বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো

উইলিয়াম কলিস | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
উইলিয়াম কলিস

উইলিয়াম কলিস

ছবি: জাহিদুল ইসলাম

আমি বাংলাদেশে এসেছি ১৯৭৮ সালে। সবে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি। তার পরই চাকরি। এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরি। বাংলাদেশে আমি ‘ফার্স্ট ফিশারিজ প্রজেক্টে’ এসেছিলাম। প্রথমে এসেই ‘ইনডাক্ট ব্রিডিং’য়ের একটি গ্রুপে যুক্ত হলাম। এই প্রযুক্তির মধ্য দিয়েই অ্যাকোয়াকালচার শুরু হয়। আমি সৌভাগ্যবান। কারণ, যে দলটি এই প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে, আমি সেই দলে ছিলাম। আমাদের দলটি এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পরিচিতি ঘটিয়েছে।
সে সময় আমি অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁদের মধ্যে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে স্যানকোয়েজ রাজ, এ কিউ চৌধুরী, এস এম চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, ইউসুফ আলী ও আতাউর রহমানকে। এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ, না আমার ভাগ্য, আমি জানি না। কিন্তু আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান যে শুরুর দিকেই অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করেছি। আর তাঁদের জন্যই এই কাজে সম্পৃক্ত হয়েছি।
সে সময় আন্তর্জাতিকভাবেই বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা ছিল। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। তবু আমি এ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না। তারপর আমি যখন এ দেশে এলাম, আমার ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। ১৯৭৮ সালে আমি ঢাকা শহরের যে অপূর্ব সৌন্দর্য দেখেছি, তা অতুলনীয়। সে সময়ের ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম একটি সুন্দর শহর ছিল। চারদিকে সবুজ, শ্যামল। মিষ্টি বাতাস। পরিচ্ছন্ন শহর। বসবাসের উপযুক্ত একটা পরিবেশ যে রকম হতে পারে, ঠিক তেমনি। জনগণও অনেক সরল। আবার গ্রামীণ এলাকার মানুষেরাও অনেক চমৎকার। আমি মনে করি, এ দেশের মানুষ অন্য দেশের মানুষের মতোই। ঢাকা, দিল্লি, নিউইয়র্ক, ব্যাংকক—সব দেশের মানুষ আসলে একরকম। আসলে মানুষ যে দেশেরই হোক, তার একটাই পরিচয়, সে মানুষ। তবে আমি একটা স্বীকারোক্তি করতে চাই, আমার জীবনে যত ভালো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, তাঁরা সবাই বাংলাদেশি।
আমার মনে পড়ে, তরুণ বয়সে আমরা চিন্তা করতাম, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎটা কেমন হবে! খাদ্যনিরাপত্তা পাবে কি না এ দেশের জনগণ, এই চিন্তা আমাদের অস্থির করে রাখত। এ দেশের সম্ভাবনা কতটুকু? দেশটা এগোতে পারবে কি না। দেশটির ভবিষ্যৎ কি আসলেই কঠিন? এ রকম নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেত। আর আজকের দিনে! কত পরিবর্তন হয়ে গেছে বাংলাদেশের! বাংলাদেশ খুব শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। বাংলাদেশ কত সহজেই স্বাবলম্বী হয়ে গেল! খাদ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অনেকাংশেই স্বাবলম্বী। এটা আশ্চর্যজনক। ১৯৭৮ সালে যে বাংলাদেশকে দেখেছি, আজকের বাংলাদেশ অনেক উন্নত। এই পরিবর্তনটা হয়তো এ দেশের তরুণদের চোখে পড়ছে না। অনুভব করতে পারছে না। তবে এই পরিবর্তন শুধু সরকার করেনি, এই অগ্রগতিতে জনগণও সমান অংশীদার। আমি নেপাল, পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে কাজ করেছি। আমি লক্ষ করেছি, বাংলাদেশের মানুষের মতো এত পরিশ্রমী নয় সেসব দেশের জনগণ। আমার অফিসের সহকর্মীরা পাঁচটার পরও কাজ করতে চায়। শুক্রবার কাজের কথা বললেও তাদের কোনো আপত্তি থাকে না। কাজ করার জন্য এত আন্তরিকতা, একাগ্রতা আমি অন্য কোথাও দেখিনি। এটা এই দেশের জনগণের বৈশিষ্ট্য।
ফিশারিজের ক্ষেত্রে আমি বলতে চাই, অ্যাকোয়াকালচার (পুকুরে মাছ চাষ) ও অভ্যন্তরীণ নদীনালা থেকে প্রাপ্ত মাছ—এই দুই ধরনের ফিশারিজ রয়েছে এখানে। অ্যাকোয়াকালচারের ক্ষেত্রে দেখি, গত ২০ বছরে এই ক্ষেত্রে দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। উৎপাদন বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে মাছ চাষে অনেক কাজ হচ্ছে। সার্বিকভাবেই এই সেক্টরের অনেক উন্নতি হয়েছে। ১৯৭৮ সালে দেখেছি, স্থানীয় জনগণ হাওর-বাঁওড়, বিল, নদীনালা থেকে যে মাছ পাওয়া যেত, সেটাই খাদ্যতালিকায় রাখত। বর্তমানে এই চিত্রটা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন সবাই পুকুরে মাছ চাষ করে এবং পুকুরের মাছই তাদের খাবারের তালিকায় রয়েছে। বাজারে এখন যেসব মাছ পাওয়া যায়, অধিকাংশই চাষ করা মাছ। এটা সত্যিকারের পরিবর্তন। এর জন্য আমাদের গর্ব করা উচিত।
তবে আমি প্রাকৃতিক জলাশয়, প্লাবনভূমি ও সামুদ্রিক মাছ নিয়ে সত্যিই চিন্তিত। ইলিশ মাছ নিয়ে এখন সবাই চিন্তিত। সরকারও এই মাছের উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে। তবে ইলিশের ব্যাপারে আরও ভূমিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া অন্য মাছগুলোর ক্ষেত্রে প্রজনন ও বেড়ে ওঠার ব্যাপারে আরও ভূমিকা রাখতে হবে। আমার মনে হয়, সরকার ইলিশ মাছের ক্ষেত্রে যে ধরনের ভূমিকা রাখছে, অন্য মাছের ক্ষেত্রেও এই ভূমিকা রাখা জরুরি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক শতাংশ চাষযোগ্য জমি হারিয়ে যাচ্ছে। এটা নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী চিন্তিত। চাষযোগ্য জমির মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ও রয়েছে। আর এই জলাশয় থেকেই দেশি মাছগুলো পাওয়া যায়। এর ভবিষ্যৎ সত্যিই সংকটাপন্ন। মতিয়া চৌধুরীর মতো আমিও এ নিয়ে চিন্তিত।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এর ভিত্তি সংবিধান। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে গণমাধ্যম। দেশে যদি স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকে, তবে গণতন্ত্র নষ্ট হয়। এ দেশে একটি কার্যকর ও স্বাধীন গণমাধ্যম দরকার। যেকোনো দেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। সে কারণে তারা এগোতেও পারছে না। আমাদের এমন গণমাধ্যম দরকার, যেটা আমাদের চোখ খুলে দেবে, আমাদের প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ব বলবে!
ঠিক প্রথম আলোর মতো। প্রথম আলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। এ দেশে প্রথম আলোর মতো গণমাধ্যমই দরকার, যেখানে পাঠক প্রকৃত খবর পেতে পারে। প্রথম আলো আমাদের নানা ধরনের খবর এনে দেয়। সেই সঙ্গে খবরগুলো দেশব্যাপী ছড়িয়েও দেয়। তাই প্রথম আলোর ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি প্রথম আলোকে শুভেচ্ছা জানাই। সেই সঙ্গে আমি প্রত্যাশা করি, প্রথম আলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সব সময় কাজ করে যাবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
 উইলিয়াম কলিস: মৎস্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন। সাবেক পরিচালক, ওয়ার্ল্ড ফিশ বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন