শিল্প: বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ১২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে
বর্তমান আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন
-
তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকেরা
-
এ কে আজাদ
স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রোথিত ছিল আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির বীজ। এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর শিল্পায়ন যেন একই সুতোয় বাঁধা। আর এই শিল্পায়নের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা প্রায় ৪০ বছরের। স্বাধীনতার পর থেকে নানা সমস্যা মোকাবিলা করে এ দেশ একটু একটু করে শিল্পায়নের পথে এগিয়েছে।
তবে বাংলাদেশের শিল্পায়নের পথযাত্রা ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই শুরু, ব্রিটিশ আমলে বাংলার স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ ব্যবস্থা ও তাঁত বা মসলিনশিল্পের বিলুপ্তির পাশাপাশি গড়ে ওঠা রেলপথভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা। তারই হাত ধরে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠে হাতে গোনা কিছু শিল্পকারখানা। তার মধ্যে ছিল আয়রন, কেমিক্যাল, কটন, ট্যানারি ও সাবান কারখানা। কিন্তু সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ব্রিটিশ আমল পেরোল। পেরোল পাকিস্তান শাসনামলও। এর মধ্যে মহান স্বাধীনতাসংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হলো বাঙালির বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে জন্ম হলো স্বাধীন, সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র। এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই ষাটের দশকে পাট ও চা-ভিত্তিক কিছু শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে এ অঞ্চলে। এই সময়ে গড়ে ওঠা কিছু বৃহৎ শিল্পকারখানা ছিল তৎকালীন পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের (পিআইডিসি) মালিকানায়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এ অঞ্চলের প্রায় সব বৃহৎ শিল্পকারখানা জাতীয়করণ হয়। এরপর ব্যক্তি খাতে বৃহৎ শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। ১৯৭৪ সালে সেই বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় তখনকার সরকার। আর ১৯৭৫ সাল থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করা হয়। তবে এর সুফল মেলে মূলত আশি সালের পরপর। সে সময় জাতীয়করণ করা কিছু শিল্প উদ্যোক্তার শিল্পকারখানা মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আশি ও নব্বই দশকজুড়ে এই ধারা অব্যাহত ছিল।
আশির দশকের শুরুর দিকে রপ্তানিমুখী শিল্পে বাংলাদেশের জন্য এক বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ সংকট এ দেশের জন্য সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
সে সময় যোগাযোগমাধ্যমের আজকের দিনের উৎকর্ষতা ছিল না। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে মুঠোফোনের যোগাযোগ কোনোটাই আজকের অবস্থায় ছিল না। অবকাঠামো থেকে শুরু করে যাতায়াতব্যবস্থা সবকিছুই ছিল অনুন্নত। তা সত্ত্বেও এ দেশের একদল তরুণ স্বপ্ন চোখে এঁকে জড়িয়ে পড়েন তৈরি পোশাক ব্যবসায়। পুঁজি বলতে কিছু অর্থ আর দৃঢ়সংকল্প। এই দুইয়ের চেয়েও বড় পুঁজিটা ছিল আসলে দুই চোখ ভরা দিগন্তবিস্তৃত স্বপ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের বাজার জয় করবে বাংলাদেশের একদল তরুণ, সেটা তো সাধারণ কোনো স্বপ্ন নয়। যাঁরা আশির দশকের শুরুতে এই স্বপ্নের পথে অভিযাত্রা শুরু করেন তাঁদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের দেশ মানে কেবলই পৃথিবীর মানচিত্র বা বইয়ের পাতায় পড়া কোনো রাষ্ট্র। আজকের দিনে হয়তো অনেকেই ব্যবসা শুরুর আগে এসব দেশ-মহাদেশ ঘুরেছেন, জেনেছেন।
অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প এই কয়েক দশকে একটা শক্ত ভিত রচনা করেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের বদৌলতে বাংলাদেশ নামের লাল-সবুজের পতাকায় আঁকা দেশটি এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই শিল্পের অর্জন জাতি হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের জন্য কেবলই গর্বের। ছোট ছোট ব্যবসায়িক উদ্যোগ আজ পুরো জাতির গর্বের বিষয়। ১৯৯০ সালের পর থেকেই সবচেয়ে বড় পাঁচটি উপখাতের একটিতে পরিণত হয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প। ১৯৯৬ সালের পর থেকে এ খাতটি রপ্তানি-বাণিজ্যে সব সময়ই শীর্ষে অবস্থান করে আসছে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের রপ্তানি আয়ের ৭০-৭৮ শতাংশ তৈরি পোশাকশিল্প থেকে অর্জিত হয়। যার ফলে ১৯৭২ সালে আমাদের রপ্তানি আয় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বর্তমানে তা ২৫ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই আয় প্রায় ৫০ গুণ বেড়েছে।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, গত কয়েক দশকে আমাদের শিল্প খাত অনেক দূর এগিয়েছে। আমরা এখন শিখে গেছি, সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরির কৌশল। এরই মধ্যে যুদ্ধজাহাজও তৈরি করে ফেলেছি। তাই আগামীর অগ্রযাত্রায় নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে এ দেশের জাহাজ নির্মাণশিল্প। আছে সম্ভাবনার চামড়াশিল্প, হিমায়িত মৎস্য খাত, সিমেন্ট, ওষুধ, জনশক্তি, বাইসাইকেল, সিরামিক, প্লাস্টিক, ফার্নিচারসহ ছোটখাটো আরও অনেক শিল্প খাত।
সম্ভাবনা যেমন আছে তেমনি আছে সমস্যা। বছরের পর বছর এসব সমস্যার মধ্যে থেকেও আমরা এগোচ্ছি। সমস্যা নিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত কথা বলছি, সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করছি। সমস্যা সমাধানের নানা দাবি উত্থাপন করে চলেছি। সেগুলো একটা দিক। তবে সমস্যার চেয়ে সম্ভাবনার গল্পটাই আজ বেশি শোনাতে চাই। কারণ সমস্যার মধ্যে থেকেও আমরা এতটা পথ পেরিয়ে এসেছি। তাই এ কথা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমানে ব্যবসা বা শিল্পে বিদ্যমান যেসব সমস্যা রয়ে গেছে সেগুলোর সমাধান খুব কঠিন কোনো বিষয় নয়।
ব্যবসার প্রসার বা অগ্রযাত্রার পথে বড় সমস্যা অবকাঠামো। সেটির সমাধানে সরকারের কাছে আমাদের দাবি অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে দুর্নীতির সমস্যা। আছে রাজনৈতিক সংকটও।
রপ্তানি-বাণিজ্য হোক আর সাধারণ ব্যবসা-শিল্প, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ও অগ্রযাত্রার ধারা অব্যাহত রাখতে হলে দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ। রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় হরহামেশা কিছু নিত্যনতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। তবে সেগুলো সাময়িক। কখনো কখনো ব্যবসার নামে রাতারাতি ধনী হওয়ার জন্য একটি গোষ্ঠী এ ধরনের সমস্যা তৈরি করে। যার কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
এবার ফিরে দেখি দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা। তাতে হতাশার চিত্র যেমন আছে, তেমনি আছে আশাজাগানিয়া তথ্য। এরই মধ্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ১২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার শক্ত এই ভিত গড়ে দিয়েছে। দেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের ঘামে-শ্রমে ভর করে আমাদের অর্থনীতি উঠে যাচ্ছে অন্য এক উচ্চতায়। এটিই আমাদের উন্নয়নশীল অর্থনীতির অবিশ্বাস্য এক শক্তি।
মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে আমাদের যাত্রা অব্যাহত। এই লক্ষ্য পূরণে বেঁধে দেওয়া হয়েছে সময়সীমা। আমার বিশ্বাস, নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে যাব। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে রপ্তানি সম্প্রসারণ করতে পারলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
শিল্পের বিকাশের জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন জোগান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থায়নে সহজলভ্যতা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং এর জন্য বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী সুযোগ-সুবিধা প্রদান, বাজারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, শিল্প স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন এবং সর্বোপরি শিল্প স্থাপনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও অর্জনও কম নয়। রাজস্ব আদায়ে বিরাট সাফল্য রয়েছে। সাফল্য আছে রপ্তানি-বাণিজ্যেও। সাময়িক পদক্ষেপের মাধ্যমে হলেও সরকার বিদ্যুৎ সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) বেশ ইতিবাচক। বিশ্বজুড়ে চলমান আর্থিক মন্দার মধ্যেও গত বছর আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৩২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিও এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন সময় কেবল সামনের দিকে তাকানো। যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এ বছরও আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারলে তার কাছাকাছি থাকবে। তাই বিদ্যমান কিছু সমস্যার বিপরীতে আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক অর্জনই হয়ে গেছে এর মধ্যে।
ফিরে যাই তৈরি পোশাক খাতের সূচনার গল্পে। প্রায় শূন্য হাতে পথ চলতে শুরু করা একদল তরুণ এরই মধ্যে এ খাতের শক্ত ভিত তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের পর বিশ্বের নতুন নতুন বাজার দখলের হাতছানি এখন এ শিল্পে। ব্রাজিল, রাশিয়া, চীনের মতো বৃহৎ বাজার দখলের প্রচেষ্টায় এখন আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা। এসব বাজার দখল করতে পারলে এ খাতের রপ্তানি আয় বেড়ে যাবে বহুগুণ। এ জন্য আমাদের নিজেদেরও প্রস্তুতির বিষয় আছে। অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। অবকাঠামো খাতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় আমরা এখনো পৌঁছাতে পারিনি, এ কথা সত্য। তাই এ খাতে উন্নয়না খুবই জরুরি।
সম্প্রতি শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানে সরকার বেশ কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। শিল্পনীতি ২০১০-এ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে মোট ৩২টি শিল্প খাতকে বিবেচনায় আনা হয়েছে। এসব শিল্প বিকাশে নগদ ভর্তুকি, ট্যাক্স হলিডেসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সে সঙ্গে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২৫টি শিল্প খাতকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলোর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
দেশের শিল্পোন্নয়নে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, প্রাইভেটাইজেশন কমিশন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন কাজ করছে। তার পরও গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে দেশের অধিকাংশ শিল্পই এখন ক্ষতির সম্মুখীন। এ জন্য আবাসনশিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সারা দেশে নির্মাণকৃত প্রায় ২৫ হাজার ফ্ল্যাট বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের অভাবে হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। ফলে আবাসন ব্যবসায়ীদের বিপুল বিনিয়োগ আটকে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট উত্তরণে সরকারের পক্ষ থেকে নিরন্তর প্রচেষ্টা তুলে ধরা হলেও কার্যকর অবস্থা উদ্যোক্তাদের খুশি করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিনিয়োগের গতিপ্রবাহে আশার সঞ্চার হয়নি, বাড়েনি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানও। নিত্যপণ্যের বাজারও অস্থির। বাজার থেকে নানা উপায়ে মুদ্রাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের সামগ্রিক শিল্প উন্নয়নের জন্য এবং শিল্পনীতির বাস্তবায়নের দিকে লক্ষ রেখে সরকার বেশ কয়েকটি শিল্পের জন্য আলাদা আলাদাভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে চামড়া খাত, ফার্মাসিউটিক্যাল খাত, তৈরি পোশাক খাত, প্লাস্টিক খাত এবং অটোমোবাইল খাত উল্লেখযোগ্য। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের উন্নয়নের ওপর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অনেকখানি নির্ভর করে। বিসিকের অধীনে এ শিল্পের আরও অধিক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য একটি আলাদা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির কাজ চলছে। এ ধরনের কার্যক্রম অবশ্যই প্রশংসনীয়, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
পাশাপাশি শিল্প বিকাশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্প স্থাপন, হাইটেক পার্ক ও টেকনোপার্ক স্থাপন করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পনগর স্থাপন করে পরিবেশদূষণ রোধে সেন্ট্রাল ইটিপি স্থাপনের যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে সেগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
এত সমস্যার মধ্যেও আমাদের অর্থনীতি বেশ কিছু শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এই অর্থনীতি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কোনো চাপের মুখোমুখি না হলে ছয় শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য খুব কঠিন কোনো কাজ নয় এখন।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে সরকার দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের রূপকল্প ২০২১ গ্রহণ করেছে এবং এর আওতায় ২০২১ সাল নাগাদ দেশে একটি শক্তিশালী শিল্প খাত গড়ে উঠবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যেখানে জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান বিদ্যমান ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে এবং শ্রমশক্তি নিয়োজনে (মোট কর্মসংস্থানে) অবদান ১৬ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এ জন্য মানব পুঁজির উন্নয়ন ও সমাহার ঘটিয়ে দেশের সব ধরনের শিল্প খাত যথা উৎপাদন শিল্প, জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতে জ্বালানিশিল্প, কৃষি ও বনজ শিল্প, খনিজ সম্পদ আহরণ ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, পর্যটন ও সেবাশিল্প, নির্মাণশিল্প, তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পসহ উপযোগী সব ধরনের শিল্পের পরিবেশবান্ধব বিকাশ ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশের শিল্প খাত মূলত খনিজ ও খনন, ম্যানুফ্যাকচারিং, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ এবং নির্মাণ এ চারটি খাতের সমন্বয়ে গঠিত। ২০১১-১২ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৩১.২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান ১৯.০১ শতাংশ (প্রাক্কলিত), যা মূলত বেসরকারি খাতেরই অবদান।
পোশাকশিল্পের মতো আমাদের অন্যান্য সম্ভাবনাময় বহুমুখী পাটপণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, বহুমুখী চামড়াশিল্প, প্লাস্টিক, আইটি শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে রপ্তানি সম্প্রসারণ হবে। এর ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গতিসঞ্চার আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
যদিও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে এ খাতের পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এর বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। অপর দিকে, কৃষিভিত্তিক শিল্প বিশেষ করে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করেও রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে পোশাকশিল্পের মতো এই দুটি খাতও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে।
কিন্তু আমরা তো আর স্বাভাবিক এ অর্জনে থেমে থাকতে পারি না। এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্মই এই এগিয়ে নেওয়ার কাজটি করবে। আমি মনে করি সঠিকভাবেই তারা সেটি পারবে। কারণ অর্থনীতির বর্তমান শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎটা আরও একটু মজবুত ও সমৃদ্ধ করতে তো তাদের খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা নয়।
এ কে আজাদ: সভাপতি, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






