টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ঘনবসতিপূর্ণ বল্লা গ্রামে থাকেন। ঘরে ঘরে তাঁত, সচ্ছল মানুষ। কিন্তু ডুবে আছে অশিক্ষার অন্ধকারে। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই আশপাশের মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার কাজ শুরু করেন। ‘পাগলামি’ বলে ঠাট্টা করে কেউ কেউ। সবকিছু তুচ্ছ করে তাঁর কার্যক্রমকে আন্দোলনে রূপ দিতে সচেষ্ট হন। গত ১৮ বছরে ১৫ হাজার মানুষকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। নিজেই জানাচ্ছেন তাঁর আন্দোলনের সাতকাহন

বাধা মানেনি আন্দোলন

আকবর আলী | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
নিজের গড়া স্কুলে পড়াচ্ছেন আকবর আলী

নিজের গড়া স্কুলে পড়াচ্ছেন আকবর আলী

ছবি: প্রথম আলো

তখন ১৯৯১ সাল। পড়ি অষ্টম শ্রেণীতে। এক সকালে বাড়ির পাশে এক দোকানের সামনে বসে আছি। একটা ছোট্ট শিশু এক টাকা নিয়ে দোকানে আসে। ওই টাকায় একটি পাউরুটি কিনে খুশিতে লাফাতে লাফাতে বাড়ি চলে যায়। কিছুক্ষণ পরই শিশুটিকে তার বাবা কান ধরে দোকানে নিয়ে আসেন। দোকানিকে বলেন, ‘ওকে বিড়ি আনতে পাঠিয়েছিলাম আর ও কিনা পাউরুটি নিয়ে গেছে।’ রুটিটি ফেরত দিয়ে বিড়ি নিয়ে তিনি বাড়ির দিকে রওনা হন। শিশুটিও কাঁদতে কাঁদতে বাবার পিছু পিছু চলে যায়।
ঘটনাটি আহামরি তেমন কিছু নয়। কিন্তু এতেই আমার মনে দাগ কাটে। মনটা খারাপ হয়ে যায়। মনে হয়, লেখাপড়া জানে না বলেই বয়স্ক লোকটির আজ এ অবস্থা। ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে ছেলের কেনা ওই পাউরুটি ফেরত দিয়ে নেশার বিড়ি কিনলেন। সেই দিনই সংকল্প করি, হতভাগা এসব মানুষের অবস্থা পাল্টাতে হবে। আর এ জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় তাঁদের লেখাপড়া শেখাতে হবে।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামে আমাদের বাড়ি। ঘন বসতিপূর্ণ গ্রামটির ঘরে ঘরে তাঁত। গ্রামে ঢুকলে তাঁতের খট খট শব্দ জানিয়ে দেয় জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে এখানকার সবাই খুব ব্যস্ত। গ্রামের স্থানীয় অধিবাসীরা ছাড়াও বাইরে থেকেও প্রচুর মানুষ আসেন এই তাঁতের কাজ করতে। আর্থিকভাবে এ গ্রামের মানুষ সচ্ছল। তবে অধিকাংশই লেখাপড়া জানেন না।
এমন এক অবস্থায় ১৯৯৪-এ এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই আমাদের বাড়ির আশপাশে থাকেন সে রকম কিছু মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া শুরু করি। তখন অনেকেই আমার এ উদ্যোগকে ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের ঠাট্টা-টিটকারিও শুরু করেন। কেউ কেউ বলতেন, ‘গরিব মানুষের ছেলে হয়ে এই পাগলামির দরকার নাই।’ কেউ বা পরামর্শ দিতেন এর চেয়ে দুই ব্যাচ টিউশনি করার। তাতে বরং কিছু টাকা আসবে। কিন্তু আমি এসবে কান না দিয়ে নিজের মতো করে ওই বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়মিতভাবে পড়াতে থাকি।
মাত্র কয়েক মাসেই ১০-১২ জনকে তাঁদের নাম-ঠিকানা লেখা, চিঠি পড়া ইত্যাদি শেখাতে সক্ষম হই। এতে আমার প্রতি অনেকের আস্থা আসে। ক্রমেই বাড়তে থাকে শিক্ষার্থী। চার বছর এভাবেই চলতে থাকে আমার পাঠদান কার্যক্রম। ’৯৮ সালে নিজেদের বাড়ির একটি কক্ষে চালু করি ‘প্রজন্ম নাইট স্কুল’। প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্কুলে তিন ধাপে (শিফট) ক্লাস করাই। যাঁরা অক্ষরের সঙ্গে একেবারেই পরিচিত নন তাঁদের জন্য প্রথম শিফট। তাঁদের অক্ষর পরিচিতি ও নাম লেখা শেখাই। দ্বিতীয় শিফটে আছেন যাঁরা অক্ষর চেনেন ও কোনো রকমে নাম লিখতে পারেন। এই শিফটে তাঁদের নাম, ঠিকানা, মাস, বারের নাম ইত্যাদি লিখতে ও পড়তে শেখাই। আর তৃতীয় শিফটে কিছুটা দক্ষ এমন শিক্ষার্থীদের চিঠি লেখা, পত্রিকা পড়া, যোগ-বিয়োগসহ প্রাথমিক হিসাব কষা শেখাই।
এদিকে সারা দিন টিউশনি আর তাঁতের সুতা কাটার কাজ করে যা পাই, তা দিয়ে চলে আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানের সংসার। সংসারের খরচ বাঁচিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে স্কুলটি চালাই। প্রথমদিকে আমার স্ত্রীও এই গণশিক্ষার কাজ ভালোভাবে দেখত না। কিন্তু এখন সব মানিয়ে নিয়েছে। পরে তাঁর উৎসাহে পার্শ্ববর্তী টেঙ্গুরিয়া গ্রামের নিরক্ষর নারীদের ক্লাসের ব্যবস্থা করি। আমার স্ত্রী এখন তাঁদের ক্লাস নেয়। আমার এই স্কুলে উৎসাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী গোপালপুর উপজেলার কিছু যুবক তাঁদের এলাকায়ও নাইট স্কুল স্থাপন করেছেন। অক্ষরজ্ঞান দিচ্ছেন নিরক্ষর ব্যক্তিদের। এই যুবকেরা আমার কাছ থেকে পরামর্শ নেন। আমি আমার এই আন্দোলন সফল করতে কিছু স্লোগানও তৈরি করেছি। যেমন—‘পাড়ায় পাড়ায় নাইট স্কুল গড়ো, নিরক্ষরতা দূর করো’, ‘দিনে কাজ, রাতে পড়ি, নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়ি’, ‘আর নয় টিপসই, লিখতে পারব নাম-ঠিকানা, পড়তে পারব বই, আমরা মূর্খ বাঙালি নই’ ইত্যাদি।
আমি বিশ্বাস করি, লেখাপড়া জানলে একজন মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি দেশ ও দশের সম্পর্কে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এই বিশ্বাস আমার আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
নানা বাধা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এই আন্দোলন থেকে পিছু হটিনি আমি। গত ১৮ বছরে অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছি। এইচএসসি পাসের পর স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু অর্থাভাবে লেখাপড়া শেষ করার স্বপ্ন আমার অধরাই থেকে গেছে। জীবিকার তাগিদে গ্রামে চায়ের দোকানও দিয়েছি। তবে অভাব-অনটন পিছু ছাড়েনি। যত দিন বেঁচে থাকব, মানুষকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করার কাজ করে যাব। শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থীরা যদি তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় নিরক্ষর মানুষের অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন, তবে অচিরেই নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। আমাদের কেবল সরকার কিংবা বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না। আমরা যে যেখানে, যে অবস্থায় আছি, যদি আশপাশের মানুষকে নিজ দায়িত্বে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করে তুলি, তবে একদিন দেখা যাবে আমাদের চারপাশের সবাই লিখতে-পড়তে পারছেন। সচেতন হয়ে উঠছেন। ভূমিকা রাখছেন সমাজ, জাতি ও দেশ গঠনে।
আমার এই কর্মকাণ্ডের খবর ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পাতায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। এরপর দেশ-বিদেশের বহু মানুষ আমার খোঁজখবর করে, আমাকে উৎসাহ দেয়, সহযোগিতা করে। মানুষের এই ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়ে আনন্দে আমার বুক ভরে যায়।
নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই বলে সব স্বপ্নও ফিকে হয়ে যায়নি। এখন আমার স্বপ্ন, গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কম্পিউটারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। কারণ, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হলে প্রতিটি শিক্ষিত মানুষকেই কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হবে। অদম্য স্পৃহা আর নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে এভাবেই হয়তো আমরা একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হব।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন