আমার প্রিয় নায়ক
উত্তম কুমার
-
উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন
-
রফিকুন নবী
কবে থেকে সিনেমা দেখতে শুরু করেছিলাম, তার দিন-তারিখ কিংবা সন আজ আর মনে নেই। তবে খুব ছোটবেলা রাজশাহীতে থাকাকালে মা আর মামির কোলে বসেই সিনেমা দেখতে যেতাম। রাজশাহীর নামকরা সিনেমা হল ‘কল্পনা’ আর ‘অলকা’ ছিল তখন সিনেমা দেখার জায়গা। আর বিনোদনের মাধ্যম বলতে তখন কেবল ওই সিনেমা। এটা চল্লিশের দশকের কথা। এই দেশে তখন সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে একটু একটু করে দাঁড়াচ্ছে। মায়ের মুখ থেকে শুনেছি, নায়িকা দেখলেই আমি মা মা বলে চিৎকার করে উঠতাম। আর বাংলা সিনেমার নায়িকা বললেই প্রথম সারিতে চলে আসতেন কানন দেবী কিংবা যমুনা। তবে নায়িকাদের নিয়ে ভাবনা বদলাতে থাকে যখন সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। তখন নায়িকার কথা মনে এলেই রোমান্টিক ভাবনার উদয় হতো। তবে সিনেমার প্রতি বাঁধভাঙা ঝোঁকটা আসে ১৯৫২ সালের দিকে, যখন আমাদের ঢাকায় বসবাসের গোড়াপত্তন হয়। তখন বাবার সঙ্গেই সিনেমা হলে যেতাম। পারিবারিক পরিমণ্ডলেই সিনেমা দেখা হতো। বাংলা সিনেমার বাইরে প্রচুর হিন্দি সিনেমা দেখতাম সবাই মিলে। বাংলা সিনেমা মানে, দুই বাংলার সিনেমা তখন একসঙ্গেই হতো। অসিতবরণ, উত্তমকুমার তখন পছন্দের, আমাদের সবার পছন্দের শীর্ষে। আর তাঁকে পছন্দের কারণও ছিল। সিনেমা মানেই তখন এই দুজন। তাই নায়ক না বলে বরং প্রিয় অভিনেতা বলাই ভালো। উত্তমকুমার আর অসিতবরণের পাশাপাশি প্রিয় অভিনেতার তালিকাটাও ছিল বেশ দীর্ঘ। উত্তম-অসিতের পরই প্রিয় তালিকায় চলে আসে ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল কিংবা বিকাশ রায়ের কথা। তবে শুধু যদি নায়ক বলি, তাহলে উত্তমকুমার আসে সবার আগে। সত্যজিতের নায়ক সিনেমার উত্তমই আসলে নায়ক হিসেবে সেরা। ওই ছবি দেখলে মনে হয়, সত্যজিৎ যেন উত্তমকুমারকে চিন্তা করেই কাহিনিটি তৈরি করেছিলেন। আর এখন, এ সময়ের নায়ক মানেই তো ভারী পেশি, পাকানো দেহসৌষ্ঠব—নায়ক বললে লোকে এখন এমন ধারণাই করে, যে নায়ক একাই একাধারে অনেক লোককে মেরে শায়েস্তা করতে পারে। নায়ক নিয়ে এমন ধারণা তখন ছিল না।
একটা সময় গল্পভিত্তিক সিনেমার চল ছিল। সিনেমাটা যেন সরব হয়ে উঠত গল্পের আদলেই। আর এ-কালের নায়কের পৌরুষ উদ্দীপনার পরিবর্তে সেকালে দেখানো হতো করুণ পরিণতি। যেমন, আনন্দ আশ্রম-এর কথাই ধরা যাক। এখানে উত্তম নায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করল। তার যৌবনভরা সময়টা এখানে মুখ্য নয়, বরং দেখানো হয়েছে তার জীবনের দুঃখ আর সংগ্রামমুখর সময়। জীবনের করুণ পরিণতি এবং সিনেমার অন্তিমে এসে পরবর্তী প্রজন্মের একটা সুবিন্যস্ত জীবন, এখানেই শেষ। কিংবা ধরা যাক, শিল্পী সিনেমার কথাই। যেহেতু নিজে ছবি আঁকি, তাই মনের মাঝে দাগ কেটে আছে সিনেমাটা। উত্তমের পুরোটা জীবনের দুঃখ, বেদনা, দারিদ্র্যভরা জীবনের আখ্যান রয়েছে এখানে। আবার সাড়ে ৭৪ উত্তমের অভিনয় অসাধারণ।
নায়ক কিন্তু আবার অভিনয়ের কথা বললে খুব বেশি মনে পড়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। অপুর সংসার কিংবা পথের পাঁচালী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ছাড়া যেন চিত্রনাট্য পূর্ণতা পেত না।
তবে কি দুঃখে ভরা কাহিনিই আমার বেশি পছন্দ? নাহ, তেমনটা নয়, তবে এখনকার মতো মারামারি আর নাচ-গাননির্ভর সিনেমার পরিবর্তে নিশ্চয়ই জীবনঘনিষ্ঠ করুণ রসের সিনেমা ভালো ছিল। যেখানে একজন কিংবা একাধিক অভিনেতা পুরোপুরি একটা কাহিনিকে নিয়ন্ত্রণ করত।
ইংরেজি সিনেমা ষাট এবং সত্তরের দশকে বাংলাদেশে অনেক বড় একটা জায়গা করে নিয়েছে। এখনো সময় পেলে ইংরেজি সিনেমা দেখি। তবে সব সময়ের জন্য গ্যারি কুপারের সিনেমা সেরা। একজন নায়কের ইমেজ কেমন হতে পারে, তা গ্যারি কুপারের সিনেমা দেখলে বোঝা যায়। ভালো লাগত সিডনি পয়েটারের অভিনয়ও।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






