচয় ঘটে যায়।
অদূরেই শহরের কেন্দ্রস্থল ‘লিয়াবে খাউজ’। যদি আরব বসন্তের মতো বর্তমানের স্বৈরাচারী উজবেকিস্তানে কোনো দিন গণজাগরণ ঘটে, উজবেক আর তাজিক সম্প্রদায় অধ্যুষিত এ কেন্দ্রটিই হবে বোখারার তাহরির স্কয়ার। আমাদের হোটেলের রাশিয়ান-উজবেক স্বত্বাধিকারী ‘সাশা’ ছিলেন উজবেকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের একজন খেলোয়াড়। নব্বইয়ের দশকে একটি বিমান দুর্ঘটনায় উজবেক জাতীয় ফুটবল দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ই নিহত হন। ভাগ্যগুণে ‘সাশা’ সেই বিমানযাত্রার প্রাক্কালে একটি খেলায় আহত হওয়ার কারণে ওই দলে ছিলেন না। ‘ভেবে দেখুন, তা না হলে বোখারায় এই স্বর্গ ছেড়ে কোন নরকে আমি থাকতাম।’ বললেন সুদর্শন, হাস্যরসপ্রিয় অতিথিপরায়ণ ‘সাশা’। বোখারা যে স্বর্গ, তা হোটেলটি থেকে বেরিয়ে পা ফেললেই বোঝা যায়।
আমাদের পান্থশালা থেকে শহরকেন্দ্রটি হেঁটে মিনিট দশেকের রাস্তা। সরু ইটগাঁথা শহরের অপ্রশস্ত সব গলি কিছুটা পুরান ঢাকার গলিগুলোর মতোই; তবে সুনির্মিত, ছিমছাম, পরিষ্কার আর জনবিরল পূর্বসূরি। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছড়িয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক সব স্থাপনা ও তার ধ্বংসাবশেষ। কেন্দ্রস্থলটি যেন উন্মুক্ত আকাশের নিচে সহস্রাব্দের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের একটি অভিনব জাদুঘর। হেঁটে দুই ঘণ্টার পরিভ্রমণ। ইতিহাস-বিজড়িত মধ্যযুগীয় পথ ধরে অতীতে ফিরে যাওয়ার মতো। আগ্রহ-উদ্দীপক, রোমাঞ্চকর, বিরল একটি অভিজ্ঞতা।
ধ্বংস আর সৃষ্টি, দুয়েরই নীরব সাক্ষী বোখারা। ধ্বংসপ্রিয় উন্মত্ত চেঙ্গিস খানের কুঠারের আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া নবম আর দশম শতাব্দীর সমাধিসৌধরাজি আজও দাঁড়িয়ে আছে আপন মহিমায়। তার কারণ হলো, চেঙ্গিস খানের আক্রমণের সময়ে শতাব্দী দুয়েকের ব্যবধানের কারণে ভাগ্যগুণে সমাধিস্থ ছিল এই সমাধিসৌধরাজি। চেঙ্গিস খান এই ভূগর্ভস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিক ভান্ডার সম্বন্ধে সম্ভবত অবহিত ছিলেন না। নইলে মাটি খুঁড়ে ভূগর্ভেই তিনি হয়তো তাঁর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতেন। আর অক্ষত রয়েছে ১১২৭ সনে নির্মিত, একদা একটি বৃহৎ জামে মসজিদসংলগ্ন, অলংকৃত ইটের তৈরি কানিয়ান। ‘কানিয়ান মিনার’ তার ১৫০ ফুট উচ্চতা আর ২৭ ফুট ব্যাসের সুনির্মিত বিশালতার নিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে। কথিত যে, গত নয় শতাব্দীতেও এ মিনারটির কোনো মেরামতের প্রয়োজন পড়েনি। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত নির্মাণশৈলীর অনেক অপূর্ব নিদর্শন বক্ষে ধারণ করে ইতিহাসের বিবর্তনের সব ঝড়ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার প্রিয় শহর বোখারা।
বোখারার আদিবাসিন্দাদের সম্পর্কে কিছু ধারণা নেওয়ার ইচ্ছা হলো। উজবেকিস্তান সফরে আমাদের দক্ষ সার্বক্ষণিক ‘গাইড’ খয়েরুল্লার পরামর্শে একটি দেয়াল পরিবেষ্টিত ঘরের সদর দরজার কড়া নাড়লাম। দরজা খুললেন উজবেক গৃহকর্তা। দেখলাম, বাড়ির উঠানে খাট আর বেঞ্চের ওপর বসে পরিবারের নারী-পুরুষেরা গল্প করছেন। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন সবাই আমাদের। চা পরিবেশিত হলো। খয়েরুল্লা ভালো দোভাষী। চমৎকার ইংরেজি বলেন। তাঁর সহায়তায় আমরাও চায়ের মগ হাতে আড্ডায় যোগ দিলাম—আমি, আমার স্ত্রী জিনাত আর বোন নাসিম। কিছুক্ষণ পর সেই বাড়ি থেকে বেরিয়েই খয়েরুল্লা বললেন, ‘ওই যে তরুণীটি আপনাদের বললেন তাঁর স্বামী তাসখন্দের একজন ব্যবসায়ী, আসলে তিনি একজন সদ্য বিধবা। আপনাদের তা বলেননি। কারণ, আপনাদের পর্যটনের আনন্দে তিনি দুঃখের কোনো ছায়া ফেলতে চাননি!’ তিনজন অচেনা পর্যটকের জন্য এই সূক্ষ্ম বিবেচনা ও অনুভূতি ছিল মর্মস্পর্শী।
জারাফসান নদীর ভাটিতে অবস্থিত বোখারা মধ্যযুগে, বিশেষ করে, ধর্মশিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, সংগীত, চিত্রকলা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ব্যবহারশাস্ত্রের (জুরিসপ্রুডেন্স) একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। পারস্যের কবি হাফিজ সমরখন্দ আর বোখারা নিয়ে একটি প্রেমের গজল লিখে ভয়ানক বিপদেই পড়েছিলেন ক্রুদ্ধ সম্রাট আমির তৈমুরের কাছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘সিরাজের সেই তুর্কি ললনার কপোলের তিলটির জন্যে আমি সমরখন্দ, আর প্রয়োজন হলে বোখারাও বিলিয়ে দিব।’ ক্রুদ্ধ সম্রাট বন্দী করে আনা হাফিজকে বললেন, ‘এমনই সুন্দরের উপাসক আপনি, আর এমনই আপনার অমিতব্যয়িতা যে আমার কষ্টে গড়া সমরখন্দ আর বোখারার মূল্য একজন নারীর কপোলের তিলের চাইতেও কম?’ উত্তরে উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন গজলসম্রাট হাফিজ, সমরখন্দ আর বোখারার অধিপতিকে বলেছিলেন, ‘জাঁহাপনা, আমার জীর্ণশীর্ণ বসনের দিকে তাকান। অমিতব্যয়ী না হলে কি আমি এই বেশে আপনার সামনে হাজির হতাম?’ তৈমুরের রাগ জল হয়ে গেল। হাফিজকে তিনি মুক্তি দিলেন।
বোখারার অনতিদূরে সুফি সাধক বাহাউদ্দিন নকসবন্দির মাজার দেখতে গিয়েছি। প্রতিদিন অন্যদের মাঝে নববিবাহিত দম্পতিদের এই মাজারে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করা একটি বিশ্বাসভিত্তিক ট্র্যাডিশনে পরিণত হয়েছে। মাজারের প্রাঙ্গণেই আমাদের ‘গাইড’ খয়েরুল্লাকে থামিয়ে বেশ কিছু সময় কথা বললেন দুজন শিরোধান পরিহিত শ্মশ্রুমণ্ডিত মধ্যবয়সী ব্যক্তি। খয়েরুল্লা বললেন, এই ব্যক্তি দুজন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে তিনি কেন দাড়ি রাখেননি, আর তিনি কি নিয়মিত নামাজ পড়েন? খয়েরুল্লা তাঁদের বলেছেন, অন্তরের ডাকেই তিনি ধর্মকর্ম করবেন, কারও জবরদস্তিতে নয়। বোখারা অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কথা তাৎক্ষণিকভাবেই মনে এল। নিকটতম প্রতিবেশী আফগানিস্তানে প্রায় ২৫ লাখ উজবেকের বাস। সেখান থেকে তালেবানি ঝড় একবিংশ শতাব্দীর বোখারায় আঘাত হানবে না তো? যদি হানেও, আকাশের প্রতি দৃষ্টি রেখে বোখারা আল্লামা ইকবালের ভাষায় বলতেই তো পারি,
‘হে আকাশ! ঝড়ে আমি ভীত নই
কতশত পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েই তো আমি বিদ্যমান!’

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন