পেশায় চিকিৎসক। চলনবিল এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলেন একটি হাসপাতাল। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কিছু মানুষের সহায়তায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বাড়ছে। ওই জনপদের বহু দরিদ্র মানুষের এখন ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। তিনি লিখেছেন তাঁর এই কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি

চলনবিল হাসপাতাল

ডা. খলিলুর রহমান | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
ডা. খলিলুর রহমানের গড়া চলনবিল হাসপাতালের বহির্বিভাগ

ডা. খলিলুর রহমানের গড়া চলনবিল হাসপাতালের বহির্বিভাগ

ছবি: আনিসুর রহমান

যে উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন দেশে তার প্রতিফলন ঘটেছে খুবই কম। মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্ন, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রামে এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ওই চিত্রগুলো ছিল খুবই উদ্বেগজনক।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় গ্রামের খেটে খাওয়া হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষের রুগ্ণ চেহারাগুলো হূদয়ে দাগ কাটত, করত ব্যথিত। ছুটি শেষে গ্রামের বাড়িতে ফিরলেই চিকিৎসা না-পাওয়া মানুষের রুগ্ণ-শীর্ণকায় চেহারা ব্যথিত করত সর্বক্ষণ। ভাবতাম, স্বাধীনতার সুফল কি পাচ্ছে এসব মানুষ!
১৯৮২ সাল। সবে ডাক্তারি পাস করেছি। ডাক্তারি পেশার শপথবাক্য শেষ করেই গ্রামে ফিরি। তখন গুরুদাসপুর উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। চলনবিলবেষ্টিত খুবজীপুর ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী সড়কটি ছিল মেঠোপথ। হেঁটে চলাচল করা যেত। গ্রাম থেকে উপজেলা সদরে যেতে আত্রাই ও নন্দকুঁজা নামের নদী দুটিতে ব্রিজ ছিল না। খেয়ানৌকায় পার হওয়া যেত। এ জন্য চলনবিলের বিরাট জনগোষ্ঠীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
চলনবিলকেন্দ্রিক গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর, বিয়াঘাট, সিংড়া উপজেলার বেড়াবাড়ি, ডাহিয়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ও সগুনা ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ চলনবিলের থই থই পানিতে অনেকটাই বন্দী জীবন যাপন করত। ইচ্ছে করলেই উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদরের হাসপাতালে যেতে পারত না চিকিৎসা নিতে। গ্রাম্য কবিরাজের পানিপড়া ও হাতুড়ে চিকিৎসকের ওষুধই রোগাক্রান্ত মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল। এ কারণে রোগ-শোকে ভুগে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করত মানুষ। চোখের সামনে মানুষের ওই করুণ চিত্র দেখে দেখে অসহনীয় যন্ত্রণা পেতে থাকি।
১৯৯৭ সালের দিকে খুবজীপুর স্কুলে সাবেক পরিষদের একটি মিটিংয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করার আগ্রহ প্রকাশ করি। একই বছরের ২৫ জুলাই হাসপাতালটি চালু করার ভাবনা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, চলনবিলের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু একটা করা। অবশেষে ওই বছরই এলাকার কৃতী সন্তান প্রকৌশলী সামছুল হক উদ্বোধন করেন ‘চলনবিল হাসপাতাল’।
খুবজীপুর স্কুলের একটি কক্ষে অস্থায়ীভাবে হাসপাতালটি চালু হয়। প্রায় দুই-তিন বছর সেখানে ফ্রি চিকিৎসা দিই নিজেই। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে থেকে মানবিক ওই সেবা কার্যক্রম দেখে এলাকার সুশীল সমাজ, ধনাঢ্য, হূদয়বান মানুষ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে থাকেন।
স্থানীয় শ্রীপুর আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজগার হোসেন হাসপাতালটির জন্য দুই কাঠা জমি দান করেন। এরপর আর থেমে থাকেনি। সবার সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি পাকাঘরসহ বারান্দা। নিয়োগ করা হয়েছে পিয়ন, নৈশপ্রহরী। সেখানে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার চলনবিলে গরিব শ্রেণীর মানুষদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ জন্য একজন খণ্ডকালীন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপত্র বাবদ একজন রোগীর কাছ থেকে ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন করে রোগী সেবা গ্রহণ করেন। জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগের ব্যবস্থাপত্রসহ সাধ্যমতো ওষুধ দেওয়া হয় আগত রোগীদের। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এক্স-রে যন্ত্র ও প্যাথলজিক্যাল ব্যবস্থা নেই হাসপাতালটিতে। হাসপাতালটির অবকাঠামোগত উন্নয়নে স্থানীয় সাংসদ আবদুল কুদ্দুস ও খুবজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. শরীফুল ইসলাম সহযোগিতা করেছেন।
১৫ বছর ধরে হাসপাতালটি চলছে। বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। বাড়ছে খরচ। কিন্তু খরচ মেটাতে অনুদান বাড়ছে না। ডাক্তার, নৈশপ্রহরী, পিয়ন ও বিদ্যুতের খরচ মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকা প্রতি মাসে ব্যয় হয় হাসপাতালটিতে। রোগীপ্রতি ২০ টাকা করে নেওয়ার ফলে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকার মতো আসে। অবশিষ্ট টাকা হাসপাতালে ভর্তুকি দিতে হয়।
আমাদের এই হাসপাতাল নিয়ে প্রথম আলোয় বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের পর এলাকায় সাড়া পড়ে যায়। এ উদ্যোগে সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
চলনবিল হাসপাতালটি যাত্রা শুরু করার পর বছরে গড়ে চার-পাঁচ হাজার টাকার মতো অনুদান পাওয়া যায়। এ কারণে হাসপাতালটিতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া হাসপাতালটি চালুর পর থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে কোনো সহায়তা মেলেনি। চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বাইরে কোনো উদ্দেশ্যও নেই। যত দিন পারি চলনবিলের দুস্থ মানুষের জন্য এই সেবা দিয়ে যাব।
এদিকে গত ১৫ বছরে চলনবিলের অবহেলিত ওই জনপদের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে। পরিবর্তন ঘটেছে বিলজনপদের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার। ইউনিয়ন সদরে একটি করে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো ডাক্তার নিয়মিত থাকেন না। সেবাবঞ্চিত হয় গ্রামের মানুষ। আশ্রয়স্থল হিসেবে চলনবিল হাসপাতালে আসে মানুষ। গ্রামের মানুষের চাহিদা মেটাতে হাসপাতালটিতে সার্বক্ষণিক একজন এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগসহ এক্স-রে মেশিন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্যাথলজিক্যাল সুবিধা চালু করা দরকার। বর্তমান বাজারব্যবস্থায় একজন সার্বক্ষণিক ডাক্তার রাখতে হলে তাঁকে মাসে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা দেওয়া দরকার। পাশাপাশি রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি এক্স-রে মেশিন, টেকনিশিয়ান, রক্ত, মল-মূত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা জরুরি। ওই সব চাহিদা মেটানো গেলে চলনবিল জনপদের প্রায় ৩০ গ্রামের অসহায়-দুস্থ মানুষকে কষ্ট করে উপজেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হবে না। কমবে দুর্ভোগ, সাশ্রয় হবে অর্থ ও সময়। দেশের বিত্তশালীরা যদি এগিয়ে আসেন তবে শুধু চলনবিল নয়, দেশব্যাপী এ ধরনের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে এলাকার গরিব-দুস্থদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যাবে অনেকটাই। সেই সঙ্গে সরকারের ওপর চাপও কমবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখেছি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে বাংলাদেশকে ভালোবেসেছি। কষ্টে অর্জিত এই দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলছি। জীবদ্দশায় চলনবিলের মানুষের জন্য ন্যূনতম ঋণ শোধ করতে চাই চলনবিল হাসপাতালকে ঘিরে।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন