নারী: শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ক্রমবর্ধমান

‘অর্ধেক তার করিয়াছে নারী’

সালমা খান | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • আন্দোলনরত পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা

    আন্দোলনরত পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা

  • সালমা খান

    সালমা খান

স্বাধীনতার চার দশক উত্তরণের সামগ্রিক পটভূমিতে এ অঞ্চলের একটি দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্জনকে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কেরালার পরই স্থান দিয়েছে বিশ্বব্যাংক উন্নয়ন প্রতিবেদন (২০০৮)। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের মানব উন্নয়ন সূচকে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশকে ১৭ ধাপ পেছনে দেখানো হয়েছে মূলত সূচক নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিবর্তন ও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সূচকের তুলনায় বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্জন প্রকারান্তরে নারীর ক্ষমতায়নের ইঙ্গিত বহন করে। কারণ প্রথাগতভাবে আর্থসামাজিক অধস্তনতার শিকার হওয়া সত্ত্বেও সরকারের কিছু নারীবান্ধব নীতি ও বেগবান নারী আন্দোলনের ফলে শহরে-গ্রামে নারীর মধ্যে যে উদ্যমী মনোভাব ও জীবনকে রূপান্তরিত করার আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে, তা নারীকে আরও দৃশ্যমান ও আর্থসামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহসী করেছে। তাই বাংলাদেশে লব্ধ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পুরুষের তুলনায় নারীরা আরও তৎপর হয়েছে।
নারীমুক্তির একটি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার প্রজনন হারকে আয়ত্তে আনা, যা ১৯৭১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নেমে এসেছে এবং বর্তমানে ২.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই অর্জন নারীস্বাস্থ্যের উন্নতি ও কর্মক্ষম জীবনের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা বাদে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে নারীর গড় আয়ু পুরুষের তুলনায় বেড়ে ৬৮.৯ বছরে দাঁড়িয়েছে। নারীস্বাস্থ্যের উন্নতির ইতিবাচক প্রভাবে শিশুমৃত্যুর হার প্রশংসনীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউনিসেফের ২০১২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ বছরে দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৬৭ শতাংশ, এ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ বাংলাদেশকে পুরস্কৃত করেছে। তবে নারীমুক্তির পথে এ দেশে নারীর সবচেয়ে বড় অর্জন শিক্ষাক্ষেত্রে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তরে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি, উপরন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ। এসব অর্জন বাংলাদেশকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীর বিশিষ্ট অবদানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিকাশ ও অব্যাহত প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখতেও নারীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা। রপ্তানি খাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও চিংড়িশিল্পে নারীর সিংহভাগ অবদান অনস্বীকার্য। সেই ধারাবাহিকতায় শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ক্রমবর্ধমান। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার পুরুষের তুলনায় বেশি (শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০), কিন্তু সংখ্যাগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় চাকরির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কর্মজীবী নারী মূলত সেবা প্রদানকারী, করণিক ও অদক্ষ কর্মী হিসেবে নিয়োগ পায়। কৃষির সাফল্য আমাদের উন্নয়নের এক মাইলফলক, যা আমাদের মতো জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশের জন্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও মজুরিবিহীন পারিবারিক কৃষিশ্রমিক হিসেবে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মোটা দাগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২০ শতাংশ নারীর অবদান। তবে জাতীয় উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক বিষয় বলে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণায় প্রতীয়মান হয়। সামাজিক ও পারিবারিক কল্যাণ সৃষ্টিতে, কৃষিকাজ, গৃহস্থালিকর্ম ও পরিবারের সদস্যদের সেবা প্রদানের জন্য নারীকে বিনা মজুরিতে যে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ব্যয় করতে হয়, তার অর্থমূল্য জিডিপিতে প্রতিফলিত হলে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ, যা জাতীয় উন্নয়নের প্রায় অর্ধেক। নারীর ক্ষমতায়নকে সংজ্ঞায়িত করে যদি বলা যায়, অর্জিত সক্ষমতাকে নির্ভয়ে ও নির্দ্বিধায় নিজের অধিকার ও ন্যায্যতার সপক্ষে স্থাপন করতে পারা—তা হলে অবশ্যই বলতে হয় বাংলাদেশে নারীমুক্তি হলেও নারীর ক্ষমতায়ন এখনো যেন সোনার হরিণ। তাই নারীর গুরুত্বপূর্ণ অর্জনসমূহকে মূল্যায়ন করে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা ও সম্ভাবনা বিকাশের জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের গৌরবময় অর্জন থাকলেও নিরাপত্তার অভাব ও বাল্যবিবাহের কারণে স্কুল থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অনুপস্থিতি। গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড ব্যতীত বর্তমানে দেশে এক কোটি ৬২ লাখ নারী কর্মক্ষেত্রে রয়েছে (বিবিএস ২০১০)। সর্বশেষ আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার বয়স-কাঠামো রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনুকূলে। অর্থাৎ শিশু ও ষাটোর্ধ্ব মানুষ, যারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের সংখ্যা ৪২ শতাংশ; সেই তুলনায় উপার্জনক্ষম মানুষের (১৫-৫১ বয়স) হার ৫৮ শতাংশ, যার অর্ধেক নারী। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতে, এই ‘জনসংখ্যাভিত্তিক মুনাফা’ আমাদের দেশে উন্নয়নের সিংহদুয়ার খুলে দিতে পারে, যদি আমরা এই শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করতে পারি। শ্রমশক্তিতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণের হার বেশি হলেও ৩৪.৫ শতাংশ পুরুষের তুলনায় মাত্র ৯.৮ শতাংশ নারী বর্তমানে পূর্ণকালীন মজুরি শ্রমবাজারে নিয়োজিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক মজুরিবৈষম্যের শিকার। পোশাকশিল্প যা রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডস্বরূপ এবং নারী শ্রমিক অধ্যুষিত একটি খাত, সেখানেও নারী শ্রমিকের ঊর্ধ্বমুখী দক্ষতা ও মজুরি ভাতা বৃদ্ধির সমস্যা অব্যাহত। এ ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি, বহুমুখী কর্মসংস্থান ও মজুরিবৈষম্য নিরসনে সরকারের যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভিবাসী শ্রমিকের রয়েছে এক বিরাট ভূমিকা। অভিবাসী শ্রমিকেরা এ বছর প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স হিসেবে দেশে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট অভিবাসী শ্রমিকের ১৩.৯ শতাংশ নারী এবং পৃথিবীর ৫১টি দেশে নারী অভিবাসী শ্রমিক কর্মরত, যাঁরা তাঁদের আয়ের সিংহভাগ (৭২ শতাংশ) পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রা এবং সন্তানের শিক্ষার জন্য দেশে পাঠিয়ে থাকেন। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে প্রকাশ যে অভিবাসী নারী শ্রমিকেরা বহুক্ষেত্রে যৌন হয়রানি এবং মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ ব্যাপারে শ্রম ও জনশক্তি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাস্তবভিত্তিক যৌথ নীতির মাধ্যমে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি নারী অভিবাসী শ্রমিকের ব্যক্তিগত ও চাকরিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চার দশক ধরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীর যৌনসত্তা ও জেন্ডার স্বরূপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রক হচ্ছে পুরুষ—যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে নারীর প্রতি পারিবারিক নির্যাতন, সামাজিক ফতোয়া, প্রকাশ্য যৌন হয়রানি এবং নারীর মানবাধিকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার মাধ্যমে। নারীর শিক্ষা ও অর্থ উপার্জনের হার ক্রমবর্ধমান হলেও মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, বছরে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে নারী নির্যাতন। এ ছাড়া পথেঘাটে মেয়েদের হয়রানি, উত্ত্যক্ত করা ও শ্লীলতাহানি, যৌতুকের দাবি, জোরপূর্বক বিয়ে ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যাকারী নারীর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। নারী নির্যাতন ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকারের বেশ কিছু আইন থাকলেও নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী রয়ে যায় সুবিচারবঞ্চিত।
নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে যথাযথ আইন ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা অপরিহার্য হলেও মূল সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে প্রয়োজন সামাজিক রূপান্তর। প্রচলিত মধ্যযুগীয় প্রথা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং পক্ষপাতদুষ্ট জেন্ডার সম্পর্ক পরিহার করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে আমাদের জেন্ডার সম্পর্ক পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রায় ২৭ বছর আগে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনের উদ্দেশ্যে সিডও সনদ পরিগৃহীত হলেও আজও মৌলিক ধারাসমূহ (ধারা ২, ১৬ আংশিক) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হয়নি। এ দাবি আদায়ে নারী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও অনড় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরে নারী দৃশ্যমান ও অসামান্য ভূমিকা রাখলেও নারীর উদ্যম, নাব্যতা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আইনি সংস্কার, প্রশাসনিক সহায়ক নীতি ও কাঠামো কোনোটাই সৃষ্টি হয়নি।
এ ক্ষেত্রে নারীকেই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর অধস্তনতা ও নির্যাতনের পেছনে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বা প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকে, তাই নারীর নিজের সম-অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের নারীর প্রতি সহিংসতাকে ‘না’ বলতে শেখাতে হবে। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ফতোয়ার নামে নারীর প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে তাদের কঠোরভাবে নিবৃত্ত করতে হবে। ইসলামে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন করার কোনো সুযোগ নেই। সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, বাংলাদেশে নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা ও কর্মসংস্থানের ব্যাপ্তির কারণে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় ক্ষমতায়নের পথে নারীর সমৃদ্ধি অর্জন ও লৈঙ্গিক ভারসাম্য স্থাপিত হয়েছে (ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার, কান্ডা ২০১১), যা আমাদের জন্য ব্যষ্টিক উন্নয়নের পথকে সুগম করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও সংকট কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন ও জেন্ডার সমতা স্থাপন। তা হলেই বাংলাদেশকে আমরা একুশ শতকের উপযোগী একটি ন্যায়ভিত্তিক উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব।
সালমা খান: নারী নেত্রী, জাতিসংঘ সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন