ভৌতিক গল্প
স্বভাব যায় না মলে
-
অলংকরণ: মাসুক হেলাল
-
শেখ আবদুল হাকিম
-
গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে জঙ্গুলে জায়গায় ঘর তুলে নতুন বউ সালেকাকে নিয়ে বসবাস করছে মনজু মিয়া। এই একটাই মাত্র ভাই লতিফার, মাটি (পাহাড়) কাটা শ্রমিক। অনেক দিন পর দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরেই ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে সে, সঙ্গে সাত বছরের মেয়ে ফজিলা।
সালেকার পেটে বাচ্চা, ছয় মাস চলছে। তার জন্য ক্ষীর, পিঠা ছাড়াও আরও কী কী সব বানিয়ে এনেছে লতিফা; হাট থেকে কিনে এনেছে একটা ছাপা শাড়ি, দুই বোতল টক আচার আর মনজুর জন্য একটা লুঙ্গি। তিন-চারটে হাটে নারকেল কেনাবেচা করে তার স্বামী জমির আলি, তাতে তার ভালোই আয় হয়।
শিশুকালে মা মারা যাওয়ার পর মনজু মিয়াকে এই লতিফাই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। বোন বেড়াতে এলে খাতির-যত্ন করতে অস্থির হয়ে পড়ে সে। প্রায় সময়ই ঘরে তেমন কিছু থাকে না। ছিটকে বেরিয়ে পড়ে মনজু, লোকজনের হাতে-পায়ে ধরে ধারকর্জ করে যা পায়, তা দিয়েই কিছু কিনে এনে বোনের সামনে ধরে। আজও তা-ই ঘটল। ‘আমি আইতাছি রে বুবু,’ বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
ভাইকে চেনে লতিফা, কোথায় যাচ্ছে জানে, পেছন থেকে ডাকাডাকি শুরু করল, ‘এই মনজুইরা, যাবি না কইলাম, এদিক আয়, তুই!’
সাড়া না পেয়ে সালেকার দিকে তাকাল লতিফা। ‘দেহিস, আমি আর তোগো বাড়িত আমু না।’
সালেকা হেসে ফেলল। ‘ভাবি, এইডা আপনে পরতিবারই কন। কিন্তুক ভাইরে না দেইকা থাকতেও পারেন না।’
‘আগে দিয়া দুই মাস পরপর আইছি না? এইবার আইলাম ছয় মাস পর।’
কিন্তু মনজু সেই যে গেছে, তার আর ফেরার নাম নেই। এদিকে শীতের বিকেল, ঝপ করে চারদিকে অন্ধকার নেমে আসবে। সাড়ে তিন মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে, চিন্তা হচ্ছে লতিফার। দেড় মাইল উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পার হয়ে রেললাইনে উঠতে হয়; বাকি দুই মাইল সোজা, কিন্তু লাইনের দুই পাশে শুধু জঙ্গল, জনবসতি নেই, দিনের বেলাই আসা-যাওয়া করতে গা ছমছম করে। মেয়েকে নিয়ে ওই জায়গাটা অন্ধকারে পার হবে কীভাবে, ভাবতেই তার বুক শুকিয়ে আসছে। এদিকে ভাই না ফেরা পর্যন্ত পোয়াতি বউটাকে এই জঙ্গলের ভেতর একা ফেলে ফিরতেও পারছে না সে। বিশেষ করে, বুট পরা বজ্জাতটার অত্যাচারে এলাকার যুবতী মেয়ে-বউরা যখন ভয়ানক আতঙ্কের মধ্যে আছে।
মামা-মামির ছোট্ট নিকানো উঠানে দুই পা মেলে দিয়ে বসে আছে ফজিলা, বগলের তলায় কাপড়ের তৈরি নেতিয়ে পড়া একটা পুতুল। গাছপালার ভেতর দিয়ে শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ এসে লাগছে তার গায়ে। আলোকিত গাছপালার দিকে মুখ তুলে, যেন সম্মোহিত, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে। কেবিনের ভেতর থেকে মা আর মামির কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে।
‘বজ্জাত ব্যাডা বাবইরার খবর কিছু জানসনি?’ জানতে চাইল লতিফা। ‘আমগো ওহানে সাব্বির কাকার মাইয়াডারে ধইরা নেওনের তিন দিন পর রাস্তায় ফালায় দিয়া গেছে।’ গলা একেবারে খাদে নেমে যাওয়ায় মায়ের পরের কথাটা ফজিলা শুনতে পেল না। ‘রক্তে এক্কেরে ভাইস্যা গ্যাছে লো!’
কাম সারাক্ষণ মাথায় চড়ে থাকা এই নির্লজ্জ প্রাণীটির নাম বাবইরা ওরফে বাবর। জীবনে কখনো ফুটবল খেলেনি সে, অথচ ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে একদিন ফিরে এল হাফপ্যান্ট, রংচঙে জার্সি আর লোহার কাঁটা লাগানো বুট জুতা পরে। এ রকম কয়েক প্রস্থ পরিচ্ছদ জোগাড় করেছে সে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেগুলোই শুধু পরে—লুঙ্গি কিংবা ট্রাউজার একদম বাদ। সংযম আর লজ্জা চিরকালই কম ছিল, এরপর সেসব পুরোপুরি বিসর্জন দিল। সেয়ানা মেয়ে দেখলেই হলো, যেচে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করবে, দু-তিন মিনিটের মাথায় শহরে নিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখানোর প্রস্তাব দেবে, কিংবা দূরে কোথাও তার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার অন্যায় আবদার ধরবে। উত্তর হিসেবে ‘না’ শুনতে একদম রাজি নয় বাবর। হাত ধরে বসবে, আদুরে গলায় অনুরোধ করবে, তাতে কাজ না হলে টানাহেঁচড়া শুরু হবে, এমনকি রাজি না হওয়ার ফল ভালো হবে না বলে হুমকিও দেবে।
কাউকে যদি বিশেষ পছন্দ হয়ে যায় বাবরের, তার কপালে মহা খারাবি আছে। রাতের বেলা সেই মেয়ে বা বউয়ের বাড়ির আশপাশে লুকিয়ে থাকবে, শিস দিয়ে বা কোকিলের ডাক ডেকে চেষ্টা করবে তার দৃষ্টি আকর্ষণের। প্রতিপক্ষ যদি সাড়া দেয় তো দিল। কিন্তু তা না হলে এই হয়রানি চেহারা বদলে চলতেই থাকবে—ঢিল পড়বে টিনের চালে, একা পেলে আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে জড়িয়ে ধরবে। মেয়ে-বউরা যদি বাপ বা স্বামীকে জানিয়ে দেয়, তারা পড়শিদের নিয়ে ধাওয়া করে, বাবর তখনকার মতো ওখান থেকে সরে যায়।
তার সরে যাওয়ার ভঙ্গিটা অদ্ভুত। অলস পায়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটে। যারা তাকে ধরার জন্য ছুটে আসে, তারা কাছাকাছি এলে ঘুরে দাঁড়ায়, তারপর দেশলাই কিংবা টর্চ জ্বেলে নিজের মুখটা আলোকিত করে। ব্যস, তাতেই কাজ হয়, পিছু নেওয়া লোকগুলো হাতের লাঠিসোঁটা নামিয়ে নিয়ে গজগজ করতে করতে যে যার বাড়ির পথ ধরে।
এলাকার সবাই জানে, বাবর এমন এক পরিবারের সদস্য, যারা বংশপরম্পরায় ভাড়াটে খুনি হিসেবে কুখ্যাত। তার দাদা নাকি আটাত্তরটা খুন করেছিল। বাবা করেছিল একটা কম, সাতাত্তর। তবে বাবর এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ খুন করেনি। তা না করলেও, লোকজনকে ভয় দেখানোর সময় নিজের দুই ভাইয়ের রেকর্ড মুখস্থ বলে যায় সে: ‘বড়জন বারোজনরে জবো দিছে, মাইজাজন জবো দিছে আটজনরে।’
‘আমরা খুব ডরে ডরে আছি গো আফা,’ বলল সালেকা। ‘বাবইরা বজ্জাতডা বাড়ির আশপাশে পেরায় পরতিদিনই একবার ঘুরন দিয়া যাইতাছে।’
‘কও কী তুমি!’ ভয়ে আঁতকে উঠল লতিফা। ‘আশপাশে লোকজন আছে না? হেগো কও, সবতে মিইলা কুত্তাডারে ধাওয়া দেউক!’
ফজিলা দেখল, গাছগাছালির গায়ে রোদ মরে যাচ্ছে। ওর মাথায় কে যেন হাত বুলাল। ঘাড় ফেরাতেই মামাকে দেখতে পেয়ে হেসে উঠল সে। ‘কই গেছিলেন? মায় আপনারে দিব নে!’
ভাগনিকে নিয়ে ঘরে ঢুকল মনজু। লতিফা তার ভাইকে কিছুই বলল না, শুধু মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। মুড়ি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, চানাচুর আর সরষের তেল কিনে এনেছে মনজু। সালেকা চটপট পেঁয়াজ-মরিচ কেটে ঝালমুড়ি বানিয়ে ফেলল। মেঝেতে গোল হয়ে বসে খাচ্ছে সবাই ঠিকই, তবে সবার মধ্যেই একটা তাড়াহুড়ো ভাব। খাওয়ার ফাঁকে উঠে গিয়ে মনজু পুরোনো একটা হারিকেন ঘষেমেজে, তাতে নতুন সলতে আর তেল ভরে ফেলল।
‘বুবু, আমি তোমগো আগায়া দিমু হেই উপায় নাই। বাবইরা বজ্জাতডার নজর পড়ছে অর দিক। তুমরা বাড়ি ফিরনের আগেই আন্ধার অয়া যাইব। এই হারিকেনডা নিয়া যাও, আমি একসম গিয়া নিয়া আসুম নে।’
সালেকা বলল, ‘দু-তিন দিন অইল বজ্জাতডারে দেখতাছি না। যাও তুমি, হেগোরে রেললাইনে ওডায় দিয়া আহো। দরজায় খিল দিয়া থাহি আমি।’
জমির আলি মাথা নাড়ল।
লতিফাও বলল, ‘না, সালেকা, না! রাইতের বেলার তরে একা রাখন ঠিক না। ওই হুয়োরডারে বিশ্বাস নাই। সঙ্গে হারিকেন থাকলে ডর কি, আমরা ঠিকই যাইতে পারুম। ফজিলা, সোয়েডার খুলছস ক্যান? তাত্তাড়ি পইরা ল, মা। রোদ নাইমা গ্যালেই দেকবি নে কেমুন ঠান্ডা লাগে।’
‘দে, বাই, হ্যারাকিনডা দে। পোয়াতি বউ ফালায়া তোরে আর যাইতে অইব না, তর দুলাবাই দিয়া যাইবনে। আহি রে, সালেকা। জীবনেও হুনি নাই প্যাটে বাচ্চা এমুন দাপাদাপি করে। এইডা পোলা অইব।’
ফজিলার হাত ধরে বেরিয়ে পড়ল লতিফা। দরজার বাইরে এসে ওদের ফিরে যাওয়া দেখছে মনজু আর সালেকা। মা-বেটি পা চালিয়ে হাঁটছে, দেখতে দেখতে গাছপালার আড়ালে হারিয়ে গেল তারা।
সরু মেঠোপথ ছেড়ে চওড়া রাস্তায় উঠে এল লতিফা। এও কাঁচা, গত সপ্তায় ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পুরোটা নরম কাদা হয়ে আছে, ওদের গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে। পায়ের স্যান্ডেল এখন দুজনের হাতে। একে কাদা, তার ওপর রাস্তাটা ঢালু হয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে। ওরা আসলে পাহাড়ে উঠছে। পুরো দেড় পাক ঘুরে ওঠা, তারপর আধা পাক ঘুরে নামা। এ রকম একটা না, তিনটে পাহাড় টপকাতে হবে।
এক এক করে তিনটে পাহাড়ই পার হয়ে এল ওরা। সূর্য অনেক আগেই ডুবে গেছে। ঝপ করে পার হয়েছে গোধূলিবেলাও। এখন অন্ধকার রাত। তবে লতিফা খুব বেশি চিন্তা করছে না, রেললাইনের ওপর উঠে পড়েছে তারা।
এখন এখানে বসে একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। কিন্তু মেয়ে ফজিলা শান্ত হতে পারছে না। কী কারণে যেন অস্থির সে।
‘কী গো, মাগো?’ জিজ্ঞেস করল লতিফা। ‘ডরাওনি?’
‘নাহ্!’ গলায় জোর এনে জবাব দিল ফজিলা। ‘তুমি কিছু হুনবার পাও?’
‘অ হ হ! প্যাঁচা ডাহে রে মা। চিকা ডাহে।’
‘ওগুলান তো ডাহে দূরে। আর উইডা?’
লতিফা হাসে। ‘আরে, আমার মাইয়া অহনও কি বোকা। ওইডা তো শিয়াল ডাক পাড়ে!’
‘না গো মা। তুমি হুনো না। লও, জিরান লাগব না,’ বলে নিজে দাঁড়াল, মাকেও টেনে দাঁড় করাল। লাইনের ওপর দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল ওরা। আকাশে চাঁদ নেই। তারাগুলোও নিষ্প্রভ।
রেললাইনের দুই পাশে জঙ্গল, দূর কোনো গাছের ডাল থেকে পেঁচা সত্যি ডাকে, ডাকে আরও কত রকমের নিশাচর প্রাণী। মায়ের চেয়ে মেয়ে বেশি তাড়াহুড়ো করছে, পারলে ছুট দেয়, ফলে একটু পরই হাঁপাতে লাগল সে।
‘থাম লো ফজিলা, তর দম ফুরায় গেছে!’ ধমকের সুরে বলল লতিফা। ‘আইসাই তো গেছি, আর এক মাইল।’
ইচ্ছা না থাকলেও থামতে হলো ফজিলাকে। সত্যি অসম্ভব ক্লান্ত লাগছে তার। তা ছাড়া, কিছুক্ষণ হলো আওয়াজটা আর শুনতে পাচ্ছে না সে।
‘মা রে,’ খানিক পর মায়ের গায়ের ওপর সরে এসে ফিসফিস করে বলল ফজিলা, ‘চারিদিক এত অন্ধকার, আল্লায় আমগো দেহে তো?’
‘হ রে মা, সব সম দেহে।’
‘বিপদ অইলে বাঁচাইবনি?’
‘হ রে মা, সব সম...’ নিজেই হোঁচট খায় লতিফা, জবাব সম্পূর্ণ করতে পারে না। ‘হ্যারে ডাক দিতে অয়, মাগো। ডাকলে পর ঠিহি উনি সাহায্যি করবেন। তুই আমার লগে সুর কইরা একডা গান ধর দেহি। ভয়-ডর বেবাক পলাইব। আল্লা মাবুদ তুমিই ভরসা...’
মায়ের সঙ্গে গাইছে ফজিলা, ‘আল্লা মাবুদ তুমিই...মা, হুনতাছ?’
‘কী হুনুম? কী কস?’ লতিফার গলায় খানিকটা ধমক।
‘লাইনে আমরা একা না রে, মা। কেডা জানি আইতাছে।’
মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় চুমো খায় লতিফা। ‘তুই না, তর মনডাই এগুলান বানাইতাছে। ল, জিরান অইছে।’ মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল সে, তার অপর হাতে হারিকেন। ‘তর বাপে চিন্তা করতাছে।’
আবার ওরা হাঁটা ধরল।
খানিক পর আওয়াজটা আবার ছোট্ট শিশুকে অস্থির করে তুলল। এবার সেটা বেশ পরিষ্কার, অনেক কাছেও। শুনলেই চেনা যায়, ভারী বুটের আওয়াজ—তলায় কাঁটা লাগানো।
‘মা রে, মুই তো আবারও হুনতাছি!’
‘এই মাইয়া, চুপ!’ হারিকেনটা ঘুরিয়ে পেছন দিকে আলো ফেলার চেষ্টা করল লতিফা। ‘দেখছস, কিছুই নাই!’
মায়ের হাত আর কাপড়ের পুতুল আরও শক্ত করে চেপে ধরে ফজিলা। সেই পেঁচা কিংবা অন্য একটা পেঁচা ডেকেই চলেছে। খসখস আওয়াজ শুনে বোঝা যাচ্ছে, গাছের পাতাগুলো সারাক্ষণ দুলছে। বাতাসের আর যেন কোনো কাজ নেই।
‘হাওয়া ছাড়ছে, তাই এত আওয়াজ হুনতাছস,’ মেয়েকে বলল লতিফা। ‘গাবগাছ দুইডা পার অয়া আইছি, আর বেশি দূর না।’
মায়ের কথায় স্বস্তি বোধ করল ফজিলা, কিন্তু ওদের পেছনের অন্ধকার থেকে ভেসে আসা বুট পরা পায়ের আওয়াজ আরও জোরে শুনতে পাচ্ছে সে।
‘মা রে, হেয় তো কাছে আইসা পড়তাছে!’
আবার হারিকেনটা ঘোরাল লতিফা, বলল, ‘বালা কইরা দেখ্, বোকা মাইয়া! কই, কিছু দেখতাছস?’
গুন গুন করে গান ধরল মা, তার সঙ্গে মেয়েও শুরু করল, কিন্তু বুটের আওয়াজ কাছে চলে আসছে বুঝতে পেরে মেয়ের কণ্ঠস্বর কেঁপে যাচ্ছে। ওর মাথায় ঢুকছে না এত জোরালো আওয়াজ কী কারণে মা শুনতে পাচ্ছে না।
লতিফার গান ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সামনে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে, ওদের নিজেদের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। পাড়ার কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠায় অকস্মাৎ থেমে গেল লতিফার গান।
‘দ্যাখ মাইয়া, আমরা বাড়িত আইয়া পড়লাম। দুই দিন ভাত দেওনে কুত্তাটা ভাবছে আমরাই হের মালিক। দ্যাখ, আমাগোরে নিতে আইছে। আর ডর নাই!’
‘তুমি মা হুনো না ক্যা? এক্কেরে কাছে আইসা পড়ছে! আমার ভয় করতাছে গো! লও দৌড় পাড়ি!’
‘তুই যহন কইতাছস...’ মেয়েকে নিয়ে দৌড় দেয় লতিফা। ‘কিন্তু দেহিস ওইডা কিছু না...’
কুকুরটা ছুটে এল ওদের কাছে। লাইন থেকে আগেই নেমেছে ওরা। সরু মেঠোপথ ধরে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে তিনটে প্রাণী।
‘কেডা? ফজিলা নি? লতিফা নি?’
অন্ধকারে বাবার গলা শুনতে পেয়ে ফজিলার বুকটা আনন্দে ভরে উঠল।
‘হ গো, আমরা। মাইয়া ডরাইছে, দৌড়াইয়া আইতে হাঁপাইয়া সারা।’
দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে মেয়েকে বুকে তুলে নিল বাবা জমির আলি। ঘরের সামনে নামিয়ে পায়ের কাদা ধুয়ে দিল।
সত্যি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মেয়ে। ঘরে ঢুকেই গামছায় পা মুছে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে, একটু পর ঘুমিয়েও পড়ল।
‘মেয়েডা না খায়া ঘুমায়া পড়ল ক্যান?’ জিজ্ঞেস করল জমির আলি। ‘মিষ্টিও তো খাইল না।’
‘ঘুমাইতে দাও,’ বলল মা। ‘খুবই ডরাইছে। কিয়ের মিষ্টি গো?’
‘আগে কও মাইয়া ডরাইছে ক্যান। কী অইছে?’
‘হুনো, লাইনের ওপরে বুট জুতার আওয়াজ হে একা না, আমিও পাইছি,’ বলল লতিফা। ‘আমি চাই নাই ফজিলা ভয় পাউক। আল্লার নামে গান গাইছি, হারিকেনডা দুলাইছি, মাইয়ারে মিছামিছি কইছি, ভয় পাওনের কিছু নাই। কিন্তু, হুনো, আমরা লাইন থিইক্কা নামানোর ঠিক আগে দিয়া, শ্যাষ একবার আলোডা ঘুরাইলাম। তহনই পেরথম দ্যাখলাম আমগো পিছ নিয়ে কেডা আইতাছে।’
‘কেডা?’ রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল ফজিলার বাবা।
‘কেডা আবার, ওই বজ্জাত ব্যাডা বাবইরা, কিন্তু হের মা...’
গলা ছেড়ে হেসে উঠল জমির আলি। তার হাসিতে বেজায় আনন্দ, সহজে থামতেই চায় না। থামার পর সে বলল, ‘তোমরা বাড়িত থন যাওনের পর এলাকার হক্কলে মিইলা আমরা মিষ্টি খাইছি। ক্যান জানো? বজ্জাত বাবইরা মইরা গেছে হুইনা। হ্যারে তুমি ক্যামনে দেখবা?’
‘বাবইরা মইরা গেছে!’ ভ্যাবাচেকা খেয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকল লতিফা।
‘হ। কেডা কে জানে জবো করছে তারে। জবো কইরা মাথাটা নিয়া গেছে। নদীর ধারে হুদা হের ধড়টা পইড়া আছে।’
লতিফাকে শুধু চিন্তিত নয়, রীতিমতো সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে, বলল, ‘ও আল্লা রে আল্লা, আমি তাইলে ঠিকই দ্যাখছি! হের তো আসলেও মাতা নাই!’
বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে







riad
২০১১.১১.০৬ ১৩:২৯riad
২০১১.১১.০৬ ১৩:২৯