আদিবাসী: মিডিয়া আদিবাসী বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চকণ্ঠ

স্বপ্ন দেখার অধিকার

সঞ্জীব দ্রং | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • আদিবাসী উত্সব

    আদিবাসী উত্সব

  • সঞ্জীব দ্রং

    সঞ্জীব দ্রং

জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগ ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বের আদিবাসীদের অবস্থা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল নিউইয়র্ক সদর দপ্তর থেকে। এই রিপোর্টের প্রথম অধ্যায়ে একটি আদিবাসী কবিতা ছাপা হয়েছে। আমি কবিতাটি রূপান্তরের চেষ্টা করলাম:
‘যত দিন আমাদের নদী ছিল,
যত দিন নদীতে জল ছিল,
মাছেরা সাঁতার কাটত।
যত দিন ভূমি ছিল আমাদের,
সবুজ ঘাস ছিল আমাদের,
সেখানে পশুপাখি বিচরণ করত।
যত দিন আমাদের বনে বড় বৃক্ষ ছিল,
যত দিন তাতে বন্য প্রাণী লুকাতে পারত,
তত দিন পৃথিবীতে আমরা নিরাপদ ছিলাম।’
এই রিপোর্টের মুখবন্ধে জাতিসংঘ আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মি. শা জুকাং বলেছেন, আদিবাসী জনগণ বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলের অধিকারী ও রক্ষাকারী। আদিবাসীরাই পৃথিবীর নানা ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারক ও বাহক। আদিবাসীদের প্রাচীন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান বিশ্বের অমূল্য সম্পদ, যা মানবসমাজকে স্মরণাতীতকাল থেকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি বলেছেন, বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের জন্য এত অবদান সত্ত্বেও আদিবাসী জনগণ নানামুখী শোষণ, বৈষম্য, প্রান্তিকতা, অতিদরিদ্রতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের শিকার হচ্ছে। অনেক আদিবাসী তাদের স্বতঃসিদ্ধ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও আদিবাসী জীবনপ্রণালিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। আদিবাসীদের নিজস্ব প্রথা, রীতিনীতি, ভাষা, জীবনধারা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক জায়গায় আদিবাসী সমাজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেছেন, রাষ্ট্রগুলো আদিবাসী জনগণের ওপর এই হুমকিগুলোকে স্বীকার করে নিচ্ছে এবং কোথাও কোথাও আদিবাসী অধিকার স্বীকৃত হচ্ছে। এ রিপোর্টের ভূমিকায় বলা হয়েছে, জাতিসংঘের প্রথম ৬০ বছরে অনেক অর্জন সূচিত হলেও এখনো সমাজের অতিদরিদ্র জনগণ, অতিপ্রান্তিক মানুষ এবং আদিবাসীরা মৌলিক মানবাধিকার, উন্নয়নের সুফল ও নিরাপত্তা ভোগ করতে পারছে না।

১.
আদিবাসী ইস্যুতে পৃথিবীর অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নরওয়েসহ স্ক্যানডিনেভিয়ান কয়েকটি দেশে সামি আদিবাসীদের স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট আছে। আমরা তাদের উদাহরণ দিই। নেপালের কনস্টিটিউশন অ্যাসেম্বলিতে জনজাতিদের বড় ভূমিকা এবং তাদের সংসদের স্পিকার ছিলেন লিমবু আদিবাসী। অস্ট্রেলিয়া সরকার অতীতের ভুল আচরণের জন্য পার্লামেন্টে আদিবাসীদের কাছে ঐতিহাসিক ক্ষমা চেয়ে বলেছে, ‘এই ক্ষমা প্রার্থনা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আমরা একে অন্যের যাতনা বুঝতে পারব এবং সামনে অগ্রসর হতে পারব।’ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস আইমারা আদিবাসী সন্তান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এসে একবার তিনি আদিবাসী পোশাক পরে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। হয়তো অনেকে কষ্ট পাবেন এই উদাহরণের জন্য যে, পাকিস্তানেও প্রভিনশিয়ালি অ্যাডমিনিস্টারড ট্রাইবাল এরিয়া এবং ফেডারালি অ্যাডমিনিস্টারড ট্রাইবাল এরিয়া (পাটা ও ফাটা) আছে, যা চিত্রল, দির, সোয়াট, খাইবার, কারাম, নর্থ ওয়ারিজিস্তান প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত। স্বশাসনের সবচেয়ে ভালো নমুনা হলো ভারতের আদিবাসী অঞ্চলগুলো। আমরা কেন তাদের কাছ থেকে শিখব না?

২.
আমাদের দেশে স্বাধীনতার ৪১ বছরে যা হয়েছে, তা হলো আদিবাসী ইস্যু নিয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে একধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে, মিডিয়া আদিবাসী বিষয়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চকণ্ঠ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ডানিডা, ইউএনডিপি, আইএলও, ইউনেসকো, ইউনিসেফসহ অনেকে আদিবাসীদের উন্নয়নে পদক্ষেপ নিয়েছে আমাদের দেশে। এনজিওদের মধ্যে বেশ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষানীতিতে আদিবাসী বিষয় যুক্ত হয়েছে। নারী উন্নয়ননীতি, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ইত্যাদিতে আদিবাসী ইস্যু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সংবিধানে আদিবাসী বিষয় এসেছে অন্য রকমভাবে। এখানে আবার অন্যান্য সমস্যা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। সরকার ‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে ‘দেশে আদিবাসী নেই’ বলে জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছে, যা দেখে আদিবাসীরা মর্মাহত হচ্ছে। তাই প্রশ্ন করি, আমাদের রাষ্ট্র কি ঠিকমতো চলেছে? স্বাধীনতার এই দীর্ঘ সময়ে আমরা আজ কোথায়?

৩.
রাষ্ট্র ও আদিবাসী জনগণ—এ বিষয়ে কথা বলতে হলে আগে ব্রিটিশ আমলে একজন মুন্ডা আদিবাসী হেডম্যান পহানের উক্তি তুলে ধরতে হয়। প্রখ্যাত লেখক মহাশ্বেতা দেবী তাঁর চোট্টি মুন্ডা ও তীর উপন্যাসে ব্রিটিশ আমলের এক মুন্ডা হেডম্যান পহানকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?’ মুন্ডা আদিবাসীরা জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছিলেন, ইংরেজ মানেই ব্রিটিশ এবং শাসক, আর তারা ভালো নয়। কলোনিয়াল শাসক ব্রিটিশ চলে গেল, পরাধীন ভারতবর্ষ নেই, পাকিস্তানি শাসক নেই, এখন ৪১ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ। আজ এত বছর পর আমি একজন আদিবাসী মানুষ এই প্রশ্ন রাখলাম, ‘তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?’ আজও কেন পাহাড়ে আদিবাসী মানুষকে হাহাকার করতে হয়? কেন তারা প্রশ্ন করে, কেন তারা বলে, এখানে এখনো জীবন আমাদের নয়, লাইফ ইজ স্টিল নট আওয়ার্স।

৪.
আজ বিশ্বের ৯০টি দেশের ৪০ কোটি আদিবাসী আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক আচরণের শিকার। আধুনিক রাষ্ট্র এযাবৎ বহুজাতিক কোম্পানি, পুঁজিপতি ও শক্তিমানদের পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিচর্যা করে এসেছে। এই দীর্ঘ সময়ে আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব জগৎ, বসতভূমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার হারিয়েছে। যে পাহাড় ও বনকে তারা স্বতঃসিদ্ধ বলে তাদের ঐতিহ্যগত অধিকার হিসেবে দেখত, রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা না করে সেখান থেকে তাদের উচ্ছেদ করেছে। বাঁধ, সংরক্ষিত এলাকা, ন্যাশনাল পার্ক, ইকো-ট্যুরিজম, সামাজিক বনায়ন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—এসব নানা প্রকল্পের দ্বারা আদিবাসীদের উন্নয়ন তো হয়ইনি, বরং তারা হয়েছে এসব কারণে উচ্ছেদের শিকার। তাদের গ্রাম, বসতভিটা, ফসলের খেত, বিচরণভূমি সব তারা হারিয়েছে, আর অসহায়ের মতো রাষ্ট্র ও মূল স্রোতের মানুষের ‘উন্নয়ন তাণ্ডব’ তারা দেখেছে। ভূমির কাগজ তৈরি করতে হবে, দলিল বানাতে হবে—এ কথা তো তারা জানত না। এর জন্য তারা চেষ্টাও করেনি। সরকারও নিজ থেকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি।

৫.
অনেকে বুঝতে পারে না আদিবাসী মানুষ কেন ক্ষুব্ধ হয়। মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বিখ্যাত বিরসা মুন্ডা উপন্যাসে লিখেছেন, আদিবাসীরা তখনই বিদ্রোহ করে, যখন বাইরের লোক এসে আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেয়, জঙ্গল কেটে আদিবাসীরা যেসব জমি তৈরি করে চাষবাস করছে, তাদের যখন সে জমি থেকে ছলে-বলে-কৌশলে উচ্ছেদ করা হয়। যখন মহাজনেরা নিরক্ষর ও সরল, আইনের মারপ্যাঁচ না-জানা আদিবাসীদের ঋণের জালে বেঁধে ফেলে। যখন আদিবাসীদের এলাকায় খনিজ ও বনজ সম্পদ—এসব নেওয়ার জন্য বড় বড় শিল্প আর ব্যবসা গড়ে ওঠে। কিন্তু তা থেকে যত টাকা আসে, তার কিছুই আদিবাসী অঞ্চলের লোকজনের উন্নতির জন্য খরচ হয় না। যখন আদিবাসীদের সস্তায় কুলি খাটানো হয়, আর সে কাজও তারা সব সময় পায় না বলে দূরদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়। যখন তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প সবকিছু একদিকে অবহেলা করা হয় আর অন্যদিকে তাদের ওপর অন্য রকম ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়।

৬.
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদি মানুষ কি ভালো আছে? আদি অধিবাসী পাহাড়ি ও বাঙালিরা? তাদের জমিতে, যে জমি ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি পূর্বপুরুষের, সেখানে বহিরাগত সেটেলার নিয়ে বসানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে। গরিব বাঙালিকে রাষ্ট্র দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অসহায় পাহাড়িদের বিপক্ষে। কয়েক লাখ সেটেলার বসিয়ে পাহাড়ের চেহারাই বদলে দেওয়া হয়েছে। আমরা কি পাহাড়দেশকে ঢাকার টঙ্গী বা আশুলিয়ার মতো দেখতে চাই ভবিষ্যতে? পর্যটন ও সৌন্দর্যের কথা ভাবার আগে এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে। সেটেলারদের মনে এই ধারণা প্রবলভাবে দেওয়া হয়েছে যে জমিটা সরকারের। তাই সরকারি জমিতে সেটেলাররা ঘরবসতি করতেই পারে। কিন্তু পাহাড়ের ভূমি যে বংশপরম্পরায় (অ্যানসেসট্রাল) আদিবাসীদের, সে কথা সরকার বলে না। আদিবাসীরা বললে তা মানে না। পাহাড়ে চলছে ভূমি লুণ্ঠন। ইকোপার্ক ও পর্যটনের চেষ্টা হচ্ছে আদিবাসী ভূমিতে, যেখানে আদিবাসীদের অংশীদারি ও মালিকানা নেই। আদিবাসী পাহাড়িরা সরকারকে বলেওনি ইকোপার্ক বা পর্যটনশিল্পের কথা। আদিবাসীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ও সংলাপ ছাড়াই, তাদের মতামত না নিয়েই চলছে পরিকল্পনা। আদিবাসীরা গভীর অস্তিত্ব-সংকটে নিমজ্জিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করে সরকার ১৫ বছরেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোই বাস্তবায়ন করেনি। ভূমি কমিশন এখনো অকার্যকর। আর সমতলের আদিবাসীদের জন্য প্রতিশ্রুত ভূমি কমিশনের কোনো খবরই নেই?

৭.
আদিবাসীরা অনেক দেশেই বর্তমান উন্নয়নধারাকে ভয় পায়। কেননা, এই উন্নয়নধারা তাদের সমাজে ও জীবনে বৈষম্য বাড়ায় এবং তাদের সামষ্টিক মূল্যবোধকে ছারখার করে দেয়, যেখানে ছিল সাম্য, মৈত্রী ও সহাবস্থানের চেতনা। তা ছাড়া উন্নয়নের নামে আদিবাসী এলাকায় পাহাড়ের গ্রামে যখন কোনো প্রকল্প আসে, তখন আদিবাসীরা অসহায় হয়ে পড়ে। তারা দেখে, উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকাজে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, বাইরে থেকে আসা মানুষ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আর আদিবাসীরা হয়ে পড়ে নামমাত্র উপকারভোগী বা টার্গেট পিপল। পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন পাহাড়িদের জমিতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, তখন বিদ্যুৎ ঠিকই পাওয়া গেল, কিন্তু পাহাড়িদের বাড়িঘরে বিজলি বাতি জ্বলা তো দূরে থাক, লক্ষাধিক পাহাড়িকে শেষ পর্যন্ত অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হলো উদ্বাস্তু হিসেবে। পুরোপুরি ৫০ বছর হয়ে গেল, ভারতের অরুণাচল-মিজোরামে আশ্রিত সেই পাহাড়ি মানুষ এখনো দেশহীন মানুষ, তাদের নাগরিকত্ব এখনো মেলেনি। এই হলো উন্নয়নের নমুনা বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে। কাপ্তাই বাঁধের কারণে বহু পাহাড়ি মানুষের জীবন ছারখার হয়ে গিয়েছিল। বহু তরুণের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল। চাকমা রাজার রাজবাড়িসহ হাজার মানুষের বসতবাড়ি পানিতে ডুবে গিয়েছিল। এখন কাপ্তাই বাঁধকে পাহাড়িদের দুঃখ বলা হয়। পরবর্তী সময়ে আমরা জানি, কাপ্তাই বাঁধের সেই দুঃখ ও ক্ষোভ থেকে, সেই বঞ্চনা বড় হতে হতে স্বাধীনতার পর পাহাড়িরা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।

৮.
টাঙ্গাইলের মধুপুর বনেও তৎকালীন পাকিস্তানি সরকার একটি জাতীয় উদ্যান গড়ে তুলেছিল ষাটের দশকে আদিবাসী গারোদের ভূমিতে, তাদের উচ্ছেদ করে। কাগজে-কলমে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও ছিল বন সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। ভেতরে উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, আদিবাসী উচ্ছেদ। আজ এই জাতীয় উদ্যান নির্মাণের ৬০ বছর পর আমরা দেখতে পাই, মধুপুর বনের প্রাকৃতিক বৃক্ষ উজাড় হয়ে গেছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসপ্রায়, অরণ্য বিরানভূমিতে পরিণত। আর বনের আদি অধিবাসী গারো ও কোচদের জীবন মুমূর্ষু। বন বিভাগ শত শত নয়, হাজার হাজার মামলা দিয়ে বনের আদি বাসিন্দাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। সবকিছুই হয়েছে উন্নয়নের নামে। এসব প্রকল্পের ফলে স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন হয়নি, দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনা বৃদ্ধি ছাড়া। অন্যদিকে বাইরে থেকে শত শত মানুষ ঢুকে গেছে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ও বনে। আদিবাসীরা পরিণত হয়েছে সংখ্যালঘু নিজ ভূমিতে। মধুপুর জাতীয় পার্ক এখন বাইরের আমোদপ্রিয় লোকদের বনভোজন ও আনন্দভ্রমণের জন্য উপযুক্ত জায়গা, আদিবাসীদের জন্য অযোগ্য। রাঙামাটি লেক এখন নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্পট আর পাহাড়িদের জন্য দুঃখভূমি। তাই এ ধরনের উন্নয়নকে আদিবাসীরা ভয় পায়।
উন্নয়ন করতে হলে আদিবাসীদের মনস্তত্ত্বকে ও জীবনভাবনার বিশ্বজনীনতাকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে মমতা দিয়ে; গায়ের জোরে, শক্তির দাপটে নয়। ওরা এখন অধিকারহীন অসহায় মানুষ। সংবেদনশীল, বিনম্র ভালোবাসা ছাড়া আদিবাসীদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি—সবখানে এ ভালোবাসার প্রতিফলন দরকার। দরকার সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ। দুই-তিন বছর মেয়াদি বিক্ষিপ্ত প্রকল্প দিয়ে আদিবাসীদের এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ওদের মনে যেন এই ধারণা না জন্মায়, ওরা অন্যের দ্বারা শাসিত হচ্ছে, শাসকগোষ্ঠী ওদের শাসন করছে। এই কাজ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং মূল দায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের। সবকিছুর জন্য দরকার আদিবাসীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ। আদিবাসীদেরও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভেরিয়ার এলুইন তাঁর আদিবাসী জগত বইয়ে লিখেছেন, ‘পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জাতীয় স্বার্থেও যেমন প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন পাহাড় ও অরণ্যের মানুষদের স্বার্থে। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে পারি। আদিবাসীদের আমরা অনেক কিছু দিতে পারি, আবার ওদেরও অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেবার মতো।’

৯.
গত বছর ৩০ জুন আদিবাসীদের আকাঙ্ক্ষা ও দাবিকে উপেক্ষা করে সরকার সংবিধানে ২৩ক ধারায় ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অন্যদিকে ৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতিতে বাঙালী বলিয়া পরিচিত হইবে।’ আদিবাসীরা স্বভাবতই এটি গ্রহণ করেনি, তারা দেশব্যাপী প্রতিবাদ করেছে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইংরেজ কমিশনার ক্যাপ্টেন লিউইন ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ সরকারকে লিখেছিলেন, ‘এই পাহাড়-পর্বতগুলোকে আমরা যেন কেবল আমাদের নিজ স্বার্থেই শাসন না করি, আমরা যেন কেবল এই পাহাড় অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বার্থেই, তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের নিমিত্তই শাসনকার্য পারিচালনা করি।’ স্বাধীনতার চার দশক পার হলেও রাষ্ট্র কথাটি উপলব্ধি করতে পারেনি।
১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে ভারতীয় সংবিধানমতে, শিডিউলড এরিয়াজ অ্যান্ড শিডিউলড ট্রাইবস কমিশন গঠিত হয়। ওই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘দ্য ফান্ডামেন্টালস অন অ্যান অ্যাপ্রোচ টু দ্য ট্রাইবস’, যার মূল বক্তব্য ছিল ‘ট্রাইবাল টাচ’ বা ‘আদিবাসীদের প্রতি পক্ষপাত’। এর মানে হলো, আদিবাসীদের চোখ দিয়ে, ওদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সবকিছু দেখার চেষ্টা করা। ভারতের সংবিধানে লেখা আছে: ‘এসব ট্রাইবাল ও আদিবাসীর সংখ্যা ত্রিশ মিলিয়ন। দে শুড বি মেড টু এনজয় দি প্রিভিলেজেস অব সিটিজেনশিপ অ্যান্ড শুড বি অ্যাবল টু টেক পার্ট ইন ডি মেকিং অ্যান্ড স্ট্রেংদেনিং দ্য ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস ইন দ্য কানট্রি। দে শুড রিয়ালাইজ দ্য ফুল অ্যাডভানটেজ অব অ্যাডাল্ট ফ্র্যানচাইজ। দে শুড এনজয় দি ফ্রুটস অব লিবার্টি, ইকুয়ালিটি অ্যান্ড ফ্রেটারনিটি।’ আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে ভারতে আদিবাসী কমিশন হয়েছিল ১৯৬০ সালে। তখন মুক্ত ভারতের বয়স মাত্র ১৩ বছর। আর আমরা ৪১ বছর পার করছি স্বাধীনতার। আমরা কত পিছিয়ে আছি। আদিবাসী বিষয়ে একটি জাতীয় কমিশন এখনই গঠিত হোক। কমিশন রিপোর্ট করুক দেশের ৩০ লাখ আদিবাসীর মানবিক মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য। অসীম নম্রতা ও হূদয়ভরা আন্তরিকতায় লেখা হবে সে রিপোর্ট, এ রকম স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে। আমাদের স্বপ্ন দেখার অধিকার যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে।
সঞ্জীব দ্রং: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন