শিরোনাম:

অভাবের কারণে লেখাপড়া তেমন হয়নি। মা হাসিনা বেগম ছিলেন হাতের কাজে নিপুণা। সেটাই অনুপ্রেরণার উৎস। ফেলে দেওয়া আইচা দিয়ে কিছু জিনিস তৈরি করেন। প্রশংসিতও হলো বন্ধুমহলে। সেই শুরু। পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ হন। ৩০ টাকা অনুদান দেন। সেই ৩০ টাকা মূলধন করে সূচনা হলো তাঁর কুটিরশিল্পের কাজ। ক্রমে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। সেসব গল্প জানাচ্ছেন তিনি

কারুপল্লি গড়ে তুলতে চাই

আনোয়ার হোসেন | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
নিজের কারখানায় কাজ করছেন আনোয়ার হোসেন

নিজের কারখানায় কাজ করছেন আনোয়ার হোসেন

ছবি: সাইফুর রহমান

১৯৬৮ সালের কথা। আর্থিক অভাবের কারণে লেখাপড়া সেভাবে করে উঠতে পারিনি। মাত্র অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেই সময় থেকেই ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা আসে মাথায়—ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র কাজে লাগানো যায় কি না।
ছোটবেলা থেকে মা হাসিনা বেগমকে হাতের কাজ করতে দেখি। তিনি অব্যবহূত জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি করতেন সুন্দর সুন্দর উপকরণ। মায়ের কাজগুলো রপ্ত করার চেষ্টা করি। মা হাতে-কলমে কিছু শিক্ষা দেন। এরপর ফেলে দেওয়া আইচা দিয়ে ঘর সাজানোর কয়েকটি জিনিস তৈরি করে ঘরে রাখি। আমার কাজ দেখে মা জানান, ‘তোর কাজগুলো সুন্দর হয়েছে।’ বন্ধুরাও প্রশংসা করে।
মা ও বন্ধুদের প্রশংসায় আগ্রহ বেড়ে যায়। প্রতিকূলতার মধ্যেই নিজের ভেতর একধরনের উদ্দীপনা জাগে। কিন্তু এসব দিয়ে কি আর পেট চালানো যাবে। কোথায় যাব কী করব, সেই চিন্তায় দিশেহারা। এর মধ্যেও তৈরি করতে থাকি নতুন নতুন জিনিস। কিন্তু এই পণ্যই যে আমার জীবনের একমাত্র অবলম্বন হবে, তা সেদিন ভাবতে পারিনি।
অভাবের সংসার, কী করব ভেবে পাচ্ছি না। ভাবতে থাকি ঢাকায় গিয়ে কিছু করা যায় কি না। ১৯৬৯ সাল। নিজের তৈরি কিছু পণ্য নিয়ে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে ঢাকায় চলে যাই। আমার ভাইয়ের শ্যালক রংমিস্ত্রি মজিবুর রহমান ওরফে মজনু তখন পাকিস্তান রেডিওর ডিরেক্টর দীন মোহাম্মদের ধানমন্ডির বাসায় কাজ করতেন। থাকতেনও সেই বাড়িতে। সেই সূত্রে ওই বাড়িতে আমার অস্থায়ী আশ্রয় হয়।
এখানে থাকা অবস্থায় দেখতে পাই, ওই বাড়ির সামনের একটা বাড়িতে অনেক লোকের আনাগোনা। আমার আত্মীয়র মাধ্যমে জানতে পারি, ওই বাড়িটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। জানার পর থেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার প্রবল ইচ্ছা জাগে মনে। ইচ্ছা হয় আমার তৈরি পণ্য তাঁকে উপহার দিতে। আমার ইচ্ছার কথা জানাই রংমিস্ত্রি আত্মীয়কে। তিনি দীন মোহাম্মদকে বলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দেন।
আমি তখন আমার হাতে তৈরি কিছু উপকরণ নিয়ে হাজির হই ৩২ নম্বরের বাড়িতে। উপকরণগুলো বঙ্গবন্ধুকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি তখনকার আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম মঞ্জুর কাছে। তিনি আমাকে বৈঠকখানায় বসিয়ে সেগুলো বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যান। নিপুণ হাতের তৈরি জিনিসগুলো দেখে তিনি অভিভূত হন এবং আমাকে ভেতরে ডেকে পাঠান। এ সময় বঙ্গবন্ধু আমাকে ৩০ টাকা আর্থিক অনুদান দেন। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া অনুদানই আমার ছিল প্রধান মূলধন।
তাঁর বাড়ি থেকে বের হয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। মনে মনে স্থির করি, আর ঢাকায় নয়। ফিরে যাব বরিশালে। শুরু করব আমার স্বপ্নের কুটিরশিল্প। সেই চিন্তা থেকে ৩০ টাকা মূলধনের ১৭ টাকা দিয়ে একটি হ্যান্ড ড্রিল মেশিন, ধাতু কাটার একটি করাত (হ্যাকস) ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে বরিশালে ফিরে আসি। ওই বছরই গড়ে তুলি মায়ের নামে হাসিনা কুটিরশিল্প।
শুরু করে দিই কুটিরশিল্পের কাজ। প্রথম দিকে আমি ও আমার স্ত্রী রাশিদা বেগমই সব কাজ করতাম। বর্তমানে আমার বড় ছেলে আবদুর রশীদ ওরফে আরিফ কাজ করছে এবং বাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়টি দেখছে। আমরা ছাড়াও ১২ জন কর্মী কাজ করেন। এঁদের মধ্যে আটজন নারী ও চারজন পুরুষ।
অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, আমার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ১২ বছর কাজ করছেন মোমেনা বেগম। তিন কন্যাসন্তান রেখে তাঁর স্বামী চলে যান। এই কারখানায় কাজ করে তাঁর এক কন্যাসন্তানকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়িয়েছেন। সে চাকরিও পেয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোট কন্যাসন্তান স্নাতকে পড়াশোনা করছে। এই সুসংবাদ পেয়ে মোমেনার স্বামী পুনরায় ফিরে এসেছেন তাঁর কাছে।
আমি চাই, অবহেলিত নারী, বিশেষ করে যারা পড়াশোনার সুযোগ পায়নি, তাঁদের হাতে-কলমে কাজ শেখাতে। সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছি। রীমা আক্তারকে কাজের ফাঁকে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা চলছে। ওদের বাড়তি কিছু শেখানোর জন্য দৈনিক একটা ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। কারিগরি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে মাকসুদা বেগম, মারুফা বেগমসহ কয়েকজনকে। অর্থাভাবে এদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। কারও বাবা রিকশাচালক বা শ্রমিক।

শিল্পের উপকরণ
আমি মূল উপকরণ হিসেবে নারকেলের ফেলে দেওয়া আইচা বা মালই (মালা) ব্যবহার করছি। এর সঙ্গে আঠা, বাঁশ, বেত, নল, শলা ও কাঠ ব্যবহার করছি।

সংগ্রহ পদ্ধতি
প্রথম দিকে নিজেই বিভিন্ন স্থান থেকে আইচা সংগ্রহ করতাম। বিনা পয়সায়ই একসময় এগুলো পাওয়া যেত। বর্তমানে আইচার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কিনতে হচ্ছে। ভালো ১০০ নারকেলের আইচা ৬০০ টাকা দরে কিনে আনতে হয়।

নকশা
নকশা (ডিজাইন) বলতে আমার যা মনে আসত তা-ই তৈরি করতাম। এখানে শিক্ষিত কোনো নকশাকার নেই। আমি আমার ছেলে আবদুর রশীদের নিজস্ব সৃজনশীলতায় প্রায় ২৫০ প্রকার পণ্য তৈরি করছি।
আমাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: মালই (আইচা) দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় ফুল শাপলা, টাকা রাখার ব্যাংক, নৌকা, বিভিন্ন দৃশ্য, ঝুলন্ত লাইট, লাইট শেড, চামচ, ফুলের তোড়া, ফুলদানি, উড়কি, চাবির রিং, চুলের ব্যান্ড, মগ, চায়ের কাপ, নামফলক, মাথার ফুল। এগুলো এখন বাংলাদেশের বাজার ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সমস্যা-সম্ভাবনা
জায়গা ও অর্থসংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সংকটের উত্তরণ ঘটাতে পারলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে। আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা না থাকায় এগোনো সম্ভব হচ্ছে না। এই শিল্পের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে ঢাকার আড়ং, কারুঘর, কারুশিল্প, চন্দ্রিমা, ফাতেমা কটেজ, কুমিল্লা হ্যান্ডিক্রাফটসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে সরাসরি রপ্তানি করতে যে পরিমাণ আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজন, তা আমাদের নেই। সিলেটের কারুঘরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে আমাদের তৈরি পণ্য পাঠানো হচ্ছে। আমরা ফ্লোরিডায় পরীক্ষামূলকভাবে কিছু পণ্য পাঠিয়েছি।

স্বপ্ন
বরিশালে একটি কারুপল্লি গড়ে তোলা। যেখানে কুটিরশিল্পভিত্তিক একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে। প্রতিষ্ঠানের মূল বিষয় থাকবে কুটিরশিল্প। গবেষণা হবে কুটিরশিল্প নিয়ে। থাকবে এখানকার শিল্পীদের তৈরি পণ্য বিক্রয় ও বিপণনব্যবস্থা। আধুনিক প্রযুক্তিগত সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে সেখানে। আমার বিশ্বাস, একদিন এই শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এর মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূর হবে। আমার এই শিল্প বেঁচে থাকবে।
কাজের শুরু থেকে এলাকার মানুষ সহযোগিতা করেছে। আর্থিক কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু পরিচিতির কথা বললে প্রথম আলোর কাছে কৃতজ্ঞ। এর আগে বেশ কিছু প্রচারমাধ্যমে আমার কুটিরশিল্পের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে সেভাবে সাড়া মেলেনি।
প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি। বরিশালের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা এখানে এসে পরিদর্শন করে গেছেন। ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের কাছ থেকে অসংখ্য ফোন পেয়েছি। অনেকেই এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন। কেউ কেউ উদ্যোগ নেবেন বলেও জানিয়েছেন। অনেকে সরাসরি এসে দেখে গেছেন। আমার কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে বরিশালে আরও চারটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-৮-এর প্রধান ব্যক্তি এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ সময় তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের পাশে এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান থাকার পরও আমরা তার খোঁজ পাইনি। প্রথম আলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি।’ এরপর র‌্যাব খুলনা অঞ্চল থেকেও আমাদের পণ্য কিনে নিয়েছেন।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন