একজন ভালো ছেলে

আনিসুল হক | তারিখ: ০৫-১১-২০১১

  • ১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
আনিসুল হক

আনিসুল হক

আমার প্রথম টেলিভিশন নাটক লেখার গল্পটা আপনাদের বলি।
মেরিনা বলল, তুমি টেলিভিশন নাটক লিখতে পারবা? আমি বললাম, কেন পারব না।
লেখো তো।
১৯৯৪-৯৫ সালের কথা। আমাদের তখন নতুন সংসার। আমি স্ত্রীবাধ্য গৃহপালিত ছেলে।
সন্ধ্যা ছয়টায় বসলাম। রাত ১২টায় একটা নাটক লেখা হয়ে গেল। নাটকের নাম একজন ভালো ছেলে।
নাটক লেখা সহজ। হাতে কাগজ-কলম থাকলেই লেখা যায়। নাটক চিত্রায়িত হওয়া ও অন এয়ার করা খুবই কঠিন। কত কঠিন, তা আমার জানা ছিল না।
আমি তখন ভোরের কাগজ-এর সহকারী সম্পাদক। নিয়মিত কলাম লিখি। আসাদুজ্জামান নূর ভোরের কাগজ-এ বেড়াতে এলেন। নীলফামারীর মানুষ। আমি তাঁর হাতে নাটকটার পাণ্ডুলিপি দিলাম। যদি কোনো হিল্লে হয়।
রিয়াজ উদ্দীন বাদশা আর আমি কিছুদিন একই বাড়ির দুই ফ্ল্যাটে পাশাপাশি বসবাস করতাম ভাড়াটে হিসেবে। সেই সূত্রে তাঁকে একটা কপি দিলাম। যদি কোনো গতি হয়।
আফজাল হোসেন আমার লেখা কলাম খুব পছন্দ করেন। তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ‘আনিস, আপনি গল্প লিখুন। উপন্যাস লিখুন। নাটক লিখুন। আপনার হবে।’ তিনি আমার কাছে নাটকের পাণ্ডুলিপি চাইলেন। আমি একজন ভালো ছেলের পাণ্ডুলিপি তাঁকে দিলাম।
কিন্তু নাটক আর হয় না। কেউ শুটিং করে না। তখন বিটিভির আমল। এ ছাড়া আর কোনো টেলিভিশন কেন্দ্র বাংলাদেশে নাই।
এর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক খ ম হারুণ আমার কলাম পড়ে আমার কাছ থেকে নাটকের পাণ্ডুলিপি চাইলেন। আমি তাঁকে দুটো নাটক লিখে দিই, আগামীকালের রূপকথা আর অবাক বইপাঠ। দুটোই নাটক হয়। আফজাল হোসেন আমার কাছ থেকে পারাপার নামের একটা নাটকের পাণ্ডুলিপি নেন। ওই সময়ে আমাকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন সেই নাটকের পাণ্ডুলিপির জন্য। কিন্তু নাটক আর নির্মিত হয়নি।
এরপর সাইদুল আনাম টুটুল আমার কাছ থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য পাণ্ডুলিপি চান। আমি তাঁকে লিখে দিই নাল পিরান। নাল পিরান তিনি অনেক যত্ন করে নির্মাণ করেন রংপুরে গিয়ে। এটা একুশে টিভিতে প্রচারিত হলে প্রশংসিত হয়।
একুশে টিভির অনুষ্ঠান প্রধান নওয়াজীশ আলী খান আমাকে ফোন করে বলেন, একুশে টিভির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জন্য আমি কি একটা নাটক লিখে দেব? আমি তাঁকে তখন আমার জীবনের প্রথম লেখা নাটক একজন ভালো ছেলে পাঠিয়ে দিই।
নাটকটা পরিচালনা করবেন আহীর আলম। আমাকে সম্মানীর চেক দিয়ে দেওয়া হয়। কথা ছিল, ২০০১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নাটকটার শুটিং হবে। ১১ সেপ্টেম্বর যেদিন আমেরিকায় টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়, সেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহীর আলম মারা যান। আমার সেই নাটকের শুটিং আবার পিছিয়ে যায়। অবশেষে জোবায়ের বাবুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ‘আলো-অন্ধকারে যাই’ নাম দিয়ে নাটকটি নির্মাণ করেন।
আমার প্রথম লেখা নাটকটি লিখিত হওয়ার সাত বছর পরে নির্মিত ও প্রচারিত হয়।
আজকে যাঁরা প্রথম নাটক লিখছেন, তাঁদের বলি, ধৈর্য ধরতে জানতে হবে। লেখা সহজ, প্রচার করা কঠিন। স্যামুয়েল বেকেটের প্রথম বইটি প্রকাশকেরা ৪২ বার প্রত্যাখ্যান করেছিল প্রকাশ করতে।
স্যামুয়েল বেকেট একদিন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেটা তাঁর সাহিত্যকীর্তির জন্য, কিন্তু ধৈর্য ধরার জন্য কোনো নোবেল থাকলে সেটাও তিনি পেতে পারতেন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন (মিঠু)

মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন (মিঠু)

২০১১.১১.০৬ ১০:৪৫
ধন্যবাদ দাদা, অভিজ্ঞতা সেয়ার করার জন্য। যা নতুনদের কাজে লাগবে.......