কৃষিতে শিল্পায়ন: পোলট্রি ও ফিশারিজ ক্ষেত্রেও এক দশকে নীরব বিপ্লব ঘটেছে
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা মূল চ্যালেঞ্জ
-
শিমখেতের পরিচর্যা
-
আমজাদ খান চৌধুরী
যেকোনো দেশের কিছু কিছু ‘কমপিটিটিভ অ্যাডভানটেজ’ অর্থাৎ তুলনামূলক সুবিধা থাকে, যার ওপর ভিত্তি করে সেই দেশ উন্নতি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনামূলক সুবিধা নিহিত রয়েছে কৃষিতে। তাই আমাদের উচিত কৃষিকে শিল্পে রূপান্তর করা। যদিও এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কৃষিকে শিল্পে রূপান্তরের বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, চিলি প্রভৃতি দেশ কৃষির ওপর ভিত্তি করে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে এবং উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ, মাত্র এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার যার বিস্তৃতি, ১৬ কোটি মানুষের আবাসস্থল। মাথাপিছু গড় বাৎসরিক আয় ৮০০ ডলারের মতো, যার কারণে এখনো বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো এখানে খনিজ সম্পদ তেমন একটা নেই। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো দেশের কঠোর পরিশ্রমী জনগণ। এই ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শিল্পায়ন জরুরি।
কৃষির মূল চারটি ক্ষেত্র তথা ফসল উৎপাদন, উদ্যানতত্ত্ব, মৎস্য ও পশুসম্পদকে শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। যদিও শিল্প বলতে আমরা প্রথাগতভাবে কলকারখানা স্থাপন করাকেই বুঝে থাকি। কিন্তু শুধু কলকারখানাই শিল্প নয়।
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অন্যতম সুবিধা হলো প্রথাগত শিল্প-কারখানা স্থাপনে যে বিপুল বিনিয়োগের দরকার পড়ে, এ ক্ষেত্রে তা প্রয়োজন হয় না। স্বল্প পুঁজিতে প্রান্তিক পর্যায়ের যে কেউ এই কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারে। প্রথাগত শিল্পায়নের মাধ্যমে যে নগরায়ণ হয়ে থাকে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মাধ্যমে তা রোধ করা যায়। তাই বাংলাদেশে শিল্পায়নের জন্য আমাদের কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয় নামে পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্পায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় নেই। এক মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে অন্য মন্ত্রণালয়ের কাজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম অন্য মন্ত্রণালয়কে প্রভাবিত করে। যেমন বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের ক্ষেত্রে পশুপালনের বিষয়টি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাপ্ত দুধ প্রক্রিয়াকরণের বিষয়টি শিল্প মন্ত্রণালয়, বাজারজাতকরণের বিষয়গুলো বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে। দেশের মন্ত্রণালয়গুলোকে যদি ঢেলে সাজানো যায় তবে শিল্পায়ন দ্রুততর হতে পারে।
মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাস ছাড়াও জাতীয় বাজেট ও কর-কাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। অনেক সময় বাস্তব প্রয়োজন উপেক্ষা করে শক্তিশালী লবিংয়ে প্রভাবিত হয়ে বাজেটে করারোপ বা কর রহিত করা হয়। দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, এ রকম শিল্পবান্ধব বাজেট ও কর-কাঠামো প্রণয়ন জরুরি।
শিল্পায়নের জন্য অন্যতম প্রয়োজন হলো জ্বালানির। এখন পর্যন্ত জ্বালানির জন্য আমরা গ্যাস ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস ও ডিজেলের স্বল্পতা ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার জন্য বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সস্তা ও সহজলভ্য কয়লার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন কলকারখানায় জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহারে উৎসাহিত করায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
যেকোনো সেক্টরের উন্নয়নের জন্য সঠিক নীতিমালা ও ফোকাস জরুরি। বিগত বছরগুলোতে দেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে উন্নতি লাভ করেছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের পোলট্রি ও ফিশারিজ ক্ষেত্রেও গত এক দশকে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। সরকারের সঠিক নীতিমালা থাকলে যেকোনো সেক্টর যে উন্নতি করতে পারে, এটা তারই প্রমাণ।
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ বলতে আমরা বুঝি, উৎপাদিত ফসলের স্থায়িত্বকাল বৃদ্ধি করা এবং মূল্য সংযোজন করার মাধ্যমে পণ্যের মুনাফা বৃদ্ধি করা। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটানো যায় তবে দেশের সার্বিক কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। এখন পর্যন্ত জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ২৩ শতাংশ আর প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান আর প্রবৃদ্ধি উভয় হার বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
যেকোনো শিল্প বিকাশের জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। শিল্প স্থাপনের জন্য পুঁজি সংগ্রহ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ ব্যাংক ঋণের সুদের হার এখনো অনেক উচ্চ। তা ছাড়া বিদেশ থেকে ক্যাপিটাল মেশিনারি তথা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত ডিউটি, ফি প্রভৃতির ঊর্ধ্বহারের জন্য উদ্যোক্তারা শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেন না।
অপর দিকে আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে অপর একটি বাধা বলা যায়। এমনিতেই এ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে এবং এই বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি-বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করার মাধমে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার প্রায় এক যুগ ধরে কঠোর আমদানিনীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সে দেশের শিল্পভিত্তি গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এমন অনেক পণ্য রয়েছে যেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের তুলনায় আমদানি করা পণ্যের বাজারমূল্য কম। ফলে দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা শিল্প স্থাপনের তুলনায় আমদানি করতেই বেশি উৎসাহী হচ্ছেন।
মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে পুরো বিশ্বের বাজার আমাদের কাছে উন্মুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শুল্কমুক্ত ও কোটা-সুবিধার মাধ্যমে প্রবেশাধিকার আমাদের রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সেখান থেকে আমরা প্রয়োজনীয় সুবিধাটুকু আদায় করে নিতে পারছি না। সাপটা চুক্তিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক চুক্তি অকার্যকর হয়ে রয়েছে। এগুলোকে কার্যকর করতে সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে ১৬ কোটি মানুষের আবাস। এর সঙ্গে রপ্তানি-বাণিজ্যের কিয়দংশ যুক্ত হলে তা যেকোনো শিল্পের জন্য একটি বিশাল বাজারে পরিণত হবে। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের নেতিবাচক ইমেজ। আর এই সুযোগে বাংলাদেশের পণ্য আমদানিকারক দেশগুলো বিভিন্নভাবে শুল্ক-অশুল্ক বাধা আরোপের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং তথা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম প্রতিষ্ঠা করা এবং রপ্তানিযোগ্য শিল্প স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রপ্তানি-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য সরকার, গণমাধ্যমসহ সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষত ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্ব আজ আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো গণমাধ্যমের খবর মুুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। তেমনি আমরাও বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানের খবর পাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ বাড়াতে গণমাধ্যমগুলোকে উন্নয়ন সাংবাদিকতা তথা ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজমের প্রতি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বিদেশে বাংলাদেশি মিশনসমূহ এবং সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশিদেরও অবদান রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের শিল্প স্থাপনে বাড়তি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেশের শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে সব সময়ই অন্তরায়। বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে কিছু কিছু বিষয়ে একমত হতে হবে।
এ কথা সত্য যে আমাদের দেশে অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে শ্রমিক পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে। তা ছাড়া দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ কর্মহীন বেকার। একাংশ প্রচ্ছন্ন বেকারত্বের মধ্যে থাকছে। এর সঙ্গে প্রতিবছর নতুন শিক্ষিত কর্মহীন বেকার যুক্ত হচ্ছে। ফলে বেকার সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এই বেকার জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নকাজের অংশীদার করতে হবে।
দুগ্ধশিল্পে ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগ থাকলেও হাতে গোনা দু-একটি ছাড়া তেমন কোনো বৃহৎ উদ্যোগ নজরে পড়ে না। দুগ্ধশিল্প এমন একটি খাত, যেখানে সব বয়সের নারী-পুরুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। দুগ্ধশিল্পের বিকাশের জন্য সর্বাগ্রে যা প্রয়োজন তাহলো দেশীয় গাভির জাত উন্নয়ন। উন্নত জাতের গাভি থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ৩০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশীয় গাভি থেকে তা পাওয়া যায় না। দেশীয় গাভির জাত উন্নয়নের মাধ্যমে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে একটি গাভি থেকে ১০-১৫ লিটার দুধ পেতে পারি। আমরা দেখেছি, একটি উন্নত জাতের গাভি দিয়ে সাত সদস্যের একটি পরিবারের খরচ মেটানো সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে এখনো গবাদিপশু লালনপালনের দায়িত্ব থাকে মহিলাদের ওপর। আমাদের এই মানসিকতা (মাইন্ডসেট) পরিবর্তন করতে হবে। গবাদিপশু পালনকে পেশা হিসেবে নিয়ে এটিকে উপার্জনের পথ হিসেবে দেখতে হবে। তবেই দুগ্ধশিল্পের বিকাশ ঘটবে।
তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের সুবিধা হলো মূল্য সংযোজিত কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সৃষ্টি করা। আর সার্বিক বিচারে দেশের কৃষি অর্থনীতিকে বেগবান করায় প্রয়োজন কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের। এমনভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে নগরায়ণ রোধ করা সম্ভব হয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য সৃষ্টি না হয় এবং সর্বোপরি দেশে-বিদেশে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি করা যায়। বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, শুধু প্রয়োজন নির্দিষ্ট সেক্টরকে চিহ্নিত করে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। লক্ষ্য যদি সঠিক থাকে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায় তবে ১০ বছরের মধ্যেই এই সেক্টরের প্রভূত উন্নতি করা সম্ভব। আমরা বিশ্বাস করি, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।
মেজর জেনারেল আমজাদ খান চৌধুরী (অব.): প্রধান নির্বাহী, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






