শিক্ষা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় আমরা অনেক দূর এগিয়েছি
আমাদের শিক্ষাচিত্র ও বৃষ্টি উপাখ্যান
-
এখন দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়তে পারছে মেয়েরা
-
রাশেদা কে. চৌধূরী
ঢাকার দরিদ্র, বস্তিবাসী পরিবারের একটি মেয়ে, নাম তার ‘বৃষ্টি’। ১৯৯৬ সালের ভরা বর্ষায় বৃষ্টির অঝোর ধারার সঙ্গে পৃথিবীর আলোয় এসেছিল ফুটফুটে এই মানবসন্তান। মা-বাবা আদর করে তাঁদের প্রথম এ সন্তানের নাম রেখেছিলেন ‘বৃষ্টি’।
চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটিকে যখন দেখি, তখন তার মাকে বলেছিলাম, ওকে স্কুলে দিতেই হবে এবং যত দূর পর্যন্ত পড়তে চায় পড়বে। মা হেসে বলেছিলেন, ‘পড়াতে তো চাই, কিন্তু এত খরচ চালাব কী করে?’ আমিও হার মানতে রাজি ছিলাম না, বলেছিলাম, ওর পড়ালেখার দায়িত্ব আমার। সে প্রতিশ্রুতি আমি পালন করেছি। ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা মিষ্টি মেয়েটি ২০১২ সালের এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগে দেখা করতে এল। তার চোখে-মুখে শুধু বুদ্ধিদীপ্ততাই নয়, দেখলাম শাণিত মেধার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিসীম আত্মবিশ্বাস। একসময় পরীক্ষা শেষ হলো। মায়ের কাছে শুনলাম, সবকিছু ভালো হয়েছে। এক সপ্তাহ পরেই তার মা-বাবা দুজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। কিছুটা বিব্রতভাবে ব্যক্ত করলেন তাঁদের ইচ্ছা—বৃষ্টির জন্য একজন চাকরিজীবী, মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের ছেলে পাওয়া গেছে। বিয়েটা যত দূর সম্ভব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে চান তাঁরা! হতভম্ব, নির্বাক আমি। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদে জানালাম, কোনো কথা শুনতে চাই না। বৃষ্টি চিকিৎসক হতে চায়, তাই তার পড়ালেখা শেষ না করে এসব চিন্তা করা যাবে না। অবনত মস্তকে কোনো কথা না বলে মা-বাবা বিদায় নিলেন। ভাবলাম, বাঁচা গেল। বাংলাদেশের একটি মেয়ের এমন কাহিনি আমাকে আর কষ্ট দেবে না। কিন্তু...।
পরের দিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে হতবাক। আমার বাসার গেটের সামনে বস্তির শ্রমজীবী মানুষের ভিড়! জানতে চাইলাম, কী ঘটেছে? দুই থেকে তিনজন মুরব্বি গোছের মানুষ আমাকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আপা, আপনি এত দিন বৃষ্টির লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন, কিন্তু এখন তো ওর ঘরে থাকা নিরাপদ নয়। পাড়ার খারাপ লোকজন ত্যক্ত করছে, কখন জোর করে তুলে নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আছি আমরা। বিয়ে দিলে সেই ভয় কমে যাবে, আমরাও নিশ্চিন্ত হব।’ ক্ষুব্ধ হয়ে যখন এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গেলাম, তখন বুলেটের মতো বুকে বিঁধল তাঁদের সরব কণ্ঠ, ‘আপা, বুঝলাম আপনি ওর পড়ালেখার ভার নিতে পারবেন, কিন্তু নিরাপত্তা দিতে পারবেন কী?’ থমকে গেলাম। এ দেশের শত-সহস্র নারী যেখানে ঘরে-বাইরে, পথে-প্রান্তরে, কর্মস্থলে নির্যাতনের শিকার হন, রাষ্ট্র যেখানে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেখানে আমি কী করে বৃষ্টিকে ঘরে-বাইরে নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা দেব?
পারলাম না, হেরে গেলাম। বৃষ্টির বিয়ে হয়ে গেল। কিছুদিন পর এসএসসির ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার সংবাদ নিয়ে এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে হাজির হলো বস্তির শ্রমজীবী পরিবারের সেই বালিকাবধূ। আমাকে জড়িয়ে ধরে তার অঝর কান্না আমার বিবেককে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করল—কোন সমাজে বসবাস করছি আমরা!
বৃষ্টির এই কাহিনি এ দেশের অগণিত পরিবারে মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের বাস্তব চিত্র। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও বলছে, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশের বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৫ বছর হওয়ার আগে! এ দেশে কন্যাশিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে যত অর্জন, সেটি এভাবেই ম্লান হয়ে যায়।
কিন্তু এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলেমেয়ের সমতা অর্জন করেছি। এর পেছনে অবশ্যই কাজ করেছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সহায়ক নীতিমালা। আমাদের দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল এখানে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এক সরকার সব শিশুর জন্য পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক করেছে, আরেক সরকার এসে কন্যাশিশুর জন্য সেটিকে এগিয়ে নিয়েছে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। পরের সরকার এসে দশম এবং তার পরের সরকার সেটিকে করেছে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। এখন দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়তে পারছে মেয়েরা!
এটিও আজ অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে শিক্ষার জন্য ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের অনেক রাজ্যে এখনো এটি করা সম্ভব হয়নি, যেখানে অনেক সময় গ্রামের কৃষক সোজাসাপ্টা বলে দেবেন, ‘লেখাপড়া শিখে কী লাভ?’ অথচ আমাদের দেশের যেকোনো শ্রমজীবী মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও উত্তর দেবেন, ‘পড়াতে তো চাই। কীভাবে, কোথায় পড়াব? খরচ চালাব কী করে?’ আপামর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার এই চাহিদা তৈরি করতে পারাটাও কম বড় অর্জন নয়।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এবং দীর্ঘদিন পর হলেও আমরা একটি ‘শিক্ষানীতি’ পেয়েছি। এটিও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন। এ নীতিতে শিক্ষায় বিরাজমান বৈষম্য স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এবং তা দূরীকরণে বহুবিধ কৌশলের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নানা ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা থাকতেই পারে। এটি মানুষের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু এর মাধ্যমে যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা দূর করা এবং এ জন্য শিক্ষানীতিতে প্রস্তাব করা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ন্যূনতম কিছু পাঠ্যসূচি সব ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা। আশা করা যায়, এতে চিন্তা-চেতনার বৈষম্য কমে আসবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানোর প্রস্তাবনাও আমরা দেখেছি শিক্ষানীতিতে। কিন্তু আমাদের জাতীয় বাজেটে এর তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। চলতি বছর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে যৎসামান্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, গত বছরের তুলনায় এ বছর কমে গেছে শিক্ষা বাজেট! শিক্ষার্থী বেড়ে গেলেও বাজেট কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দ কমে গেছে আমাদের। তাহলে রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে?
সব নাগরিকের শিক্ষা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব অবশ্য রাষ্ট্রের। সেখানে বিনিয়োগও নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় বহুমুখী বৈষম্য তৈরির কারণে পরিবারগুলোকে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, যেটি আগে রাষ্ট্র করত।
বাংলাদেশের সংবিধানে সবার জন্য ‘একই ধারার শিক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সেটা থেকে আমরা ধীরে ধীরে অনেক দূরে সরে এসেছি। এ মুহূর্তে অনেক ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি চালু রয়েছে বাংলাদেশে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ১১টি ধারা চালু আছে। তবে মোটা দাগে তিনটি ধারা বিরাজমান—বাংলা মূলধারা, ধর্মীয় ও ইংরেজি মাধ্যম। এসব শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সমাজব্যবস্থা ও চিন্তা-চেতনায় একধরনের বৈষম্য তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এই নেতিবাচক পরিবর্তনটা অবশ্য এসেছে বিশ্বব্যাপী। শিক্ষা এখন পরিণত হয়েছে পণ্যে, মানবাধিকার হিসেবে নয়, বরং একধরনের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যে যত বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, সে হচ্ছে ততই লাভবান।
ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ অবারিত থাকায় প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে ভুঁইফোড় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মোটামুটি তদারকির একটি ধারার মধ্যে আনার চেষ্টা হয়েছে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে। কিন্তু ভুঁইফোড় হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসার ওপর সরকারের তদারকি তেমন নেই। গ্রামে-গঞ্জে বেশির ভাগ মাদ্রাসায় থাকা-খাওয়া ফ্রি। দরিদ্র অভিভাবকেরা স্বভাবতই সেদিকে বেশি ঝোঁকেন। কিন্তু সেখানে শিক্ষার মান কী রকম, মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে তাদের কোনো সংগতি আছে কি না, এসব বিষয়ে অনেক প্রশ্ন আছে।
‘কওমি মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারের তদারকের আওতায় আসে না। এসব মাদ্রাসার ক্ষেত্রে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব আছে। জেলা শিক্ষা প্রশাসনের আওতাধীন এলাকায় কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটি আছে, আদমশুমারির মাধ্যমে সে তথ্য উঠে আসার কথা। কিন্তু সেখানেও আমরা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাই না। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে কী করে, কীভাবে শ্রমবাজারে সম্পৃক্ত হয়, কীভাবে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠে—এসব বিষয়ে আমাদের তেমন ধারণা নেই। দেশের শিক্ষার কোনো চলমান ধারা সম্পর্কে ধারণার এ অস্বচ্ছতা ভালো লক্ষণ নয়।
নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে দাবি করা হচ্ছে, স্থানীয় সরকারকে শিক্ষা তদারকের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকারকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে। তাদের কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকের ভার দিলে অনেক তথ্য পাওয়া যেত এবং শিক্ষার মানও ভালো হতো।
মূলধারার বিদ্যালয়গুলোয়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। শিক্ষার মানও সন্তোষজনক নয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়মিত পরিচালিত ‘যোগ্যতা মূল্যায়নের ফলাফল’ জনসমক্ষে তেমন একটা প্রচারিত হয়নি। এতে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের প্রয়োজনীয় শিখন দক্ষতা অর্জন এবং পরবর্তী শিখনের ভিত্তি স্থাপনের প্রধান কাজটি করতে অনেকাংশে সফল হচ্ছে না। এই ফলাফল ‘এডুকেশন ওয়াচ’ ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত অন্যান্য স্বাধীন মূল্যায়নের ফলাফলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এসব ফলাফল ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাশের উচ্চ হারের সঙ্গে মেলে না। তাই এ বিষয়ে আরও নিবিড় ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার প্রয়োজন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষাগুলোয় ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যবই থেকে মুখস্থ করার সক্ষমতার চেয়ে তাদের প্রকৃত শিখন দক্ষতা কতটা পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে, এ বিষয়টি যাচাই করা দরকার।
অবশ্য এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এ পর্যায়গুলো ছাড়াও প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোয় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যদিও এগুলোয় প্রধানত একটি বিশেষ শ্রেণীর জনগোষ্ঠী অনেক বেশি সুযোগ পায়। শুধু শিক্ষার্থীই নয়, শিক্ষকদের মধ্যেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে কারিগরি শিক্ষায় এই হার অবিশ্বাস্য রকম কম। এ ধারার শিক্ষায় যাঁরা ভর্তি হন, তাঁদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৪ শতাংশেরও কম। এসব প্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামোর সমস্যা আছে। নারী শিক্ষক নেই বলে মা-বাবারাও সেখানে পাঠাতে আগ্রহী হন না। অনেক প্রতিষ্ঠানে আবাসনসুবিধা নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে একদিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে, অন্যদিকে কৌশল ও বিনিয়োগ সঠিক হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে আমাদের শিক্ষকেরা এখন জাতীয়করণের দাবি তুলছেন। দাবিটি ন্যায্য হলেও, এটি করলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। তথাকথিত ‘ভালো’ স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থীপ্রতি কত ব্যয় হয়, আর গ্রামে-গঞ্জে, সরকারি-বেসরকারিভাবে পরিচালিত মূলধারার স্কুলগুলোয় ব্যয় কত হয়, তা দেখা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে ফলজনিত বৈষম্য কম দৃশ্যমান হলেও, ওপরের স্তরে তা এখনো বিদ্যমান। গ্রামের স্কুলগুলো কিছু ক্ষেত্রে ভালো করছে। কিন্তু অষ্টম শ্রেণী সমাপনী পরীক্ষার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, শহরের নামীদামি স্কুলগুলোই ভালো করছে। এসএসসি এবং এইচএসসিতে গিয়ে এটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে—মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং, সেখানে কারা যেতে পারে? তাদের সিংহভাগই মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের। শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন মানুষের কাছে শিক্ষা ক্রমাগত বিলাসদ্রব্য হয়ে উঠছে।
গ্রামের একজন কৃষকের মেয়ে, সে যদি অদম্য মেধাবীও হয়, সে যদি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে, কিন্তু এর খরচ নির্বাহ করে পড়ালেখা চালানো তার পক্ষে কি সম্ভব? ছেলে হলে সে হয়তো মেসে থেকে পড়তে পারত। একটি মেয়েকে কোনো সুবিধাবঞ্চিত পরিবার এ সুযোগ দিতে দ্বিধা করে। কাজেই, এসব ক্ষেত্রে আমাদের সঠিক কৌশল নির্ধারণ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
সরকার ইদানীং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে যেমন—সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও জাপানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দশম বা দ্বাদশ শ্রেণী পাস করেই চলে যায় কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় এবং পরবর্তী সময়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়। আমাদের দেশে এ ধরনের শিক্ষা এখনো অবহেলিত। সমাজে এখনো শ্রমের মর্যাদা আমরা সেভাবে দিই না। উচ্চশিক্ষা ও উচ্চ পদের অনেক বেশি মোহ আমাদের। বিশেষ করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি অনেক বেশি লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা-চেতনার একটা ঘাটতি রয়ে গেছে।
অবশ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি অর্থনৈতিক দিক থেকে যেমন বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি এটি করতে গিয়ে কোনো মানবসন্তানের মানবাধিকারের বিষয়টি যেন উপেক্ষিত না থাকে, সেদিকেও দৃষ্টি থাকা চাই।
অদম্য অনেক বাধা যখন দূর করা সম্ভব হয়েছে, তখন অন্য বাধাগুলোও অনতিক্রম্য নয়। এ জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যথাযথ কৌশল, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং এর সদ্ব্যবহার জরুরি। এটি না করতে পারলে আমরা হয়তো বেশি দূর এগোতে পারব না। যতটুকু এগিয়েছি, সেখানেই হোঁচট খেতে হবে আমাদের। তবে এ দেশের সংগ্রামী মানুষের আত্মত্যাগ ও তিতিক্ষার ইতিহাস আমাদের সামনে চলার পাথেয় হয়ে থাকবে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নিশ্চয়ই অব্যাহত থাকবে।
রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






