এখানেও আমার শিকড় আছে, কীভাবে সব ছেড়ে যাই?
ক্যাথরিন মাসুদ।
ছবি: কবির হোসেন
চলচ্চিত্রনির্মাতা
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ
আপনার জীবনের দীর্ঘ একটা অংশ বাংলাদেশে কাটছে, জীবনের এই সফরের অনেক সফলতা ও বিপর্যয়ও রয়েছে। এখন এসে এই জীবনযাত্রাকে কীভাবে দেখেন?
সবই তো কাকতালীয়। যখন প্রথম বাংলাদেশে আসি, তখন তারেক মাসুদের সঙ্গে তো পরিচয় দূরের কথা, বাংলাদেশ সম্পর্কেই তেমন কিছু আমার জানা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে পরিকল্পনা ছিল, অর্থনীতি বা সমাজতত্ত্ব নিয়ে পিএইচডি করব। আমার পরিবারের সবাই অধ্যাপনা করে, আমিও হয়তো সেটাই করতাম। আমার অধ্যাপক বাইরের কোনো দেশে গিয়ে কাজ করার পরমার্শ দিলেন। পাঁচ মিনিটেই আমার কাগজপত্র দেখে বললেন, আমার মনে হয় বাংলাদেশই চমৎকার হবে। তরুণ বয়সে বড় চাকরি, বড় বেতনের প্রতি আকর্ষণ ছিল না আমার। আমাদের স্বপ্নটা ছিল যে দুনিয়া দেখব। সংকল্প ছিল বড় কিছু করার। এভাবেই এখানে এলাম। আসার এক বছর পর তারেকের সঙ্গে দেখা হয়, এই ঢাকাতেই।
আপনার পূর্বপুরুষ প্রাচীন ইনকা সভ্যতার কেন্দ্র মাচু পিচ্চুর আবিষ্কারক। আবার এখানে আপনার ঝোঁকও সেদিকেই গেল।
আমি আসলে উন্নয়নের নামে যে কাজ হয়, এনজিও ইত্যাদি, এদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিতেই দেখতাম। এখানে যাঁরা বিদেশি ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে মেশার তেমন আগ্রহই পেতাম না। বরং আহমদ ছফার মতো মানুষের সঙ্গেই বেশি মিশতে চাইতাম। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি আমার ওপর প্রভাব ফেলেছেন। এটা আমার জন্য একটা সুযোগ ছিল, তাই না? ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কথা হতো। ওই বয়সটা তো স্পঞ্জের মতো, সবকিছু শুষে নেয়। এভাবে মানুষের সঙ্গে মিশেই বাংলাদেশকে চিনতে চাইছিলাম, বই পড়ে নয়।
আপনার ও তারেক মাসুদের দেখা হওয়া ঐতিহাসিক কাকতাল। কখন বুঝতে পারলেন যে আপনাদের পথ এক হয়ে গেছে?
এ দেশে আসার পর আহমদ ছফার মাধ্যমে শিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে পরিচয় হলো। এই ঘরানাতেই আমি ঢুকেছিলাম। তারেকের সঙ্গে পরিচয়ও সেখানেই। শুনতে পেয়েছিলাম, শিল্পী এস এম সুলতানের ওপর একজন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছে। আগ্রহী হলাম। কারণ, সুলতানের কাজ দ্বারা আমি খুবই অনুপ্রাণিত ছিলাম। সেই সূত্রেই তারেকের সঙ্গে দেখা। সে কী কাজ করছে তা নিয়ে কথা হলো। তখনই সে বলল, ছবিটার ইংরেজি সংস্করণের ধারাভাষ্য তৈরিতে আমার সাহায্য লাগবে—পরে যেটা চলচ্চিত্রকার আলমগীর পাঠ করেছিলেন। এমনিভাবে একটা মানুষের সঙ্গে অনেক কিছু ভাগাভাগি হয়ে যায়। কথা শুরু হলে তো আর থামে না। আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু করতে পারি, এই অনুভূতি দুজনের মনে একসঙ্গেই জেগেছিল।
ওই সময় বাংলাদেশের লেখক-শিল্পী-চলচ্চিত্রকার মহলের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। তারেকের সঙ্গে পরিচয়ের সময়টায় লেখক শিবিরের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারেকের সঙ্গে ওখানে ঘুরে আসতাম। সেটা ছিল ১৯৮৬-৮৭ সাল। আমি তখন মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের এনজিও নিয়ে গবেষণা করছিলাম, সেই সূত্রেই আনু মুহাম্মদের সঙ্গে পরিচয়। বামপন্থীদের সঙ্গেই যোগাযোগ বেশি ছিল।
সেই সময়ের তারেক মাসুদ আর পরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করা তারেক মাসুদের বিকাশ কি একই ধারায় এগোচ্ছিল?
আত্মপরিচয় খুঁজে বের করার একটা উদ্দেশ্য ছিল তারেকের, যে দেশটাকে কীভাবে তুলে ধরব? তারেক শেকড়সন্ধানী ছিল, বিশ্বাস করত লোকসংগীত ও গ্রামের সংস্কৃতির মধ্যেই সেই শেকড় বেশি প্রোথিত। সে কারণেই শহুরে, সংকীর্ণ রাজনীতি থেকে সে দৃষ্টি সরিয়েছিল। বৃহত্তর মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির মধ্যেই সে তার উদ্দেশ্যকে খুঁজত। বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটা মানুষ হয়ে গিয়েছিল তারেক।
মার্কিন নাগরিক হয়ে আরেকটা দেশের আরেকটা সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকছেন, তাতে করে আপনার পরিচয়ও বদলে যাচ্ছে। এই নতুন পরিচয়কে কীভাবে অনুভব করেন?
আমি তো এখানকার বা সেখানকার নই, তাই না? অনেকে বলবে আমি বাঙালি হয়ে গেছি। কিন্তু আমি তো এই জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে মানুষ হতে চেয়েছিলাম। সবকিছুর মধ্য দিয়েই তো একটা মানুষ মানুষ হয়। দেশে বা সংস্কৃতির মধ্যে যেমন আমাদের আত্মপরিচয় আছে, তেমনি অনেক সর্বজনীন বিষয়ও তো আমাদের মধ্যে আছে। সংস্কৃতির যত গভীরে যাই, তত গভীরভাবে আমরা দেখতে পাই যে আমরা সবাই এক। ভিন্ন ভাষায় বা সুরে কথা বললে বা গান করলেও মানুষ হিসেবে আমাদের স্বপ্নটা তো এক। এখানকার এই স্বপ্ন, ভঙ্গি, ভাবনাকে আমি নিজের হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি।
দীর্ঘদিন এখানে থাকার পর, এখানকার মানুষেরাই তো আপনার নিকটজন, এসব থেকে কি কোনো পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটাই বেশি?
সব স্বপ্নই তো ভেঙে গেল। এত বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছিলাম, এখন একজন তো চলে গেল। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে আমার আরও সময় লাগবে। আমাদের আগের স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি, সেই অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করাই এখন আমার প্রধান বিবেচনা। আসলে আমাকে তো আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তাই না? এত বড় ধাক্কা। আমি তো এখনো থিতু হইনি, আমাদের মণিপুরিপাড়ার বাসাটাতে এখনো ফিরতে পারিনি। তবে, কাজের মধ্য দিয়ে একধরনের শক্তি পাচ্ছি। তারেক যা বাস্তবায়িত দেখতে চাইত, সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে, এগুলো একধরনের শান্তি। পরে, কখনো যদি শান্তি পাই, সময় পাই, তখন বই লিখতে চাই। এসবের পর আমি বড় কাজ নিয়ে ভাবতে চাই, যেমন তারেকের ছবি কাগজের ফুল ইত্যাদি। অনেকে বলেন, আপনি নিজ দেশে চলে গেলেন না কেন? আমি বলি, বাংলাদেশে আমি এত দিন আছি, ছাড়তে পারছি না তো, এত সহজ নাকি? একটা অদৃশ্য শেকড়। সারা পৃথিবীতেই আমার শেকড়। এখানেও আমার শেকড় আছে। আমার পরিণত বয়সের বেশ বড় একটা সময় আমি এখানে থেকেছি। আমি কীভাবে সব ছেড়ে যাই?
একজন নারী হিসেবে, কর্মী-সংগঠক হিসেবে, যৌথভাবে বা একাকীভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার প্রেরণা কী?
আমি কোনো দিন এসব ধারণাকে পাত্তা দিইনি যে আমি নারী। আমি কোনো শাসনের সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠিনি। এখানে ছোটবেলা থেকে একজন নারীকে যেসব বিধিনিষেধ শুনতে শুনতে বড় হতে হয়, সেসব আমি কখনো পাইনি। আমার কাজকর্মকেও আমি নারী হিসেবে দেখতে চাই না। কেউ গুরুত্ব দিক বা না দিক, আমি এসব পাত্তা দিই না।
আপনাদের ছবিতে নারী তো দারুণভাবে উপস্থিত। ছবিতে সংস্কৃতির যে প্রতীকগুলো আসছে, তারাও নারী?
সেটা তো অন্য দিক, আমার ব্যক্তিগত দিক না। মুক্তির গান চলচ্চিত্রটা যখন প্রথম মুক্তি দিলাম, তখন বেশির ভাগ দর্শক ছিল তরুণীরা। তারা খুবই অনুপ্রাণিত হলো যে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেয়েরা মুক্তির গান গেয়ে বেড়াচ্ছে! যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক নেই বা যারা বিবাহিত সম্পর্কে আবদ্ধ নয়, এমন ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে মিলে সংগ্রাম করছে। তখন পর্যন্ত একাত্তরের ছবিতে নারী আসত কেবল আক্রান্ত হিসেবে; ধর্ষিত, সন্তানহারা, স্বামীহারা নারী হিসেবে, নির্যাতিতের চরিত্রে।
হ্যাঁ, সক্রিয় হিসেবে নয়, পার্শ্বচরিত্র বা নিষ্ক্রিয় অত্যাচারিত হিসেবে?
তাদেরও যে সক্রিয় একটা ভূমিকা ছিল বা থাকতে পারে, সে রকম ধারণা আগে তেমন আসত না। মুক্তির গান ছবির মাধ্যমে এই ধারণা কিছুটা হলেও আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। এর পরে নারীর কথা নামের আরেকটা ছবিতে মুক্তিযুদ্ধে নারীর এই সক্রিয় ভূমিকা দেখালাম, তাদের কণ্ঠস্বর শোনালাম। মাটির ময়না হোক, অন্তর্যাত্রা হোক বা রানওয়ে হোক, সেখানে নারীদের মধ্যে আলাদা শক্তি থাকে, স্বাধীন চরিত্র থাকে। তারা দায়িত্ব নিচ্ছে, সহানুভূতিশীল হচ্ছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আপনার নাম স্থায়ীভাবে জড়িত হয়ে গেছে, ২৫ বছর আগে নিশ্চয়ই তা ভাবেননি। আবার আপনাদের যৌথতার উত্তরাধিকারও এখন কেবলই আপনাকেই বইতে হবে...
মানুষের ভালোবাসা ও স্বীকৃতি এক ধরনের দায়িত্ব হিসেবে অনুভব করি। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তারেককে ভালোবাসত। সেও তাদের নিয়ে আশাবাদী ছিল। অনেকেই তারেকের প্রস্থানে আশা ছেড়ে দিয়েছে, ভেঙে পড়েছে। কেউ কেউ আমাকে বলে, আপনি আছেন, আপনার মধ্যেই আমরা তারেক ভাইকে পাই। ভালো লাগে, কিন্তু আরও দায়িত্ব বোধ করি। অনেক কাজ বাকি আছে, আমি জানি না কতটা পারব, কিন্তু আমাকে তো করতে হবে, ব্যস।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
অনেক শুভেচ্ছা সবাইকে।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






