বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে
জুলিয়ান ফ্রান্সিস: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তোলা ছবিতে নিজেকে দেখাচ্ছেন
ছবি: প্রথম আলো
বাংলাদেশ ও এর উন্নয়ন বিষয়ে আমার অনুভূতি নিয়ে যখনই লিখতে বলা হয়, তখনই আবিষ্কার করি এ দেশের জন্মমুহূর্ত থেকে কষ্টদায়ক এত বেশি উপলব্ধি আমার রয়েছে যে তার সবকিছু লিখে বোঝানো মুশকিল।
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে সড়কপথে কলকাতা থেকে ঢাকা এসে আমি দেখেছিলাম একটি বিধ্বস্ত দেশ। গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেতু ও কালভার্ট, ফেরিগুলো নিমজ্জিত, বহু খেত পড়ে আছে পতিত। তবে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ দেখিনি, দেশে প্রত্যাবর্তনরত শরণার্থীদের সঙ্গে কথাও বলেছিলাম আমি। তারা আমাকে বলেছিল, বাড়ি ফিরতে পারছে এ জন্য তারা খুশি। একই সঙ্গে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা ছিল শঙ্কিত।
১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে বাংলাদেশে এক উন্মাতাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু ১৯৭২ সালের মার্চ মাস নাগাদ পরিস্থিতি কতটা খারাপ তা আরেকটু স্পষ্ট হয়ে উঠলে আমি আমার (তখনকার) প্রতিষ্ঠান অক্সফামকে একটা চিঠি লিখলাম। তাতে আমি বলেছিলাম, বিশ্বসম্প্রদায় যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য সাহায্য না দিলে এবং অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা না হলে বাংলাদেশ একটা রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে সমর্থ নাও হতে পারে।
আমার জন্য এটা খুবই আনন্দের বিষয় যে আমার ওই ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। ৪০ বছর পর এ সংখ্যা ১৬ কোটির বেশি। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার লোক অনাহারে মারা গিয়েছিল। এখন আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, কেউ আর না খেয়ে মারা যায় না। তাদের প্রতিবেশী ও স্থানীয় কমিউনিটি তা হতে দেয় না। ১৯৭৪-৭৫ সালে যে রৌমারী আমি দেখেছি, তা মোটেই আর সে রকম নেই। এলাকাটি এখন বছরের বেশির ভাগ সময় ফসলে সবুজ থাকে। কাজেই কৃষি খাতের ‘ইতিবাচকতা’ বিশাল, যা সহজেই চোখে পড়বে। এ ছাড়া কম পানি বা লবণাক্ত পানিতে হতে পারে এমন ধানের জাত উদ্ভাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলছে। তবে অনেকেই এটা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন যে একটিমাত্র ফসলের চাষ মাটির গঠন ও উর্বরতার ক্ষতি করছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়ে জমিকে বিষাক্ত করে ফেলা হচ্ছে, এমন কথা বলাবলি করেন অনেক কৃষক। এ ব্যাপারে সঠিক ভারসাম্য রাখাটা হয়তো সত্যিই কঠিন।
সবাই জানে, এই দেশের জন্য তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ কতটা ইতিবাচক হয়েছে। এটি নারীর ভাবমূর্তি বদলে দিতেও সহায়তা করেছে। ১৯৭২ সালে আমি ঢাকার রাস্তায় খুব কম নারীকেই দেখেছি। আর তখন যেসব সরকারি অফিসে গিয়েছি, তাতে কোনো নারী দেখিনি বললেই চলে। আজকের ছবিটা একেবারেই অন্য রকম। মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে নাটকীয় অগ্রগতি ঘটেছে।
আরেকটি বিশাল ইতিবাচক দিক হচ্ছে যোগাযোগের ক্ষেত্রে উন্নয়ন। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রসার। তবে রেলপথে বিনিয়োগের বিষয়টি মর্মান্তিকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা অনেক বড় একটি ভুল। এত দিন ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো যদি রেলপথ ও গণপরিবহনে বিচক্ষণতার সঙ্গে বিনিয়োগ করত, তা হলে সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের কারণে দেশের অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হচ্ছে তা এড়ানো যেত।
যে একটি কাজের ক্ষেত্র আমার হূদয়ের খুব কাছাকাছি তা হচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। গত ২৫ বছরে এ ক্ষেত্রে সরকারি এবং এনজিও উভয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু যেহেতু প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ধরনের অক্ষমতা আছে, সে কারণে এ অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতা উল্লেখযোগ্য কিন্তু এ জন্য প্রাপ্ত তহবিল মোটেই যথেষ্ট নয়। বিতরণব্যবস্থাও এমন নয় যে সবচেয়ে অভাবীরা তা পায়। দুঃখজনকভাবে অনেক সময়ই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটে থাকে। আবার একই সঙ্গে সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষের অনেক অবদানের কথা উঠে আসছে। এর মধ্যে আছে বিভিন্ন আয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড।
বিদেশিরা অনেক সময় প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশকে কেন আমি এত ভালোবাসি। তাঁরা মনে করিয়ে দেন ঢাকা তো বিশ্বের সবচেয়ে বসবাসের অযোগ্য রাজধানী শহর হিসেবে মনোনীত হয়েছে। এখনো ব্যাপক দারিদ্র্য রয়ে গেছে। তাঁদের প্রশ্ন, আমি কি একটু পাগলই হয়ে গেছি তা হলে? এ কথা সত্যি যে ২৫ বছর আগে আমি যখন থাকতাম তখন ঢাকা অনেক বেশি সবুজ ছিল। তখন থেকে নগর কর্মকর্তারা এর বাসিন্দাদের বিরাট ক্ষতি করেছেন। তবে কথা হচ্ছে, আমি যা ভালোবাসি তা হচ্ছে এ দেশের মানুষ—ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণীনির্বিশেষ বাংলাদেশের সব মানুষ আমার প্রিয়জন। তাদের বেশির ভাগই কঠোর পরিশ্রমী, অতিথিপরায়ণ, সহূদয় ও দিলখোলা মানুষ। ১৯৯০-এর শেষ দিকে ‘গণতন্ত্র’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় আমি বাংলাদেশে ছিলাম। তখন সর্বত্র ব্যাপক আশা-উদ্দীপনা ছিল যে দেশ নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাবে। তখন থেকে উল্লেখযোগ্য রকম অগ্রগতি হয়েছে। তবে সংঘাতময় রাজনীতি জেঁকে না বসলে আরও অনেক বেশি উন্নয়ন হতে পারত। আশা করি, আমরা শিগগিরই এর অবসান দেখব। কিন্তু সেটি কবে হবে তা অনুমান করা মুশকিল।
বাংলাদেশিদের সহূদয়তার কথা লিখেছি আমি। এ বছরেরই গোড়ার দিকে বিভিন্ন দেশের যে বেশ কয়েকজন বিদেশিকে বাংলাদেশ সরকার সম্মানিত করেছে, আমি তাঁদের একজন। ১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ছয় লাখ শরণার্থীর জন্য কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে আমাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। আমার জন্য ১৯৭১ সালে প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করতে পারাটা ছিল একটা সম্মানের ব্যাপার। আমি আসলে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় ছিলাম, এই আরকি। আমার মনে হয় না আগে কোনো দেশ এভাবে বিদেশিদের ধন্যবাদ দিয়েছে। এটি সত্যিই একটি অসাধারণ পদক্ষেপ। একটি অসামান্য পুরস্কার।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
জুুলিয়ান ফ্রান্সিস: উন্নয়ন পরামর্শক। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নকাজে যুক্ত রয়েছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু’ পুরস্কারে ভূষিত। যুক্তরাজ্যের নাগরিক।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






