শিরোনাম:

কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বাল্যবিবাহ ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৮৮টি বাল্যবিবাহ রোধ করেছেন। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই ছুটে যান। অভিভাবকদের বোঝান। প্রতিরোধের মুখোমুখিও হন। প্রয়োজনে প্রশাসনের সহায়তা নেন। সমাজমনস্ক কর্মিষ্ঠ এই মানুষটি হয়ে উঠেছেন এলাকার গর্ব। তাঁর নিজের বয়ানেই জানুন সেই সমাজ-সংগ্রামের কথা

কিশোরীরা এখন নিজেরাই এগিয়ে আসছে

শিবুপদ বিশ্বাস | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
শিবুপদ বিশ্বাস: বাল্যবিবাহের কুফল বোঝাচ্ছেন মেয়েদের

শিবুপদ বিশ্বাস: বাল্যবিবাহের কুফল বোঝাচ্ছেন মেয়েদের

ছবি: আজাদ রহমান

আসমানী ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। তার বাবা মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন। কিন্তু আসমানী বিয়েতে রাজি নয়। পরিবারের চাপে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। এমন সময় সে ফোন করে ঘটনাটি জানায়। তাৎক্ষণিক ছুটে গিয়ে বিয়েটি বন্ধ করেছি। এখন আসমানী সপ্তম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে। একইভাবে নিজের বিয়ে বন্ধ করার জন্য ফোন করে রেক্সোনা খাতুন, কিশোরী রসুলা। তাদের মতো অনেকেই এখন আমাকে ফোন করে। তারা অনুরোধ করে বিয়ে বন্ধ করার। বলে, ‘শিবুদা, আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। এই অবস্থায় বিয়ে করে নিজের জীবনটা নষ্ট করতে চাই না। কিন্তু পরিবারের বিরুদ্ধে আমাদের কিছু বলারও নেই। আপনি এসে আমাদের বিয়েটা বন্ধ করেন।’ এই ফোনগুলো এখন আমার কাজে আরও বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে আমার বাল্যবিবাহ বন্ধ কার্যক্রম নিয়ে প্রথম আলোয় বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের পর।
বাল্যবিবাহ বন্ধের এ উদ্যোগের সংবাদ প্রকাশের পর সমাজের মানুষ অনেক সচেতন হয়েছেন। বিশেষ করে কিশোরী মেয়েরা বুঝতে পেরেছে অল্প বয়সে বিয়ের খারাপ দিকগুলো। তাই তারা নিজেরাই এখন নিজেদের বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য যোগাযোগ করে। আর আমিও তাদের কথা চিন্তা করে গোটা উপজেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলেছি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে। এখন কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পাওয়ামাত্র ছুটে যাই। যেভাবেই হোক বিয়ে বন্ধ করি। প্রয়োজনে প্রশাসনের সহযোগিতা নিই।
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে আমার জন্ম। আমার গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকা দরিদ্রপ্রধান হওয়ায় এখানে অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়ার একটা প্রচলন ছিল, যা আমাকে খুব কষ্ট দিত। আমি প্রায়ই দেখতাম বাবা-মা তাঁদের মাত্র ১০-১২ বছরের বয়সের ছেলেমেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করছে, যারা অল্প দিনেই মা হয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। আবার অনেকে পারিবারিক কলহে জড়িয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসছে। এই দেখে আমি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে তৎপরতা শুরু করি। ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমি ১৮৮টি বাল্যবিবাহ ঠেকাতে পেরেছি, যাদের মধ্যে অনেক মেয়ে এখন পড়ালেখা করছে। অনেকে প্রাপ্ত বয়স হওয়ার পর বিয়ে করেছে।
আমার বয়স যখন ১৪-১৫ তখন থেকেই সমাজের কাজ করার একটা আগ্রহ ছিল মনের মধ্যে। ১৯৮১ সালে স্থানীয় মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েই যোগদান করি বাম দলের ছাত্রসংগঠনে। ইচ্ছা ছিল নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের কল্যাণে কাজ করার। পরে সেই কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএ পাস করি। এই পড়ালেখার পাশাপাশি নিজেকে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রেখেছিলাম। মধুগঞ্জ এলাকায় ছিল এ অঞ্চলের প্রবীণ ও খ্যাতিমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ মাহমুদুল হক মনি পিরের বাড়ি। ছাত্র থাকা অবস্থায় এলাকায় যুবক ছেলেদের নিয়ে মনি পির স্মৃতি সংসদ গড়ে তুলি। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি দীর্ঘদিন। আর এই সংগঠনের মাধ্যমে রক্তদান কর্মসূচি, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অর্থের অভাবে কারও মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, এমন খবর পেলে সেখানে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে যাওয়া ছিল আমাদের কাজ। একসময় মাথায় আসে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার পরিকল্পনা।
২০০৪ সালে আমাদের পাড়ার অধীর দাসের দুই মেয়ে অর্পণা দাস ও অনিতা দাসের বিয়ের আয়োজন চলছে। অর্পণার বয়স ১২ আর অনিতার ১০। দুই বোনকে একসঙ্গে বিয়ে দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন অধীর দাস। আমাদের সমাজে এখনো দাস সম্প্রদায়ের মেয়েদের ছোটবেলায় বিয়ে দেওয়া হয়। যে কারণে ওই সম্প্রদায়ের মেয়েরা এটা মেনে নেয়। এই খবর পেয়ে ছুটে যাই সেই বাড়িতে। ছোট ছোট দুটি মেয়ের বিয়ে কেন দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পরিবারের লোকজন কোনো উত্তর দিতে পারেন না। একপ্রকার বুঝিয়ে বিয়ে দুটো বন্ধ করি। ঘটনাটি ২০০৪ সালের, এখান থেকেই শুরু আমার বাল্যবিবাহ বন্ধের কার্যক্রম। প্রথম দিকে আইন সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল না, যে কারণে অনেক অভিভাবক পাত্তা দিতে চাইতেন না। কিন্তু খারাপ দিকগুলো বুঝিয়ে বন্ধ করতাম বাল্যবিবাহ। এখন আইন সম্পর্কে ধারণা দিই, অনেক ক্ষেত্রে ভয় দেখাই। তারপর অভিভাবকেরা তাঁদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
অর্পণা ও অনিতার বিয়ে বন্ধ করার পর সারাক্ষণ আমার মনের মধ্যে একটা আনন্দ কাজ করত। মনে হতো মেয়ে দুটোর জীবনের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছি। এই উপলব্ধি থেকেই শুরু করি বাল্যবিবাহ বন্ধ কার্যক্রম। একটি সময় আসে যখন শতাধিক বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সক্ষম হই। আর তখনই প্রথম আলো বিষয়টি সবার নজরে আনে। পত্রিকায় আমার এই কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা প্রকাশের পর এই কাজে আরও আগ্রহ বেড়ে যায়। পেতে শুরু করি সবার সহযোগিতা। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে আকৃষ্ট করেছে তা হচ্ছে পত্রিকা পড়ে গোটা এলাকার কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিশোরী মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিতে গেলে এখন তারা নিজেরাই ফোন করে বিয়ে বন্ধ করার অনুরোধ জানায়। তাই কিশোরীদের আরও বেশি করে সচেতন করতে শুরু করেছি পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা সভা করে।
কালীগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের ইলিয়াস হোসেনের অষ্টম শ্রেণীতে পড়া মেয়ে রোজিনা খাতুন (১৩), নিয়ামতপুর গ্রামের শের আলীর মেয়ে রুমানা খাতুন (১২), শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার সন্তোষ দাসের মেয়ে কাকলী দাস (৯), নিয়ামতপুর গ্রামের সোবহার হোসেনের মেয়ে খোদেজা পারভীন (১৪), দাদপুর গ্রামের সত্য দাসের মেয়ে লিপিকা দাস (৯), আবু বক্কর বিশ্বাসের মেয়ে রেশমা খাতুন (১৩), নওদাপাড়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেনের মেয়ে লতিফা খাতুন (১৩), মোবারকগঞ্জ চিনিকল কলোনির সেলিম খানের মেয়ে রাজিয়া খাতুন (১৩), খড়িকাডাঙ্গা গ্রামের মহিউদ্দিন বিশ্বাসের মেয়ে সাগরিকা খাতুন আদুরী (১২), নাকোবাড়িয়া গ্রামের আবদুল হাকিমের মেয়ে জলি খাতুনসহ (১৩) অনেক মেয়েকে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। যাদের বিয়ে বন্ধ করেছি, তারা আবার পড়ালেখায় মন দিয়েছে।
সংবাদপত্রে খবর ছাপার পর যে কিশোরীরা বিয়ে বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উপজেলার বানুড়িয়া গ্রামের আবদুর রউফের মেয়ে রেক্সোনা খাতুন (১২), নদীপাড়ার আশরাফ হোসেনের মেয়ে আসমানী খাতুন, পারখির্দ্দা গ্রামের ওমর আলীর মেয়ে রসুলা খাতুন, ফয়লা গ্রামের ভবেন দাসের মেয়ে ছন্দা রানী (১২), দামোদরপুর গ্রামের রণজিৎ পালের মেয়ে স্মৃতি রানী পাল, নদীপাড়ার মনোদাসের মেয়ে লীমা দাস (১১), মল্লিকপুর গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেনের মেয়ে মর্জিনা খাতুন, মঙ্গলপোতা গ্রামের সহিদুল ইসলামের মেয়ে কাকলী খাতুন (১৩) ও ভোলপাড়া গ্রামের নূরুল ইসলামের মেয়ে আরিফা খাতুন (১০)। এরা নিজেরাই বিয়ে বন্ধ করার জন্য ফোন করে যোগাযোগ করেছে।
বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গিয়ে কিছু সমস্যায়ও পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনেক ক্ষেত্রে বয়সের সনদ দিয়ে বিয়ের উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে দেন। যেমন পারখির্দ্দা গ্রামের রসুলা খাতুনের বিয়ে বন্ধ করলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম খাঁ তার বয়স সনদ দিয়েছিলেন, যার ওপর ভিত্তি করে পরিবারের লোকজন রসুলার বিয়ের আয়োজন করেন। বিষয়টি জানার পর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় অবহিত করা হয়েছিল। সেখানে চেয়ারম্যান অবশ্য ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া বাল্যবিবাহগুলো সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে হয়। যে কারণে বিয়ের দিন হাজির হতে হয় বিয়ে বন্ধ করতে। এতে অনেক সময় ঝামেলায় পড়ে যেতে হয়। এই ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু সব সময় সেই সহযোগিতা পাওয়া যায় না। আইনের কিছু সংশোধন প্রয়োজন। সবকিছু উপেক্ষা করে কোনো অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের বাল্যবিবাহ দিলে তার যে শাস্তি, তা খুবই লঘু। যে কারণে অনেকে শাস্তির ভয় পান না।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন