সফল ও আদর্শ শিক্ষক তিনি। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশ তৈরির জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। সাফল্যের পথে বাধা এসেছে বিস্তর, সহযোগিতাও পেয়েছেন। ১৯৮৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননা পান। তাঁর বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অনুসরণ করে আরও অনেক বিদ্যালয় সফলতা পেয়েছে। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তবু থেমে নেই কর্মধারা। তাঁর নিজের জবানিতেই জানুন এই গল্পের আদ্যোপান্ত

প্রতিজ্ঞা করেছিলাম শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় গড়ে তুলব

নুরুল আলম | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করাচ্ছেন নুরুল আলম

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করাচ্ছেন নুরুল আলম

ছবি: প্রথম আলো

১৯৮১ সালের কথা। সহকারী শিক্ষক হিসেবে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধনিয়ারকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করতে যাই। চাকরির প্রথম দিন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রধান শিক্ষক।
পরে শ্রেণীকক্ষে গেলাম। প্রথমে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করি, তোমরা আমার কাছে কী চাও? শিক্ষার্থীরা বলল, ‘আমরা লেখাপড়ায় আনন্দ চাই। খেলাধুলার পরিবেশ চাই।’ তাদের চাওয়াগুলো মাথায় রেখে পাঠদান শুরু করি।
সহকারী শিক্ষক হয়েও বিদ্যালয়ের পরিবেশ বদলে দিই। বিদ্যালয়টি রাজশাহী বিভাগের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। চারদিকে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঈর্ষান্বিত হন প্রধান শিক্ষক। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বলেন, ‘সহকারী শিক্ষক হয়ে থাকেন। অতি বাড়াবাড়ি করবেন না।’ এ নিয়ে আমাদের দুজনের মধ্যে বাগিবতণ্ডা হয়। তখন আমি প্রতিজ্ঞা করি, কখনো প্রধান শিক্ষক হলে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় গড়ে তুলব।
পদোন্নতি পেয়ে ১৯৮৪ সালে সুন্দরগঞ্জের শিবরাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। সেই প্রতিজ্ঞা থেকে মাঠে নেমে পড়ি। পেশাই আমার নেশা হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের সমস্যা উপলব্ধি করে চেষ্টা করি তা সমাধানের। তিন কক্ষের জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক ও ১২৫ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে যাত্রা। বিদ্যালয়ে সুশৃঙ্খল পরিবেশ, আকর্ষণীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন, শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ ও ব্যবহার, সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি অনুশীলন ও সামগ্রিক প্রতিভা বিকাশের অনুকূল সাংস্কৃতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ড শুরু করি।
শিশুদের মানসিক বিকাশে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জ্ঞানচর্চার নানা রকম ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিদ্যালয়ে শিশু সাময়িকী ও জাতীয় পত্রিকা নিয়ে তা পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলি। বিভিন্ন কক্ষ সাজানো হয় নানা শিক্ষণীয় বিষয় শিশুদের উপযোগী করে। একটি কক্ষের নাম ‘ভৌগোলিক’ দিয়ে সেখানে নদ-নদী, আগ্নেয়গিরি, জলপ্রপাত, বন, মরুভূমি, শহর-বন্দর ও গ্রামের প্রতিকৃতি তৈরি করি। এসব কক্ষের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো বাস্তবতার আলোকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রয়োগ করতে থাকি। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সব বিষয়ের বাস্তব, অর্ধবাস্তব, বস্তুনিরপেক্ষ উপকরণসমূহ তৈরি ও সংগ্রহ করে উপকরণ কক্ষে সংরক্ষণ করেছি, যা পাঠদানের সময় প্রয়োজনানুসারে শেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।
শিশুদের ভৌগোলিক ধারণা প্রদানের জন্য বিদ্যালয়ে ১০টি ভূগোলক ও ৩০টি মানচিত্র রাখার ব্যবস্থা করি। দেয়ালে দেশ-বিদেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনেতাদের ছবি সেঁটে দিই। এ ছাড়া ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কীয় দুর্লভ ছবি সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অন্বেষণের জন্য একটি ইতিহাস ঐতিহ্য কক্ষ সৃষ্টি করেছি। ‘গানে গানে’, ‘পাতায় পাতায়’, ‘দীপের আলো’, ‘ঊর্মিমালা’, ‘নয়নের নীড়’, ‘মমতার মিলন’ প্রভৃতি নামে শ্রেণীকক্ষগুলোর নামকরণ করেছি। বিভিন্ন কক্ষের নিত্যনতুন নামকরণে শিক্ষার্থীরা আনন্দ অনুভব করে। কক্ষগুলো সবার খুব প্রিয়। মুখস্থবিদ্যা পদ্ধতি পরিহার করে আকর্ষণীয় পাঠ উপস্থাপনের মাধ্যমে শিশুদের জয়ফুল পঠন-পাঠন ব্যবস্থায় হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করি। এতে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে শিশুদের।
আমার প্রচেষ্টায় সরকারি উদ্যোগে দুটি দোতলা, একটি পাঁচতলা এবং স্থানীয় উদ্যোগে ২১টি আধা পাকা কক্ষ তৈরি হয়েছে। ফলে বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০টি। এ ছাড়া মোট ২৫টি শৌচাগার, দুটি গুদাম, সংগীত কক্ষ, বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, সহকারী শিক্ষকদের কক্ষ, সভাকক্ষ, পাঁচটি নলকূপ, পানি উত্তোলনের জন্য মোটর, দুটি জেনারেটর, একটি কাপড় ইস্ত্রিকরণ কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিনোদনের জন্য পার্ক ব্যবস্থা চালু করেছি।
আমার স্কুল ও আমাকে নিয়ে ২০০৪ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রথম আলোয় একটি বিশেষ প্রতিবেদন ও ২০০৮ এবং ২০০৯ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায় দুটি পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদনগুলো পড়ে দেশ-বিদেশের মানুষ আমার কথা আরও বেশি করে জানতে পারে। বহু মানুষ আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন।
সঠিক কর্মপরিকল্পনা, ঈর্ষণীয় ফলাফল, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম-সুখ্যাতির কারণে আমি জাতীয় পর্যায়ে ১৯৮৫ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা অর্জন করি। শ্রেষ্ঠত্বের সুবাদে চীন, সিঙ্গাপুর ও ভারত সফর করি। বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ও সাফল্যের ধারাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি, উপদেষ্টা পরিষদ, ছাত্রাবাস ব্যবস্থাপনা পরিষদ ও কল্যাণ সমিতি গঠন করেছি। ১৯৯১ সালে ইউনিসেফ বিদ্যালয়টিকে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৬ সালে বিদ্যালয়টিও জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।
এ ছাড়া আমার প্রচেষ্টায় এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কৃত হয়। ২০০৬ সালে শতভাগ ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতির জন্য দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। বিদ্যালয়ের সাফল্যগাথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যায়। ইতিমধ্যে চীন, ফ্রান্স, পাকিস্তান, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের অসংখ্য প্রতিনিধি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। প্রতি মাসেই দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার লোকজন বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে আসেন।
বিদ্যালয়ে সরকার অনুমোদিত ১১ জন শিক্ষকের সঙ্গে মোট ৬৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ৩০ জন কর্মচারী বেসরকারিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪২৩ জন। এর মধ্যে আবাসিক ছাত্রছাত্রী ২৮০ জন।
শিবরামের আদলে দেশে অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। আমি চাই সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিবরামের অনুকরণে চলুক। এতে দেশে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ঘটবে। শিবরামের পদ্ধতি অনুসরণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিবরামে এনে হাতে-কলমে পাঠদান পদ্ধতি, সার্বিক কার্যক্রম দেখানো ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া মুঠোফোনের মাধ্যমে আমার সাফল্য অর্জনের কলাকৌশল দেশের শিক্ষকদের জানাই।
আমি দীর্ঘ ২৭ বছর এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর অবসর নিয়েছি। আমি কাজপাগল মানুষ। অবসর নিয়েও বসে থাকতে খারাপ লাগছে। সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় হলে অস্থির লাগে। শিক্ষকতা করতে গিয়ে শিক্ষার উদ্ভাবনীশক্তিই আমার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই গাইবান্ধা শহরে নতুন মডেলে একটি বেসরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি। অচিরেই বিদ্যালয়টি চালু করব। আমি চাকরি থেকে অবসর নিলেও শিবরাম বিদ্যালয়টি আগের গতিতেই চলছে। আমার স্থলাভিষিক্ত হয়ে বর্তমান প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান আমার মতো করেই বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। আশা করছি, এই সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন