শিশু বয়স থেকেই গান-বাজনার প্রতি প্রবল টান। কলের গানের রেকর্ড শুনে গান শেখার বাসনা আরও তীব্র হয়। কিন্তু বাধা হলো পরিবার। সব বাধা পেরোলেন উদ্যম ও অধ্যবসায়ের জোরে। ভাওয়াইয়া গানের কৃতী শিল্পী হলেন তিনি। খ্যাতিমান প্রশিক্ষক হলেন ওই গানের। তাঁর কাছে প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরা এখন ভাওয়াইয়া গান গেয়ে দেশ-বিদেশ মাতিয়ে বেড়াচ্ছে। এই গানের মানুষটির জীবনগান শুনুন তাঁর কণ্ঠেই
প্রাণের গান ভাওয়াইয়া
ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন হারুন অর রশীদ
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম যেদিন কলের গান শুনি, তখন অবাক হয়ে কলের গানের রেকর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওই সময় আমার বয়স ছিল ৯-১০ বছর। ভেবেছি, কেমন করে রেকর্ড ঘুরছে, গান বাজছে, শিল্পী কে, কে গান গাইছেন? যিনি কলের গানের রেকর্ড বাজাতেন, তাঁকে আমি চাচা বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘এই গান কে গেয়েছেন, একদিন ঠিকই তোমাকে আমি দেখাব।’ শিল্পী দেখার লোভে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসার পথে যে দোকানে কলের গান বাজানো হয়, সেখানে একটু ঢুঁ মারতাম।
এই কলের গানের রেকর্ডে আমারও গান যেন বাজে, এমন চিন্তা মাথায় ঘুরপাক করতে থাকে। কিন্তু গান কীভাবে শিখব। গান শিখতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমার পরিবার। একদিন সাহস করে গান শেখার কথা বললাম। কিন্তু বাবা ও দাদা মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা বললেন, ‘পড়াশোনা করো। কিন্তু গানের কথা যেন মুখে আর না শুনি।’
বাবা ও দাদার বাধার মুখেও আমি ঘরে একাকী নীরবে গুনগুন করে গানে সুর ধরেছি। গ্রামের মেঠোপথে, গাছের নিচে আড়ালে-আবডালে খালি গলায় গান ধরেছি। একটার পর একটা সুর ধরে একাকী গান গেয়েছি। ছিল না কেউ শ্রোতা। তবে মাঝেমধ্যে কেউ দেখে ফেললে লজ্জায় মুখ ঢাকতাম।
একদিন খালি কণ্ঠে প্রথম গান গেয়েছি স্কুলের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। দিনাজপুরের বিরামপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে। সালটা ১৯৬৪। ওই সময় পড়তাম ষষ্ঠ শ্রেণীতে। এই গান শুনে সবার কাছ থেকে উৎসাহ পাই। স্কুলের শিক্ষকেরা আমার গানে মুগ্ধ হন। তাঁরা আমার গানের কথা বাবা-দাদাকে জানালেন। কিন্তু তাঁদের কোনো সাড়া ছিল না। সেই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর আমার বড় দুই বোন হাসিনা বানু ও আমেনা খাতুনের রংপুরের পাগলাপীরের বাড়িতে চলে আসি। আমার এই দুই বোন গান গাইতে সহায়তা করলেন। বড় বোন হাসিনা আমাকে একটি হারমোনিয়াম কিনে দিলেন। তখন আমার আনন্দ আর দেখে কে।
হারমোনিয়ামে গান শিখতে কখনো বাইসাইকেল আবার কখনো হেঁটে ২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যেতাম রংপুর শহরের মুন্সিপাড়ায়। সেখানে এক গানের ওস্তাদের (মরহুম আশরাফুজ্জামান সাজু ভাই) কাছে প্রথম তামিল নিই। এরপর ওস্তাদ খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া, মো. সিরাজউদ্দিনের কাছে গান শিখেছি। এঁদের সবার কাছে আমি ঋণী।
গান গেয়ে আমার সাফল্যও আসে। রংপুর বেতারের নিয়মিত ভাওয়াইয়া শিল্পী হিসেবে ১৯৭৩ সালে মনোনীত হই। সেই থেকে রংপুরের মাটি ও মানুষের গান ভাওয়াইয়া গান গাওয়া শুরু করি।
এর পরও কথা থাকে। আমি তো নিজে গান গাইছি। নতুন করে শিল্পী তৈরি না হলে এই গান এভাবে আর কে-ই বা বাঁচিয়ে রাখবে—মাথায় এমন চিন্তা। এরপর আমার স্বপ্নের যাত্রা শুরু হলো নতুন করে। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। যেখানে বিনা মূল্যে গ্রামের হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের ছেলেমেয়েরা গান শিখতে পারবে।
প্রতিষ্ঠান করার আগে রংপুরের খলেয়াগঞ্জিপুরে আমার বাড়িতেই এই গানের চর্চা শুরু করি। গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এভাবে গান শেখানো অভিভাবকেরা মেনে নিতে পারেন না। গ্রামের ছেলেমেয়েরা গান শিখে কী করবে। বাড়ির অন্য কাজ করলে তো লাভ। এরপর নতুন করে আবার ভাবনা। সুবিধাবঞ্চিত ওই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনারও ব্যয়ভার বহন করব। কিন্তু এত টাকা জুটবে কোথা থেকে। শেষমেশ প্রাইভেট টিউশনি শুরু করি। সেই টাকা দিয়ে নিজের বাড়িতে রেখে সন্তানের মতো লালনপালন করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচও চালাতে থাকি। শুরুতে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র পাঁচজন। তাদের গান গাওয়া এবং সেই সঙ্গে পড়াশোনার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। অন্যান্য অভিভাবকও পাঠাতে থাকেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের। এভাবে একদিন আমার বাড়ির আঙিনা, ঘরদুয়ার ছেলেমেয়েদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে।
এই গানের পাঠশালায় সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের লোকসংগীত ভাওয়াইয়া গানের হাতেখড়ি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এসব শিল্পীর মধ্যে অনেকেই ভালো গান গাওয়ার জন্য দেশে কৃতিত্ব অর্জন করেছে। পুরস্কার পেয়েছে টেলিভিশনে—নতুন কুঁড়ি পুরস্কার। পেয়েছে জাতীয় শিশু পুরস্কার। টেলিভিশন ও বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দেশের বাইরে জাপান, ভুটান, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ডসহ আরও কিছু দেশে সরকারিভাবে গান গাওয়ার জন্য মনোনীত হয়। এদের মধ্যে অনেকেই দেশের স্বনামধন্য ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের সংগীতের সুরে ভরে উঠেছে এ দেশের মাটি। ভাওয়াইয়া গান মানুষের হূদয়জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
সংগীত বিষয়ে আমার এ কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় শনিবারের একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। সাড়া পড়ে যায় দেশ-বিদেশে। আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে ফোন করে। ছুটে আসে আমার কাছে। এই প্রতিবেদন পড়ে বিদেশ থেকেও অনেক ফোন এসেছে। এরপর এই প্রতিবেদনের ওপর আমাকে নিয়ে অনেক ছড়া-কবিতা রচনা করা হয়। এসব কথা বলতে গেলে বুকটা ভরে যায়। অনেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আমাকে সম্মাননা দিয়েছে। বিশ্ব সংগীত দিবসে এই অঞ্চলে ভাওয়াইয়া গানের অনবদ্য অবদানে সম্মানিত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম আলো-গ্রামীণফোনের আয়োজনে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বিশাল বাংলার নেপথ্যের নায়ক’ নামে সম্মাননা দেওয়া হয়।
আমি আরও উৎসাহী হতে থাকি। ভাওয়াইয়া গান যেন হারিয়ে না যায়, এ জন্য নতুন জীবন নিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়াগঞ্জিপুরে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছি। নাম দিয়েছি ‘কচি কণ্ঠের আসর’। আমি এই সংগঠনের মাধ্যমে ভাওয়াইয়া গানকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। তাই আমি এখনো অবিচল। ছুটছি মেঠোপথে। সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে তাদের গলায় সুর বাঁধতে কাজ করে চলেছি। ওরা গাইছে। ওরা এগিয়ে যেতে চাইছে আরও সামনের দিকে। ভাওয়াইয়া গানের নতুন নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে। এরাই টিকিয়ে রাখবে লোকসংগীত ভাওয়াইয়া গান।
আমার জীবনের চলার পথের সামান্য কিছু আশাবাদের কথা বললাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এই গানকে বাঁচিয়ে রাখতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমি আশা করব, মাটি ও মানুষের প্রাণের গান ভাওয়াইয়া যেন এই অঞ্চল থেকে হারিয়ে না যায়।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






