জনসংখ্যা: কর্মক্ষম মানুষ বাড়ছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে
এগিয়েছি অনেক দূর, তবে...
এ কে এম নূর-উন-নবী
বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সেক্টরে এগিয়েছে অনেক দূর। এই এগিয়ে যাওয়াটা এ দেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি বলে যাঁরা আখ্যায়িত করেছিলেন, তাঁদের মিথ্যা প্রমাণিত করেছে। অগ্রগতির পরও দেশটি এখনো যথেষ্ট মাত্রায় দরিদ্র, অসাম্য ও বঞ্চনাসংবলিত নিম্ন আয়ের দেশই রয়ে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় সরকার একটি রূপকল্প প্রণয়ন করেছে। সেই রূপকল্পে বর্ণিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জিত হলে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের অর্থনীতির প্রথম পর্যায়ে পদার্পণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে উচ্চ মাথাপিছু আয় অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত হবে, উন্নততর শিক্ষা পাবে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, অধিকতর সমতাভিত্তিক আর্থসামাজিক পরিবেশ তৈরি হবে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে উন্নততর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত হবে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ হবে গণতান্ত্রিক, যা মানবাধিকার, ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সম-অধিকারের সুযোগ প্রতিষ্ঠিত করবে।
এই রূপকল্পের কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে বাংলাদেশের জনবৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গটি বিবেচনায় আনা খুবই জরুরি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার জনবৈজ্ঞানিক কাঠামোটি যে চিত্র প্রদর্শন করে, তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন প্রায় সম্পূর্ণ করার পর্যায়ে চলে এসেছে। কিন্তু জনসংখ্যার মধ্যে বিদ্যমান গতিশীলতার কারণে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন মাত্রা অর্জন করলেও, বাংলাদেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল হতে আরও ৬০ থেকে ৭০ বছর লেগে যেতে পারে এবং তত দিনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটি হয়ে যেতে পারে। তবে আনন্দের বিষয় হলো, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হারের হ্রাস ও এর ফলে বয়সকাঠামোর মধ্যে পরিবর্তনের কারণে কর্মক্ষম মানুষ বাড়ছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি সুযোগের জানালা উন্মোচিত করেছে। জনসংখ্যাকাঠামোর এ অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে আখ্যায়িত করা হয়। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে দুইভাবে। প্রথমত, প্রয়োজনীয় সংখ্যায় কর্মক্ষম মানুষের পরিমাণ বাড়ার কারণে ভোক্তার তুলনায় উৎপাদকের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা মোট জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, একটি জনসংখ্যায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লে সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ফলে সামাজিক সঞ্চয় ও ভোগের মাত্রা বেড়ে বর্ধিত পুঁজিকে সহজলভ্য করে তোলে। অন্যদিকে, মানুষের মনোভাবের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণে নারীর মর্যাদা, শিক্ষা ও শ্রমশক্তিতে তাঁদের অংশ নেওয়ার মাত্রা বাড়ে, যা মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তোলে।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি সুযোগের জানালা উন্মোচিত করলেও এটি জাতীয় উন্নয়নের বিভিন্ন সেক্টরে কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। যদি দারিদ্র্য ও নিম্নমানের জীবনযাত্রা অব্যাহত থাকে, তবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে সাফল্যের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা বিভিন্ন সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পূর্বসংগঠিত কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা নয়, বরং বয়সকাঠামোর পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট একটি সুযোগ মাত্র। এ সুযোগটি একটি জনসংখ্যাকাঠামোয় খুব অল্প সময়ের জন্য (৩০ থেকে ৩৫ বছর) একবারই আসে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিভেন্ড থেকে আপনা-আপনিই কোনো অর্থনৈতিক ফলাফল আসে না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে অর্থনৈতিক ডিভিডেন্ডে পরিণত করতে হলে তিনটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ—শ্রমের জোগান, সঞ্চয় ও মানবসম্পদ। এ তিনটি উপাদান তখনই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে, যখন দেশে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সঠিক নীতিনির্ধারণের পরিবেশ বিরাজ করবে।
যদি আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কারণে সৃষ্ট সুযোগের জানালা দিয়ে অর্থনৈতিক ফসল ঘরে তুলতে চাই, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে কতগুলো বিষয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেমন: যথাযথ নীতিনির্ধারণের পরিবেশ নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য দূর করা, বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা, সব ধরনের অসমতা দূর করা, সবার জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, বয়স্ক মানুষের জন্য নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারিত করা, মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য উপযোগী ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া, সঞ্চয় কৌশলের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা, দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়নের পরিবেশ নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা আমাদের জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ করে তুলতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যা একটি বোঝা হিসেবে থেকে যাবে। ধরে নেওয়া যায়, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেমে এসেছে। তার পরও জনসংখ্যার যে পরিমাণটি বাংলাদেশের এই ছোট ভূখণ্ড ও সীমিত সম্পদের আওতায় রয়েছে, তার যথাযথ ব্যবস্থাপনা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে দুর্নীতি, সামাজিক অনাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকবে এবং রাষ্ট্র ও সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দেখা দেবে একধরনের অস্থিরতা। জনসংখ্যার যথাযথ ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ সংকটগুলোকে মোকাবিলা করা যেতে পারে।
জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত না করলে রূপকল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে। কেননা, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যায় প্রতিবছর ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে। জন্মশীলতা ও প্রজননের হার জাতীয়ভাবে প্রত্যাশিত মাত্রায় হ্রাস পেলেও এখনো ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর মাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়নি, যেমন—হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী ও শহর এলাকায় বসবাসকারী বস্তিবাসী। এসব জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও যথাযথ সেবা প্রদানের ব্যবস্থা নেই। এটিকে সর্বাধিকারের ভিত্তিতে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। নইলে জনসংখ্যাকাঠামোর ভেতরে বিদ্যমান যে গতিশীলতা রয়েছে, তা বিভিন্ন কর্মসূচির সফলতা নস্যাৎ করে দেবে।
বাংলাদেশে নারীর অধিকারকে তোয়াক্কা না করে অপরিণত বয়সে বিয়ে করতে নারীকে বাধ্য করা হয়। বাল্যবিবাহ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রতিটি লক্ষ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। প্রজনন স্বাস্থ্য মাতৃমৃত্যুর হার, শিশুমৃত্যুর হার, বিশেষ করে নবজাতক শিশুমৃত্যুর হার, বাল্যবিবাহের সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত। ১০ থেকে ১২ বছরে আমরা কোনোক্রমেই বিয়ের বয়স এক বছরের বেশি বাড়াতে পারিনি। নারীর বিয়ের বয়স-সম্পর্কিত বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কোনো কন্যাশিশুর বিয়ে দিলে যে আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অভিভাবকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ নারীর বিয়েটি কোনোভাবেই পরিবর্তিত হয় না। তাতে কন্যাসন্তানের যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়ে যায়। এটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য কোনো সহায়ক আইন হতে পারে না।
জন্মহার কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্য-পরিস্থিতির উন্নয়নের কারণে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি উন্নয়নের একটি ইতিবাচক সূচক হলেও পক্ষান্তরে তা জনসংখ্যাকাঠামোর মধ্যে একটি নেতিবাচক অবস্থান সৃষ্টি করে। যেমন মানুষ বেশি দিন বেঁচে থাকার কারণে ৬০ বছরের অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে, যা নির্ভরশীলতার মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ বছরের অধিক জনগোষ্ঠীর পরিমাণ প্রায় এক কোটিরও বেশি, যা অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশেও যদি এ মুহূর্তে এ-সম্পর্কিত পরিকল্পনা ও যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ না করা হয়, তা হলে এ সমস্যাটি অচিরেই জাতীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি একটি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার স্থানান্তর ও নগরায়ণ পরিকল্পিত নয়। বল্গাহীনভাবে গ্রামের দরিদ্র মানুষ হু হু করে ছুটে আসছে শহরের দিকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধান শহর ঢাকা শহরে। অধিক হারে ঢাকা শহরে মানুষের বসবাস বাড়ার কারণে এ শহর চিহ্নিত হয়েছে একটি মেগাসিটিতে। একটি মেগাসিটির অন্যান্য যে নাগরিক বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা, তা সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়নি। ঢাকা মেগাসিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর দ্রুততম হারে বেড়ে ওঠা মেগাসিটি, যেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে। এতে শহরে দারিদ্র্যের পরিমাণ বাড়ছে এবং শহরে স্বাস্থ্য, বাসস্থান, যানবাহন, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে খুব দ্রুত হারে। এ কারণে ঢাকা মেগাসিটি হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে অ-বসবাসযোগ্য শহরে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনসংখ্যার নিরঙ্কুশ আকারটি প্রতিনিয়ত বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। যদি এই হারে কৃষিজমির পরিমাণ কমতে থাকে, তবে কৃষিতে ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টি হুমকির সম্মুখীন হবে এবং সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের যে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিদ্যমান, তাতে দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এযাবৎ ধরে বাংলাদেশের যেসব ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা যদি অব্যাহত রাখতে হয়, তা হলে উল্লিখিত প্রসঙ্গগুলোকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে রাজনৈতিক অঙ্গীকারসহ এর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে।
ড. এ কে এম নূর-উন-নবী : অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






