মাতৃদুগ্ধ: বাংলাদেশে মা ও শিশুর অপুষ্টির চিত্র বেশ খারাপ

মায়ের দুধের তুলনা নেই

এস কে রায় | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
এস কে রায়

এস কে রায়

শিশুর সুস্বাস্থ্য এবং যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা উন্নত জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত। এই বাস্তবতাকে ফলপ্রসূ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা উন্নয়নে জোর দিচ্ছে এবং ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মা ও শিশুর অপুষ্টির চিত্র বেশ খারাপ। জাতিসংঘের বিশ্বের পুষ্টি অবস্থার (ওয়ার্ল্ড নিউট্রিশন সিচুয়েশন) ষষ্ঠ রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৪০ দশমিক ২ শতাংশ শিশুই অপুষ্টির শিকার। এ দেশে প্রতিদিন ২৫০ জন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু অপুষ্টিতে মৃত্যুবরণ করছে।
বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার চারটি দেশের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভিস (বিডিএইচএস) ২০১১ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ বয়স অনুযায়ী কম ওজনসম্পন্ন, ৪১ শতাংশ খর্বকায় এবং ১৬ শতাংশ কৃশকায়। বিডিএইচএস ২০১১ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ৬৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ৫৩ শতাংশ হয়েছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন ২০১৫-এর চতুর্থ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ৪৮ শতাংশের নিচে নিয়ে আসতে হবে, যা থেকে আমরা এখনো অনেক পেছনে আছি।
শিশুর অপুষ্টি ও অপুষ্টিতে মৃত্যুর দুটি প্রধান কারণ হলো সঠিকভাবে মায়ের দুধ না খাওয়ানো ও সঠিকভাবে পরিপূরক খাবার না খাওয়ানো
বিডিএইচএস ২০১১ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ৬৪ শতাংশ মায়ের বুকের দুধ পান করে। দুই মাসের কম বয়সী শিশুদের ৮৫ শতাংশ শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করলেও চার-পাঁচ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ৩৫ শতাংশ শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করে। ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের ২১ শতাংশ পর্যাপ্ত পরিমাণে ও পরিপূরক খাবার খেয়ে থাকে, এই হার ২০০৭-এ ছিল ৪৩ শতাংশ। সঠিক পরিপূরক খাবারের অভ্যাস গ্রামের (১৯ শতাংশ) তুলনায় শহর অঞ্চলে (২৮ শতাংশ) ভালো। স্বাস্থ্য জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি (এইচপিএনএসডিপি) ২০১১-২০১৬-এর মধ্যে ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ও পরিপূরক খাবারপ্রাপ্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৫২ শতাংশ ।
সঠিকভাবে মায়ের দুধ ও পরিপূরক খাবার না খাওয়ানোর একটি কারণ শিশু পুষ্টির উন্নয়নের জন্য দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত কার্যক্রমের অভাব। তবে এটাও লক্ষণীয় যে গুঁড়া দুধ এবং প্যাকেটজাত বাড়তি খাবার তৈরির কোম্পানিগুলো সারা দেশে নীতিবর্জিত আগ্রাসী বাজার প্রসার কৌশল অবলম্বন করে গুঁড়ো দুধ বাজারজাতকরণ অধ্যাদেশ (১৯৮৪) লঙ্ঘন করছে। গুঁড়ো দুধের কোম্পানিগুলো বিভিন্ন হাসপাতালে ডাক্তার, নার্সদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে তাদের পণ্য প্রমোশনের জন্য, ডাক্তার ও নার্সরা মায়ের দুধ খাওয়াতে সাহায্য না করে গুঁড়ো দুধ আনার জন্য কাগজে লিখে দিচ্ছে। মায়েদের কাছেও গুঁড়ো দুধ কোম্পানিগুলো তাদের গুঁড়ো দুধের লিফলেট বিতরণ করছে। এসবের ফলে মায়েরা বিভ্রান্ত হয়ে বুকের দুধ সঠিকভাবে না দিয়ে শিশুদের বোতলে গুঁড়ো দুধ খাওয়াচ্ছে।
বিডিএইচএস ২০০৭-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫-৪৯ বছরের মহিলাদের গড় বিএমআই (ওজন ও উচ্চতার বিশেষ আনুপাতিক সূচক) ২০ দশমিক ৬ হলেও ৩০ শতাংশ মহিলার বিএমআই ১৮ দশমিক ৫-এর কম অর্থাৎ অপুষ্টির শিকার। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হারও অনেক বেশি। সহস্রাব্দ উন্নয়নের পঞ্চম লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ২৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। একটি জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৩১ শতাংশ মায়ের মৃত্যুর কারণ রক্তপাত এবং ২০ শতাংশ মায়ের মৃত্যুর কারণ একলাম্পসিয়া।
এ দেশে অনুপুষ্টির (মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট) অভাবজনিত অপুষ্টির হারও উল্লেখযোগ্য। এইচপিএনএসডিপির লক্ষ্য হলো ২০১৬ সালের মধ্যে ছয় থেকে ৫৯ মাসের ৯০ ভাগ শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা, কিন্তু বিডিএইচএসের হিসাবে ২০১১ সালে ছয় থেকে ৫৯ মাসের শিশুদের মধ্যে ৬০ শতাংশ শিশু ভিটামিন এ ক্যাপসুল গ্রহণ করে, এই হার ২০০৭ সালে ছিল ৮৮ শতাংশ। বিডিএইচএস ২০০৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের ৭৮ শতাংশ ভিটামিন এ সমৃদ্ধ এবং ৫৮ শতাংশ আয়রনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করে। ২০০৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ৪৬ শতাংশ গর্ভবতী নারী এবং ৩০ শতাংশ কিশোরী রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। এ ছাড়া ন্যাশনাল নিউট্রিশন প্রোগ্রামের ২০০৪ সালের জরিপ থেকে চার হাজার ৯৯৩ জন কিশোরীর তথ্য নিয়ে দেখা যায়, ২৬ শতাংশ কৃশকায় এবং ৩২ শতাংশ খর্বকায়। একজন অপুষ্ট মা একটি কম ওজনসম্পন্ন অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়। কম ওজনসম্পন্ন অপুষ্ট শিশুর ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অপুষ্ট ও রোগাক্রান্ত শিশু বড় হয়ে একজন অপুষ্ট কিশোর অথবা কিশোরী এবং পরবর্তী সময়ে অপুষ্ট, কম কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। অপুষ্ট মা পুনরায় অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয় এবং এভাবেই অপুষ্টি এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে বাহিত হতে থাকে। একে বলা হয় অপুষ্টির দুষ্টচক্র।
আমাদের দেশে অপুষ্টির প্রধান কারণ খাদ্যনিরাপত্তা এবং খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। অপুষ্টির দুষ্টচক্র থেকে পরিত্রাণের জন্য যেমন খাদ্যনিরাপত্তা বাড়াতে হবে, তেমনি সঠিক খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সঠিক তথ্যের প্রচার ও প্রসার বাড়াতে হবে। ইউনিসেফের মতে, অপুষ্টির জন্য প্রধানত তিনটি বিষয় দায়ী। এ তিনটি বিষয়ের উন্নতি হলে স্বাভাবিকভাবেই অপুষ্টি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই তিনটি উপাদান হলো খাদ্যনিরাপত্তা, রোগনিয়ন্ত্রণ এবং যত্ন ও পরিচর্যা; তিনটি উপাদানকে একত্রে পুষ্টি ত্রিভুজ বলে।
খাদ্যনিরাপত্তা বলতে একটি পরিবারে সব সদস্যের পুষ্টিচাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যের উপস্থিতি ও প্রাপ্তিকে বোঝায়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে পর্যাপ্ত খাদ্য বলতে পুষ্টিচাহিদা (ক্যালরি, প্রোটিন ও অনুখাদ্য উপাদান) পূরণ করতে পারবে এমন পরিমাণ খাদ্যের উপস্থিতিকে বোঝায়। যখনই একটি শিশুর বা পরিবারের যেকোনো সদস্যের পুষ্টিচাহিদা পূরণ নিশ্চিত হবে, তখনই অপুষ্টি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। আমাদের আয়ত্তের মধ্যে আছে এমন সহজলভ্য খাবার দিয়েই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পুষ্টিচাহিদা পূরণ করা সম্ভব। রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ, খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। বিশেষ করে শিশুদের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কাজেই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে শিশু বারবার অপুষ্টিতে আক্রান্ত হবে। এ ছাড়া অন্যান্য রোগ যেমন ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ বা পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হলে (যেমন হুকওয়ার্ম) শিশুর অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই বেড়ে যায়। তাই এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হওয়া প্রয়োজন। যত্ন বলতে এককথায় সময়মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, শারীরিক যত্ন নেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তি বিশেষ করে শিশুর সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিকভাবে বোঝায়। একটি শিশুকে সময়মতো খাওয়ানো, নতুন খাদ্য গ্রহণে উৎসাহ প্রদান, শিশুর যত্ন, তার অন্যান্য চাহিদা পূরণ, অপুষ্ট শিশুকে খাওয়ানো ইত্যাদি নিশ্চিত হলে শিশু অপুষ্টির হার কমবে।
ইউনিসেফের পুষ্টি ত্রিভুজের ওপর ছয় থেকে নয় মাস বয়সী শিশুদের মায়েদের পুষ্টি শিক্ষা দেওয়ার ফলে দেখা যায় যে পুষ্টি শিক্ষা পাওয়া দলের শিশুদের ওজন শিক্ষা না পাওয়া দলের তুলনায় বৃদ্ধি পায় এবং অপুষ্টির হার কমে যায়। (এসকে রয় অ্যাট আল; ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বুলেটিন, ২৮ ভলিউম, ৪র্থ সংখ্যা, ২০০৭)
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, আমরা যদি পারিবারিক পর্যায়ে সবার জন্য খাদ্য গ্রহণের নিশ্চয়তা নিশ্চিত (যেমন শিশুর পুষ্টিচাহিদা অনুযায়ী পুষ্টি শিক্ষা প্রদান, গৃহ থেকে প্রাপ্ত খাদ্য উপাদান দ্বারা পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য তৈরি এবং সঠিক পদ্ধতিতে শিশুকে খাওয়ানো), রোগ বিস্তার নিয়ন্ত্রণ (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য প্রস্তুতের সময় পরিচ্ছন্নতা, ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে সঠিক ও সুস্পষ্ট তথ্য প্রদান, অসুস্থতার সময় ও অসুস্থতা-পরবর্তী অবস্থায় খাদ্য গ্রহণের ধরন ইত্যাদির মাধ্যমে) এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই একটি সুস্থ, সুখী ও কর্মক্ষম জাতি গড়ে তোলা সম্ভব।
ড. এস কে রায়: পুষ্টিবিশেষজ্ঞ। চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন