আমার বাংলাদেশ

অ্যান্ড্রু ইগল | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
অ্যান্ড্রু ইগল: হাতিয়ায় গেরস্তের ঘরের আপনজন

অ্যান্ড্রু ইগল: হাতিয়ায় গেরস্তের ঘরের আপনজন

ছবি: প্রথম আলো

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজটা দেওয়া হয়েছে আমাকে। বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে হবে, মাত্র এক হাজার শব্দে। আমাদের বাংলাদেশ অথবা আমার বাংলাদেশ, ১৬ বছর ধরে যা আমার জীবনজুড়ে আছে। ছোট ছোট কোন কথা ছেড়ে কোনটি বলব? এ চেষ্টাই আমি করতাম না, যদি না অনুরোধ আসত খ্যাতনামা সংবাদপত্র প্রথম আলো থেকে, তাদের বর্ষপূর্তি সংখ্যায় লেখার জন্য। চেষ্টা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
‘কেন তুমি বাংলাদেশে থাকছ?’ এ প্রশ্নটা প্রায়ই শুনি। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা হাসাহাসি করেন। ‘বাংলাদেশিরাই যায় অস্ট্রেলিয়া আর তুমি উল্টোটা করলে’, বলেন তাঁরা। একবার এক হাসপাতালের কর্মী আমার বন্ধুকে কড়াভাবে বলেছিলেন, ‘ওকে বলুন, এখানে যেন ওর জীবনটা নষ্ট না করে।’ যদি আমি বলি যে বাংলাদেশে থাকাটা আমি পছন্দ করি, মানুষের প্রতিক্রিয়া হয় নানা রকম। দ্বিধান্বিত আনন্দ থেকে শুরু করে অনিশ্চিত চমক। আর এটাও একটা কারণ বাংলাদেশকে ভালোবাসার।
আমি বলব, অস্ট্রেলিয়া অন্য রকম। সেটা শুধু এই অর্থে যে বাংলাদেশের চিন্তাভাবনা আসে বিনয় আর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার অভাব থেকে আর অস্ট্রেলিয়ানদের প্রতিক্রিয়া হয় পক্ষপাতদুষ্ট মত আর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার অভাব থেকে। আমার বোন একবার বলেছিল, ‘কিন্তু এটা একটা উন্নয়নশীল দেশ।’ মেক্সিকোয় কয়েক ঘণ্টা কাটানো ছাড়া সে আর কোনো উন্নয়নশীল দেশে যায়নি বলেই আমার মনে হয়। সে জানেই না কী নিয়ে সে কথা বলছে। আমার বড় ভাই বলেছিলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের বাস। তাঁর মনে ছিল ভারত বা তার কোনো অংশের কথা। বাংলাদেশ সম্পর্কে জানাশোনা কমই।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের আমি বলি, ‘ঠিক আছে, কিন্তু বাংলাদেশে কাজ পাওয়াটা সবচেয়ে কঠিন। যদি ভালো আয়ের ব্যবস্থা থাকে, তবে এটা থাকার জন্য চমৎকার একটা জায়গা।’
বোনকে আমার কিছু বলার নেই। তার নেতিবাচক মনোভাব বদলানোর নয়। গত বছর মা-বাবা ঢাকা আর হাতিয়ার এক গ্রামে বেড়াতে এসে কত মজা পেয়েছিলেন তা টেলিফোনে বলছিল সে। তার কণ্ঠে ছিল ধাঁধা। গ্রামে মা পরেছেন শাড়ি, বাবা লুঙ্গি—ফেসবুকে এই ছবিগুলো দেখে বাঙালিরা খুব মজা পেয়েছেন। তাঁদের এই পোশাকগুলো উপহার দিয়েছেন আমার বাঙালি পরিবারের সদস্যরা। রক্তের সম্পর্ক নয়, বিয়েরও নয়, তবু তাঁরা গত ১৬ বছরে আমার পরিবার হয়ে গেছেন। কোনো কারণ ছাড়াই যেন এটা হয়ে গেছে। আমার সব অভিভাবকের একটা সুন্দর ছবি আছে। মাম, ড্যাড আর আম্মা। আব্বাকে দেখার আগেই তিনি মারা গেছেন।
বাংলাদেশ: কীভাবে বলি? এই বিকেলের কথাই বলি। দিনাজপুরে ফোনে কথা বলছিলাম আমার বুয়ার মায়ের সঙ্গে। ঈদের শুভেচ্ছার পরই এল সেই কথা: দাওয়াত। জানি, বাংলাদেশের আতিথেয়তার কথা বললে ক্লিশে শোনাবে। কিন্তু এটার উল্লেখ আমাকে করতেই হবে। কারণ, এটা একদম সত্যি। একবার আমার এক ঢাকাইয়া বন্ধু বলেছিল, ‘যদি বাঙালির পকেটে পাঁচ টাকা থাকে, তবে সে বন্ধুদের চা খাইয়ে ১০ টাকা খরচ করবে।’ প্রায় রোজই কোনো না কোনো দাওয়াত পাই। যদিও আমার সুযোগ হয় না সবগুলোতে যাওয়ার। বিদেশি হওয়ার কারণে কোনো কোনো দাওয়াত পেলেও আমি দেখেছি আমার বন্ধু বাঙালিদের প্রতিও তারা কতটা উদার আর অতিথিপরায়ণ হতে পারে। তাই আমি পশ্চিমা বলেই এমনটা হয়, সব সময় তা নয়। আর হাতিয়াতে তো নয়ই।
অবশ্যই আতিথেয়তা আর চিন্তাভাবনা সংস্কৃতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট। একবার আমার মাম আর ড্যাড হাতিয়ার রুক্ষ, নোংরা রাস্তা ধরে ইঞ্জিনচালিত টমটমে করে রহমত বাজারে যাচ্ছিলেন। জায়গাটা সৈকতের কাছে, যেখানে আমি, নাসির আর তার ভাইবোনদের সঙ্গে একবার কাবাডি খেলেছিলাম। যাত্রাটা কিছুটা সাহসেরই ছিল। কারণ, রাস্তার অবস্থা ভালো ছিল না আর এক ছোট্ট সেতুর গর্ত দিয়ে টমটমটা একবার প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
মা-বাবার বয়স সত্তরের ঘরে। রহমত বাজারে পৌঁছে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মা অবশ্য পঙ্কজের টিনশেড সেলুনে চুল কাটার প্রস্তাবটা প্রায় নিয়েই ফেলেছিলেন। বদলে সে কেটে দিল আমার চুল। আমরা ফিরতে পারছিলাম না। কারণ, টমটমচালক আরিফ গিয়েছিল তার বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে। পাশেরই একটি বাড়িতে আমরা বিশ্রাম নিতে গেলাম। তড়িঘড়ি করে তারা উঠানে আমাদের বসার ব্যবস্থা করে দিল।
গৃহকর্তা চাইছিলেন আমরা দুপুরে খেয়ে যাই। আমি তাঁকে ভালো চিনতাম না। আমরা ‘না’ করার পরও তিনি গোপনে রান্নার জন্য বাজার করতে পাঠিয়ে দিলেন। কেউ তাঁর উঠান পর্যন্ত এসে শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে চলে যাবে, এটা তিনি ভাবতেই পারছিলেন না।
এটা নিয়ে একটু ঝামেলাই হলো। মা খুব চিন্তা করছিলেন। তিনি তাঁর অস্ট্রেলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবছিলেন, আমরা অনধিকার প্রবেশ করেছি। তিনি বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘আমরা যে উঠানে বসে আছি তাতে তাঁরা কিছু মনে করছেন না তো?’ আমার মনে পড়ে গেল বাংলাদেশে আসার পর আমি কেমন ছিলাম। অস্ট্রেলিয়ায় কখনো কখনো চিন্তাভাবনা আবর্তিত হয় ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ঘিরে। টমটম এলে মা গৃহকর্তাকে ধন্যবাদ জানালেন ইংরেজি ভাষায়। ব্যাপারটা তাঁর হূদয়ঙ্গম হলো না মোটেও। ভাষার জন্য নয়। হাতিয়ার বাসিন্দাকে ধন্যবাদ জানানো হবে কিছুক্ষণ তাঁর উঠানে বসে থাকার জন্য, এটা যেন বাতাসকে ধন্যবাদ জানানো আমাদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য। তিনি বারবার বলেই যাচ্ছিলেন খাওয়ার কথা। যদি আমরা না খাই তাহলে অন্তত যেন আমার বন্ধুর বাচ্চারা খায়। কাউকে না কাউকে তিনি খাওয়াবেনই!
‘তুমি তাঁকে চেনো?’ মা পরে প্রশ্ন করলেন।
‘যে কেউই এমন করবে।’
সংস্কৃতি আমাদের নতুনভাবে ভাবতে দেয়। আমার মায়ের ভাবনাগুলো যেমন যুক্তিপূর্ণ ছিল, তেমনি সেই গৃহকর্তার আতিথেয়তাও। এটা শুধু একটা ছোট উদাহরণ, কীভাবে এই ব্যাপারগুলো আলাদা হয়। কেন বাংলাদেশ? কারণ, এখানে এত কিছু শেখার আছে, এত কিছু প্রশংসা করার মতো আছে এবং এত আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা আছে। কারণ, বাঙালি রীতিনীতি এক সহজ স্বাভাবিক হয়ে গেছে আমার কাছে, ঠিক অস্ট্রেলিয়ান রীতিনীতির মতোই, যেখানে আমি জন্মেছিলাম।
যখন আমি বছরে একবার বাংলাদেশে আসতাম, অদ্ভুত অনুভূতি হতো। সিডনি ছাড়ার প্লেনে বসে নিশ্চিত সেই ‘চলে যাচ্ছি’ বোধ, ১২ ঘণ্টা পরই ঢাকায় নেমে যেন ‘বাড়ি ফিরেছি’ খুশির ভাবটা ভেতরে জমা হওয়া—কাগজ-কলমে এমন অনুভূতি প্রকাশ করা মুশকিল। শেষ বাক্যটা অস্ট্রেলীয়রা অনেকভাবে বিশ্লেষণ করবেন, যুক্তির মধ্যে ফেলবেন, ধারণ করবেন। আর এখানেই তাঁরা ভুল করবেন। এটা যেন আধ্যাত্মিক আর কাব্যময়। সহজভাবে সবকিছু নেওয়ার যে গুণটা বাঙালিরা দেখায়, উত্তর আছে তার মধ্যেই। কখনো কখনো এমন হয়ই।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
 অ্যান্ড্রু ইগল: অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যান্ড্রু ইগল ১৬ বছর ধরে নিয়মিত আসছেন হাতিয়া, নোয়াখালীতে। তিনি প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন একজন পর্যটক হিসেবে। পুরান ঢাকার কিছু তরুণের আতিথেয়তায় তিনি আকৃষ্ট হন। এর পর থেকে তিনি নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। হাতিয়ার সজ্জন ব্যক্তি রেজা আলী মুবারকের (সিতু) সেবায় তিনি মুগ্ধ হন। এর পর থেকে হাতিয়াকে তিনি নিজের গ্রামের বাড়িই মনে করেন। চার বছর ধরে তিনি ঢাকায় থাকছেন। দ্য ডেইলি স্টার-এর স্টার ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখছেন তিনি। বর্তমানে রহিমআফরোজ গ্রুপের ইতিহাস প্রকল্পের মূল লেখক হিসেবে নিয়োজিত আছেন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন