শিক্ষায় নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে
মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় ছাত্রীসংখ্যা কম হলেও ক্রমান্বয়ে তা বাড়ছে। স্কুলে যাওয়ার এ দৃশ্য নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের
জিয়া ইসলাম
বর্তমান সরকারের গত তিন বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন ৫৮ হাজার ৫৫৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৪৩ হাজারই নারী, শতকরা হিসাবে তা ৭৪ শতাংশ।
এ তথ্য জানিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন প্রায় ৫৯ শতাংশ শিক্ষক নারী। আর কিছু নিয়োগ হলে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে।’
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ কোটা নারীর জন্য সংরক্ষিত। সংরক্ষিত ও মেধা—দুই কোটাতেই চাকরি পাচ্ছেন নারীরা।
প্রাথমিকে নারী শিক্ষকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ছাত্রীদের সংখ্যাও। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রাথমিকে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ, ছেলের সংখ্যা ৪৯ দশমিক ৯৩।
১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকে ভর্তির ক্ষেত্রে মেয়ে ও ছেলের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৪৫: ৫৫। ২০০৮ সালের ওই অনুপাত ছিল মেয়ে ৫০ এবং ছেলে ৪৯।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রধান ইমতিয়াজ মাহমুদ প্রথম আলোকে জানান, প্রাথমিক স্তরে এখন মোট শিক্ষার্থী এক কোটি ৬৩ লাখ ১২ হাজার সাতজন। এদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ৮২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৫৪।
মাধ্যমিকেও মেয়েরা এগিয়ে: ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৪ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৪ জন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (মাধ্যমিক) এস এ মাহমুদ জানান, এই স্তরে ছাত্র ৪৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ, ছাত্রীর সংখ্যা ৫৩ দশমিক ৩১ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাব বলছে, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিকে ভর্তির ক্ষেত্রে মেয়ে ও ছেলের অনুপাত ছিল ৩৪:৬৬। ২০০৫ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা আসে, বর্তমানে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় বেশি।
কিছু ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মাধ্যমিক স্তরে সরকার ও দাতাদের টাকায় চারটি প্রকল্পের মাধ্যমে উপবৃত্তি মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
উপবৃত্তির পাশাপাশি মেয়েদের বিনা মূল্যে বই, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য পরীক্ষার ফি দেওয়াসহ নানা উদ্যোগ শিক্ষার হার বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুযায়ী, ভর্তির দিক থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে লিঙ্গসমতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের বেতন মওকুফ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ডিগ্রি পর্যন্ত এ সুযোগ বাড়ানো হবে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, সরকার শিক্ষা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে যাচ্ছে। এটা হলে আরও অধিক শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের সংখ্যা বাড়লেও নারী শিক্ষকের অনুপাত প্রাথমিকের তুলনায় কম। মাধ্যমিকে মোট শিক্ষক রয়েছেন দুই লাখ ১৮ হাজার ১১ জন। তাঁদের মধ্যে নারী শিক্ষক ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। এই স্তরেও ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগের বিধান আছে, কিন্তু তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এ প্রসঙ্গে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোটা থাকলেও মফস্বলে অনেক সময় যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না।
উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতি ধীর: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩১টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন ১৩ লাখ ৮২ হাজার ২১৬ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছিলেন পাঁচ লাখ ৫২ হাজার ৯৮৮ জন (মোট শিক্ষার্থীর ৪০ শতাংশ)।
ইউজিসির কয়েকটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত মেয়ে ও ছেলের অনুপাত ছিল ২৫:৭৫। ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও এই এক দশকে উচ্চশিক্ষায় ছাত্রী ভর্তির হার বেড়েছে ধীরগতিতে।
ব্যানবেইসের ২০০৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া দুই লাখ ৬৩ হাজার ৫৪১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ছিলেন ৮২ হাজার ৪৪২ জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা নেই। এখানে মেয়েরা আসছে নিজের যোগ্যতায়। তিনি বলেন, মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় ছাত্রীসংখ্যা কম হলেও ক্রমান্বয়ে তা বাড়ছে।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর মোর্চা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভেদ ও মতের অমিল থাকলেও মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে সব সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল। এই সদিচ্ছা এখনো আছে। এটা অব্যাহত থাকলে অগ্রসরমাণ নারীশিক্ষার আরও বিকাশ হবে।







Md. Nazrul Islam
২০১৩.০১.০৩ ০৭:৫৩