বিষমুক্ত ফসল চাষের জন্য তিনি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ফসলে-খাদ্যে বিষের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন বীর যোদ্ধার মতো। তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু চাষি এখন বিষহীন সবজিসহ কৃষিপণ্য চাষ করছেন। তিনি জানাচ্ছেন তাঁর যুদ্ধবৃত্তান্ত
আমার যুদ্ধ সর্বনাশা বিষের বিরুদ্ধে
গিরিশ চন্দ্র রায়: বিষমুক্ত সবজি ফলাতে উত্সাহিত করছেন গ্রামবাসীদের
ছবি: প্রথম আলো
জন্ম আমার রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বাছুরবান্ধা গ্রামে। নাম গিরিশ চন্দ্র রায়। ভালোবেসে সবাই ডাকে কৃষকের ‘গ্যারেজ’ বলে। আমি তাদের ডাকে খুশি হই। অভাবের কারণে চতুর্থ শ্রেণীর পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। অনেকটা ভবঘুরে জীবন ছিল আমার, এখন নেই। এখন আমার যুদ্ধ সর্বনাশা বিষের বিরুদ্ধে। সকাল-বিকেল পাঠশালায় বসি, কৃষকদের কষ্ট-দুঃখের কথাও শুনি। বিষমুক্ত ফসল চাষের পরামর্শ দিই।
সর্বনাশা বিষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করি প্রায় এক যুগ আগে। তখন গ্রামের চারদিকে কীটনাশকের উপকারিতার জয়গান। ১৯৯৮ সালে খেতে কীটনাশক ছিটানো সবজি খেয়ে আমার দুটি ছাগল মারা যায়। খুবই কষ্ট পাই আমি। ভাবি, যে জিনিস ফসলে দিলে পোকা মরে, ছাগল মরে, তা খেলে তো মানুষেরও ক্ষতি হয়। পরিবেশের ক্ষতি হবে।
একদিন প্রতিজ্ঞা করি কীটনাশক ছাড়া ফসল চাষ করব। আমাকে দেখে অন্য কৃষকেরাও বিষমুক্ত ফসলের চাষ করবেন। এ ভাবনা থেকে ১৯৯৯ সালে ১৭ শতক জমিতে বেগুনের চাষ করি। ফসল পোকা নষ্ট করে ফেলে। গ্রামের লোকজন হাসাহাসি শুরু করে। নিজের বউও রাগারাগি করে, ঝগড়াও হয়। অভিমান করে আমি যাই গঙ্গাচড়া উপজেলার লালচাঁদপুর গ্রামে ছোট বোন গীতা রানীর বাড়িতে। সেখানে দেখি এনামুল হক নামের এক কৃষক বেগুনখেতে বাঁশের খুঁটির মধ্যে ঝুলানো প্লাস্টিকের কৌটায় কী যেন দিচ্ছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, ওটা নাকি পোকা মারার ফাঁদ। তিনি আমার কথা শুনে বিষমুক্ত সবজি চাষের কৌশল শেখান। বাড়ি এসে প্রায় চার মাস পর ১০ শতক জমিতে করলার আবাদ করি। এনামুলের পরামর্শে পোকা দমনে খেতে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বসাই। কীটনাশক ছাড়াই করলাখেত সবুজে ভরে ওঠে। বিক্রি করে খরচ উঠেও লাভ হয় আট হাজার টাকা। বিষয়টি শুনে আমার বাড়িতে আসেন তারাগঞ্জের কৃষি কর্মকর্তা আলী আজম। তিনি আমাকে প্রায় এক মাস পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক ব্যবহার ও আধুনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষের কৌশল শেখান।
শুরুর দিকে গ্রামের কৃষকদের কীটনাশক ছাড়া ফসল চাষ করতে বললে সবাই হাসি-ঠাট্টা করেন। অনেক বোঝানোর পর রাজি হন চাচাতো ভাই অতুলচন্দ্র ও প্রফুল্লচন্দ্র। তবে শর্ত দেন, পোকার কারণে ফসল নষ্ট হলে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আমি রাজি হই। ৪০ শতকে তাঁরা রাসায়নিক সার ছাড়া করলার চাষ করেন। পোকা দমনে বিষ ব্যবহার না করে খেতে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বসান। ফলন খুব ভালো হয়। একেকটি করলার ওজন হয় ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত। এবার গ্রামের কয়েকজন কৃষক আমার কাছে পরামর্শের জন্য আসেন। আমি তাঁদের কৌশল শিখিয়ে দিই, বিষমুক্ত সবজি চাষ করে তাঁরাও লাভবান হন। বিষয়টি জানাজানি হলে দলে দলে কৃষক আমার বাড়িতে পরামর্শের জন্য আসতে শুরু করেন। ২০০০ সালে নিজের টাকায় ৪০ হাত একটি টিনের ঘর বানাই। কৃষকদের জন্য চালু করি কৃষি পাঠশালা। এখানে সপ্তাহে এক দিন কৃষকদের খেত-খামারে পোকার আক্রমণ, পরিমিত সারের ব্যবহার, জমি তৈরি, বীজ সংরক্ষণ, কম্পোস্ট সার তৈরি, মাছ চাষ, বিষমুক্ত সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি, গাভি-ছাগল পালনের কৌশল শেখাই। এখন আমার গ্রামের কৃষকেরা বিষমুক্ত ফসলের চাষ করছেন। নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করছেন বীজ। তৈরি করেন কম্পোস্ট সার। বসতভিটায় সবজি, জমির আইলেও ফলদ গাছ লাগাচ্ছেন। কোনটা আসল আর কোনটা ভেজাল সার তাও এখন তাঁরা চেনেন।
কৃষকদের নিয়ে আমি একটা সমিতি করেছি। প্রতি আমন-বোরো মৌসুমে গ্রামের কৃষকদের পুঁজির অভাব হয়। ফসল চাষ করার জন্য তাঁরা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া সুদে ঋণ নেন। পানির দামে ফসল বেচে তা শোধ করেন। কৃষকদের লাভ থাকে না। একদিন আমি কৃষকদের ডেকে পাঠশালায় বোঝালাম, সবাই মিলে একটা সমিতি করি, উপকার হবে। সবাই সাড়া দেন, ১০ টাকা করে সপ্তাহে সঞ্চয় দিয়ে সমিতির সূচনা হয়। নাম দেওয়া হয় বাছুরবান্ধা কৃষক সমবায় সমিতি। ২৫০ জন সদস্য সপ্তাহে ১০ টাকা করে এখনো সঞ্চয় জমা দেন। প্রতি মৌসুমে তাঁরা এ সমিতি থেকে ঋণ নেন। এখন সমিতির তহবিলে আট লাখ টাকা আছে। রাস্তায় লাগানো আছে ১৫ হাজার ফলের গাছ। পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছি। সমিতির আয়ের টাকায় গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করছি। গরিব ঘরের মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করছি।
বিষের বিরুদ্ধে আমার এই যুদ্ধ নিয়ে প্রথম আলোয় ‘কিষান-কিষানীদের পাঠশালা’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নানা জায়গার নানা মানুষ আমাকে অভিনন্দন জানান, উৎসাহ দেন।
বিভিন্ন উপজেলা থেকে দলে দলে কৃষক এখন আমার পাঠশালা দেখতে আসেন। ইথিওপিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ট্যামরায় সেগাইয়ি ও আমাদের দেশের কৃষি বিভাগের পাঁচজন মহাপরিচালকও পাঠশালায় এসেছিলেন। তাঁরা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ১০ বছরে আমি ১০ হাজার ফলদ গাছের চারা এলাকাবাসীর মধ্যে বিতরণ করেছি।
আমরা দেশের কৃষকেরা মাটি থেকে ফসল পাচ্ছি, জীবন ধারণ করছি, আবার আমরাই এই মাটিকে ধ্বংস করছি। মাটিতে ভেজাল সার, কীটনাশক ব্যবহার করছি। ক্ষতি করছি পরিবেশের। শহরে বাস করে এমন নামীদামি ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি এবং আমলাদের সহায়তায় এক অশুভ শক্তি আমাদের সোনাফলা মাটি শেষ করছে। তারা বালু আর লবণের সঙ্গে রং মিশিয়ে ভেজাল পটাশ সার এবং সিমেন্ট ও বালু জমাট করে ভেজাল টিএসপি সার তৈরি করে কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এ অশুভ শক্তিকে ঠেকাতে সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকদের সচেতন হতে হবে।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






