ক্রিকেট

উজ্জ্বল আলোর নিচে

সৌরভ গাঙ্গুলী | তারিখ: ২৫-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • বাংলাদেশের আশাজাগানিয়া ক্রিকেট দলের উজ্জ্বল তারকারা

    বাংলাদেশের আশাজাগানিয়া ক্রিকেট দলের উজ্জ্বল তারকারা

    ছবি: শামসুল হক

  • সৌরভ গাঙ্গুলী

    সৌরভ গাঙ্গুলী

বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে চলেছে জোরালো পা ফেলে। বিশ্বসেরাদের তালিকায় উঠে আসছেন আমাদের ক্রিকেটাররা। পাচ্ছেন অভাবনীয় সব সাফল্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টির কথা বলছেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী।

বাংলাদেশে আমি প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৮৯ সালে, ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে যুব এশিয়া কাপে খেলতে। সফর শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে, শেষ হয়েছিল ঢাকায়—ওই দেশে যেটি ‘রিকশার শহর’ বলে পরিচিত। সে ছিল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। চট্টগ্রামে কোনো ভালো হোটেল তখন ছিল না, আমাদের থাকতে হয়েছিল একটা অতিথি-নিবাসে। আর যে উইকেটগুলোতে আমরা খেলেছিলাম, তাতে শুরু থেকেই বল টার্ন করতে শুরু করত। এটা বুঝতে একটুও সময় লাগেনি যে এমন একটি দেশে খেলাটা হচ্ছে, এই খেলা সম্পর্কে যাদের খুব বেশি জ্ঞান নেই, তবে সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ ছিল বিপুল। মাঠে যে দর্শক আসত, তারা যে মূলত ফুটবলের দর্শক সেটি বুঝতেও সমস্যা হতো না। ফুটবল আর ক্রিকেটের দর্শকের মানসিকতায় পার্থক্য তো আছেই।
নিজে বাঙালি বলে ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ আমি সব সময়ই খুব উপভোগ করেছি। ভাষা এক, হয়তো এ কারণেই আমি সেখানে প্রচুর সমর্থন পেয়েছি। লোকজন আমাকে তাদেরই একজন ভেবে আপন করে নেয়। বাংলাদেশে গিয়ে মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, যে আতিথেয়তা পেয়েছি, সেটি সত্যি অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে খেলার প্রতি সাধারণ মানুষের মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করেছি। বন্ধুও হয়েছে অনেক, যে বন্ধুত্ব এখনো অম্লান।
ঘটনাচক্রে ভারতের অধিনায়ক হিসেবে আমার যাত্রাও শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে। ওই টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে দারুণ করেছিল, লিডও নিয়ে নিয়েছিল প্রায়। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা ওদের অনভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাউন্সারে জর্জরিত করে জিতে গিয়েছিলাম। ওই সময়ে ক্রিকেট খেলা হতো ঢাকার কেন্দ্রস্থল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে, যেখানে একই সঙ্গে ফুটবলও খেলা হতো। গত কয়েক বছরে ক্রিকেটের সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়েছে। মিরপুরে নতুন যে ক্রিকেট স্টেডিয়াম হয়েছে, সেটি যেকোনো বাংলাদেশিরই গর্ববোধ করার মতো। আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই এখানে আছে। বিশ্ব-ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা যে এখন বাংলাদেশকে যেকোনো শীর্ষ পর্যায়ের টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য উপযুক্ত মনে করে, এতে তাই বিস্ময়ের কিছু নেই। এ কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ আয়োজন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলতেও সারা বিশ্ব থেকে ক্রিকেটাররা ওখানে গিয়েছে। কারণ ওরা জানে, হোটেল ও খেলার সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলার জন্য দারুণ এক জায়গা।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে আমার প্রথম সফরের পর থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়েছেও অনেক। অবকাঠামোর উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড়ও বেরিয়ে আসছে। সাকিব আল হাসান এখন বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। এ গর্ব শুধু সাকিবের একার নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের। সাকিব দুর্দান্ত এক ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটের প্রতিটি সংস্করণেই দেশের পক্ষে দারুণ ওর পারফরম্যান্স। গত বছর আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাফল্যেও ওর বড় ভূমিকা ছিল। কাউন্টি ক্রিকেটে উস্টারশায়ারের হয়েও সাফল্য পেয়েছে। সাকিবের পারফরম্যান্স এবং ক্রিকেট বিশ্ব থেকে পাওয়া স্বীকৃতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে বাধ্য।
বিপিএলেরও একটা ভালো প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার সাফল্যে বিপিএলে অন্য সব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের সঙ্গে খেলা ও মেলামেশার বড় একটা ভূমিকা আছে। ওরা ২০১১ বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছে। ভয়ডরহীন মনে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে বড় দলগুলোকে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে এক ড্রেসিংরুমে থাকাটা তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য দারুণ একটা শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। একজন ক্রিস গেইল, একজন মারলন স্যামুয়েলস, একজন শহীদ আফ্রিদি অথবা বিশ্ব-ক্রিকেটে এমন যেকোনো বড় নামের সঙ্গে একই দলে খেলাটা যেকোনো তরুণের মানসিকতা গড়ে দিতে পারে। অমন বড় বড় তারকার কাছ থেকে দেখে যেকোনো উঠতি তরুণের মনে হয়, ওরাও তো আমার মতোই রক্তমাংসের মানুষ। ওরাও ক্রিকেট খেলে, আমিও খেলি। আমরা একই জগতের লোক।
তবে বাংলাদেশ যদি এখন পর্যন্ত যা অর্জন করেছে, তাতেই আত্মতৃপ্ত হয়ে বাকিটুকু এমনিতেই হয়ে যাবে বলে ভাবে, তা হলে বড় ভুল হবে। সংগঠক, ক্রিকেটার, খেলাপ্রেমী লোকজনের উচিত সম্ভাবনার জায়গাগুলো কাজে লাগানো। বাংলাদেশে ক্লাব-সংস্কৃতি খুব শক্তিশালী, আন্তক্লাব প্রতিদ্বন্দ্বিতাটাও খুব তীব্র। সাধারণ মানুষের মধ্যে আবাহনী ও মোহামেডানের মতো ক্লাবগুলোর প্রচুর সমর্থক আছে। এই ক্লাব টুর্নামেন্টকে ভারতের রঞ্জি ট্রফির মতো রূপ দেওয়া যেতে পারে। এতে প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি বাড়বে এবং ক্রিকেটারদেরও বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেলার অভ্যাস গড়ে উঠবে।
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে বাংলাদেশ যথেষ্টই সমীহ জাগানো দল। তবে বিশ্ব-ক্রিকেটে নিজেদের আরও উঁচুতে তুলে নিতে হলে টেস্ট ক্রিকেটে আরও ভালো করতে হবে। ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচে ভালো পিচ তৈরি করতে হবে; নিষ্প্রাণ উইকেট নয়, ভালো ক্রিকেট উইকেট, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের বাইরেও ভালো খেলার জন্য প্রস্তুত করবে। একবার দেশের বাইরে ভালো করতে শুরু করলে পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের দিকে অন্যভাবে ফিরে তাকাবে। খেলাটি নিয়ে আগ্রহও তখন আরও বাড়বে। আমি নিশ্চিত, দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এসব চিন্তাভাবনা বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্মকর্তাদের মাথায়ও আছে। এসব নিয়ে তারা কাজে নামলে আমার কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের ক্রিকেট ভবিষ্যতে আরও আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
সৌরভ গাঙ্গুলী, ভারত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন