দুর্যোগ মোকাবিলা
বড় দুর্যোগ দ্রুত মোকাবিলা
-
নিল ওয়াকার
-
বাংলাদেশ প্রকৃতিনির্ভর দেশ। প্রকৃতির ভয়ংকর দুর্যোগের মুখে সে উন্মুক্ত। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলায় পৃথিবীর সামনে এই দেশ হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। লিখেছেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নিল ওয়াকার।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। দুর্যোগের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে যে ১৫টি দেশকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে পঞ্চম। দেশটির সামনে কী গভীর ও বহুস্তর চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা এর এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থানের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। নাজুক অবস্থাকে আরও নাজুক করে তোলায় জনঘনত্ব আর দারিদ্র্য হাত ধরাধরি করে চলে। বাংলাদেশের মতো জনঘনত্বপূর্ণ দেশে দরিদ্র মানুষের জীবনযাপনের উপায়গুলো এমনিতেই সীমিত। তাঁরা ঝড়বৃষ্টি, খরা-বন্যা-ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বাস করেন, তাঁদের জমিজমা ও ঘরবাড়ি বিরুদ্ধ প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞ সইতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে; বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির বিষয়গুলো বোঝা একান্তই সহজ। খুব ঘনবসতিপূর্ণ এই স্বল্পোন্নত দেশের উত্তরে হিমালয়ের বরফ গলছে, ফলে এর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদনদীগুলোর পানিপ্রবাহ অপ্রত্যাশিত মাত্রায় বেড়ে গেছে। দক্ষিণে বঙ্গোসাগরের পানির উচ্চতা বাড়ছে, ফলে স্থলভূমি হয়ে আসছে সংকুচিত। পৃথিবীর মধ্যে যে দুটি দেশের জনগণ সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বন্যার শিকার হয়, বাংলাদেশ তার মধ্যে দ্বিতীয়। স্বাভাবিক বৃষ্টির মৌসুমে দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি পানির নিচে চলে যায়। আর ১৯৯৮ সালের মতো প্রবল বন্যা হলে মোট ভূমির ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত প্লাবিত হয়। সহজ ভাষায়, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ুর পরিবর্তন মানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবে আরও ঘন ঘন, সেগুলো হবে আগের চেয়ে বেশি প্রবল আরও প্রলয়ংকরী ও ধ্বংসাত্মক। বাংলাদেশে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করা না হলে যে মূল্য দিতে হতে পারে, বাংলাদেশের জনগণের জন্য তা হবে অত্যন্ত চড়া।
এই অবিশ্বাস্য রকমের চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যেও সুখবর আছে। বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সত্যিকারের সাফল্য অর্জনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্তগুলোর একটি। এ দেশের মানুষের সৃজনশীলতা, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা এবং এই ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। সরকার, জাতিসংঘ ও মানবিক সাহায্যকারী বিভিন্ন সংস্থা উন্নত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের জীবন রক্ষার্থে কাজ করে আসছে। ২০০৫ সালে হিয়োগো ফ্রেমওয়ার্ক অব অ্যাকশনের (এইচএফএ) আওতায় ঝুঁকি হ্রাসকরণ এজেন্ডার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই বাংলাদেশ এ বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগে মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশ দুর্যোগের পর ‘প্রতিকারমূলক মানবিক ত্রাণ’ ব্যবস্থা থেকে সরে এসে গ্রহণ করেছে দুর্যোগ আসার আগেই ‘আগাম সতর্কতামূলক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’র নীতি। একই সঙ্গে জোর দিয়েছে সংকটের অব্যবহিত পরেই প্রতিকার-পুনর্বাসন ও দ্রুত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মিলিত উদ্যোগের ওপর।
এসব যৌথ উদ্যোগের সুফল সময়ের ব্যবধানে স্পষ্টতই ফলেছে। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রাণহানি হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ সালে ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ, আর ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক শ। কার্যকর প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ ও দ্রুত পূর্বাবস্থা পুনরুদ্ধারের একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ পাওয়া যাবে ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭) থেকে। উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অবকাঠামো থাকার ফলে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও জাতীয় প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছিল। স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ে কাজের সমন্বয় ছিল এবং যথাযথ নেতৃত্বের ফলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৩৫ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। অধিকাংশ দুর্যোগকবলিত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারসামগ্রী পৌঁছে গিয়েছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। অতিসম্প্রতি সরকার বেশ উন্নত একটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন পাস করেছে, যার লক্ষ্য দুর্যোগের ঝুঁকিতে নাজুক অবস্থায় বসবাসরত নাগরিকদের আইনগতভাবে ক্ষমতায়িত করা। অতীতে মানবিক ত্রাণকাজে সহযোগিতা-সমন্বয়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দুর্যোগ ও জরুরি প্রতিকারমূলক পদক্ষেপবিষয়ক স্থানীয় পরামর্শক দলকে (লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপ অন ডিজাস্টার অ্যান্ড এমারজেন্সি রেসপন্স—এলসিজিডিইআর) শক্তিশালী করা হয়েছে। এই পরামর্শক দল দুর্যোগ পরিমাপের হাতিয়ারগুলোর কার্যকর ব্যবহার সম্ভব করেছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সুসংগঠিত পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে বিদ্যমান উন্নয়ন সমন্বয় কাঠামোগুলোর পাশাপাশি একটি লাগসই কাঠামো তৈরি করেছে। ইউএনডিপির সহায়তায় ২৭ হাজারের বেশি সরকারি কর্মকর্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যকে দুর্যোগ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা দান করা হচ্ছে।
দুর্যোগের ব্যাপারে বাংলাদেশের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা সম্পর্কে আগাম সতর্কতামূলক তথ্য প্রচার করা হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর জনগোষ্ঠীর জন্য এমন উদ্যোগের গুরুত্ব একবার কল্পনা করে দেখুন। অত্যন্ত নাজুক জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য ১৬ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজে ইউএনডিপি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই সব এলাকার জনগোষ্ঠী দুর্যোগের সময় নিজেদের জীবিকা সুরক্ষার লক্ষ্যে ভবনগুলোর নকশা নিখুঁতকরণে নিজেরাও অংশগ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব এলাকায় খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়েছে, সেসব এলাকার জন্য লবণাক্ততা সহনক্ষম ও খরা-প্রতিরোধী শস্যের জাত উদ্ভাবন ও গ্রহণে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সহায়তা করেছে। একইভাবে উপকূলীয় সবুজ অঞ্চলজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা ও দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসকরণের কাজকে পরস্পর-সংযুক্ত করেছে ইউএনডিপি ও জিইএফ। উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে রোপিত গাছ ও প্যারাবন উজাড়করণের ফলে আটকে পড়া পলিমাটি এখন ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাস ও বর্ধিত জোয়ার থেকে নাজুক জনগোষ্ঠীগুলোকে রক্ষা করে এবং একই সঙ্গে ব্যবহারযোগ্য জমি তৈরি হয়েছে, যা থেকে উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সংস্থান হয়।
তবে এসব সুসংবাদ সত্ত্বেও এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট হুমকি টেকসইভাবে মোকাবিলায় এবং যেকোনো দুর্যোগের পর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন একটি সত্যিকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমনকি, দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ সুসমন্বিত ও কার্যকর হলেও বাংলাদেশের প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের নীতির পরিবর্তে টেকসই উন্নয়নের পথে রূপান্তর ঘটানো।
আর এ দেশের উচ্চমাত্রার নাজুকতা যদি যথেষ্ট নাও হয়, নতুন নতুন অনেক সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জলাবদ্ধতার মতো ধীরগতির দুর্যোগ, যা কয়েক মাস এমনকি বছরের পর বছর ধরে চলে, জনগণের জীবিকা, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর তার গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মানুষ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পনের ঘটনাগুলো ঢাকার মতো শহর এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা নিয়ে তেমন চিন্তাভাবনা করা হয় না। বাংলাদেশের শহর এলাকাগুলোর দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা ও পরিধি হ্রাসকরণে অনেক কাজ করা বাকি রয়েছে। আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে জাতিসংঘের সহায়তায় আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ার প্রোগ্রামের আওতায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স বিভাগের সারা দেশের ১৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাঁরা যেকোনো দুর্যোগের সময় অগ্রবর্তী সহায়ক দল হিসেবে কাজ করবেন। ইউকেএইড ও ইউএনডিপির সহায়তাপুষ্ট আরেকটি কর্মসূচি হলো আরবান পার্টনারশিপ ফর পোভার্টি রিডাকশন (ইউপিপিআর)। এই কর্মসূচির আওতায় শহরাঞ্চলের ৩০ লাখ দরিদ্র মানুষ, বিশেষত অল্পবয়সী ও পূর্ণবয়স্ক নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ উন্নয়ন ও ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করা হচ্ছে।
এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় জরুরিভাবে দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসকরণে এগুলো যথেষ্ট নয়। সেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি হ্রাসকরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেই কেবল নয়, বেসরকারি খাতে নানা ধরনের সৃজনশীল পন্থা উদ্ভাবন; বিশ্ববিদ্যালয়, চিন্তাশালা ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে সক্রিয় শক্তি হিসেবে কর্মরত এনজিওদের গবেষণা ও উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতেও সরকারকে জোরালোভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যেতে হবে। নতুনভাবে জরুরি তাগিদবোধ থেকে আমি দৃঢ়ভাবে আশা করি, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সদাপ্রস্তুত একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার কাজে এ সমাজের সকল স্তরের মানুষ মিলিতভাবে কাজ করবেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
নিল ওয়াকার, যুক্তরাষ্ট্র
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






